পিরামিডের দেশে -৬ষ্ঠ পর্ব (রি-পোস্ট)

দ্বিতীয় রামাসিসের মমী। দ্বিতীয় রামাসিস, যিনি অনেকের মতে ওল্ড টেস্টামেন্টের এক্সোডাস (Exodus) গ্রন্থে বর্ণিত ফারাও, রাসুল মোজেস (মুসা) ( আ: ) এর সময়কার।
বাস স্ফিংসের কাছা কাছি রাস্তা ধরে চলতে শুরু করল। অস্থির হয়ে উঠছিলাম স্ফিংসকে (The Sphinx) কাছ থেকে দেখার জন্য। অবশেষে নিকটবর্তী এক জায়গায় বাস থামলে সবাই স্ফিংসের দিকে পদব্রজে যাত্রা শুরু করলাম। অসংখ্য পর্যটকের কোলাহলে মূখরিত চারিপাশ। তারই মাঝে মন্ত্র-মুগ্ধের মত শুনতে লাগলাম গাইডের তথ্যপূর্ণ বর্ণনা।
.jpg)
এভাবে নীল নদ বয়ে যেত স্স্ফিংস সংলগ্ন মন্দিরের গা ঘেঁষে
পিরামিডগুলো যখন নির্মিত হয় তখন নীল নদ কল কল রবে প্রবাহিত হত স্স্ফিংস সংলগ্ন মন্দিরের (The temple of the Sphinx) গা ঘেঁষে। সন্ধ্যায় পশ্চিমাকাশে অস্ত যাওয়া সূর্য্য দেবতা আমন রার সাথে মানব জীবনের মহান দর্শন মৃত্যু এবং মৃত্যু পরবর্তী অনন্ত জীবনের তুলনা করে মিশরীয়রা তাদের সমাধিক্ষেত্রটি (Necropolis) নির্মাণ করেছিল নীল নদের পশ্চিম পার্শ্বে। আর এই সমাধিক্ষেত্রের প্রবেশেদ্বার ছিল স্ফিংস মন্দির। গাইডকে অনুসরণ করে মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করলাম। শুধু কিছু স্তম্ভ ছাড়া আর তেমন কিছুই নেই মন্দিরের ভেতর। তারপর গাইড আমাদের নিয়ে গেলেন একটি কক্ষে যেখানে মমীকরন করা হত। মমীকরন ছিল একটি জটিল প্রক্রিয়া যা মাত্র ৭০ দিনে সম্পন্ন করা হত। আমাদের দলের সর্ব কনিষ্ঠ সদস্য, ১৪ বছরের তরুণ ইয়র্গেনকে গাইড কাছে ডেকে নিলেন। তারপর বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি এবং সুচারু বর্ননায় আমাদের সামনে তুলে ধরলেন প্রাচীন মিশরীয়দের মমীকরন পদ্ধতি।
সুবাসিত করণ
প্রথমে মৃতদেহটি ইবু (Ibu) নামক একটি তাঁবুতে নিয়ে যাওয়া হত। ইবু মানে হল পবিত্রকরণ স্থান। সেখানে একজন মমীকারক (Embalmer) মৃতদেহটি সুবাসিত মদের দ্বারা ধুয়ে নিতেন এবং অতঃপর নীল নদের জ্বল দ্বারা আলতোভাবে গোসল দিতেন।
তারপর একজন মমীকারক মৃতদেহটিকে পঁচনের (decompose) হাত থেকে রক্ষার্থে তার বাঁ পাশ কেটে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রতঙ্গ বের করে আনতেন। জলীয় অংশ দূরীকরনের জন্য হৃদপিন্ড, ফুসফুস, পাকস্থলী এবং অন্ত্রনালীকে নাট্রনে (natron) ডুবিয়ে রাখা হত। প্রাচীন মিশরীয়দের ধারণা ছিল মানবজীবনে মস্তিষ্কের কোন ব্যবহার নেই এবং জীবনে যে জিনিসের ব্যবহার নেই মৃত্যুপরবর্তী অনন্ত জীবনেও সেই জিনিস অনাবশ্যক। তাই একটি লম্বা হুকের সাহায্যে অনাবশ্যক এই জিনিসটিকে গুঁড়িয়ে নাসিকে পথে বের করে আনা হত এবং তা ছুঁড়ে ফেলা হত।
অভ্যন্তরীন অঙ্গ-প্রতঙ্গের স্থলে নাট্রন দেহটিতে স্থান করে নিত এবং সমগ্র দেহটিকেও নাট্রনে ঢেকে দেয়া হত। মমীকরণ পদ্ধতিতে ব্যবহৃত সকল জলীয় উপাদান এবং কাপড় সংগ্রহ করা হত মমীর সাথে সমাধিস্থ করার উদ্দেশ্যে।
