বৃহস্পতিবার ২৯ জুলাই ২০১০, ১৪ শ্রাবণ, ১৪১৭ সাইনইন | রেজিস্টার |bangla font problem

বাড়ি ছেড়ে পালানোর গল্প........

ক্লাস সেভেনের ১ম সাময়িক পরীক্ষা শেষ। বৃহস্পতিবার,বেলা দুইটা। আমার হাতে বাংলা ১ম পত্র পরীক্ষার রেজাল্ট,পেয়েছি মাত্র ৪৫। ক্ষোভে-দুঃখে চোখ ফেটে পানি আসছে,দুরুদুরু বুকে বাসার দিকে এগুচ্ছি। সিঁড়ি বেয়ে উঠছি। পা যেন চলতে চাইছে না, সিঁড়িটাকে মনে হচ্ছে হিমালয় যার কোন শেষ নেই। মনে শুধু একটাই চিন্তা,'' এই রেজাল্ট বাসার কাউকে দেখানো যাবে না''। যাই হোক বাসায় ঢুকলাম, ভাত খেলাম। কিন্তু মনে হচ্ছে পৃথিবীটা ঘুরছে,পেটের খাবারগুলো দলা পাকিয়ে উঠে আসতে চাইছে। অস্থির লাগছে খুব,আম্মুর দিকে তাকাতে পারছি না। শেষমেষ সিদ্ধান্ত নিলাম বাসা থেকে চলে যাব দূরে কোথাও, রেজাল্টের কথা কিছুতেই বলা যাবে না। প্রস্তুতি নিলাম। বের হলাম বাসা থেকে,পকেটে নিলাম সব মিলিয়ে ৭০ টাকা। তখন ৭০ টাকাকেই অনেক মনে হয়েছিল। আম্মুর কাছে বললাম ক্রিকেট ম্যাচ আছে। মনে তখন নানান চিন্তা। অনেক দূরে যেতে হবে যাতে কেই খুঁজে না পায়। কোন হোটেলে কাজ নিতে হবে,আরও কত কি! পরিচিত দোকান থেকে একটা পার্ক চকলেট নিলাম বাকিতে। দাম বোধহয় ১৮ টাকা ছিল। দাম নিয়ে কোন সমস্যা ছিল না কারণ টাকা দিবে আব্বু। পুরো দোকান তুলে নিয়ে গেলেও আব্বু কিছু বলবে না। পায়ে হেঁটে চলে গেলাম গাবতলী বাস স্টান্ডের কাছে,পথে দেখা সজীবের সাথে। আমায় দেখে জিজ্ঞেস করলো,''কিরে কই যাস?'' আমি সত্য কথাই বললাম,''খবরদার বলবি না কারও কাছে'' তখন সজীব বলল,''চল আমিও যামু তোর সাথে,আমার কাছে ৩০০ টাকা আছে এখন।'' আমি তো পুরো অবাক কিন্তু মনে মনে দারুন খুশি একজন সঙ্গী পেয়ে। মনে যেটুকু দ্বিধা ছিল সজীবকে পেয়ে তাও কেটে গেল। দারুন থ্রিলিং লাগছে এখন ব্যাপারটা। সজীবকে বললাম,''দেখ পরে আমার দোষ দিতে পারবি না কিন্তু, ভালো কইরা ভাইবা দেখ''। ও বলল,''ধুর ব্যাটা কিছু হবে না''। কোথায় যাওয়া যায় চিন্তা করতে করতে সাভার যাওয়ার একটা বাসে উঠে পড়লাম। তারপর বাস থেকে নামলাম। সজীব বলল,''দোস্ত আরও দূরে যেতে হবে,না হলে কট খাবার চান্স আছে''। আমিও ওর কথায় সায় দিলাম। কিন্তু কোথায় যাওয়া যায় তাই নিয়ে ভাবছি। তারপর হাঁটা শুরু করলাম,হাঁটছি তো হাঁটছি। ইতিমধ্যেই সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে। অবশেষে একটা ছোট বাজারের মতো জায়গায় এসে পৌঁছলাম। পরে জেনেছি ওটা আশুলিয়ার কোন এক জায়গা ছিল। এখন পুরো রাত,হয়তো ৯টার মতো হবে। এখন একটু ভয় ভয় করছে দুজনেরই। রাতে কোথায় থাকবো তাই ভাবছি,খাওয়ার চিন্তা তখন মাথায় নেই। এরপর দুজনে মেইন রোড ছেড়ে ভিতরের একটা রোড ধরে এগুতে লাগলাম। চারিদিকে অন্ধকার, মাঝে মাঝে কোন বাড়ির আলো দেখা যাচ্ছে। বেশ ক্লান্তও লাগছে এখন। এপর দুজনে একটা বাড়ির পাশে এসে দাঁড়ালাম। আধাপাকা বাড়িটা,চারপাশে ঢেউটিন দিয়ে বেড়া দেয়া। ওখানেই দাড়িয়ে আছি,চারপাশ অন্ধকার। ভয় লাগছে কেমন যেন। হঠাৎ দেখলাম দুটো লোক আমেদর দিকে আসছে,হাতে টর্চ লাইট। আমাদের দেখে দাঁড়াল,টর্চের তীব্র আলোয় কিছুই দেখতে পারছি