বৃহস্পতিবার ২৯ জুলাই ২০১০, ১৪ শ্রাবণ, ১৪১৭ সাইনইন | রেজিস্টার |bangla font problem

পরশ পাহাড় [মধ্য পর্ব]

পরশ পাহাড় [শুরুর পর্ব]

তাই এবারে সে উৎসাহ খুঁজে পেতে চায়। তার বয়েসের বিভিন্ন ইভেন্টে অংশ নিতে মাঠে ঘুরে ফিরে। সুযোগ বুঝে কক ফাইট (মোরগের লড়াই)-এর বৃত্তের মাঝে ঢুকে পড়ে। বাছাই পর্বে ফাইটে টিকে থাকা যে আটজনকে বেছে নেয়া হয়, তাতে তার নাম আসে। প্রথম চারজনের মাঝেই সে ছিল। একটা আকাঙ্খা গড়ে উঠে সাব্বিরের মাঝে। খেলায় যে চতুরতার আশ্রয় সে নিয়েছে, তা অনুসরণ করলে প্রথম তিনজনে তার নাম আসাটা অসম্ভব কিছু না। সে সেদিনের মত বাসায় পৌঁছে যায়। মনে মনে ভালভাবে সে ফন্দি আঁটে, কিভাবে অন্যদের আক্রমণ থেকে নিজেকে বাঁচাবে। সে ডিফেন্সিভ খেলতে ভালবাসে। অন্যরা কাঁধ দিয়ে আক্রমণে এলেই সে কুঁজো হয়ে নুইয়ে পরে। তাই আক্রমণগুলো তার গায়ে আর লাগে না। অন্যরা নিজেদের মধ্যে ফাইট করুক, ঝরে পড়ুক। কিন্তু সে নিজে তাতে শরীক হবে না। যখন সংখ্যা কমে তিনে আসবে, তখনই সে সুযোগ খুঁজবে কিভাবে দু'জন মিলে একজনকে আক্রমণ করা যায়। পরিকল্পনা পাকাপাকি করে রাতে সে ঘুমাতে যায়। রাত তার আর কাটে না, যেন স্বপ্নেও সে দেখে কিভাবে তাকে যুদ্ধে টিকে থাকতে হবে। সকালে ঘুম থেকে সে ঠিকমত উঠতে পারে না। চোখে ঘুমের ঘোর আর কাটে না। বিছানা থেকে উঠতেও ইচ্ছে করে না। ঘুম থেকে উঠতে না দেখে, মা এসে তার কপালে হাত রাখে। সে অবস্থায় মা চিৎকার জুড়ে দেয়, "কাল সারাদিন তুমি কোথায় ছিলে, হ্যাঁ? তোমার গায়ে এত জ্বর কেন? স্কুলে কি করেছিলে, কোথায় ছিলে?" সাব্বির ভড়কে উঠে। মায়ের এ চিৎকারে সে কখনো কিছুই লুকাতে পারে না। গড়গড় সে বলে ফেলে, "মা, কাল স্কুলে আমাদের স্পোর্টস ছিল। আমি কক ফাইটে নির্বাচিত হয়েছি। আজকে আমাদের ফাইনাল। আমাকে যেতে হবে।" তেতেমেতে উঠে মা, "কি বললে? কাল তুমি মাঠে মাঠে দৌড়িয়েছো। রোদে ঘুরে এইজন্য তো জ্বর বাঁধিয়েছো। আমাকে তুমি স্পোর্টসের কথা জানিয়েছো? আবার আজকেও জ্বর নিয়ে মাঠে যাবার কথা বলছো? তোমার কোথাও যাওয়া হবে না। তুমি বাসায় থাকবে।" সাব্বির পড়ি্-মড়ি করে কাঁদো কাঁদো গলায় মাকে বলে, "মা আমাকে যেতে হবে। আজ ফাইনাল।" "আবারো তুমি আমার মুখের উপর কথা বলো। কম সাহস তো তোমার না। দাঁড়াও তোমার বাবা বাসায় আসুক আজকে।" সাব্বির তার নিয়তি আঁচ করে ফেলে। কিন্তু নিয়তিকে মেনে চলা আজ তার পক্ষে সম্ভব না। সে হাঁস-ফাঁস করে। টেবিল ঘড়ির কাটার দিকে তার চোখ পড়ে। বেলা ১১:৩০ মিনিটে কক ফাইটের ফাইনাল। এখন ঘন্টা আড়াইয়ের মতো বাকি। সে কিছুক্ষণ বিছানায় শুয়ে থাকে। কিছুক্ষণ এপাশ-ওপাশ করে বিছানায়। মাকে যে কিভাবে বুঝ দেয়া যায়! এই মা যে কখনও কখনও তার ছুটে চলার গতিকে বন্ধ করে দেয়, তা সে কিভাবে কাকে বোঝায়? সাত-পাঁচ ভাবে সে। একদিন তো মনে মনে সে খুব কেঁদে ফেলেছিলো। মনে হয়েছিল, মা তাকে একদমই ভালবাসে না। তাকে চায় কি না, তাও সে জানে না। মরে গেলে কী হয়! এমন সব সাত-পাঁচ চিন্তা। আধা ঘন্টা পর বাসার কাজের শিউলি এসে তার বিছানার পাশে এক বাটিতে করে পাতলা সুজি রাঁধা দিয়ে যায়। সে সাথে দু'টো পাতলা করে বেলে নেয়া রুটি। সাব্বির তৃপ্তির সাথেই সুজি দিয়ে রুটি খায়। খাওয়া শেষ হলে আবার ঘড়ির দিকে তাকায়। একটু একটু করে সময় এগিয়ে যাচ্ছে। তার ভেতরেও ধীরে ধীরে অস্থিরতা আঁকুপাঁকু করছে। নিজের মধ্যে কিছুটা সুস্থ সবল উচ্ছ্বল ভাব নিয়ে আসার চেষ্টা করে সে। মা তার রুমে এলেই খাট থেকে নেমে এসে পাশে তার পড়ার টেবিলের দিকে সে আগাতে যায়। মা তার সামনে এসে থামিয়ে দিয়ে বলে, "এই ঔষুধটুকু একটু খেয়ে নাও।" শিশি থেকে ঔষুধ চামুচে ঢেলে সাব্বিরের মুখে দিয়ে দেয় দু'বার। সাব্বির ঔষুধ খেয়ে নিয়ে মাকে বলে, মা আমি এখন বেশ সুস্থ বোধ করছি। মা শুধু 'ঠিক আছে' বলে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়ে সাব্বির। বুঝে উঠে পারে না, মাকে কোন রকম বুঝিয়ে স্কুলে যেতে পারে কি না। একটু ঘুম ঘুম আসে তার। দশটার কাছাকাছি ঘড়ির কাটা। আরেকটু বিছানায় শুয়ে থাকার ইচ্ছা হয় তার।

