মেঘনাপাড় ধীবর বিদ্যানিকেতন এবং ভবিষ্যত পরিকল্পনা।
মেঘনাপাড় ধীবর বিদ্যানিকেতন। লক্ষ্মীপুরের মজু চৌধুরী হাটের সেই জেলে শিশুদের একটি স্বপ্ন বাস্তবায়নের গল্প। জেলে শিশুরা স্বপ্ন দেখার সাহস পেয়েছিল ছোট্ট একটি গল্প থেকে। গল্পটি কিছুই নয়। গল্পচ্ছলে বলেছিলাম, তোমরা লেখাপড়া শিখলে সোহরাব দর্জির মতো পানি ছেড়ে ডাঙ্গায় বাসা বাঁধতে পারবে। দাখিল পরীক্ষার্থী সোহরাব আর্থিক অনটনের কারণে দাখিল পরীক্ষা দেয়নি। সে-ই এ জনগোষ্ঠীতে একমাত্র শিক্ষিত। মজু চৌধুরী হাট বাজারে সে এখন টেইলারিং এর দোকান চালায়। মাঝিপাড়ায় উচ্চশিক্ষিত হিসেবে সোহরাবের অনেক সম্মান। নামের মিল আছে এরকম আরেক সোহরাব আছে এই মাঝি পাড়ায়। সোহরাব মাঝি তৃতীয় শ্রেণী পাশ। এই জনগোষ্ঠীতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শিক্ষিত বলতে এই সোহরাব মাঝি। ও এখন মাছ ধরা পেশা ছেড়ে পর্যটকদের বোটে ভ্রমণ করিয়ে আয় করে। শিক্ষার প্রতি অনুরাগ থেকে সোহরাব মাঝির কঠোর শ্রম এই মেঘনাপাড়ের ধীবর বিদ্যানিকেতনকে ঘিরে। সোহরাব মাঝির মতো হানিফ বয়াতি, চুন্নু মোল্লারা অপেক্ষায় আছে স্বপ্নের এই স্কুলটি অনেক অ-নে-ক বড় হবে।
প্রাথমিক অবস্থায় স্কুলটি যখন শুরু করি তেমন কিছু ভাবিনি। কোন ভাবনা এমনকি বড় কোন স্বপ্ন দেখানোর কথাও মনে আসেনি। ঢেউয়ের দোলায় যাদের জীবন দোলে তাদেরকে কী স্বপ্ন দেখাবো? ওদের অর্থনৈতিক অবস্থা দেখে আমরা এর চেয়ে বেশি স্বপ্নের কথা বলতে পারিনি। আমাদের এই গল্পকে কি জানি ওরা কতটুকু বিশ্বাস করেছিল! কিন্তু আমাদের চোখের সেই স্বপ্নটাকে ওরা ওদের চোখে ধারণ করে নিয়েছিল- এটি নিশ্চিত করে বলা যায়।
তারপর আমাদের ভূমিকা একপ্রকার নেই বললেই চলে। এখন বাস্তবায়িত গল্পের রূপকার সেই জেলে শিশুরা। মেঘনাপাড়ের আলামিন, রাসেল, রাজন, মুক্তা, ফাতেমা আরও নাম জানা ৮৬ জনের একটা স্বাপ্নিক দল স্বপ্ন দেখে যাচ্ছে লেখাপড়া শিখে ঠিক একদিন ওরা এই নদীর ওপারে পৌঁছে যাবে। যেখানটাতে ভোলা হয়ে লক্ষ্মীপুরের উপর দিয়ে ঢাকার দিকে বড় বড় গাড়িগুলো ছুটে চলে।
