বৃহস্পতিবার ২৯ জুলাই ২০১০, ১৪ শ্রাবণ, ১৪১৭ সাইনইন | রেজিস্টার |bangla font problem

মেঘনাপাড় ধীবর বিদ্যানিকেতন- আসুন, পরিকল্পনা সাজাই...

লক্ষ্মীপুর সদর থেকে প্রায় সাড়ে এগার কিলোমিটার দক্ষিণে মজু চৌধুরীর হাট নামক একটি জায়গা আছে। চমৎকার একটি পর্যটন কেন্দ্র এটি। শহরের কোলহল থেকে মুক্ত থাকার জন্য মোটর সাইকেল হাকিয়ে শহর থেকে অনেকেই স্বপরিবারে মেঘনা নদীর বুকে বেড়াতে চলে যায়। লক্ষ্মীপুর শহর ছাড়িয়ে দুইপাশে ঘন গাছের ছায়াশীতল পথ মাড়িয়ে মজু চৌধুরী হাট পৌঁছুতে মনটা আনন্দে ভরে যায়।
কিছুদিন আগেও এই স্থানটি তেমন পরিচিত ছিল না। এখান থেকে ভোলা যাওয়ার সহজ এবং সক্ষিপ্ত একটি নদীপথ স্থানটিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। এখান থেকে প্রতিদিন দুইটি ফেরি ছাড়ে ভোলাগামী বাস-ট্রাক নিয়ে। আগে যেখানে ঢাকা ঘুরে বরিশাল রোডে ভোলা যেতে হতো, সেখানে মাত্র চার/পাঁচ ঘন্টার পথ- মজু চৌধুরী হাট থেকে।
মেঘনা নদীর একটি শাখাকে শাসন করার জন্য দুইটি স্লুইস গেট আছে। স্লুইস গেটের উপর দিয়েই একটি রাস্তা এগিয়ে গিয়ে বহুদূর বিস্তৃত চর অঞ্চলের দিকে চলে গেছে।
দুইটি স্লুইস গেটের মাঝ দিয়ে হাতের ডানদিকে একটি কাচা রাস্তা পশ্চিমে মেঘনা নদীর শাখাকে দুই ভাগ করে দাড়িয়ে আছে। রাস্তাটি দৈর্ঘ্যে আনুমানিক ৫০০ গজ হবে। কাচা রাস্তাটিকে ঘিরে দুই পাশে প্রায় ৫০টি মাঝি পরিবার থাকে। প্রায় ৩০/৩৫ বৎসর ধরে এ স্থানটিকে কেন্দ্র করে এই জনপদটি গড়ে উঠেছে। এরা মেঘনার বুকে নৌকা নিয়ে সারা দিনমান ব্যাপী ইলিশ ধরে। মহাজনের নিকট বিক্রি করে যা পায় তা দিয়েই চাল,ডাল, তেল, নুন কিনে এনে নৌকায় বসেই রান্না করে। পরিবারের সবাই মিলে খায়। নৌকার মধ্যেই ঘুমায়।
৫০ টি পরিবারে গড়ে ৬ জন করে সদস্য ধরলে মোট ৩০০ জনের একটি জনগোষ্ঠী। এরা বছরের পর বছর ধরে এখানে থাকছে। বড় হচ্ছে। বিয়ে শাদি করছে। পৃথক হয়ে আরেকটি নৌকার মালিক হচ্ছে।
মজার ব্যাপার হচ্ছে এই মাঝিপাড়ার পুরো জনগোষ্ঠীতে মাত্র একজন কোনরকমে দাখিল পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন করতে পেরেছে কিন্তু পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারেনি। ওর নাম মোঃ সোহরাব। মাঝিপাড়ায় শিক্ষিত ব্যাক্তি হিসেবে সোহরাবের খুব সম্মান। সোহরাব নৌকা ছেড়ে টেঁকে (নদীর পাশে গ্রামে) গিয়ে উঠেছে স্ত্রী সহ। সোহরাবের স্ত্রী ক্লাস সিক্স পর্যন্ত পড়েছে। বিয়ের পর কিছুদিন সোহরাব স্ত্রী সহ নৌকায় ছিল।