পাহাড়ের উত্তরদিকে বসবাস করা সালেহীন সাহেবের ছেলে সামির পাহাড়ে উঠতে যেয়ে একদিন পাহাড় থেকে নীচে গড়িয়ে পড়ে। পাহাড়ের তলদেশের গা ঘেঁষে পাহাড়ের সমান্তরালে পানির ইয়া বড় মোটাসোটা পাইপ সুবিস্তৃত হয়ে বসানো রয়েছে। কোথাও কোথাও পাইপের আশে-পাশের পাহাড়ের মাটি সরে গিয়ে পাইপটা খুব উন্মুক্ত হয়ে গেছে। সামির পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়লেও অলৌকিকভাবে পাইপের সাথে সংঘর্ষ থেকে বেঁচে গেছে। সামির যখন একেবারে নীচে এসে পড়ে সাব্বিরদের ঠিক সীমানার বাইরে, সীমানার ভেতর থাকা সাব্বির সামিরের শরীর থেকে এক ক্যোঁত করা শব্দ শুনতে পায়। পুরো ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সাব্বির ভীষণ শংকিত হয়। সামিরের এই অল্পতেই বেঁচে যাওয়াতে আশ্চর্য হয় খুব। এমূহুর্তে সেও পাহাড়ে উঠার খুব চেষ্টা করছে। পা যে তার একদম চলতে চায় না। উফ্‌ কী ভীষণ কষ্ট! সে আগে থেকেই পাহাড়ের মাঝামাঝি উঠা অবস্থায়, অনেক চেষ্টা করেও আরেক পা বাড়াতে পারছে না। কষ্টকরভাবে একই জায়গায় যে সে থেকে যাচ্ছে! এমন সময় মায়ের গলায় তাকে ডাকা শোনে। ভয় পেয়ে যায় ভীষণ সাব্বির। আর তখনই সে দেরী না করে পাহাড় থেকে উল্টে পড়ে গড়াতে থাকে নীচে। কোন কিছু ঘটার আগে সে আঁতকে ঘুম থেকে উঠে পড়ে এবং ভীষণ আশ্চর্য হয়ে তাকে আবিষ্কার করে বিছানার থেকে উঠে বসা অবস্হায়। ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ার মতই অবস্থা। দেরী না করে সে তড়িৎ গতিতে ঘড়ির দিকে তাকায়। ও মা, এ তো বেলা তিনটা বাজে। সাব্বির বুঝে উঠতে পারে না কেন সে এত ঘুমালো। দ্রুত সে ঘর থেকে বেড়িয়ে বাসার সামনের গেইটের দিকে যায়। সামনের রাস্তা দিয়ে দু'চারজন করে স্কুল ছাত্ররা তাদের বাসায় ফিরছে। অস্থির আর ভাঙ্গা মন নিয়ে কোন কিছু না ভেবে বোকার মত দু'চারজনকে জিজ্ঞেস করে ফেলে, "আচ্ছা, কক ফাইট কি হয়ে গেছে?" কোন সদুত্তর পায় না কারো কাছ থেকে। বরং কোন কিছু বুঝতে না পেরে দু'একজন অবাক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকায়। কেউ ঈষৎ অবজ্ঞা দেখিয়ে চলে যায়। সাব্বিরের আর কাউকে প্রশ্ন করার ইচ্ছে বা সাহস কোনটাই হয় না। তাকে কষ্ট এক ভীষণ গিলে ফেলে। একটা পাওয়া কেমন তার হাতছাড়া হয়ে গেছে। মনের কষ্ট মনে গুজে সে বাসায় ফেরত আসে।