নিত্যদিন ওরা এই দৃশ্য দেখে। ভোলা থেকে বড় বড় ট্রাক-বাস ফেরি পারাপার হয়ে ঢাকা কিংবা চট্টগ্রামের দিকে রওনা হয়। ফেরি ঘাটের এই খানটায় নানান মানুষের মিলন মেলা বসে। ওরা চেয়ে চেয়ে দেখে আর অবাক হয়। নদীর ওপারে ওদের জীবনকে ভাবতে গিয়ে ওরা রোমাঞ্চিত হয়। বাস্তবতা হচ্ছে ওরা নৌকা ছেড়ে শুকনোতে ওদের আশ্রয় কল্পনাও করতে পারে না। রাস্তার শেষ মাথাটুকু ওদের একমাত্র বিনোদনের জন্য স্থলভাগ। ওরা হতবাক হয় যখন দেখে ওদের বিনোদনের একমাত্র এই স্থলটুকুকে মটর সাইকেল রেখে খেলা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। পর্যটকরা দলে দলে মোটরসাইকেল নিয়ে এখানটাতে বেড়াতে এসে স্থানটুকুকে আবদ্ধ করে ফেলে।
ছোট্ট এই স্থলটুকুতে ওদের খেলা বলতে ডাংগুলি, মার্বেল কিংবা কানামাছিই সম্বল ছিল। কুৎসিত গালাগাল আর ছোট খাট মারামারিতে শিশুরা জড়িয়ে সন্ধ্যার সময় এক নরক গুলজার করে তুলত জায়গাটা। আর সেই বাক-বিতণ্ডায় জড়িয়ে নৌকা থেকে নৌকায় ছড়িয়ে পড়তো তা বড়দের মধ্যে। তীব্র গালাগাল আর হৈ-চৈ চিৎকার-চেঁচামেচিতে মাঝি পাড়াট হয়ে উঠতো সরগরম। স্কুলটি গড়ার আগে আমরা যে দু'তিনবার ওখানে গিয়েছি প্রতিদিনই এমন দৃশ্য চোখে পড়েছে। এসব ঝগড়াঝাটির বাইরে ওদের মধ্যে সদ্ভাবও যেমন ছিল সৌহার্দ্রও তেমনিই। কেনইবা থাকবেনা? ৩০/৪০ বছর ধরে ওরা এখানেই নৌকার মধ্যে কাটিয়ে দিচ্ছে। এখানেই ওরা বড় হচ্ছে। বড় হয়ে আরেকটি পৃথক নৌকার মালিক হচ্ছে। ওরা জানে না জীবনে আদৌ ওরা নদীর ঘর ছেড়ে মাটির উপরে ঘর করে বাস করতে পারবে কিনা।
ওদের অনেক অভাব। সারাদিন যা মাছ ধরে তা মহাজনের কাছে বিক্রি করে দিতে হয়। এই আয় দিয়ে কোনোদিন ওদের পেট পুরে খাবার জোটে, আবার কোনোদিন তা-ও জুটে না। ছোট্ট ছোট্ট শিশুরা জন্মেই জীবনযুদ্ধে নেমে যায় বৈঠাকে সম্বল করে। কচি কচি শিশুরা বৈঠা বেয়ে বেয়ে সুদূর মেঘনা পাড়ি দিয়ে চরে চলে যায়। সারাদিন মাছ ধরে সন্ধ্যায় ঘরে ফেরে। সান্ধ্য প্রদীপ জ্বেলে ওদের খাওয়া হয় কি হয় না- তারপর রাতভর ঘুম। এভাবে এক দঙ্গল শিশু বেড়ে উঠছে জেলে পাড়ার এই জনবসতিটিতে। ওদেরকে কে বোঝাবে শিশুদের জন্য শিক্ষা প্রয়োজন?