ওরা চলে যাবার পর এই জনপদে আর শিক্ষিত ব্যক্তি বলতে রইলো সোহরাব মাঝি। ক্লাস থ্রি পর্যন্ত পড়াশুনা। এই মঝির বয়স ৩৫ বছর হবে। ৩ ছেলেমেয়ে সহ ৫ জনের সংসার তার। বাচ্চা তিনটির বয়স চার থেকে সাত পর্যন্ত।
প্রতিটি সংসারে গড়ে ৩টি করে শিশু আছে। সেই হিসাবে মোট শিশুর সংখ্যা ১৫০। জনপদটির আশেপাশে কোন স্কুল নেই যে শিশুরা পড়বে। প্রায় এক দেড় কিলোমিটার দূরে একটি প্রাইমারি স্কুল থাকলেও বাচ্চারা সেখানে পড়তে পারে না। কারণ স্কুল যখন শুরু হয় শিশুরা তখন বাবা-মার সাথে নদীতে চলে যায়। সারাদিন নৌকায় কাটিয়ে এরা মাছ ধরে। ছোট্ট ছোট্ট শিশুরা বৈঠা ধরে নৌকাকে সুদূর মেঘনার বুকে জেগে ওঠা চরে চলে যায়। সূর্য যখন পশ্চিম পাটে অস্ত যায়, শিশুরা ঘরে ফিরে।
স্থল বলতে ৫০০ গজের রাস্তার এই শেষ মাথাটুকু। ওখানে মার্বেল খেলা, মাটির মধ্যে দাগ টেনে ঘুটি খেলা কিংবা ছোঁয়া-ছুয়ি খেলা এগুলোই শিশুদের বিনোদন।
চলতি বছর এখানকার বয়ষ্ক বাসিন্দাদের ভোটার করা হয়েছে। এলাকার মেম্বার, চেয়ারম্যান এসে ভোটারদের সাথে হাত মিলিয়ে ভোট চেয়ে গেছে- কিন্তু কেউ বাচ্চাদের একটি স্কুলের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেনি।
এই ১৫০টি বাচ্চার জন্য সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে একটি স্কুল গড়ে তোলার পরিকল্পনা থেকে ২০০৮ সালের ১৪ জুলাই একটি কাযর্ক্রম হাতে নেওয়া হয়।
২০০৮ সালের ২৬ আগষ্ট মাঝিপাড়ার অধিবাসীদের মধ্যে বিদ্যানুরাগী ৫ জনকে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সদস্যদের চোখে যে স্বপ্ন ছিল তা এখন বাস্তবায়িত। মাঝিপাড়ার শিশুরা চাটাই বিছিয়ে মাটিতে বসে সুর করে অ-আ-ক-খ শিখছে। সময়ের পরিক্রমায় স্কুলটি এখন জেলে অধিবাসীদের গর্ব।
স্কুলটি প্রতিষ্ঠার পেছনে আছে চমকপ্রদ ইতিহাস। সে কথা আরেকদিন বলবো। স্কুলটির অবকাঠামো নিয়ে কিছু বলা যাক। প্রথমে ভেবেছিলাম শুধু বাঁশের পালা বসিয়ে উপরে ত্রিপল দিয়ে একটি পাঠশালা গড়ে তুলবো। কিন্তু বাতাসের তোড়ে এরকম একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ৬ মাসও টিকবে না। মাঝিদের আবার স্বপ্নভঙ্গ হবে। তাই অন্তত টিনের চালা দিয়ে একটি স্থায়ী ঘর তুলে দিতে হবে।
মাঝিদের স্বপ্নের এই ঘরটুকুকে একটু ভালো করে তুলে দিতে পারলে ওরা নতুন স্বপ্ন দেখে বেঁচে থাকতে পারবে এই আশায় কষ্ট করে হলেও টিনের চালা দিয়ে ঘরটুকু করে দিয়েছি। এতে ছোট করে হলেও অনেকেরই অবদান আছে। জেলে শিশুদের ছোট্ট ছোট্ট সেই স্বপ্নগুলোই এখন অনেক বড় হয়ে গেছে। এখন ৮৬ জন শিশু স্কুলের শিক্ষার্থী। স্ছিয়াশি জন শিশুর স্বপ্ন আমাদের অনেকের স্বপ্নের সাথে লীন হয়ে গেছে।
