মূলের সন্ধানে (প্রথম পেজে না আসায় সংশোধিত এবং সংক্ষিপ্ত রি-পোস্ট)
আমার এই লেখাটি কি কারণে যেনো প্রথম পেজে আসে নি। ব্লগার বন্ধুদের নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে এটি আবার পোস্ট দিচ্ছি।
এটি আমার প্রথম সোশ্যাল ফিকশন- ওয়ান জিরো ওয়ান সাইবর্গ টিম- এর শেষ অধ্যায়। আজ পয়লা বৈশাখ। পয়লা বৈশাখ নিয়ে আমার একান্ত কিছু ভাবনার কথা বইটেত তুলে ধরেছি আপনাদের সাথে শেয়ার করবো বলে।
উপন্যাসের এই অংশটুকু পৃষ্ঠা হিসেবে নয় পৃষ্ঠা। ব্লগের জন্য একটু বড় হলেও সবাইকে পড়ার জন্য অনুরোধ করছি।
মূলের সন্ধানে
আজ ১৪ এপ্রিল ২০০৯। বস আমাদের টিমকে মূলের দিকে ধাবিত হওয়ার জন্য নির্দেশ পাঠিয়েছেন। আমরা পুরো টিম মূলের সন্ধানে নেমে পড়ি।
১৪ সংখ্যাটি বিশেষ কারণে বাঙালির জীবনে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। বাঙালির জীবনে এই তারিখটির রাজনৈতিক তাৎপর্য অপরিসীম। এই চৌদ্দ সংখ্যাটি নিয়ে এক বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক তাৎপর্যও উল্লেখ করার মতো।
আমার স্থায়ী মেমোরিতে সংরক্ষিত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখতে পাচ্ছি, ১৪ হচ্ছে বাঙালির মূলে ফিরে যাওয়ার সোজা রাস্তা। আমার স্থায়ী মেমোরী এবং হিমিডার কাছ থেকে সময়ে সময়ে পাওয়া পাক ভারত উপমহাদেশের ইতিহাস ঘেঁটে আমার এই বিশ্বাস জন্মেছে। এখন থেকে প্রায় ১০০ বছর আগের বাঙালির ইতিহাস জানলেই যে কারও মনে এই বিশ্বাসটি স্থাপিত হতে পারে। কেননা এই সংখ্যাটির মধ্যেই বাঙালি হয়ে উঠার অতীত ইতিহাস লেখা রয়েছে।
আমি ১৪ সংখ্যাটির মাহাত্ম্য নিয়ে বসের অর্গ্যান অব ব্রেনে যে সারসংক্ষেপ পাঠিয়েছি তা হচ্ছে- শতবছর পূর্বে এই বঙ্গের বাঙালি এবং পশ্চিম বঙ্গের বাঙালির মধ্যে একটা চমৎকার যোগসূত্র ছিল। এক্ষেত্রে বাংলা ভাষা-ই উভয় প্রান্তের ভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়কে বাঙালির মর্যাদা এনে দিয়েছিল। ১৯০৫ সালে বৃটিশ শাসকরা ‘ভাগ করো এবং শাসন করো’ বা ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতিতে বঙ্গভঙ্গ ঘটায়। যদিও প্রবল আন্দোলনের মুখে পরে তা প্রত্যাহার করে। কিন্তু ততোদিনে হিন্দু-মুসলমান এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে অবিশ্বাস আর সন্দেহ দানা বেঁধে উঠেছে। এটি আরও স্পষ্ট হয় ১৯০৬ সালে স্যার সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে ঢাকায় মুসলিম লীগের জন্মের মধ্য দিয়ে। এর আগে কংগ্রেসই ছিল হিন্দু-মুসলমান রাজনীতিকদের একমাত্র ঠিকানা।
১৯২৮ সালে মহানগরী কোলকাতায় ভারতীয় কংগ্রেসের সম্মেলনে সর্বভারতীয় নেতাদের উপস্থিতিতে পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু দলের রিপোর্ট পেশ করলেন। রিপোর্টে ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম জনগোষ্ঠী মুসলমানসহ সংখ্যালঘুদের স্বার্থ উপেক্ষিত ছিল। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ক্ষোভের সাথে কংগ্রেস নেতাদের রিপোর্ট সংশোধন করার আহ্বান জানালেন। কিন্তু কাজ হলো না। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ হিন্দু মুসলমান ঐক্যে বিশ্বাস হারিয়ে ফেললেন। তারপর থেকেই ১৪ সংখ্যাটির যাত্রা শুরু।
