ফেব্রুয়ারি
০৭

রসের গুড় পিঁপড়ায় খায়!

Photobucket
ভাবছিলাম রাজনীতি নিয়ে লেখালেখিতে ক’টা দিন বিরতি দেব। অনেক লিখেছি, মাঝে মধ্যে এ নিয়ে লিখ্‌তে গেলে নিজের কাছেই নিজকে অপরাধী মনে হয়। আমি যাদের সমালোচনা করছি তাদেরকেই তো দেশের জনগণ ভোট দিয়ে নির্বাচিত করছে, দেব-দেবীর মত পূঁজা করছে, এমনকি জীবন পর্য্যন্ত উৎসর্গ করতে দ্বিধা করছেনা কেউ কেউ। আমি এমন কি হরিদাস পাল যে তাঁদেরকে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করাব? কিন্তূ প্রতিদিনের দৈনিকগুলো পড়তে গেলে এমন সব খবরে চোখ আটকে যায় যা নিয়ে দু’কলম না লিখলে দিনটাই অসম্পূর্ণ লাগে। অস্থিরতার কথা না হয় বাদই দিলাম।

এঞ্জিনীয়ারিং পড়ার সময় কুতুব নামে আমার এক বন্ধু ছিল। আমি ছিলাম ইলেকট্রিকেলে, ও ছিল সিভিলে। প্রথম বর্ষ শেষ করে দ্বিতীয় বর্ষের শুরুতে রুশ মেয়ের প্রেম ও তাকে বিয়ে করে সংসার শুরু করে দেয় মনের সূখে । বছর না ঘুরতে ফুটফুটে কন্যা সন্তান লাভের মধ্য দিয়ে পরিপূর্ণতা লাভ করে কুতুবের সংসার। সে সূখী, তার সূখে আমরাও সূখী। তবে সব সূখ কাহিনীরই বোধহয় কোথাও না কোথাও শেষ আছে। কুতুবের বেলায়ও এর ব্যতিক্রম হলনা। লেখাপড়া শেষ করে দেশে ফিরে গেল সে। স্ত্রীকে কথা দিয়ে গেল কাগজপত্র ঠিক হলেই নিয়ে যাবে তাদের। স্ত্রী আর কন্যা অপেক্ষার দিন গুনতে থাকে। শীত পেরিয়ে বসন্ত আসে, বসন্ত শেষে গ্রীষ্মের পালা। কুতুবের কাগজ তৈরী আর শেষ হয়না। কোন এক ভরা সন্ধ্যায় কুতুবের স্ত্রী আমাদের হলে এসে উপরের আকাশ মাটিতে নামিয়ে চীৎকার শুরু করে দেয়। তার মতে স্বামী ও কন্যার জনক কুতুবকে লুকিয়ে রেখেছি আমরা। প্রায় প্রতিদিন হাংগামা করতে থাকে প্রতিটা বাংলাদেশীর রুমে গিয়ে। ত্যক্ত বিরক্ত সবাই, শেষ পর্য্যন্ত খবর নিতে বাধ্য হলাম বন্ধু কুতুবের। কুতুব দেশে ফিরে ভাল একটা চাক্‌রী পেয়েছে ও ভাল অংকের যৌতুক নিয়ে বিয়ে করে রীতিমত সূখের সংসার করছে। সেই হতে কুতুব নামটা শুনলে কেমন একটা অবিশ্বাষ ও সন্দেহ দানা বেধে উঠে মনের অজান্তেই (no offense to any other Kutub)।

