বৃহস্পতিবার ১৭ মে ২০১২, ৩ জ্যৈষ্ঠ, ১৪১৯ সাইনইন | রেজিস্টার |bangla font problem


সিলেটের আদিত্যপুর গণহত্যা

পতাকায় লেগে আছে নববধুর সিথির সিদুঁর

লাল সবুজে ছাওয়া আমাদের জাতীয় পতাকা। এ পতাকায় লেগে আছে শত-সহস্র নববধূর সিথির সিদুঁর, কিশোরীর সতিত্ব হরণের দাগ, ছেলেহারা মায়ের চোখের লোনা জল। আজ স্বাধীনতার ৩৬বছর। কথায় কথায় আমরা মুক্তিযুদ্ধের কথা টেনে এনে দেশপ্রেমিক হিসাবে নিজেকে জাহির করি। অন্তরে অন্তর মিশিয়ে বলি দেশকে ভালোবাসি, ভালোবাসি দেশের মানুষকে। কিন্তু শহর-নগর-গ্রামে স্বাধীনতার জন্য যারা প্রাণ দিয়েছে কিংবা স্বাধীনতার চিহ্নধারণ করে আজো বেঁচে থেকে অপমান আর দারিদ্রে ধুঁকছে তাদের কথা ভাবার সময় কই! ইতিহাসের পাতায় তেমনি একগ্রাম সিলেটের বালাগঞ্জের আদিত্যপুর। ১৯৭১ সালের ১৪ই জুন সোমবার একদল পাকসেনা আর তাদের দোসরদের পৈচাশিক নির্যাতনে পুরুষ শূন্য হয়ে পড়েছিল সম্পূর্ণ গ্রাম।
সেদিনে বর্বরতা............
অন্য আট দশটা দিনের মতো সেদিনও চাষী জমিনে জুড়েছিল হাল। সাতসকালে পুকুর ঘাটে বাসন মাজার শব্দ, বউ-ঝিদের খুনটুসি, ছোট ছেলে মেয়েদের সুর বেধে এক-দুই গণণা সবই ছিল। ছিল প্রতিটি ঘরে গৃহদেবতার ঘুম ভাঙ্গানোর আয়োজন। হঠাৎ মানুষ হারালো সকালের আলস্যতা-বাতাস হারালো আপন গতি। ৪টি সাঁেজায়া জিপ নিয়ে ২৫-৩০জন পাকিস্তানী সেনা এসে হাজির হলো আদিত্যপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে। একান-ওকান ঘুরে গ্রামের প্রতিটা মানুষের কাছে পৌঁছে গেল শকুনের খবর। ভয়ে রক্তশূন্য হয়ে পড়া মহিলারা সতিত্ব রার্থে দিক-বেদিক ছুটাছুটি শুরু করলেন। পাকিস্তানী বাহিনীর পা-চাটা কুকুর এদেশীয় জারজ আব্দুল আহাদ চৌধুরী (ছাদ মিয়া), মসরু মিয়াসহ কয়েকজন গ্রামে এসে জানাল, ভয় নেই। এরা মারতে আসেনি বরং বাঁচার পথ দেখাতে এসেছে। সবাইকে নিয়ে স্কুল মাঠে মিটিং হবে। কার্ড দেওয়া হবে। শান্তি কমিটির কার্ড। শংকিত মানুষগুলো আশা পায়, বেঁচে থাকবে তারা বেঁচে থাকবে! একে একে গ্রামের প্রতিটা বাড়ির পুরুষ জড়ো হয় স্কুল মাঠে। একদিকে সেনারা কার্ড নামে রশি দিয়ে বেধে ৬৫ জন পুরুষকে দাঁড় করায় অন্যদিকে আব্দুল আহাদ চৌধুরী আর মসরু মিয়ার নেতৃত্বে গ্রামের প্রতিটা বাড়ীতে চলে লুন্ঠন। মহিলাদের কান্নার স্বর স্কুল মাঠে জড়ো হওয়া পুরুষদের কানে পৌঁছলেও ভয়ে কেউ টুশব্দ করে না। ওয়ান-টু-থ্রী বলে হুইসেল বাজার সঙ্গে সঙ্গে সেনাদের বন্ধুক থেকে বেরিয়ে এলো রাশি রাশি গুলি। বাঁচাও বাচাঁও শব্দে কেঁদে উঠলো পুরো গ্রাম। আবারো চললো গুলি। শত শত গুলি, বৃষ্টির মতো গুলি। কেউ একটু পানি চাইলো, কেউবা চাইলো না। আবার কেউ বললো, ঈশ্বর! মুহূর্তে প্রাণ হারান ৬৩জন। স্তব্দ হয়ে পড়লো সম্পূর্ণ গ্রাম। আবারো গাড়ীযোগে পাক সেনারা স্কুল মাঠ ত্যাগ করলো। আর তাদের দোসররা গ্রামের লুন্ঠিত মাল ও ৪মহিলাকে ধরে নিয়ে গেল সাথে।
