একুশে ফেব্রুয়ারীতে লিখলাম
অনেক দিন ধরে ভাবছিলাম লিখব ব্লগটাতে, কিন্তু সময়ই করে উঠতে পারছিলাম না। অবশেষে আজ ভাষা দিবসের মাহেন্দ্রক্ষণে না লিখা অন্যায় হবে, এই ভেবে লিখছি। যাদের আত্মত্যাগে এই বাংলায় লিখতে পারছি তাদের আত্মত্যাগকে অসম্মান করা হবে যদি আজকের ক্ষণে না লিখি। তাই শত ব্যস্ততার মাঝেও আজ লিখছি। বিষয় তেমন কিছু না, তবে আবার গুরুত্বপূর্ণও কেননা আজ সালাম/রফিক/বরকতদের রক্তের বিনিময়ে আমরা যা পাচ্ছি তা নিয়ে কিছু বলব।
সেদিন উকিলের অফিসে গেলাম বাবা-মাকে নিয়ে ট্যাক্স ফাইল করতে হবে। মোটামুটি বড়ই লাইন ছিল, তাই অপেক্ষা করতে হলো অনেকক্ষণ। দেখলাম এক মহিলা (দেখে তো মনে হলো বাঙালীই) কিন্তু কথা বলছিল ইংরেজীতে ফোনে। মনে করলাম হয়তো বা তাহলে দক্ষিণ এশীয়ই হবে (চেহারাতে তো তাই বলে)। যা হোক, কিছুক্ষণ পরে ওনার এক বোন আসলো ট্যাক্স ফাইল করতে। উনিও বোনের সাথে ইংরেজীতেই কথা বলছেন। আমরা (আমি, বাবা-মা) যখন কথা বলছিলাম আমাদের দিকে কেমন যেন বিদ্রুপাত্মক দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল। যাক গে! কিছুক্ষণ পরে দেখি উকিলের স্ত্রী এসে আমাদের বলছেন চা-কফি কিছু খেতে আর ওনাদেরকেও বলছেন। একি বাংলাতে বলছেন, আর ওনারাও বুঝছেন! ওনারা কি বাংলা বোঝেন, না তাই নয় তো! ওনারা তো বাংলা বলতেও পারেন। উকিলের স্ত্রীর সাথে তো বাংলাতেই বলছেন। একি তাহলে বোনে বোনে এমন করে ইংরেজীতে বলছিলেন কেন?
কিছুক্ষণ পরে বুঝলাম এরা বাংলাদেশেরই লোকজন। বিদেশে এসে বদলে গেছেন। ভাই-বোন, বা এমনকি ছেলে-মেয়ের সাথেও (ফোনে সম্ভবত ছেলের সাথে বলছিলেন) ইংরেজীতে! এই কি আমার মায়ের ভাষা? এই কি তাদের মায়ের ভাষা? এর জন্যই কি ওরা রক্ত দিয়ে গেছে? আরে, আমরা কি ইংরেজী জানি না নাকি ইংরেজী বলে জাহির করতে হবে ওনারা ইংরেজী জানেন? বুঝি না এদের মনস্তত্ত্ব।
এ তো গেলো বিদেশের “নব্য বাঙালীদের” কথা, যারা নিজেদের পরিচয় বাঙালীই দিতে চায় না। সুদূর মাটিতে পরে নিজেদেরকে ভিনদেশী হিসেবে দেখাতে চায় অন্যদের কাছে। কিন্তু সেদিন খবরে দেখলাম (এখন বেশী দেখা হয় না, মাঝে মধ্যে উইকেন্ডেতে দেখি বাবার সাথে) এক রিপোর্টার রিপোর্ট করছেন বাংলাদেশের (বিশেষ করে ঢাকার) স্কুলগুলোর যেখানে ইংরেজী মাধ্যমের কিছু বাচ্চাদের মধ্যে জানতে চাওয়া হলো তারা জানে নাকি বাংলার মাহাত্ম্য। একজনকে জিজ্ঞেস করলো, বাংলা মাসগুলোর নাম বলতে। জৈষ্ঠ্য বলে আর আওড়াতে পারছে না। আরেকজনকে বলে, বাংলাদেশের জাতীয় কবি কে? বলে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। হায় রে কপাল! এই প্রজন্মের জন্যই কি আমাদের ভাইয়েরা রক্ত দিয়েছিল পাকিস্তানীদের সামনে? এই ফল পাবার আশায়? দেশে-বিদেশে এই হাল হচ্ছে আর আমরা বাংলা ভাষা-ভাষীরা কি চেয়ে চেয়ে দেখব বাংলার এমন করুণ দশা?

Phonetic
আফসোস।
আফসোস করে করে আর কত দিন কাটাবো বলুন?
হুমমম..ব্লগে স্বাগতম..একুশের শুভেচ্ছা রইল..
আপনাকেও একুশের শুভেচ্ছা
প্রথম আলো ব্লগে স্বাগতম আপনাকে।
একটা গল্প শোনাই, হয়ত খুব প্রাসঙ্গিক না, তবুও শোনাই। মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় গেছেন এক স্কুল পরিদর্শনে। মত বিনিময় সভায় শিক্ষকদের প্রচন্ড ধমক লাগালেন তিনি, কী লেখা পড়া শেখান মিঞা, কয়দিন আগেই বিলাত গেলাম, ঐহানে ছোড ছোড পোলাপান কি সুন্দর ইংরাজীতে কথা কয়...!
হুমম...এরকমই তো মনে হচ্ছে। বাঙালী এখন নব্য ভিনদেশী হবার ধান্দায় আছে, নিজ সংস্কৃতি সব বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
দুঃখজনক আমাদের জন্য!!!!

এই বলেই কি আমাদের এ থেকে সরে আসতে হবে? কিছু কি করা যায় না? একটা গণজোয়ার?
শুধু ভাষা নিয়ে দুঃখ পেয়ে কী হবে। দেশ হিসেবে আমরা এখনও অনেক ব্যপারেই অন্যদের মুখাপেক্ষি। এই নির্ভরশীলতাই আমাদের মধ্যে সামান্য হীনমন্যতার জন্ম দিয়েছে। আর হীনমন্যতা থেকে নিজের বাঙালী পরিচয় নিয়ে লুকোচুরি।
তাহলে সেই যে ব্রিটিশরা চলে গিয়েও কিন্তু আমাদের পরাধীন করে রেখে গেছে। তাদেরই ইংরেজী মাধ্যমকে আমরা আজো দিন দিন ব্যাপকহারে ব্যবহার করছি। বিশ্বায়নের ফলেই কি তাহলে বাংলার মতো ভাষার দমে যাচ্ছে? ব্যবহার কমে যাচ্ছে? এমনকি আমাদের বাঙালীদের মাঝেও?
সেদিন একটা খবরের ইন্টারভিউতে দেখলাম এক কোরিয়ান (বাংলা জানে এমন এক মহিলা) বলছিল, "এটা খুবই দুঃখজনক বাঙালীরা একজন আরেকজনকে দেখলে ইংরেজীতে কুশলাদি বিনিময় করে।" তাহলে দেখুন, বিদেশীরাও বুঝতে পারছে বাঙালীরা নিজেরাই নিজেদের ভাষার মর্যাদা রক্ষা করতে পারছে না। হায়!