তেমনি এক কুতুবের কাহিনী পড়লাম আজকের দৈনিক প্রথম আলোতে। মায়ের চল্লিশায় ২৫টা তড়তাজা গরু জবাই করে ১৭৫ মন চালের ভাত দিয়ে ৩০ হাজার অতিথি আপ্যায়ন করেছেন। ভূমি মন্ত্রনালয়ের প্রোটকল অফিসার কুতুব উদ্দিনের বাড়ি শরিয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার নাগেরপারা ইউনিয়নের ছয়গাঁও গ্রামে। সর্বসাকুল্যে অনুষ্ঠানটি সমাধা করতে ব্যয় হয় ৫০ লাখ টাকা। উল্লেখ থাকে এই সেই কুতুব উদ্দিন যাকে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে অবৈধ সম্পদ আয়ের জন্যে গ্রেফতার করা হয়েছিল। সাময়িক ভাবে বরখাস্ত করা হয়েছিল চাকরী হতে। ১৬ মাস জেল খাটার পর মামলার উপর হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ জারি করানোর মধ্য দিয়ে ২০০৯ সালে গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে জামিনে বেরিয়ে আসেন, এবং ফিরে পান হারানো চাকরী। একজন প্রোটকল অফিসারের মাসিক কত টাকা আয় হলে মার চল্লিশায় ৫০ লাখ টাকা ব্যায় করতে পারেন তা হিসাব করার ভার পাঠকদের উপরই ছেড়ে দিলাম। রাজনীতির এমনই এক বিগ ফিশকে চিনতাম যিনি জীবিতাবস্থায় মাকে খরপোষ দেয়া দূরে থাক শারীরিক অত্যাচার পর্য্যন্ত করতেন। সেই মায়ের মৃত্যুর পর তিনি আয়োজন করেছিলেন চোখ ধাঁধাঁনো এক চল্লিশা। আশাকরি প্রোটকল অফিসার কুতুব উদ্দিন এ দিক হতে পরিস্কার ছিলেন।

দ্বিতীয় একটা খবরও সরকারী টাকা পয়সা সংক্রান্ত। অন্য এক ব্লগে জনৈক ব্লগার জানাচ্ছেন নবম জাতীয় সংসদের প্রথম বছরে বিরোধী দলীয় নেত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন ৩ দিন জাতীয় সংসদে উপস্থিত থেকে আয় করেছেন ৩০ লাখ টাকা। অর্থাৎ দিনে ১০ লাখ টাকা। জনাবা জিয়ার আয়ের হিসাবটা এ রকমঃ মাসিক পরিতোষক হিসাবে ১ বছরে ১৩ লাখ ২০ হাজার টাকা। আপ্যায়ন খরচ ১০ লাখ টাকা। বছরের ঐচ্ছিক খরচ ১ লাখ টাকা, ভ্রমন ভাতা ৫০ হাজার টাকা। এ ছাড়াও আছে জ্বালানি ও চিকিৎসা ভাতা খরচ। দেশ বিক্রীর সংসদে কথা বলতে দেয়া হয়না এমন একটা আজুহাতে সংসদে না গেলেও বেতন-ভাতা সহ যাবতীয় সূবিধা নিতে কোথাও কিছু বিক্রীর অভিযোগ না তুলেই সানন্দে নিয়ে গেছেন ৩০লাখ টাকা। এ না হলে আর দেশনেত্রী!

রসের গুড় পিঁপড়ায় খায়! বাংলাদেশের সরকারী খাঞ্জানীখানাও তেমনি এক রস, যা রাজনীতিবিদ এবং তাদের সেবাদাসের দল পিঁপড়ার মত খাচ্ছেন দিনের পর দিন বছরের পর বছর।


২০টি মন্তব্য

  • ই-মন বলেছেন ২০১০/০২/০৭ ১২:১২:০৮

    ৫০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। ১৭৫ মন চাল রান্না হয়েছে। ২৫ টি গরুর সদগতি হয়েছে। ৩০ হাজার লোক একবেলা ভরপেট খেতে পেরেছে। আর এতসব আয়োজনের জন্য নিশ্চয়ই ৪০০/৫০০ লোক লেগেছিল। তাদেরও নিশ্চয়ই ৩/৪ দিনের কর্মসংস্থান হয়েছিল। ভালইতো জনগনের টাকা জনগন খেয়েছে। বিদেশী কোন ব্যাংকে তো আর জমা রাখেনি।
    ----------------------------------------------------------------
    প্রথম আলোতে খবরটা পড়ে টাশকি খেয়ে গেছিলাম।

    ওয়াচডগ বলেছেন ২০১০/০২/০৮ ০০:৪০:২৮

    অর্থনীতির বিনিয়োগ সূত্রে আপনার দিক নির্দেশনা ঠিকই আছে। আসলেই তো, টাকা তো আর বিদেশে যাচ্ছেনা, এক হাত হতে অন্য হাতে ঘুরছে মাত্র।

    ধন্যবাদ।

  • সাইদুর রহমান চৌধুরী বলেছেন ২০১০/০২/০৭ ১২:১৫:০২

    বিষয়টি সবাইকে নাড়া দিয়েছে - এরই মধ্যে ব্লগেই তিনটি তিন স্বাদের পোস্ট এসেছে। আপনারটির জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

    ওয়াচডগ বলেছেন ২০১০/০২/০৮ ০০:৪২:২৩

    ভাল লাগছে ন্যায় অন্যায় নিয়ে আমাদের চিন্তাশক্তি প্রসারিত হচ্ছে দেখে। অনেকেই এগিয়ে আসছেন অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে, এটা নিশ্চয় পজিটিভ দিক।

    ধন্যবাদ আপনাকে।

  • জুনেট বলেছেন ২০১০/০২/০৭ ১২:২৩:১৪

    তবে পিপড়ার গুড় কে খায়???