প্রথম আলোর ব্লগার বন্ধুদের সহমর্মিতা এবং সমর্থনে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি শিশুদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে। ওদের জন্য বইয়ের ব্যবস্থা হয়েছে। বাচ্চাদের প্রধান দাবি বেঞ্চ তৈরির এস্টিমেট হাতে পেয়েছি। মোট ১২ টি বেঞ্চ তৈরিতে প্রায় ৯ হাজার টাকা খরচ হবে। আমাদের হাতে আছে ৭,৪০০/- টাকা। বেঞ্চ তৈরির কাজ শুরু করতে আমি শনিবার (০২/০৫/০৯) লক্ষ্মীপুর যাচ্ছি। আপনাদের অব্যাহত সমর্থন শিশুদের স্বপ্নগুলোক সবুজ রঙে রাঙিয়ে তুলতে পারে। আসুন আমরা স্কুলটিকে নিয়ে আরও সুন্দর সুন্দর সব পরিক্ল্পনা সাজাই।
লক্ষ্মীপুর থেকে ঘুরে এসে এ পর্যন্ত স্কুলের যাবতীয় খরচ নিয়ে একটি পোস্ট দেবো। ততদিন পর্যন্ত সবাই ভালো থাকুন।
৩০ টি মন্তব্য
fuad05 দেবদাস৩০ এপ্রিল ২০০৯, ০৫:৪২
ধন্যবাদ। ফিরে আসুন বিস্তারিত আলোচনা হবে।।
azman আজমান আন্দালিব৩০ এপ্রিল ২০০৯, ০৯:২১
আশা করি ফিরে এসে আপনার সাথে এককাপ চা খাব...
qmilon ‍িমলন৩০ এপ্রিল ২০০৯, ০৫:৪৩
আমি কিভাবে সহযোগীতা করতে পারি জানাবেন কি?
ধন্যবাদ, আমাদের স্বপ্ন সফল হোক।
azman আজমান আন্দালিব৩০ এপ্রিল ২০০৯, ০৯:২৪
যে কোন সহযোগিতা করতে পারেন...এই যেমন শনিবার আমার সাথে যেতে পারেন। ঐদিন বেলা ৩.০০ টায় শিশুরা আমাদের স্বাগত জানাবে। চোখে মুখে উছলে পড়া আনন্দময় একদল শিশুর সাথে সময় কাটানো যাবে। নিজ চোখে ওদের প্রয়োজনীয়তার কথা শুনে সাহায্য করতে পারেন...
likhon52 অধীর দত্ত০২ মে ২০০৯, ০৯:২৮
"ঐদিন বেলা ৩.০০ টায় শিশুরা আমাদের স্বাগত জানাবে"------ওরা রোদে পুড়বে নাতো !!!!
azman আজমান আন্দালিব০৫ মে ২০০৯, ০২:১৫
নারে ভাই, রোদে পুড়ে নাই। ছোট্ট একটি শামিয়ানার নিচে সবাই ছিলাম। পরে স্কুল ঘরে গিয়ে শিশুদের সাথে গল্প করেছি।
nasrinjubaer নাসরীন জুবায়ের৩০ এপ্রিল ২০০৯, ০৫:৪৪
ধন্যবাদ
azman আজমান আন্দালিব৩০ এপ্রিল ২০০৯, ০৯:২৮
কি ব্যাপার, শুধু ধন্যবাদ দিয়েই খালাস পেয়ে যাচ্ছেন যে...ধীবর বিদ্যানিকেতনের বাচ্চাদের জন্য উপহার কই?
nazlaabedin ফাতেমা আবেদীন নাজলা৩০ এপ্রিল ২০০৯, ০৫:৪৪
পথচলা এগিয়ে যাক
azman আজমান আন্দালিব৩০ এপ্রিল ২০০৯, ০৯:৩১
This is a journey...not a destination. Thanks for your wishing.