লাশের খবর...........
এতো বড় অঘটনের পর কেউই এ ভুতুড়ে গ্রামে নেই। পাকসেনাদের আগমনে অনেকে কুশিয়ারা নদী সাতরিয়ে পার হয়ে গেছে অনেক দূর। কেউবা হয়ে গেছে বোবা। আর কেউবা একা একা রয়ে গেছে লাশের পাহারায়। লাশের পঁচা গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। ১৭ই জুন বৃহস্পতিবার রাজকাররা আবার এলো আদিত্যপুরে। এবার লুন্ঠন বা হত্যা নয়। সংবাদ মিডিয়া থেকে আড়াল করতে কোন রকম ধর্মীয় আচার ছাড়াই লাশগুলো এবার মাটি চাঁপা দিল তারা। ২২শে জুন মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি এমএজি ওসমানীর উপস্থিতিতে মাটি খুঁড়ে লাশ বের করা হয়। তারপর পোষ্টমর্টেমের জন্য প্রেরণ করা হয় সিলেট সদর হাসপাতালে। সেখানে দেশী ও আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের সামনে লাশের সংখ্যা গণণা করা হয়। তারপর লাশগুলো আবার আদিত্যপুর এনে বর্তমান গণকবরে সমাহিত করা হয়।
কেমন আছে গণকবর.............
মুক্তিযুদ্ধের বেশ কবছর পর শিবপ্রসাদ সেন চৌধুরী (পাকিস্তানীদের বুলেট বিদ্ধ হয়ে বেঁচে যাওয়া একজন) আদিত্যপুর গণ কবরের সীমানা নির্ধারনে দেয়াল তৈরির কাজে হাত দেন। ইট, বালু ইত্যাদি ক্রয় করার পর জমির মালিক বাঁধা দেয়। ফলে তার এ উদ্যোগের মৃত্যু। ১৯৮৪ সালের ৩০এপ্রিল বালাগঞ্জ থানা পরিষদের এক সভায় আদিত্যপুর গণকবর নামে ২৪হাজার ৮৩২টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। চারিদিকে দেয়াল দিয়ে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। গণকবরের চারিদিকে পানি এবং জঙ্গলে আবদ্ধ। বিশেষ দিনে গ্রামের লোকজন ও স্কুলের ছাত্র/ছাত্রী শিক মিলে পুষ্প অর্পন করেন। পৌষ সংক্রান্তিতে গ্রামের হিন্দু লোকজন নাম-সংকীর্ত্তনের আয়োজন করেন শহীদদের স্মরণে। পুষ্প অর্পনে যেতে হয় হাটু পানি ও কাদা ভেঙ্গে। প্রশাসন বা সরকারের প থেকে কোন উদ্যোগ কোন কালেই নেওয়া হয়নি। কোন রাজনৈতিক নেতা বা মন্ত্রী কোনদিন পরিদর্শন করেননি। এমনকি গণকবরের কোন নামফলকও নেই। গণ কবরের এ হেন দশায় আদিত্যপুরের শিশির কান্ত দেব বলেন, আদিত্যপুর গণকবরের বর্তমান অবস্থা একেবারে নাজুক। জরুরী ভিত্তিতে এর সংস্কার না করলে পরবর্তী প্রজন্ম ইতিহাস হত্যাকারী হিসাবে আমাদের দিকেই আঙ্গুলী ইশারা করবে।
একজন শিব বাবুর কথা