    ওয়াচডগ বলেছেন ২০১০/০২/০৮ ০০:৪৩:০৭

    জটিল প্রশ্ন! তবে শুনেছি পিপড়ার গুড় দিয়ে মাছ ধরা যায়!!

  • কারিম ভাই বলেছেন ২০১০/০২/০৭ ১২:৩০:১৫

    বস, আপনার দোস্ত কুতুবের বর্তমান খবর কি? ঐ রাশান মেয়ের খবরই বা কি?

    ওয়াচডগ বলেছেন ২০১০/০২/০৮ ০০:৪৫:০৯

    লেখাটা পোষ্ট করার পর আমার এক বন্ধু কুতুবের আপ-ডেট জানাল। বেচারা বেচে নেই, ক'বছর আগে হার্ট এট্যাকে মারা গেছে। জানা থাকলে তার নাম এখানে উল্লেখ করতামনা। দুঃখিত।

  • ফকির আব্দুল মালেক বলেছেন ২০১০/০২/০৭ ১৩:৪২:৪৮

    একজন প্রোটকল অফিসারের মাসিক কত টাকা আয় হলে মার চল্লিশায় ৫০ লাখ টাকা ব্যায় করতে পারেন তা হিসাব করার ভার পাঠকদের উপরই ছেড়ে দিলাম।


    পাঠকের কি এমন দায় পড়েছে কষ্ঠ করে হিসাব মিলাবে? কত মিলাবে পাঠক? কত আর!!

    ওয়াচডগ বলেছেন ২০১০/০২/০৮ ০০:৪৬:৫২

    আসলেই বোধহয় তাই! এসব গুনাগুনতি করতে যে সব প্রযুক্তির দরকার তাও ফুরিয়ে আসছে। এর বোধহয় কোন শেষ নেই।

  • ইলিয়াজ বলেছেন ২০১০/০২/০৭ ১৫:১৫:০৩

    কুতুব কি? জয়......
    কুতুব কি? জয়......

    ওয়াচডগ বলেছেন ২০১০/০২/০৮ ০০:৪৭:১৭

    ভাল থাকবেন।

  • কাহেনি বলেছেন ২০১০/০২/০৭ ১৬:৪৫:২২

    আসসালামু আলাইকুম,
    ভ্রাতা,
    এইসব ঘটনা অতীব দুঃখের। সেই সাথে উহা দেশের জন্য জনগণের জন্য এবং গণতন্ত্রের জন্য বিপদজনক বার্তা বহন করিয়া থাকে।
    জনগণকেই এইসব অপ-কর্মের তীব্র প্রতিবাদ জানাইতে হইবে। গণতন্ত্র আমাদিগকে সেই শিক্ষাই দিয়া থাকে।
    তাহা ছাড়া নির্বাচিত করা হইলেই দেশের রাজনীতিকগণ সমালোচনার উর্ধে উঠিয়া যান না। তাহাদিগকে ভোট দিবার পরেও তাহাদের খারাপ কাজের জন্য সমালোচনার অধিকার জনগণের পুরোমাত্রায় রহিয়াছে।

    আপনি হতাশা ব্যক্ত করিয়া বলিয়াছেন :
    ''আমি যাদের সমালোচনা করছি তাদেরকেই তো দেশের জনগণ ভোট দিয়ে নির্বাচিত করছে, দেব-দেবীর মত পূঁজা করছে।''

    জনগণ ভোট দিয়া কি মহা অন্যায় করিয়া ফেলিয়াছে? গণতান্ত্রিক দেশে বসবাস করিয়া জনগণ ''ভোট'' দিবো না তো ''ভেট'' প্রদান করিবে? নাকি ''তত্বাবধায়ক সরকার'' নামক বস্তুটির কাছে দেশকে জিম্মি করিয়া রাখিতে দিবে? নাকি চাহিতেছেন জনগণ ''জেনারেলদের পকেটে'' দেশটাকে ছাড়িয়া দিক!!!