n_h_sarja নেহাল হাসনাইন সার্জা৩০ এপ্রিল ২০০৯, ০৫:৪৯
আন্দালিব ভাই, এগিয়ে চলুন,
ভালো কাজে সফলতা আসবেই ইনশাল্লাহ।
azman আজমান আন্দালিব৩০ এপ্রিল ২০০৯, ০৯:৩৫
আমাদেরও তাই আশা... ধন্যবাদ আপনাকে।
afruj আফরোজ৩০ এপ্রিল ২০০৯, ০৫:৫২
শুভ কামনা রইল
azman আজমান আন্দালিব৩০ এপ্রিল ২০০৯, ০৯:৩৬
মেঘনাপাড়ের শিশুদের পক্ষ থেকে আপনার জন্যও শুভকামনা।
chinta ‍িচন্তা৩০ এপ্রিল ২০০৯, ০৫:৫৪
এগিয়ে চলুন...
azman আজমান আন্দালিব৩০ এপ্রিল ২০০৯, ০৯:৩৭
কি খবর মি. চিন্তা। এতদিন কি চিন্তা নিয়ে ডুবে ছিলেন?
sujanpranto12 সুজন৩০ এপ্রিল ২০০৯, ০৫:৫৫
শুভ কামনা রইল।
azman আজমান আন্দালিব৩০ এপ্রিল ২০০৯, ০৯:৩৮
ধীবর শিশুদের পক্ষ থেকে আপনার জন্যও শুভকামনা।
ferdousmirza ফেরদৌস মির্জা৩০ এপ্রিল ২০০৯, ০৮:০৯
আপনিও ভাল থাকবেন। সাথে আমাদের প্রিয় খুড়িয়ে চলা স্কুলটির জন্য রইল অনেক অনেক শুভকামনা।
azman আজমান আন্দালিব০১ মে ২০০৯, ১০:৩২
আমাদের প্রিয় খুড়িয়ে চলা স্কুলটির শিশুদের পক্ষ থেকে আপনার জন্যও শুভকামনা।
myousufs ইঊসুফ৩০ এপ্রিল ২০০৯, ০৮:৫৫
ধন্যবাদ।
dukkho দুঃখ৩০ এপ্রিল ২০০৯, ০৮:৫৯
ইউসুফ ভাই পরীক্ষা কেমন হচ্ছে?
azman আজমান আন্দালিব০১ মে ২০০৯, ১০:৩৩
কি মি. ইউসুফ...পরীক্ষা যেন কবে শেষ?
myousufs ইঊসুফ০৩ মে ২০০৯, ০৯:০০
@ দুঃখ, আলহামদুলিল্লাহ ভালো হচ্ছে।
@ আজমান, এই তো আর দশ দিনের মতো বাকি..
dukkho দুঃখ৩০ এপ্রিল ২০০৯, ০৮:৫৮
ধন্যবাদ।
মিলন ভাই উপরে সহযোগিতা করার কথা বলেছে, উনার সাথে যোগাযোগ করুন।
azman আজমান আন্দালিব০১ মে ২০০৯, ১০:৩৮
ধন্যবাদ দু:খ। গতকাল সেই যে কারেন্ট চলে গিয়েছে- .....কেমন আছেন আপনি?
মিলন ভাই সহযোগিতার কথা বলেছেন...আমরা মিলন ভাইয়ের সহযোগিতার অপেক্ষায় আছি।
smc এস মাহবুব৩০ এপ্রিল ২০০৯, ০৯:২৩
শুভকামনা।
azman আজমান আন্দালিব০১ মে ২০০৯, ১০:৩৯
আপনার জন্যও শুভকামনা।
ajobdhaka আজব ঢাকা০৩ মে ২০০৯, ০১:৫৫
আপনি কবে আসবেন..........
azman আজমান আন্দালিব০৫ মে ২০০৯, ০২:১২
কি ব্যাপার! কোথায় ডুব মেরে ছিলে?
মাঝখানে কয়দিন নেটের বাইরে থেকে আজ ফিরেছি। লক্ষ্মীপুরে শনিবার গিয়ে শনিবারই ফিরেছি। রবি, সোম দুইদিন অফিসে প্রচণ্ড ব্যস্ততায় কেটেছে। আজ নেট সংযোগ নিয়েছি।
লক্ষ্মীপুরের পরবর্তী আপডেট নিয়ে খুব শীঘ্রই পোস্ট দেবো। অফিস থেকে ফোন দেবো...ধরবে কিন্তু...

সাম্প্রতিক পোস্ট Star

সাম্প্রতিক মন্তব্যComment