বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরিদের সাহিত্যকীর্তি
![]()
বাংলাদেশে শতাধিক ক্ষুদ্র ধর্ম-সংস্কৃতি ও ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর বসবাস। এদের মধ্যে যে জনগোষ্ঠীটি তার সংস্কৃতি তথা নৃত্য-ঐতিহ্যের কারণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিল তারা হলো মণিপুরি জনগোষ্ঠী। রবীন্দ্রনাথের তৎপরতায় তাদের নৃত্যরীতি সমগ্র ভারতবর্ষে ধ্রুপদী নৃত্যের মর্যাদা পায় ঠিকই, কিন্তু এ কথাও ঠিক যে, রবীন্দ্রনাথ প্রদত্ত সেই পরিচয়ের আড়ালে থেকে যায় মণিপুরি জনগোষ্ঠীর ভাষা, সাহিত্য, দর্শন ও বৃহত্তর সংস্কৃতির ঐতিহ্যগত পরিচয়। যেমন বাংলাদেশ ও ভারতের আসাম-ত্রিপুরায় বসবাসরত মণিপুরিদের নৃত্যধারার পাশাপাশি অন্যান্য সৃজনশীল ও গৌরবময় পরিচয়ের মধ্যে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিনির্ভর সাহিত্যকীর্তি। সম্প্রতি কবি ও নাট্যকার শুভাশিস সিনহার অনুবাদ ও সম্পাদনায় দুই খন্ডে প্রকাশিত মণিপুরী সাহিত্য সংগ্রহ পাঠে মূলত বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরিদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিনির্ভর সাহিত্যকীর্তি হিসেবে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরিদের প্রাচীন মৌখিক রীতির গান, কবিতা, প্রবাদ, লোককথার পাশাপাশি আধুনিককালে রচিত প্রবন্ধ, গল্প, নাটকের সমৃদ্ধ ইতিহাসের প্রমাণ পাওয়া গেল।
গ্রন্থটির প্রথম খন্ডের ভুমিকাংশে সম্পাদক মণিপুর ও মণিপুরিদের ইতিহাস, মণিপুরিদের ভারত-বাংলাদেশ বিস্তৃত বসতিস্থাপন সুত্র, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিবৃত্ত বর্ণনা করেছেন। মূলত সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে মণিপুরি রাজা পামহৈবার আত্যাচার ও রাজনৈতিক কোন্দলে জর্জরিত হয়ে প্রাণ বাঁচাতে অনেক মণিপুরি তাদের আদি ও মূল আবাসস্থল ভারতের মণিপুর থেকে ভারতের আসাম-ত্রিপুরার বিভিন্ন অঞ্চলে, মিয়ানমারে এবং বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের ছড়িয়ে পড়ার ইতিহাস ব্যক্ত করার পাশাপাশি শুভাশিস সিনহা ‘বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী কবিতা ও সাহিত্যিক তৎপরতা’ অধ্যায়ের শুরুতেই জানিয়েছেন, ‘বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী সাহিত্যের প্রধান এলাকা আসাম ও ত্রিপুরা। সেখানে প্রায় তিন লাখ মণিপুরী আছে এবং অসংখ্য সাহিত্যিকও। সে তুলনায় বাংলাদেশে নানা রাজনৈতিক জৈবনিক অস্িথরতার কারণে সাহিত্যের ধারাটা তেমন বেগবান নয়।’ তারপর তিনি প্রথাগতভাবে ইতিহাস বিশ্লেষণ করে প্রাচীন, প্রাক-আধুনিক ও আধুনিক সাহিত্য এই তিনটি পর্যায়ে মণিপুরি সাহিত্যের আলোচনা ও সংগ্রহ সংকলন করেছেন।
প্রথম পর্যায়ে এ যাবৎ প্রাপ্ত মণিপুরি কাব্যসাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন হিসেবে মৌখিক রীতির বৃষ্টি নামানোর গান ‘বরণ ডাহানির এলা’ এবং বিয়ে ও গার্হস্থ্য জীবন সংশ্লিষ্ট গান ‘মাদই সরালেলর এলা’র পরিবেশনা রীতির আলোচনাসহ কিছু গীতিনিদর্শন সংকলন করেছেন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ে বিগত শতকের ত্রিশের দশক থেকে বর্তমান সময়ের মধ্যে রচিত লেখ্যরীতির সাহিত্যনিদর্শন হিসেবে লেখক পরিচিতিসহ বাংলাদেশে জন্েনাদ্ভুত ত্রিপুরার মণিপুরি কবি গোকুলানন্দ গীতিস্বামী, আসামের কৃষ্ণধন সিংহ, চন্দ্রমোহন রাজকুমার, মদনমোহন মুখোপাধ্যায়, সেনারূপ সিংহ, ব্রজেন্দ্রকুমার সিংহ বা ধনঞ্জয় রাজকুমার, চন্দ্রকান্ত সিংহ, গোপীনাথ সিংহ, গীতা সিংহ, মৌসুমী সিংহ, মথুরা সিংহ, সুধন্য সিংহ, রঞ্জিত সিংহ প্রমুখ; ত্রিপুরার সমরজিৎ সিংহ, অমর সিংহ, বিশ্বজিৎ সিংহ প্রমুখ; শিলচরের চাম্পালাল সিংহ বা অভয় কুমার সিংহ, শিবেন্দ্র সিংহ প্রমুখ এবং বাংলাদেশের রণজিৎ সিংহ, সুখময় সিংহর কিছু কাব্যনিদর্শন মুদ্রণ করা হয়েছে। এ বিবেচনায় শুভাশিস সিনহার মণিপুরী সাহিত্য সংগ্রহ শীর্ষক গ্রন্েথর ১ম খন্ডে মূলত বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরিদের কাব্যসাহিত্য সংকলিত হয়েছে।