চল্লিশ দিন পর মৃত দেহটিকে নীল নদের পানি দিয়ে আরেকবার ধুয়ে নেয়া হত। চামড়াকে নমনীয় রাখার জন্য অতঃপর তাতে এক বিশেষ তেল ব্যবহার করা হত। এই তেল খুবই পবিত্র বলে বিবেচনা করা হত যার প্রক্রিয়ারণ পদ্ধতি প্রধাণ পাদ্রী এবং স্বয়ং রাজা-রানী ছাড়া আর কারো জানা ছিলনা। বিভিন্ন ফুলকে বিশেষ পদ্ধতিতে আলাবাস্টার পাথর নির্মিত পাত্রে মাটির নিচে দীর্ঘসময় রেখে প্রস্তুত করা হত পবিত্র এই নির্যাস। তুত-আংখ-আমুনের সমাধিতে আলাবাস্টার পাত্রে সংরক্ষিত এমনই একটি তেলের নমুনা পাওয়া যায়। পরবর্তীতে বিভিন্ন গবেষনার ফলশ্রুতিতে বেরিয়ে আসে গোপন এই তেলের রহস্য।
জলশূণ্য অভ্যন্তরীন অঙ্গ-প্রতঙ্গগুলিকে লিনেন কাপড়ে মোড়ানো হত এবং দেহটিকে কাঠের গুঁড়ি, শুকনো পাতা, লিনেনের মত উপাদানে পরিপূর্ণ করা হত। অবশেষে দেহটিকে আরেকবার সুগন্ধি তেল মাখানোর মধ্য দিয়ে লিনেনাবৃত করার জন্য প্রস্তুত করা হত।
মমীকরণ প্রক্রিয়ার প্রথম দিকে মমীকৃত অভ্যন্তরীন অঙ্গ-প্রতঙ্গগুলিকে উপরের ছবির ন্যায় চারটি ক্যানপিক পাত্রে (canopic jars) রেখে মূল দেহের সাথে সমাধিস্থ করা হত। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যায় সেগুলোকে ক্যানপিক পাত্রের স্থলে মূল দেহেই পূণঃস্থাপন করা হত। এতদসত্তেও ক্যানপিক পাত্রগুলোকে সমাধিস্থ করা হত মমীর সাথে, অভ্যন্তরীন অঙ্গ-প্রতঙ্গগুলিকে প্রতিক্ষা প্রদানের প্রতিকীরূপে।
মমীকৃত দেহটিকে কাপড়ে মোড়ানো হল প্রক্রিয়ার দ্বিতীয় ধাপ। এ ধাপে প্রথমে গলা থেকে মাথা পর্যন্ত লিনেনে মোড়ানো হয়। তারপর হাত এবং পায়ের আঙ্গুলগুলোকে একেক করে আলাদাভাবে মোড়ানো হয়।
হাত এবং পাগুলোকে আলাদাভাবে মোড়ানো হয়। পরবর্তী অন্তহীন জীবনের যাত্রাকে বিপদমুক্ত করতে ব্যবহৃত মোড়কের বিভিন্ন স্তরে পবিত্র কবজ স্থাপন করা হত।
একজন পাদ্রীর মন্ত্র পাঠের পর হাত এবং পা গুলোকে একসাথে শক্ত বাঁধনে বাঁধা হত। বাঁধা হাতের মাঝে স্থান পেত মন্ত্র লিখিত প্যাপিরাসের পাকানো ফালি।
সমস্ত দেহটিকে আরো অধিক লিনেনে মোড়ানো হত এবং প্রতিটি লেয়ারে তরল রজন (resin) ব্যবহার করা হত যাতে লিনেন স্তর গুলো পরস্পরের সাথে যুক্ত হয়ে যায়।
তারপর দেহটিকে কাপড়ে আবৃত করে তার উপর দেবতা ওসিরিসের (Osiris) ছবি আঁকা হত।
সর্বশেষে লিনেনের দড়ি ব্যবহার করে একটি বিশাল কাপড়ে মমীটিকে আবৃত করা হত। তারপর মমীটিকে শবাধারে স্থাপন করে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য প্রস্তুত করা হত।
(চলবে)
রচনাকাল : ১০ই জানুয়ারী, ২০০৯; স্তাভাংগার, নরওয়ে।
লেখক মহিম উদ্দিন
- মহিম উদ্দিন -এর ব্লগ
- ১৩ টি মন্তব্য
- ০৩ এপ্রিল ২০০৯, ১২:৫৫
- বিবিধ
প্রিন্ট করুন
- ১৩ টি মন্তব্য
-
না বলা কথা০৩ এপ্রিল ২০০৯, ০১:১৮
ওয়ালাইকুম-আস-সালাম ভাইয়া। আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। দোয়া করি, পরীক্ষা ভালো হোক। ভালো থাকবেন।
-
মামুনুর রহমান০৩ এপ্রিল ২০০৯, ০১:০৮
তথ্যবহুল পোস্ট। চমৎকার। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
প্রথম ছবিটা দেখে ভয় লাগে। ঐটা আরেকটু নিচে থাকলে ভাল হত। -
আনন্দময়ী০৩ এপ্রিল ২০০৯, ০২:০৫
এটা অনেক ভাল পোস্ট, আমি আগেও পড়েছি।
আমি একটা লেখা লিখেছি - ঐ যে আপনি যেমন লিখলেন গত সপ্তাহে সে রকম। সময় পেলে পড়বেন, তবে কাজ মিস করে নয়, বাস যেন ফেল না হয়।





নীতিমালা
ব্লগ বই
অভিযোগ
সাম্প্রতিক পোস্ট

ফনেটিক