বৃহস্পতিবার ২৯ জুলাই ২০১০, ১৪ শ্রাবণ, ১৪১৭ সাইনইন | রেজিস্টার |bangla font problem

একশ বস্তা চাল এবং মেঘনাপাড় ধীবর বিদ্যানিকেতন

একশ বস্তা চাল একটি জনপ্রিয় জাপানী নাটক। নাটকটির সময়কাল শোগানদের শেষ সময়। মেইজি সংস্কার শুরু হয়েছে। দুর্ভিক্ষপীড়িত একটি জায়গায় রাজধানী থেকে ১০০ বস্তা চাল পাঠানো হয়েছে। এসময়ই শোগানরা (যোদ্ধা) সংবাদ পায় এলাকার বৃদ্ধ পণ্ডিত এ চাল নগদ দামে বিক্রি করে দিয়েছেন। তারা পণ্ডিতকে হত্যা করতে যায়। কিন্তু বৃদ্ধ পণ্ডিত অসুস্থ, শয্যাশায়ী। অসুস্থ, দুর্বল, বৃদ্ধকে হত্যা করা শোগানদের মতো বীরদের বীরত্বের অবমাননা। তাই তারা ফিরে যায়।
এর কিছুদিন পর শোগানরা আবার সংবাদ পায় বৃদ্ধ পণ্ডিত ১০০ বস্তা চালের পুরোটা বিক্রি করে দিয়েছেন। চাল বিক্রি লব্ধ অর্থ দিয়ে একটি স্কুল তৈরি করেছেন গ্রামে। এতে শোগানরা আরও ক্ষেপে যায়। কারণ তারা হচ্ছে শক্তির পূজারী। মস্তিষ্কের কারবারে তাদের আগ্রহ নেই। দল বেঁধে আবার তারা ছুটে যায় বৃদ্ধ পন্ডিতের কাছে। এর কৈফিয়ত চায়। পণ্ডিত তাদের বোঝালেন, ওই ১০০ বস্তা চাল যদি এলাকার মানুষদের মধ্যে বন্টন করা হয়, জনপ্রতি পাবে ছয় ছটাক করে চাল। এক বেলাও হবে না। কিন্তু বিক্রয়লব্ধ অর্থ দিয়ে স্কুল বানিয়ে অশিক্ষিত জনগণকে যদি শিক্ষিত করা যায়, তাহলে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ঘটবে। ফলে দুর্ভিক্ষ, অজন্মা এসবের কারণ বুঝতে পারবে এবং সমাধানের পথ জনগণ নিজেই খুঁজে বের করবে।
ত্বরিত কাজ হয়েছিল তাতে। ১৮৬৮ সাল থেকে ১৯০০ সালের মধ্যে জাপানীরা ১০০ ভাগই শিক্ষিত হয়ে যায়। তারপর জাপানীদের অগ্রযাত্রার ইতিহাস আমাদের সবার জানা।

উপরোক্ত নাটকের মর্মার্থ বিশ্লেষণ করলে এই দাঁড়ায় যে, শিক্ষিত জনগোষ্ঠী পিছিয়ে থাকতে পারে না। তারা ভদ্রোচিতভাবে তাদের কর্মসংস্থানের কোন না কোন উপায় খুঁজে বের করবেই। একটি দেশের সমস্যা এবং সম্ভাবনাগুলো বুঝার মতো শিক্ষিত হতে পারলেই একটি দেশের জনগোষ্ঠী জনসম্পদে পরিগণিত হতে পারে। তাই সর্বাগ্রে প্রয়োজন সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করা। আর এটা নিশ্চিত করতে হবে একেবারে তৃণমূল পর্যায় থেকে যেখানে শিক্ষার জন্য সরকারি-বেসরকারি কোন সহায়তা পৌঁছেনি কিংবা পৌঁছানো যাচ্ছে না।

মেঘনাপাড় ধীবর বিদ্যানিকেতন এরকম একটি তৃণমূল পর্যায়। ত্রিশ-চল্লিশ বছরের পুরনো একটি জনগোষ্ঠীর একজনও শিক্ষিত নয়- এটি আমাদের বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অত্যন্ত বাস্তব একটি চিত্র। এরকম অনেক জনগোষ্ঠী আছে যারা জন্মেই জীবন সংগ্রামে লিপ্ত হয়ে যায়। তাদের সেই সংগ্রামে লিপ্ত রেখেই শিক্ষা দিতে হবে। লোকাল কারিকুলাম, লাইফ লং এডুকেশন এক্ষেত্রে মূল শিক্ষার পাশাপাশি সহায়ক শিক্ষা হিসেবে ভূমিকা পালন করতে পারে। কারিগরি শিক্ষা এক্ষেত্রে কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারে।

মেঘনাপাড় ধীবর বিদ্যানিকেতনকে একটি টেকনিক্যাল আ্যান্ড ভোকেশনাল প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রথম থেকেই গড়ে তুললে কেমন হয়?