অপরদিকে গ্রন্থটির ২য় খন্ডে স্থান পেয়েছে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি প্রবাদ, লোককথা, প্রবন্ধ, সাক্ষাৎকার, গল্প ও নাটকের কিছু প্রামাণ্য পান্ডুলিপি। ২য় খন্ডের শুরুতে ‘প্রসঙ্গ: প্রতিবেশী সাহিত্য’ শিরোনামে কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের নাতিদীর্ঘ একটি মুখবন্ধ সংযোজিত হয়েছে। সেখানে তিনি বাংলাদেশে মণিপুরি সাহিত্যের মূল্যায়ন সম্পর্কে স্পষ্টভাবে বলেছেন, “দুর্ভাগ্যক্রমে বাংলাদেশে সমান্তরালে তেমন কিছুই ঘটেনি। অনধিক এক লাখ মণিপুরী বাস করেন বাংলাদেশে। এঁদের বেশির ভাগই ‘বিষ্ণুপ্রিয়া’ সম্প্রদায়ভুক্ত, ‘মেইতেই’ সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা কম। ভারতে এর ঠিক উল্টো−সিংহভাগ ‘মেইতেই’ অংশ, তুলনায় ‘বিষ্ণুপ্রিয়া’র সংখ্যা খুব অল্প। শিল্প সাহিত্য সংগীত সংস্কৃতির বেলায় বাংলাদেশের বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরিদের ক্ষেত্রে এই নৃ-তাত্ত্বিক, ভাষা-তাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক বিভিন্নতার ফল শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়িয়েছে, সেই দীর্ঘ ও জটিল ইতিহাস আলোচনার জায়গা এটা নয়−শুধু বলা যায়, বাংলাদেশের বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী সাহিত্য শিল্প সংগীত সংস্কৃতি চরম অবহেলার শিকার হয়ে গেছে।”
সম্প্রতি বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি কবি ও নাট্যকার শুভাশিস সিনহার হাত ধরে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি সাহিত্যের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের যে আগ্রহ যথেষ্ট পরিমাণ বেড়েছে সে সম্পর্কে অনন্ত নিশ্চিত হওয়া গেল মণিপুরী সাহিত্য সংগ্রহ শীর্ষক গ্রন্েথর পরপর দুটি খন্ডের প্রকাশনা দেখে।
২য় খন্ডের ভুমিকায় সম্পাদক খুব সংক্ষেপে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি সাহিত্যের বহুমুখী ধারা সম্পর্কে যে খতিয়ান প্রদান করেছেন তাতে সুস্পষ্টভাবে জানা গেল মণিপুরি কথাসাহিত্য হিসেবে ছোটগল্প রচনার হাল-হকিকত। তবে, মণিপুরি কথাসাহিত্যের ধারায় উপন্যাস রচনা সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্য চোখে পড়ল না। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষার গল্পকারদের মধ্যে বর্তমান খন্ডে ইন্দ্রকুমার সিংহ, ব্রজেন্দ্রকুমার সিংহ, শ্যামানন্দ সিংহ, বিমল সিংহ, জ্যোতিপ্রকাশ সিংহ, গীতা মুখার্জি, প্রভাসকান্তি সিংহ, সুরেন্দ্রকুমার সিংহ, শ্রীকান্ত সিংহ, স্মৃতিকুমার সিংহ ও অঞ্জন সিংহের গল্প মুদ্রিত হয়েছে। সৃজনশীল গল্প রচনার প্রাণবন্ত ধারার মতো না হলেও মণিপুরি ভাষায় মননশীল প্রবন্ধ রচনার কিছু দৃষ্টান্ত রয়েছে। বর্তমান গ্রন্েথ তাঁর প্রামাণ্য দলিল হিসেবে ড. কালীপ্রসাদ সিংহ, বরুণকুমার সিংহ ও রণজিৎ সিংহের তিনটি প্রবন্ধ ও ব্রজেন্দ্রকুমার সিংহের একটি চিন্তাশীল সাক্ষাৎকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আর বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষার নাট্যকারদের মধ্যে ইন্দ্রকুমার সিংহ, ব্রজেন্দ্রকুমার সিংহ ও অশ্বিনীকুমার সিংহের মানোত্তীর্ণ নাটকগুলোর বিশেষত্ব সম্পর্কে ভুমিকায় উল্লেখ করে গ্রন্েথর মধ্যে শুভাশিস সমীর রচিত মঞ্চসফল নাটক ভানুবিল সংকলন করা হয়েছে।
