বৃহস্পতিবার ২৯ জুলাই ২০১০, ১৪ শ্রাবণ, ১৪১৭ সাইনইন | রেজিস্টার |bangla font problem

বাঙ্গালী’র মাতৃভাষার আন্দোলন। (২য় অংশ)

ইতিপূর্বে সংবিধানের কাঠামো ও মূলনীতি নির্ধারণের জন্য গণপরিষদ কর্তৃক গঠিত মূলনীতি কমিটি ১৯৫০ সালের ৭ সেপ্টেম্বর রিপোর্ট প্রদান করলে দেখা যায় যে, তারা উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উল্লেখ করেছে। উর্দুর বিরুদ্ধে ১৯৪৭ সাল থেকে পূর্ব বাংলার জনগণের প্রতিবাদ চলতে থাকলেও জিন্নাহর মৃত্যুর পরে পূর্ব বাংলাসহ পাকিস্তানের রাজনীতির মোড় ঘুরে যায়। এসময় শহীদ সোহরাওয়ার্দী ভারত থেকে পাকিস্তানে আসেন। তার পৃষ্ঠপোষকতায় জন্ম নেয় নতুন রাজনৈতিক দল পূর্ব বাংলা আওয়ামী মুসলিম লীগ। অনুরূপ তার নেতৃত্বে পাকিস্তান ভিত্তিক রাজনৈতিক দল “জিন্নাহ আওয়ামী লীগ” গঠিত হয়। মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠিত এটাই ছিল প্রথম রাজনৈতিক দল। কেন্দ্রীয় জিন্নাহ আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন সোহরাওয়ার্দী এবং পূর্ব বাংলার সভাপতি হন মাওলানা ভাসানী। এর পরেই ১৯৫১ সালের মার্চে জন্ম নেয় “পূর্ব বাংলা যুবলীগ”। এর সভাপতি ও সম্পাদক ছিলেন যথাক্রমে মাহমুদ আলী ও অলী আহাদ (জম্ম ১৯২৯)। একই বছরের অক্টোবর মাসে লেয়াকত আলী খানের মৃত্যু হলে পাকিস্তান রাজনীতিতে বিরোধীদের অবস্থান আরো শক্তিশালী হয়ে উঠে। অন্যদিকে পাকিস্তানী প্রশাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটে। খাজা নাজিম উদ্দীন প্রধানমন্ত্রি হন। কিন্তু জিন্নাহর ঘোষিত উর্দু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হওয়া থেকে পাকিস্তানী শাসকরা সরে পড়েননি। প্রধানমন্ত্রী হয়ে ১৯৫২ সালের জানুয়ারীর শেষ দিকে খাজা নাজিম উদ্দীন ঢাকায় এক জনসভায় ঘোষণা দেন যে উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এটা একদিকে ছিল পাকিস্তানের পশ্চিমাংশের আমলা ও শাসকদেরকে সšু‘ষ্ট করার একটা ঘোষণা, অন্যদিকে তিনি (নাজিম উদ্দিন) ভেবেছিলেন পূর্ব বাংলার ছাত্র সমাজ এ ব্যাপারে আর কোন প্রতিবাদ করবে না। কার্যতই লেয়াকত আলী খানের মৃত্যুর পর থেকে পূর্ব বাংলায় ভাষার প্রশ্ন নিয়ে তেমন কোন হৈ চৈ দেখা যায়নি। কিন্তু নাজিম উদ্দীনের ঘোষণায় পূর্ব বাংলার মধ্যবিত্ত শিক্ষিত মহলে প্রতিবাদের জোয়ার এনে দেয়। চলতে থাকে প্রতিবাদ শুরু হয় রক্ত ঝরা আন্দোলন।

পাকিস্তানী শাসকদের পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত দৈনিক আজাদ ও মর্নিং নিউজ নাজিম উদ্দীনের ঘোষনাটি ছাপিয়ে প্রশংসা করতে থাকে। (দৈনিক আজাদ একটি জাতীয় বাংলা দৈনিক পত্রিকা। ১৯৩৬ সালের ৩১ অক্টোবর কলিকাতা থেকে আÍপ্রকাশ করে। মাওলানা আকরাম খাঁর সম্পাদনায় বাংলা ও আসামের মুসলমানদের মুখপত্র হিসেবে দৈনিক আজাদ প্রকাশিত হয়। ১৯৯০ সালে পত্রিকাটির প্রকাশনা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়। )