আদিত্যপুর স্কুল মাঠে পাকবাহিনী যে ৬৫জনকে ধরে এনেছিল তাদের মধ্যে ভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়েছিলেন শিবপ্রসাদ সেন (কনকন বাবু) ও সুখময় চন্দ্র। সুখময় চন্দ্র একযুগ আগে গত হলেও শিবপ্রসাদ সেন আজো বেঁচে আছেন শরীরের বিভিন্ন স্থানে বুলেটের ত নিয়ে। পাক বাহিনী স্কুল মাঠে এসেছে জেনে তিনি বাড়ীর পাশে একটি কাটাগুল্মের ঝোঁপে লুকিয়ে ছিলেন। রাজাকার আব্দুল আহাদ চৌধুরী (ছাদ মিয়া) তাকে সেখান থেকে ধরে এনে স্কুল মাঠের ফায়ারিং লাইনে দাঁড় করায়। ক্যাপ্টেনের নির্দেশে গুলি হলে শিব প্রসাদ সেনের বুকে দুটি এবং হাতে একটি গুলি লাগে। গুলি লাগার পর তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। পরে তার ভাই শশধর সেন তাকে কাঁধে করে গ্রাম থেকে নিয়ে যান। ২দিন কেমন ছিলেন, কেথায় ছিলেন তিনি নিজেও জানতেন না। ৫দিন পর সামান্য সুস্থ্য হয়ে গ্রামে এলে জানতে পারেন তার পিতা শ্রীশ চন্দ্রসহ একাধিক আত্মীয় সেদিনে বর্বরতায় শহীদ হয়েছেন। রাজাকাররা তাদের বাড়ীর সবকিছু লুট করে নিয়ে গেছে। বর্তমানে শিব বাবুর বয়স ৬২ বছর। শরীরে গুলি লাগার কারণে ভারী কাজ করতে অম। তার স্ত্রীও দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত। কিন্তু আর্থিক অনটনে স্ত্রীকে উন্নত চিকিৎসা করাতে পারছেন না। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুর সরকার কর্তৃক প্রদত্ত ২ হাজার টাকা ছাড়া আজ পর্যন্ত আর কোন সাহায্য পাননি। এ প্রসঙ্গে শিব বাবু বলেন, সাহায্য দূরে থাক, কেউ সহানুভূতি টুকু জানায়নি। অভিমান ভরে তিনি বলেন, বেঁচে গিয়ে ভুল করেছি। মরে গেলেই ভালো ছিল। শিববাবু তার কথা জানাতে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। কেউ কি বলতে পারে শিববাবুর বুক ভরা এ অভিমান শেষ হবে কবে!
৭ টি মন্তব্য
১০ ডিসেম্বর ২০০৮, ০১:০২
দারুণ লিখেছেন। রাজাকারদের পদক দেয়া দরকার।
serendipity মাভেরিক১০ ডিসেম্বর ২০০৮, ০১:৫০
লেনিন ভাই, কেন পদক কি এখনও দেয়া হয়নি? যতদূর জানি, রাজাকারদের একুশে পদক দেয়ারও ঘটনা আছে।
smc প্রতীপ১০ ডিসেম্বর ২০০৮, ০২:২৯
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় গণকবরসমূহ সংরক্ষণ ও সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। এইক্ষেত্রে উপজেলা প্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ করে আদিত্যপুর গণকবরের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্হা নিতে পারে।
sharmabangla সজল শর্মা১০ ডিসেম্বর ২০০৮, ০২:৩৮
খুবই মর্মান্তিক। আর কি বলব- বলার মত ভাষা খুঁজে পাচ্ছিনা।
ujjwalldhar1 উজ্জ্বল ধর১০ ডিসেম্বর ২০০৮, ০২:৫৭
আমরা কবে সত্যিকার ভাবে মানুষ হবো সজলদা বলতে পারেন??
litonjoy ‍লিটন দেব জয়১০ ডিসেম্বর ২০০৮, ১২:৫০
So fine....
deathmetal ফারহান দাউদ১১ ডিসেম্বর ২০০৮, ০৯:১১
মূল্যবান লেখা।

সাম্প্রতিক পোস্ট Star

সাম্প্রতিক মন্তব্যComment