এ ঘটনার পর এক বছর পেরিয়ে যায়। [শেষ পর্বের শুরু]
২৪ টি মন্তব্য
sokal_ratri সকাল০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১০, ০৯:১১
কবি শামান প্রতিটি পর্ব ভাললাগাটা বাড়িয়ে নিয়ে চলেছে ।
আমি লেখাটা হৃদয়ে রাখলাম রাতভোরে পড়ব।
কবি আমি একটা ছোট্ট গল্প লিখেছি আজ যদি ক্লান্তির রেশ ঝেড়েফেলে
আমার আঙ্গিনায় একটিবার হানা দিতেন তো আমি আটখানা হতাম আহ্লাদে।
কবি আপনার লেখনির দীর্ঘায়ূ কামনা করছি।
shamanshattik শামান সাত্ত্বিক০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১০, ০৯:১৫
পড়বো রাতে বাসায় ফিরে এসে। তখন আপনাদের সকাল। ধন্যবাদ সাথে থাকার জন্য।
kabiraahmed কবির য়াহমদ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১০, ০৯:১২
পড়লাম। আর ১বছর পর কী হয়???????????????????
shamanshattik শামান সাত্ত্বিক০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১০, ০৯:১৫
হুম, সাসপেন্স।
sharmabangla সজল শর্মা০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১০, ০৯:৩০
এই পর্বও খুব ভাল লাগলো। পরের পর্বের কারিশমার অপেক্ষায় রইলাম।
shamanshattik শামান সাত্ত্বিক০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১০, ০৫:০৯
ধন্যবাদ শায়েরজী। আপনিও তো ভাল গাল-গল্প জানেন। পরের পর্বে কারিশমা থাকবে, কিভাবে জানলেন।
ostorag একলা তেপান্তর০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১০, ০৯:৩৪
দুটো পর্বই পড়লাম,,,,,,,,,গল্প জমে উঠেছে,,,,,,