না। আমাদের দুজনকে নানা ধরনের প্রশ্ন করতে লাগল। শেষে দুজনের মধ্যে মোটা লোকটা বলল,''এই দুজনে ছেলে ধরা, ছেলে-মেয়েদের ধরে বেঁচে দেয়। এই দুজনরে ক্লাব ঘরে নিয়া বাইন্ধা রাখ।'' আমরা তো লোকটার কথা শুনে পুরা থ। ''বলে কি এই লোকটা!!" ভয়ে হাত পা অবশ হয়ে আসছে। এমন সময় একজন মধ্যবয়সী এক ভদ্রলোকের আবির্ভাব,দেখেই মনে হলো এই লোক ভদ্র এবং শিক্ষিত। এসেই জিজ্ঞেস করলেন ঘটনা কি? শয়তান লোক দুটো বলল আমাদের কথা। শুনে লোকটা বলল,''ঠিক আছে তোমরা যাও আমি দেখছি''। শয়তান দুটো চলে গেল,আমরা যেন হাপ ছেড়ে বাঁচলাম। এরপর লোকটা তাকার আমাদের দিকে। বলল,দেখে তো ভাল ঘরের ছেলে বলেই মনে হলো,বাড়ি থেকে পালানো হয়েছে বুঝি?'' আমরা তো অবাক, বুঝল কি করে ব্যাটা!
আমরা আমতা আমতা করে বললাম,জ্বী।
''ঠিক আছে,এসো আমার সাথে,বলল লোকটা। তখন তিনি আমাদের কাছে সাক্ষাৎ দেবদূত,তার কথা কি ফেলা যায়?
তিনি আমাদের নিয়ে ওই বাড়িটায় ঢুকলেন যে বাড়ির পাশে আমরা দাঁড়িয়ে ছিলাম। বুঝলাম তিনিই এ বাড়ির মালিক। আমাদের বাড়ির ভিতর নিয়ে গেলেন,বসালেন একটা বিছানার উপর। তারপর একট তোয়ালে হাতে নিয়ে আমাদের দুজনকে শান বাঁধানো পুকুর ঘাটে নিয়ে গেলেন। আমরা সুবোধ বালকের মতো হাত পা ধুইয়ে আবার তার পিছু পিছু বাড়ির ভিতর চলে গেলাম। গিয়ে দেখি টেবিলে খাবার রেডি। ভাত আর কোন একটা মাছের তরকারি। খাবার দেখেই এতক্ষণে ক্ষুধার কথা মনে পড়ল। তাড়াতাড়ি বসে পড়লাম খেতে। আমাদের সামনেই বসা এক বৃদ্ধা। আমাদের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছেন,''এই পোলাপান অল্প বয়সেই ফাজিল হয়ে গেছে, বাড়ি থেকে পালানো? কি সাংঘাতিক! আমরা তো কটমট করে বুড়ীর দিকে তাকাচ্ছি,মনে মনে বড়ীর মুন্ডুপাত করছি। ইতিমধ্যেই বুড়ীর পাশে আরও দুজন পিচ্চি মেয়ে এসে হাজির,সাথে তাদের মা। পিচ্চি দুটো আমাদের অবাক চোখে দেখছে। শুয়ে,বসে,দাঁড়িয়ে যতভাবে দেখা যায়। যাই হোক ভাত খাওয়া শেষে আমরা আবার বিছানায় এসে বসলাম,সাথে সেই লোকটিইও। জিজ্ঞেস করলেন কেন বাড়ি থেকে পালিয়েছি? বললাম,''আমরা পালাই নি,ঢাকা যাবার পথে পথ হারিয়ে ফেলেছি।''
ও আচ্ছা, লোকটাকে দেখেই মনে হলো তিনি আমার কথা বিশ্বাস করেন নি। ঠিকানা চাইলেন, ভুল ঠিকানা দিয়ে দিলাম। বাসার ফোন নাম্বার যখন চাইলেন তখন সজীব বলে উঠল, ৮০১.... আমি তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম,''ফোন নাম্বার মনে নেই।'' চিন্তা করতে লাগলাম,বাসায় ফোন করলে কি হতে পারে।
''ঠিক আছে তোমরা এখন শুয়ে পড় আর খবরদার রাতে পালানোর চেষ্টা করো না আবার।''
লোকটা নিজের হাতে মশারি টানিয়ে দিলেন। যখন বিছানায় গা লাগালাম তখন বাসার কথা মনে হতে লাগল। চোখ দিয়ে পানি ঝড়তে লাগল।
সজীব বলল,দোস্ত কালকে সকালেই বাসায় যামু গা।''
আমি বললাম,'' হ ঠিকই কইছোস''
কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম কেউ জানে না। সকালে তাড়াতাড়ি উঠেই যাওয়ার জন্য রেডি হলাম। ভালো মানুষ লোকটা আমাদের বাসে তুলে দিলেন। তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিলাম। দুঃখের বিষয় তার নামটাই জানা হলো না!