এলাকার মেম্বার-চেয়ারম্যানরা গত নির্বাচনে ভোট চেয়ে গিয়েছেন। মাঝিদের জন্য মাথাপিছু চাল-গম বরাদ্দের আশ্বাস দিয়েছেন। কেউ কেউ তাদেরকে রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা বুঝিয়েছেন কিন্তু শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বুঝান নি। অবশ্য শিক্ষালাভ করে এরা শিক্ষিত হয়ে গেলে ওদেরকে আর শোষণ করা যাবে না- এই মানসিকতাও কাজ করতে পারে। কিন্তু মানসিকতা যাই হোক না কেন ওদেরকে সংশ্লিষ্ট পেশা সম্বন্ধীয় শিক্ষা দেওয়া যায় সহজেই।
ঠিক আছে, ধরা যাক ওরা আজীবন মাছ ধরেই খাবে। তাহলে এই পেশার সাথে এই শিক্ষাটাও দেওয়া যায় যে- জাটকা ধরা নিষেধ, কারেন্ট জাল অবৈধ, নদীর পরিবেশ দূষণ ক্ষতিকর। অর্থাৎ তাদেরকে এই পেশাতে রেখে শিক্ষা দিয়েও দেশের সম্পদ গড়ে তোলা যায়।
মেঘনাপাড় ধীবর বিদ্যানিকেতন প্রথম আলো ব্লগার বন্ধুদের সহায়তায় আজ একটি স্বপ্নের মডেল। দু:খ, আনন্দময়ী, নাজলা আবেদীন, রুবা, ওস্তাদের ওস্তাদ, আজব ঢাকা সহ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বন্ধুসহ সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মেঘনাপাড়ের শিশুদের এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব হয়েছে। প্রথম আলো ব্লগে আমি ব্লগার বন্ধুদের এই সহমর্মিতা দেখে অভিভূত। সবচেয়ে বেশি অভিভূত হয়েছে মেঘনাপাড়ের শিশুরা। ওদের স্কুলঘরে একটি ব্ল্যাকবোর্ড হয়েছে। চক দিয়ে ওখানে ওরা অ-আ, ক-খ লিখতে পারে। সবার শ্লেট-চক হয়েছে। সামনে ওরা স্কুল ড্রেস পড়ে বেঞ্চে বসে পড়াশুনা করবে। ওদের চোখ জুড়ে স্বপ্ন-কল্পনা বিস্তৃত হয়। আমাদের অনেকের স্বপ্নগুলো জেলে শিশুদের স্বপ্নের সাথে মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়।
আগামী ২৩ মার্চ মেঘনাপাড় স্কুলের গ্রীষ্মকালীন ছুটি শেষে খোলার দিন। ঐদিনই ব্লগের দ্বিতীয় মিটআপ। কাকতালীয় তাই না? কি করে যেনো হয়ে গেলো। কিন্তু হয়ে ভালোই হলো। আমরা মিটআপে সরাসরি মোবাইল ফোনে শিশুদের পড়ার সুর শুনবো। ওদের কাছ থেকে ওদের স্বপ্নের কথা শুনবো। শিশুদের নিয়ে শিক্ষক ফারজানার পরিকল্পনার কথা শুনবো।
মেঘনাপাড় ধীবর বিদ্যানিকেতনের একটি বাংলা ওয়েবসাইট ডেভেলপ করা হয়েছে। অনেকে পরামর্শ দিচ্ছেন ইংরেজিতে ডেভেলপ করে বিদেশিদের কাছে সাহায্য চাইতে। কেউ কেউ এনজিও করার পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু মেঘনাপাড়ের শিশুরা সাহায্য চায় না। ওরা ওদের শিক্ষার অধিকার পুনরুদ্ধার করতে চায়। একটি সুন্দর পরিকল্পনা তাদেরকে শিক্ষার পাশাপাশি আয়বৃদ্ধির উপায় বাতলে দিতে পারে। এজন্য প্রয়োজন একটি ফান্ড গঠন। আমরা একটি ফান্ড গঠন করার পরিকল্পনা করছি। মেঘনাপাড় স্কুল শিক্ষা ফান্ড জেলে শিশুদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। আরও আরও অনেক পরিকল্পনা করা যায় স্কুলটিকে কেন্দ্র করে। আমাদের ব্লগার বন্ধুদের মধ্যে অনেকে এরকম পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেনও।