    সাম্প্রতিক সময়ে বিলাতেও এম পি-গণের বিরুদ্ধে সরকারি টাকায় অবৈধ সম্পদ কিনিবার/খরচ দিবার প্রমাণ সেই দেশের মিডিয়াতে প্রচার হইতেছে।পত্র-পত্রিকায় তাহার খবর প্রকাশ হইতেছে। নিন্দা জানানোরও বাকী নাই।আর এইসব অপকর্মের ''দায়'' সেই নির্বাচিত ব্যক্তির। যিনি জনগণের ভোটকে অসম্মান করিতেছেন। এই দেশের ক্ষেত্রেও ঠিক একই কথা প্রযোজ্য।

    রাজনীতি নিয়া লিখিবেন বেশ ভালো কথা।
    গণতন্ত্র নিয়া লিখিতে যাওয়াটা অপরাধ নহে। তবে তাহার পূর্বে গণতন্ত্রের
    ''এ বি সি ডি'' অথবা রাজনীতির ''ক খ গ ঘ'' শিখিয়া আসাটা যে অতি জরুরি সেই কথাটা সকলে মনে রাখিলে সুবিধা হয়।
    পরম করুণাময় আমাদিগকে ছহি-ছালামতে রাখুন।

    আমি বাংলাদেশী বলেছেন ২০১০/০২/০৮ ০৩:৪৩:৪২

    আমাদের দেশে গনতন্ত্র শুধু কাগজে-কলমে-মুখে। কাজে নয়।
    Good intentions are good for nothing - actions speak louder than words.

  • মেহেদী বলেছেন ২০১০/০২/০৮ ০২:৩২:৫৮

    আমি এখন যেখান থেকে আপনার লেখাটা পড়তেছি। এই দেশে কোন দলীয় নেতা হলে তার বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে দলে ফিরিয়ে নিত না। আর সরকারী কর্মকর্তা হলে তো কথাই নেই।
    এখন প্রশ্ন হল,
    কুতুব উদ্দিনের বিচার চলছে। তাকে স্বপদে কিভাবে বহাল করা হল ? আফসোস।
    সুন্দর পোষ্টের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।

    ওয়াচডগ বলেছেন ২০১০/০২/০৮ ০৪:৩২:২৩

    রাজনীতি করলে আমাদের দেশে সাত খুন মাপ! এ জন্যেই তিনারা এ সব অপকর্ম করতে সামান্যতম চিন্তা করেন্‌না। গনতন্ত্র!!!

    রঙ্গীলা বলেছেন ২০১০/০২/০৮ ০৫:৩৫:০৩

    সব সম্ভবের দেশ আমাদের দেশ।

  • দেবদাস বলেছেন ২০১০/০২/০৮ ০৯:৪৬:৩৮

    প্রথমে ভেবেছিলাম আপনার উল্লেখিত সেই সিভিল ইঞ্জিনিয়ার কুতুবই বুঝি এই কুতুব। যাইহোক হুবুহু এক লোক না হলেও কার্যক্রমের স্টাইল ডিজাইন প্রায় একই ধরনের। প্রতারনা। এই কুতুবরাই এই দেশের সব। কেউ সরাসরি সরকারী খাজাঞ্জিখানা থেকে হাতড়ে নিচ্ছে কেউ তাদের ছত্রছায়ায়।

    ওয়াচডগ বলেছেন ২০১০/০২/০৮ ১০:০৪:৪৯

    না, সে ব্যক্তি একই কুতুব নন। দুঃখের সাথে জানাচ্ছি আমার পরিচিত কুতুব বেচে নেই। তবে ৫০লাখ টাকার কুতুব সাহেব খুব ছহি ছেলামতে আছেন এ ব্যপারে কোন সন্দেহ নেই।

    ভাল আছেন তো আপনি?

    দেবদাস বলেছেন ২০১০/০২/০৮ ১০:০৯:০৪

    জ্বী ভাইয়া মোটামোটি ভালো আছি। আপনাদের সবার প্রতিও আমার অফুরান শুভকামনা রইলো।



প্রথম আলো, সিএ ভবন, ১০০ কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা ১২১৫