ধন্যবাদ কবি।

ভালো থাকুন।
drrumi ডাঃ রুমী০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১০, ১০:০১
ভাল লাগলো । অধীর আগ্রহের সাথে অপেক্ষায় থাকলাম শেষ পর্বের জন্য ।
shamanshattik শামান সাত্ত্বিক০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১০, ১০:০৬
আপনার আগ্রহ আমার অনুপ্ররণা বাড়িয়ে দিল। আশা করছি, আগামীকাল সকালেই শেষ পর্ব পেয়ে যাবেন। ধন্যবাদ।
asmarshad আ,শ,ম,এরশাদ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১০, ১০:৩২
আসতেছি ৩য় পর্বে। একটু ঝামেলায় আছি
zhsoykot জেড এইচ সৈকত০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১০, ১১:০২
প্রথম থেকে পড়ে আসি।
shamanshattik শামান সাত্ত্বিক০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১০, ০৫:০৭
পড়া শেষ হয়েছে কি? সব শেষে মতামত জানালে উৎসাহিত হবো।
alrahim আলরাহিম০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১০, ১১:৪২
আগেরটা সহ একসাথে পড়বো পরে
shamanshattik শামান সাত্ত্বিক০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১০, ১২:১৯
ধন্যবাদ। অপেক্ষায় আছি।
rudrasakal কৃষ্ণ তরুণ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১০, ০৭:২১
খুব যখন ছোট ছিলাম, তখন পাড়ার এক ভাই চট্টগ্রাম তার নানার বাড়ির স্কুলে পড়তো। সে বাড়ি এসে চট্টগ্রামের গল্প বলতো। একদিন সে একটা শিল্ড আর সে মোরগ লড়াই খেলছে এমন একটা ছবি নিয়ে বাড়িতে বেড়াতে আসে। তাদের ঘরের দেয়ালে ছবি আর শিল্ড চকচক করে ওঠে।

গল্প ভালো লাগছে।
ভালো থাকুন।
shamanshattik শামান সাত্ত্বিক০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১০, ১২:০২
অনেক ধন্যবাদ সাথে থাকার জন্য।
mou মৌসুমী দত্ত০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১০, ১২:৩৩
ভালো লাগলো মধ্য পর্ব।
এক বছর পর কি হবে সে অপেক্ষায় আছি।
ধন্যবাদ শেয়ার করার জন্য শামান ভাই।
shamanshattik শামান সাত্ত্বিক০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১০, ০৫:০৭
অনেক ধন্যবাদ আপনাকে পাঠের জন্য। এক বছর পরে আছে সাসপেন্স
asmarshad আ,শ,ম,এরশাদ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১০, ১২:৪৬
এই পর্বে টান পেলাম। আগের পর্ব একটু থেমে থেমে পড়েছি । এই পর্বের বাক্যবিন্যাস পড়তে আরাম দিয়েছে। তবে কক ফাইট না বলে মুরগ লড়াই বললেই ভাল হত। কারন প্লট গ্রামের।
ব্রেকেট দিয়ে বুঝানোর প্রয়োজন ছিল না।

এই পর্ব শেষ পর্বের জন্য আগ্রহ বাড়াতে পেরেছে।
shamanshattik শামান সাত্ত্বিক০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১০, ১২:০০
আসলে প্লটটা গ্রামের না। আমার শৈশবের চট্টগ্রামের পাহাড়তলী, যেখানে আমাদের বাসা ছিল।

অনেক ধন্যবাদ আপনার মনোযোগের জন্য।
afruj আফরোজ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১০, ০৬:৪২
আহারে ছেলেটার জন্য মায়া হচ্ছে
shamanshattik শামান সাত্ত্বিক১০ ফেব্রুয়ারি ২০১০, ১২:০৫
আহারে........।
sayedurchowdhury সাইদুর রহমান চৌধুরী১২ ফেব্রুয়ারি ২০১০, ০২:৩৪
খুব খুঁতখুঁতে মন নিয়ে বিচার করলে এ পর্বে একটু মনোটোন এসেছে, তবে উৎরে যাবে..। দেখি সামনে কি আছে
shamanshattik শামান সাত্ত্বিক১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১০, ০২:২৫
আসলে গল্পের বাঁকে বাঁকে যেতে গেলে মনোটোনটা কখনো কখনো সঙ্গী হয়ে উঠতে পারে। যেমন, আমাদের জীবন।

সাম্প্রতিক পোস্ট Star

সাম্প্রতিক মন্তব্যComment