বাসায় এসে দেখি সব ফ্লাটের মানুষ আমাদের বাসায় এসে জড় হয়েছে। আমার বেশ লজ্জা লাগছে এখন। দৌড়ে গিয়ে বিছানায় আম্মুর কোলে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। লজ্জায় চোখ তুলে তাকাতে পারছি না। কিন্তু এতকিছুর মধ্যেও টের পাচ্ছি আমার প্যান্টের পিছনের পকেটে রাখা পার্ক চকলেটটা বের করে নিচ্ছে আমার পিচ্চি ভাইটা!!! এত উত্তেজনার ভিতরে চকলেট বারটা খাওয়ার সময়ও পাই নি।

এরপর কয়েকদিন রাস্তায় বেরুতে কি যে লজ্জ লাগত! স্কুলে সবাই আমাদের দুজনকে দেখে মুখ টিপিয়ে হাসে। এই নিয়ে একজনকে ধোলাইও দিয়েছিলাম। এরপর স্যাররা সব ক্লাসে এসে সব উদাহরণের বেলায় আমাদের টানেন। এই ক্লাসের সবচেয়ে ফাজিল কে? চয়ন আর সজীব। সবচেয়ে সেন্টিমেন্টাল কে? চয়ন আর সজীব। আরও কত কি?
মনে পড়লে এখনও হাসি পায়। অন্তরের গভীর থেকে ধন্যবাদ জানাই সেই লোকটিকে।

অনেকেরই হয়তো এ ধরণের অভিজ্ঞতা আছে,আশা করি শেয়ার করবেন।
১৩ টি মন্তব্য
savik আসিফুর রহমান১৫ জুলাই ২০০৯, ১১:১৮
জোস্ তো.......
rokter_rong হে চয়ন১৬ জুলাই ২০০৯, ১১:০৭
আসলেই মজার ছিল ঘটনাটা
gogodools িকবাল মাহমুদ১৫ জুলাই ২০০৯, ১১:৪৮
rokter_rong হে চয়ন১৬ জুলাই ২০০৯, ১১:০৭
হুমমম
godhulirsurjo গোধুলীর সুর্য১৫ জুলাই ২০০৯, ১১:৫১
হা হা হা , জিবনেও পালাইনি
rokter_rong হে চয়ন১৬ জুলাই ২০০৯, ১১:০৮
এটা ছিল দারুন এক এক্সপেরিয়েন্স
shoummo71 সৌম্য১৬ জুলাই ২০০৯, ০১:০৫
৩ ঘন্টা ধরে অফলাইনে বসে আছি। এই লিখাটা পড়ে লগ ইন করতেই হলো কমেন্ট করার জন্যে।
এক কথায় অসাধারন লেখনী।
rokter_rong হে চয়ন১৬ জুলাই ২০০৯, ১১:১০
আপনার কথা শুনে ভাল লাগল সৌম্য ভাই, ধন্যবাদ আপনাকে
mahmud মাহমুদ১৬ জুলাই ২০০৯, ০৮:১৮
চয়ন তোমার লেখা খুব সুন্দর তবু তুমি নিয়মিত লিখোনা কেনো?
rokter_rong হে চয়ন১৬ জুলাই ২০০৯, ১১:১১
মাহমুদ ভাই,পড়াশুনার চাপে সময় বের করতে পারি না খুব একটা আর বাকিটা বোধহয় আলসেমি। তবে নিয়মিত লিখব । ধন্যবাদ মাহমুদ ভাই
kamaluddin কামাল উদ্দিন১৭ জুলাই ২০০৯, ০৪:২৬
আমারো বাড়ি পালানোর অনেকবারের অভিজ্ঞতা আছে কোন এক সময় লিখব, আপনার গল্পটা ভালো লেগেছে, আপনার লেখনি চমৎকার ।
rokter_rong হে চয়ন১৮ জুলাই ২০০৯, ১১:৫২
আপনার গল্প শুনার অপেক্ষায় রইলাম কামাল ভাই
anson এনসন১৯ জুলাই ২০০৯, ০৯:১৭
অসাধারন আইডিয়া

সাম্প্রতিক পোস্ট Star

সাম্প্রতিক মন্তব্যComment