এদেশের আলো বাতাসে বেড়ে উঠা বঞ্চিত শিশুদের ভাগ্য গড়ার জন্য বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন নেই। সামান্য একটু সমর্থন এবং সহায়তা পেলে আমরা নিজেরাই আমাদের ভাগ্য গড়ে তুলতে পারি- এর অনেক প্রমাণ আমাদের সামনেই রয়েছে। ওয়েবসাইটটি গড়ার ক্ষেত্রে বাংলাকে আমরা প্রাধান্য দিয়েছি। তথ্য প্রযুক্তিকে সাধারণ জীবনমানে নামিয়ে আনতে হলে বাংলা চর্চার বিকল্প নেই। তাই বাঙলা ভাষা-ভাষী মানুষগুলোর প্রাণের ভাষাকে ধারণ করেই ওয়েবসাইটটি বাংলায় ডেভেলপ করা হয়েছে। ওয়েবসাইটটি দেখলে যে কেউ বিল রাসেলের সৃজনশীলতার প্রশংসা করবে।
www.meghnaparschool.com সাইটটি একটি ভার্চুয়াল স্কুল হয়ে জেলে শিশুদের কাছে শিক্ষা পৌঁছানোর বাহন হয়ে উঠুক। বাহরাইন, সৌদি আরব, অষ্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইংল্যান্ড, চীন, জাপান, মালয়েশিয়া...বিশ্বের সর্বত্র থেকে ব্লগার বন্ধুদের মাধ্যমে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে পড়ুক জেলে শিশুদের মাঝে। একটি ভার্চুয়াল স্কুলের মডেল হয়ে ওয়েবসাইটটি শিশুদের বিশ্বের সাথে যুক্ত রাখতে- এই আশাবাদটুকু ব্যক্ত করতে পারি।
ধন্যবাদ সবাইকে। ধন্যবাদ লক্ষ্মীপুরের স্থানীয় ব্যক্তি যারা স্কুলটিকে প্রাথমিক অবস্থায় গড়ে তুলতে সহায়তা করেছেন। ধন্যবাদ প্রথম আলো ব্লগকে এরকম একটি স্কুলের স্বপ্ন সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করে।
লেখক আজমান আন্দালিব
- আজমান আন্দালিব -এর ব্লগ
- ১৮ টি মন্তব্য
- ১৮ মে ২০০৯, ০৮:৫১
- বিবিধ
প্রিন্ট করুন
- ১৮ টি মন্তব্য
-
বিল রাসেল১৮ মে ২০০৯, ১০:১০
ভাল লাগল চিন্তার ভিন্নতা...
"ধরা যাক ওরা আজীবন মাছ ধরেই খাবে। তাহলে এই পেশার সাথে এই শিক্ষাটাও দেওয়া যায় যে- জাটকা ধরা নিষেধ, কারেন্ট জাল অবৈধ, নদীর পরিবেশ দূষণ ক্ষতিকর। অর্থাৎ তাদেরকে এই পেশাতে রেখে শিক্ষা দিয়েও দেশের সম্পদ গড়ে তোলা যায়।"
"এদেশের আলো বাতাসে বেড়ে উঠা বঞ্চিত শিশুদের ভাগ্য গড়ার জন্য বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন নেই। সামান্য একটু সমর্থন এবং সহায়তা পেলে আমরা নিজেরাই আমাদের ভাগ্য গড়ে তুলতে পারি"
মেঘনাপাড়ের শিশুরা সাহায্য চায় না। ওরা ওদের শিক্ষার অধিকার পুনরুদ্ধার করতে চায়। একটি সুন্দর পরিকল্পনা তাদেরকে শিক্ষার পাশাপাশি আয়বৃদ্ধির উপায় বাতলে দিতে পারে। এজন্য প্রয়োজন একটি ফান্ড গঠন। আমরা একটি ফান্ড গঠন করার পরিকল্পনা করছি।
.....সফল হবে এই কামনাই করছি....
-
সাম্প্রতিক পোস্ট
-
সাম্প্রতিক মন্তব্য





নীতিমালা
ব্লগ বই
অভিযোগ
সাম্প্রতিক পোস্ট

ফনেটিক