আমাদের দেশের শিক্ষার প্রকৃত হার পঞ্চাশ শতাংশের বেশী নয় কোনক্রমেই। যদি ১৬ কোটি জনগোষ্ঠী ধরি তাহলে এর অর্ধেক অর্থাৎ ৮ কোটি জনগোষ্ঠী একেবারে অশিক্ষিত। অর্থাৎ ২ জনকে পাশাপাশি দাঁড় করালে এদের মধ্যে ১ জন লিখতে বা পড়তে জানে না।

মেঘনাপাড় ধীবর বিদ্যানিকেতনের শিক্ষার্থী সংখ্যা বর্তমানে ১০০। এই শিক্ষার্থীরা কিছু হলেও লিখতে এবং পড়তে জানে। ধরা যাক, ঢাকার ফুটপাথে, বস্তিতে যে টোকাই শিশুরা বসবাস করে এদের ১০০ জনকে মেঘনাপাড়ের শিশুদের পাশে দাঁড় করানো হলো। ২০০ জেনর গ্রুপের মধ্যে ১০০ জন পড়তে ও লিখতে জানে বাকি ১০০ জন পড়তে কিংবা লিখতে কিছুই জানেনা। আরও সুক্ষ্মভাবে বলতে গেলে ১ জন লিখতে ও পড়তে জানে এবং অপরজন তা জানে না। পুরো বাংলাদেশের চিত্রটা তাই নয় কি !!!

ব্লগার বন্ধুরা, আপনাদের মতামত কি?

(ভূমিকাংশটুকু বিশিষ্ট নাট্য ব্যক্তিত্ব জনাব মামুনুর রশীদের 'একশ বস্তা চাল ও শিক্ষা সংস্কার' নামে প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত একটি কলাম থেকে নেওয়া।)
৯ টি মন্তব্য
godhulirsurjo গোধুলীর সুর্য১৬ জুলাই ২০০৯, ০৩:০৮
" টেকনিক্যাল আ্যান্ড ভোকেশনাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান " হিসেবে গড়ে তুললে খুবেই ভাল হয়, তবে এই শিক্ষা কার্যক্রম নবম শ্রেনী থেকে শুরু হয়, সো আপনি যদি এটা করতে চান তাহলে....

আমি আসলে বুঝতেছিনা, মানে মাথায় ঢুকতাছে নাহ,

প্রাইমারী টা তো আগে দরকার তাই নয় কি ?
azman আজমান আন্দালিব১৬ জুলাই ২০০৯, ০৩:২০
ঠিক বলেছেন। প্রাইমারি না পড়ে কিভাবে টেকনিক্যাল অ্যান্ড ভোকেশনাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠবে।
আমি কিন্তু বলিনি যে ২০১০ সাল থেকে চালু হওয়া প্রথম শ্রেণী থেকে তা গড়ে উঠবে। তবে বলেছি যে, প্রথম থেকেই চিন্তাটা মাথায় রাখা যে এই শিশুরা প্রাথমিক শিক্ষার পাশাপাশি তাদের নিজস্ব পেশার শিক্ষাটা যাতে পায়। এতে করে তার মনে শিশু অবস্থায়ই একটা কর্মের প্রেরণা সৃষ্টি হবে।
আর বর্তমানে ৬ষ্ঠ শ্রণীতেই কৃষি শিক্ষা বাধ্যতামূলক, কম্পিউটার শিক্ষা বাধ্যতামূলক হতে যাচ্ছে। এগুলো টেকনিক্যাল এন্ড ভোকেশনাল সাবজেক্টের আওতায় পরে।