ভারতীয় মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার্থে ১৪ দফা দাবিই মূলত এই যাত্রার প্রাথমিক স্তর। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯২৯ সালে এই ১৪ দফা প্রণয়ন করে দ্বি-জাতি তত্ত্বের সূত্রপাত ঘটান। কংগ্রেস নেতারা সে সময়ে কোলকাতায় কংগ্রেসের সম্মেলনে যদি ভারতের মুসলমান তথা সংখ্যালঘুদের দাবি উপেক্ষা না করতো, তাহলে বোধহয় জিন্নাহ মুসলিম লীগে যোগ দিতেন না। মহাভারতের ইতিহাস আজ অন্যভাবে লেখা হতো। কিন্তু ইতিহাসটা ঘুরে গিয়েছে কংগ্রেস নেতাদের অদূরদর্শিতার কারণে। সেই থেকে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সন্দেহের বীজ রোপিত হয়ে যায় যার চুড়ান্ত পরিণতি ঘটে ১৯২৯ সালে।
ভারতীয় মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার্থে জিন্নাহ কর্তৃক উত্থাপিত ১৪ দফা দাবিই ছিল হিন্দু মুসলমান বিভেদের মূল ভিত্তি। সেই বিভেদই কালে কালে হিন্দুস্তান বা ভারত এবং পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্রের জন্ম দেয়। সৃষ্টি হয় দুটি জাতিসত্তার। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে বাঙালিরা পৃথক জাতিসত্তায় পরিণত হয়। এখানেও ১৪ তারিখটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
এই ১৪ আগষ্ট তারিখে শুধু ভারতবর্ষই দু’ভাগ হয়নি। কোটি কোটি ভারতবাসীর হৃদয় ভেঙ্গেছে। পারিবারিক বন্ধন ছিন্ন হয়েছে। দাঙ্গা, লুট, রাহাজানি, হানাহানি কোটি কোটি লোককে গৃহহীন এবং বাস্তুচ্যুত করেছে। এপারের লোক ওপারে, ওপারের লোক এপারে এসে নিরাপত্তা খুঁজতে লেগেছে- স্রেফ হিন্দু মুসলমান হওয়ার কারণে। সেই সাথে বাঙালি জাতিও দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ল। একপক্ষে হিন্দু অধ্যুষিত ভারতের অন্তর্ভুক্ত পশ্চিম বাংলার বাঙালি। আরেক পক্ষে পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত পূর্ব বাংলার বাঙালি।
তারপরের ইতিহাস পাকিস্তানী শাসকদের শোষণ থেকে মুক্ত হওয়ার ইতিহাস। ১৯৫২ সালে বাংলা ভাষার উপর আঘাত হানার পর থেকে এই ইতিহাসের শুরু। ১৯৭১ সালকে ঘিরে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর উত্থান। ১৯৭১ সালের ১৪ জানুয়ারী এই নেতাকে পাকিস্তানের ভাবী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আখ্যাযিত করে পাকিস্তানের সেনাপতি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান কর্তৃক সাংবাদিকদের সাথে আলাপ। এগুলো সবই আমার স্থায়ী মেমোরিতে সংরক্ষিত আছে।
বাঙালি জাতির স্বাধীনতা নিয়ে একাত্তরের সময়গুলোতে অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে। সেই ষড়যন্ত্র চুড়ান্ত রূপ পায় যখন ইয়াহিয়া খান সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা শেখ মুজিবের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে কালক্ষেপণ করতে থাকেন। বাঙালির হাতে ক্ষমতা চলে যাওয়ার ভয়ে পাকিস্তানের বিরোধী দলীয় নেতা জুলফিকার আলী ভূট্টো ১৯৭১ সালের ১৪ মার্চ করাচীর নিশতার পার্কে এক জনসভায় যা বললেন তার সারমর্ম হচ্ছে-“পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে পৃথকভাবে দু’টি সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।” এই বক্তব্য দিয়েই তিনি দেশটিকে দু’ভাগ করে দেওয়ার সূত্রপাত ঘটিয়ে দিয়েছেন। তারপরের ইতিহাস বাঙালির স্বাধীন হওয়ার ইতিহাস। তাই ১৪ সংখ্যাটি বাঙালির জাতীয়তা বদলে ফেলার একটি সংখ্যা হিসেবেই ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