গ্রন্থ শিরোনাম মণিপুরী সাহিত্য সংগ্রহ, কিন্তু গ্রন্েথর মধ্যে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি সাহিত্য আলোচনা ও সাহিত্যনিদর্শন সংকলিত হয়েছে। সেদিক দিয়ে পাঠকবর্গের বিভ্রান্ত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। তাই আমাদের প্রত্যাশা, অদুর ভবিষ্যতে নিশ্চয় এই গ্রন্েথর সম্পাদক আরেকটি খন্ড প্রবর্তন করে সেখানে মণিপুরি জাতিগোষ্ঠীর অন্য দুটি সম্প্রদায় মৈতৈ ও পাঙনদের সাহিত্য আলোচনা ও সাহিত্য সংকলন করে এই বিভ্রান্তি থেকে পাঠককে মুক্ত করবেন।
মণিপুরী সাহিত্য সংগ্রহ গ্রন্থটির আলোচনার সঙ্গে প্রসঙ্গত একটি কথা না বলে পারছি না। আর তা হচ্ছে আমাদের অনেকেরই হয়তো জানা নেই, মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার দাবিতে বাঙালিদের যেমন আত্মত্যাগের এক সুমহান ইতিহাস রয়েছে তেমনি মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার গর্বিত ইতিহাস রয়েছে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরিদের। বিগত শতকের পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু করে প্রায় অর্ধশত বছর ধরে আসাম ও ত্রিপুরার বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরিরা তাদের মাতৃভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতি আদায় ও প্রাথমিক স্তরে মণিপুরি মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম চালুর দাবিতে নিরন্তর আন্দোলন চালিয়ে যায়। সে আন্দোলনের একপর্যায়ে পুলিশের গুলিতে আত্মাহুতি দেন বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি মেয়ে সুদেষ্ণা সিংহ। তাঁর সেই জীবনোৎসর্গের পর আসাম-ত্রিপুরায় বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষা সেখানকার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়। প্রতিবছর বাংলাদেশ ও ভারতের বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি জনগোষ্ঠী সুদেষ্ণার আত্মোৎসর্গের দিনটিকে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষা শহীদ দিবস হিসেবে উদ্যাপন করে থাকে। এই তথ্যটি মাতৃভাষাপ্রেমী মণিপুরি জনগোষ্ঠীর ভাষার প্রতি যেমন আমার ভক্তি ও প্রেম জাগিয়ে দেয় তেমনি এই ভাষার সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক তৎপরতা আমাকে সর্বক্ষণ আচ্ছন্ন করে রাখে। আসুন না, আমরা একবার মণিপুরি ভাষা-সংস্কৃতির পাঠে মনোনিবেশ করি আর আবিষ্ককার করি আমাদের দেশের প্রাণস্পন্দনের সবটুকু বাণী-ধ্বনি, আরেকটি বিচিত্র রূপ।
মণিপুরী সাহিত্য সংগ্রহ(১ম ও ২য় খন্ড) । ভুমিকা, অনুবাদ ও সম্পাদনা: শুভাশিস সিনহা। ফেব্রুয়ারি ২০০৮। ঐতিহ্য, ঢাকা। প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ। পৃষ্ঠা ও মূল্য : ১ম খন্ড, ৮০ পৃষ্ঠা, ৮০ টাকা; ২য় খন্ড, ১৩৬ পৃষ্ঠা ১৭০ টাকা
সাইমন জাকারিয়ার লেখা থেকে
সুত্রঃ প্রথম আলো সাময়িকী

Phonetic
আমি আমার এক মণিপুরী বন্ধুর কাছ থেকে মণিপুরী কবিদের লেখা বাংলা কবিতা পড়েছিলাম। অসাধারণ ছিল সেই কবিতাগুলি। মাঝে মাঝে মণিপুরী শব্দের ব্যাবহারও ছিল।
ধন্যবাদ আপনার এই পোস্টের জন্য।
পড়ার জন্য আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।
এধরনের পোষ্ট দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