ধন্যবাদ আপনাকে। আপনার আরও পরামর্শ থাকলে জানান প্লিজ...
nazlaabedin ফাতেমা আবেদীন নাজলা১৬ জুলাই ২০০৯, ০৩:২২
ভাইয়া চিন্তাটা খারাপ না। দেশে আসব, আমার খুব খুব ইচ্ছা আপনার স্কুল নিয়ে কিছু করা।
azman আজমান আন্দালিব১৬ জুলাই ২০০৯, ০১:০২
কাল যখন আপনার মন্তব্যের জবাব লিখছিলাম বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিল।
আপনি কবে নাগাদ বাংলাদেশে আসছেন? আশা করি সবাই মিলে স্কুলটিকে একটি মডেল হিসেবে দাঁড় করাতে পারবো।
ধন্যবাদ আপনাকে।
oliur_rahman_chowdhury অলিউর রহমান চৌধুরী১৬ জুলাই ২০০৯, ০৪:৩৪
আমার প্রথম পরামর্শ হবে আত্মুউপলব্ধির ব্যপারটি খুব ধীর গতিতে হলেও ওদের মাঝে সঞ্চার করা। এন্ড্রু কার্নেগী বলেছিলেন, সফল মানুষ হতে যে শিক্ষার প্রয়োজন তার চাইতে ঢের বেশি সময় আমরা অপচয় করি স্কুল কলেজের ভারী ভারী শিক্ষায়। আমার মনে আছে প্রথম শ্রেনী কিংবা দ্বিতীয় শ্রেনীতে পড়ার সময় আমরা চেচিয়ে ভাঙাদেশ বলে খুব মজা পেতাম। নিজের দেশের প্রতি এই অবজ্ঞা ছোট কাল হতে কে ঢুকিয়ে দেয় যদি বের করে রোখা যেত। তাই তো পিচ্ছি ভাগিনাকে বলতে শুনি, বাংলাদেশের ডাক্তার কচুর ডাক্তার। আমার ছাত্র বলত, বাংলাদেশের কিছু হবে না। স্কুল পড়ুয়া এই শিশুদের মাঝে মন উন্মেষকারী শিক্ষার পাশাপাশি দেশপ্রেম আর আত্মমর্যাদাবোধ জাগানোর জন্য কিছু কি করা যায় না? নৈতিকতার বীজ এ সময়ই গড়ে, সে নৈতিক শিক্ষাও কি জরুরী নয়? অনেক বলে ফেললাম, তবে শেষের কথাটি বলা হয়নি। পাঠদানের পদ্ধতি কতটা আনন্দায়ক তার উপর নির্ভর করে শেখার গতি। ওদিকে নজর দেয়ার জন্য অভিনব কোন পন্থার কথা কি ভাবা যায়? দেশে ফিরে কোন এককালে আপন বিশ্বাসের এই ক্ষেত্রগুলো নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা রাখি। আপনার নামটি সহজে মনে গেথে যায়। একবার মাত্র আমার ব্লগে মন্তব্য লিখে এসেছিলেন তবু চিনে গেলাম। ভালো আছেন আসা করি।
azman আজমান আন্দালিব১৬ জুলাই ২০০৯, ০১:১০
কেমন আছেন? শিক্ষা নিয়ে আপনার গভীর ভাবনাগুলো আমাকে চমৎকৃত করেছে। শিক্ষা যদি আনন্দদায়ক হয়, তবে সেই শিক্ষা খুবই কার্যকরী হবে- এটি নিশ্চিত। আপনাদের মত চিন্তাশীল এবং সুন্দর মনের মানুষগুলো দেশে এসে আপন বিশ্বাসের এই ক্ষেত্রগুলোতে কাজ করলে অবশ্যই একদিন বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে যাবে। ধন্যবাদ আপনাকে।
সময় করে উঠতে পারি না, তাই ব্লগে অনিয়মিত। তবে মাঝে মাঝে আপনার সাইটে ঢুঁ মারি। ভাল থাকবেন। আবারও দেখা হবে।
smc এস মাহবুব১৬ জুলাই ২০০৯, ০৬:৪৫
শুধু শিক্ষিত না। এই শিক্ষা দিয়ে যাতে তারা নিজেদের জন্য কিছু করতে পারে সেই ব্যবস্হা থাকলে ভালই হয়।
azman আজমান আন্দালিব১৬ জুলাই ২০০৯, ০১:১৫
ধন্যবাদ এস মাহবুব ভাই। আমরা চেষ্টা করবো যাতে স্কুল শিক্ষার পাশাপাশি বাচ্চারা নিজেদের জন্য কিছু করতে পারে। এ ব্যাপারে আপনার পরামর্শ ও সহায়তা চাই।
ভালো থাকবেন।
@শামছুল আলম মেহেদী : সহমতের জন্য আপনাকেও ধন্যবাদ।
samsulalammehedi মেহেদী১৬ জুলাই ২০০৯, ০৬:৪৭
সহমত।

সাম্প্রতিক পোস্ট Star

সাম্প্রতিক মন্তব্যComment