((“মর্নিং নিউজ” ইংরেজী দৈনিক সংবাদ পত্র। ইহা ঢাকার নবাব পরিবারের খাজা নুুরুদ্দিনের প্রচেষ্টায় ১৯৪২ খৃষ্টাব্দে কলিকাতায় প্রকাশিত হয়। প্রথম সম্পাদক ছিলেন আবদুর রহমান সিদ্দিকী, এরপর সম্পাদক হন ডঃ জিলানী। পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর ইহার কার্যালয় ঢাকায় স্থানান্তর করা হয় এবং বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করার পর কয়েক বছরের মধ্যে পত্রিকাটি প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়। দেখুন-বশির আল-হেলাল, পৃষ্ঠা-১৪১।))

তার এ ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় ৩০জানুয়ারী ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতীক ধর্মঘট ও সমাবেশ আয়োজিত হয়। সমাবেশে রাষ্ট্রভাষা সংক্রান্ত বিষয়ে ১৯৪৮ এ স্বাক্ষরিত চুক্তির পবিত্রতা রক্ষা করার দাবী জানানো হয়। (((১৯৪৮ এ স্বাক্ষরিত চুক্তি:- ১৬ মার্চ ১৯৪৮ সালে পরিষদ ভবনের সামনে অব্যাহত তুমুল বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে দুর্বল চিত্ত মুখ্যমন্ত্রি খাজা নাজিম উদ্দীন ছাত্রদের সাথে আপোষ মিমাংসার প্রস্তাব পাঠান। সংগ্রাম পরিষদ সঙ্গে সঙ্গেই সেই প্রস্তাব লুফে নেয় এবং ফজলুল হক হলে অনুষ্ঠিত সভায় কামরুদ্দিন আহমদ, নঈম উদ্দীন আহমদ, মোহাম্মদ তোয়াহা ও আবদুর রহমান চৌধুরী প্রমুখ কয়েকজন মুখ্যমন্ত্রির সাথে আলোচনায় বসেন এবং তুমুল বিতর্কের পর ৮ দফা চুক্তিনামা (অবশ্য জেলে আটক শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, কাজী গোলাম মাহমুদ প্রমুখের সম্মতির সাপেক্ষে) স্বাক্ষরিত হয়। সংগ্রাম পরিষদের পক্ষে স্বাক্ষর দেন কামরুদ্দিন আহমদ এবং সরকার পক্ষে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রি নাজিম উদ্দীন। স্বাক্ষরিত চুক্তির ধারাগুলো ছিল নিন্মরুপঃ
(১) ভাষা আন্দোলনে ধৃত বন্দীদের অবিলম্বে মুক্তি (২) পুলিশের অত্যাচার সম্পর্কে মুখ্যমন্ত্রি কর্তৃক তদন্তকরণ (৩) এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে পূর্ব বাংলার আইন সভার অধিবেশনে রাষ্ট্রভাষা বাংলা সম্পর্কে প্রস্তাব উত্থাপন (৪) প্রাদেশিক ভাষা হিসেবে বাংলা পক্ষে প্রস্তাব উত্থাপন(৫) আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে কোনরূপ ব্যবস্থা না নেয়া (৬) সংবাদ পত্রের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। (৭) কোন কোন স্থানে জারীকৃত ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার এবং(৮) আন্দোলনকারীগণ রাষ্ট্রের দুশমন নন এইস্বীকৃতি। দেখুন- রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, এম এ বণিক পৃষ্ঠা ৭৯-৮০ ; বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র, প্রথম খন্ড ১৯৮২, পৃষ্ঠা -৭৭।)))

