স্ব ধ্যান-ধারণা

জানুয়ারি
১০

কিছু বিভ্রান্তি...অতঃপর এই লেখা

আমার আগের লেখাটা খুব সম্ভবত ভাষাগত বা বলার কোনো ত্রুটীর কারণে অনেকের কাছেই উষ্কানীমূলক লেগেছে। আমি যে মূল বক্তব্য বলতে চেয়েছিলাম সেই লেখায়, আমার মনে হয় না খুব বেশী পাঠককে তা আমি বোঝাতে পেরেছি। তাই এই অহেতুক বিভ্রান্তি দূর করতে এই লেখা। তবে আমি আগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি আগের লেখায় যদি পাঠকের কাছে কোনো ত্রুটীপূর্ণ বক্তব্য আমি বলে থাকি।

এবার মূল কথায় আসি।

আগের লেখার মূল বিষয় ছিল, রাম মন্দির ও বাবরি মসজিদ সংক্রান্ত। ভারতের অযোধ্যা নগরীতে হিন্দুদের বিশ্বাস অনুযায়ী রাম মন্দির পূর্বে ছিল বা ওই অঞ্চলে রামের জন্ম হয়েছিল। অনেকের কাছে এসব বিষয় উপাখ্যান বা পৌরাণিক কাহিনী হিসেবে (যেমন গ্রীসের mythology) মিথ্যা মনে হতে পারে। কিন্তু একজন হিন্দু হিসেবে অনেকেই এসবে বিশ্বাস করে থাকেন। আমিও তাদেরই একজন।

বলা হয়, মুঘল সম্রাট বাবর ওখানে মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। সত্য-মিথ্যা কি তা নিয়ে ঘাটাঘাটি করলে কাদা ছোড়াছুড়ি শুরু হয়ে যাবে, তাই মূল আলোচনায় আসি।

যেকোনো ধর্মাবলম্বীর কাছে তার নিজ নিজ ধর্ম অন্য সকল কিছুর চেয়ে বড়। বাংলাদেশ বা ভারতের মত উপমহাদেশের দেশগুলোতে ধর্ম আরো বড় ভূমিকা বহন করে পশ্চিমা দেশগুলোর চেয়ে। তাই, সহজেই আমাদের উপমহাদেশের মানুষ অল্প ধর্মীয় আঘাতই সহ্য করতে না পেরে হানাহানি, বিবাদে লিপ্ত হয় - যা খুবই অনাকাঙ্খিত। যেমন করে হিন্দু কোনো মহাপুরুষ, ঋষি এসব সমর্থন করবেন না, আমার মনে হয় না কোনো মুসলিম ইমাম বা হুজুরেরাও করবেন।

বাবরি মসজিদ যেমন করে উগ্রভাবে কিছু হিন্দু ভেঙ্গেছে তা সত্যিই দুঃখজনক। এ ধরনের ঘটনা আসলেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আরো লেলিয়ে দেয় - এ কথা অনস্বীকার্য। এ ঘটনায় যারা লিপ্ত ছিলেন, তারা অবশ্যই দাঙ্গাতে ইন্ধন দিয়েছেন। এখানে একটা বিষয় লক্ষ্য রাখবেন, সকল হিন্দুই কিন্তু সেই ঘটনার সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেননি। যেমনভাবে এইসব হিন্দুগণ উগ্রবাদী হিসেবে পরিচিত, মুসলিম সমাজেও কিন্তু বর্তমান সময়ে উগ্রবাদীদের সংখ্যা কম নয়। তাই বলে আমি এই বলছি না সকল মুসলিমই জঙ্গীবাদী মনোভাব পোষণ করেন।

এখানে আমি একটা বিষয় স্পষ্ট করতে চাই যে, সহিংসতা কখনোই কোনো দেশ, জাতি, বা সমাজের জন্য মঙ্গল বয়ে আনে না। যেমনভাবে সেইসব কিছু হিন্দুর জন্য অন্য হিন্দুদের মূল্য দিতে হয়েছে, তেমনিভাবে আজকের কিছু বিচ্ছিন্ন মৌলবাদী মুসলিমদের জন্য সারা বিশ্বে মুসলিমরা বৈষম্যের স্বীকার হচ্ছে। আর এটি শুধু হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না। খ্রীষ্টান-ইহুদী মৌলবাদীও কিন্তু বিশ্বে আছে। মৌলবাদী মানে শুধু মুসলিম বা হিন্দু নয়, এরা হলেন কট্টরপন্থী। এরা ধর্মের নাম ভাঙিয়ে সহিংসতার লিপ্ত হন।

বর্তমান সমাজ খুবই সচেতন (কমপক্ষে আমার আগের লেখায় পাঠকদের মন্তব্য পড়ে যতদূর বুঝতে পারলাম)। অধিকাংশ মানুষই শান্তিপ্রিয়। কিন্তু যখনই আমাদের নিজেদের কোনো মন্দির-মসজিদে আক্রমণ হয়, তখনই কিন্তু আমরা আমাদের আবেগ বশীভূত রাখতে পারি না। নানাভাবে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে যেয়ে শান্তি ভঙ্গ হয়, বিশৃঙ্খলা বাধে।

কিন্তু একবারও কি ভেবে দেখেছেন, এসবের জন্য কারা দায়ী। শুধুমাত্র একাংশ হিন্দু বা একাংশ মুসলিমদের জন্য সারা জাতি কি দায়ী হতে পারে? হয়ত শিব সেনারা বাবরি মসজিদ ভেঙ্গেছে, কিংবা লস্কর-ই-তৈয়বার হাত ছিল মুম্বাইয়ের নানা সময়ের হামলায়, কিন্তু তাই বলে কি সারা হিন্দু জাতি দায়ী হতে পারে বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার পেছনে কিংবা ভারতের পুরো মুসলিম জাতি মুম্বাই হামলার পেছনে?