৩০জানুয়ারী ওই সভায় রাষ্ট্রভাষার আন্দোলনকে পুনঃ সংগঠিত করার ঘোষণা করা হয় এবং ৪ ফেব্র“য়ারী ঢাকার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট আহ্বান করা হয়। এর পরদিনেই ঢাকার বার লাইব্রেরীতে ভাসানীর আহ্বানে বিরোধী দলীয় নেতৃবৃন্দের এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে খেলাফতে রব্বানী পার্টি, তমদ্দুনে মজলিশ, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, পূর্ব বাংলা আওয়ামী মুসলিম ছাত্র লীগ এবং যুব লীগের নেতৃবৃন্দ ও কর্মীরা যোগ দেয়। উক্ত সভায় একটি প্রস্তাবে পল্টন ময়দানের বক্তৃতায় খাজা নাজিম উদ্দীনের রাষ্ট্রভাষা বিষয়ক বক্তব্যের বিরুদ্ধে নিন্দা ও প্রতিবাদ জ্ঞাপন করা হয় এবং অবিলম্বে তার সে বক্তব্য প্রত্যাহার করার দাবী জানানো হয়। সভার অপর এক প্রস্তাবে আরবী অক্ষরে বাংলা প্রচলনের সরকারী চক্রান্তের বিরোধিতা করে সে চক্রান্ত বন্ধ করার দাবী জানানো হয় এবং ৪টা ফেব্র“য়ারী বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদ কর্তৃক আহুত ধর্মঘটের প্রতি সমর্থন জানানো হয়। সভায় কাজী গোলাম মাহবুবকে আহ্বায়ক করে ৪০ সদস্য বিশিষ্ট একটি সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। ৪০ সদস্য বিশিষ্ট এ পরিষদে ছিলেন মাওলানা ভাসানী (১৮৮৫-১৯৭৬), আবুল হাশিম(১৯০৫-১৯৭৪), আতাউর রহমান(১৯২৫-১৯৯৯), কামরুদ্দীন আহমদ (১৯১২-১৯৮২), খয়রাত হোসেন, আনোয়ারা খাতুন, শামসুল হক, আবুল কাশেম,(১৯২০-১৯৯১) আবদুল গফুর, মোহাম্মদ তোয়াহা, অলি আহাদ, মির্জা গোলাম হাফিজ, আবদুল মতিন, কাজী গোলাম মাহবুব, শামসুল হক চৌধুরী, খালেক নেওয়াজ খান, সৈয়দ আবদুর রহিম প্রমুখ।

বাঙ্গালী’র মাতৃভাষার আন্দোলন। প্রথম অংশ দেখার জন্য এখানে ক্লিক করুন
৩ টি মন্তব্য
kutubi নিজাম কুতুবী২০ ফেব্রুয়ারি ২০১০, ১১:৩৮
তথ্য সুত্রঃ---
রবীন্দ্র নাথ ত্রিবেদী, সম্পাদিত, বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ: প্রাসঙ্গিক দলিল পত্র,(ঢাকা: জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন,১৯৯৮)
আবদুল মতিন-আহমদ রফিক, ভাষা আন্দোলন ইতিহাস ও তাৎপর্য, (ঢাকা: জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী, ১৯৯২)
বদর উদ্দীন ওমর, পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি, (ঢাকা: জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন
আবদুল মতিন-আহমদ রফিক, প্রাগুক্ত
অপরূপ তালুকদার, আমাদের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, (ঢাকা: অগ্রদুত বইঘর, ১৯৯৯)
এম আর আখতার মুকুল, ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা, (ঢাকা: শিখা প্রকাশনী ১৯৯৯)
বশির আল হেলাল, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, (ঢাকা: বাংলা একাডেমি,১৯৮৫)
দৈনিক সৈনিক,
দৈনিক সৈনিক,ভাষা আন্দোলন ও শহীদ সংখ্যা....।
sujanpranto12 সুজন২১ ফেব্রুয়ারি ২০১০, ০৭:০৮
জানার মত চমৎকার একটি পোষ্ট নিজাম ভাই।
drrumi ডাঃ রুমী২১ ফেব্রুয়ারি ২০১০, ১২:৪৪
প্রিয়তে রাখলাম । ভাল থাকবেন সবসময় ।

সাম্প্রতিক পোস্ট Star

সাম্প্রতিক মন্তব্যComment