তাহলে, সেইসব কিছু উগ্রপন্থীদের আমরা কি করছি? আমরা বলছি আমরা আমাদের সমাজ থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন ঘোষণা করেছি। তাদেরকে সমাজচ্যুত ঘোষণা করেছি। কিন্তু তাতেই কি সমস্যার সমাধান হচ্ছে? শিব সেনাই কি শিবের নাম করে তাদের বাহিনী রিক্রুট করতে বাধার সম্মুখীন হচ্ছে, কিংবা মাদ্রাসাকে ব্যবহার করে লস্কর-ই-তৈয়বা বা আল-কায়েদা সুস্থ প্রকৃতির মুসলিমদের অসুস্থ পথে নিতে বাধার সম্মুখীন হচ্ছে?

আমি জানি, অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিই (যেমন মহাত্মা গান্ধী) বলে গেছেন, An eye for an eye makes the whole world blind। কিন্তু আজকের যুগে কি তা দিয়ে দুষ্টকে দমিয়ে রাখা সম্ভব। যতদূর আমি বুঝি, না। এর জন্য প্রয়োজন আমাদের মধ্যে একতা। একতাবদ্ধ হয়ে আজ যদি আমরা আমাদের নিজ নিজ ধর্মের নানা খারাপ দিকগুলো দেখি, মন্দিরে মসজিদে সেগুলো নিয়ে আলোচনা করি, তাহলে কি পারবে শিব সেনা মতো বাহিনী কিংবা লস্কর-ই-তৈয়বার মতো গোষ্ঠী আমাদের মধ্য থেকে বাহিনী তৈরীতে লোক রিক্রুট করতে? প্রয়োজনে যুদ্ধ যদি ঘোষণা করি, নিজ নিজ ধর্মের মধ্যে সেইসব গোষ্ঠী-বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। যদি সম্ভব হয়, সেসব লোকগুলোকে বোঝাবো। যদি বোঝার সীমার মধ্যে না থাকে, তখন কি তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেয়া খুবই অন্যায় হবে? তার উপরে যেখানে তাদের মতো কিছু লোকদের জন্য একটা গোটা সম্প্রদায় তিরস্কারের পাত্র বনে যায় অন্য সম্প্রদায়ের কাছে।

সুতরাং, আসুন আমরা সকলে একযোগে সেইসব জঙ্গীবাদী/মৌলবাদী যেন গড়ে উঠতে না পারে সে দিকে নজর দেই। শুধু নজর না, প্রয়োজনে এ্যাকশনে নামব। তবুও তাদের জন্য মিথ্যা অপবাদের গ্লানি নিয়ে চলব না।

[বি. দ্র. - উপরোক্ত কথাগুলো একান্তই আমাদের ব্যক্তিগত অভিমত। এর সাথে অন্যের মতের পার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু তাই বলে গালাগালি, কাদা ছোড়াছুড়ির মতো ঘটনা ঘটলে তা হবে পুরোই অনাকাঙ্খিত। আশা করছি সকলে শোভনীয় আচরণ করবেন।]


৫টি মন্তব্য

  • সাইদুর রহমান চৌধুরী বলেছেন ২০১০/০১/১০ ২২:১০:৪০

    আপনার অন্য কিছু লেখার মত স্টকে থাকলে সানন্দে আপনার লেখা পড়তে আসবো, এসব ধর্মে ধর্মে কুটকচালি দেখতে দেখতে বিরক্ত হয়ে গেছি।

    পাপ্রদজ বলেছেন ২০১০/০১/১০ ২২:২৮:০৬

    আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে কিছু বলেন ভাই।

  • মুরুব্বী বলেছেন ২০১০/০১/১০ ২২:৪২:১৫

  • গঙা বলেছেন ২০১০/০১/১০ ২২:৪২:৫৭

    পাপ্রদজ ভাই , ধর্ম ধর্ম করেই তো সব গেল !
    আমার একটা কবিতার কয়েকটি লাইন লিখে গেলাম ! এর মাঝেই আমার মন্তব্য খুঁজে নেবেন । তবে আপনার এই লেখাটির জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ !


    তারা সাজিয়া বকধার্মিক
    হাসিছেন সদা ফিক-ফিক
    সমাজে সৃজিয়া অনাচার
    ঢেলে বিষ ধর্মান্ধতার
    এ সমাজের মুখে ;
    জাগায়েছে বিষজ্বালা আজ সমাজের বুকে !

    পাপ্রদজ বলেছেন ২০১০/০১/১০ ২২:৪৮:০৭

    অসাধারণ পংক্তি!



প্রথম আলো, সিএ ভবন, ১০০ কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা ১২১৫