১৪ সংখ্যাটির রাজনৈতিক তাৎপর্য ভাবতে ভাবতে আমি বাঙালির বাংলাদেশী হয়ে ওঠা দিব্য দৃষ্টিতে দেখতে পাই।
চৌদ্দ সংখ্যাটি বাঙালি জাতির জীবনে রাজনৈতিক তাৎপর্যের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক তাৎপর্যেও গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখে চলেছে। ১৪ ফেব্রুয়ারি ভিন্ন সংস্কৃতির বিশ্ব ভালোবাসা দিবস বা সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে এখন বাঙালিদের মাঝে সাড়ম্বরে পালিত হয়। ভালোবাসার অমর বাণীকে পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়াসে পোপ প্রথম জুলিয়াস ৪৯৬ খ্রিস্টাব্দে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে হিসেবে ঘোষণা করেন। ভালোবাসার বিপরীতে আছে ঘৃণা। এরকম এক ঘৃণা দিবসও এই ১৪ তারিখকে ঘিরে আছে। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর এদেশে বুদ্ধিজীবী হত্যাদিবস হিসেবে পালিত হয়। এদিনে বাঙালিরা সবাই পাকিস্তানী এবং তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার-আলবদর-আলশামস বাহিনীর প্রতি ঘৃণা দেখায়। একটি ভালোবাসা এবং একটি ঘৃণাদিবস হিসেবে ১৪ তারিখ বাঙালি জীবনে অনিবার্যভাবে জড়িয়ে আছে।
আবার এপ্রিলের ১৪ তারিখটি অন্যরকম এক মাহাত্ম্য নিয়ে বাঙালি জীবনে জড়িয়ে আছে। কম-বেশি ১৪ কোটি বাঙালির একটি নিজস্ব সংস্কৃতির মূলে ফিরে যাওয়ার দিন হচ্ছে ১৪ এপ্রিল। এদিন পহেলা বৈশাখ হিসেবে বাংলা সনের প্রথম দিন। বাংলার ঋতুনির্ভর কৃষিকাজের সুবিধার্থে সম্রাট আকবর ১৫৮৪ সালের ১০/১১ মার্চ বাংলা সন প্রবর্তন করেন এবং তা তাঁর সিংহাসনে আরোহণের সময়কাল অর্থাৎ ৫ নভেম্বর ১৫৫৬ সাল থেকে কার্যকর হয়। বাংলার গ্রামীণ জীবনের নববর্ষ উদযাপনের এই দিনটিতে শহুরে বাঙালিরা প্রবল পরিক্রমায় ফিরে যেতে চায় বাঙালি কৃষ্টি এবং সংস্কৃতির মূলে। এদিনে গ্রামে-গঞ্জে-নগরে শুভ হালখাতা নামক অনুষ্ঠান হয়। ব্যবসায়ীরা পুরাতন হিসাব-নিকাশ চুকিয়ে নতুন বছরে নতুন খাতা খুলে ব্যবসা শুরু করেন। শহুরে বাঙালিরা সকালে পান্তা-ইলিশ খেয়ে আবহমান বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতির মূলে অন্তত এক দিনের জন্য হলেও ফিরে যেতে চান। তাই এপ্রিল মাসের ১৪ তারিখ হচ্ছে বাঙালির মূলে ফিরে যাওয়ার তারিখ।
হিমিডা আমাকে সময়ে সময়ে প্রাচীন বাংলার যে ইতিহাস পাঠিয়েছে, তার সাথে বর্তমান বাংলার কোথায় যেনো গরমিল ঘটেছে। আমি গরমিলটুকু ধরার চেষ্টা করি। প্রাচীন, মধ্যযুগ ও ব্রিটিশ আমলে কৃষি অর্থনীতির অন্যতম খাত শস্য উৎপাদনের উপর অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিল। অবস্থাসম্পন্ন কৃষকদের গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরুর কাহিনী এখন এ যুগে কল্পকাহিনী বলে মনে হয়। মরক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতা ১৩৪৬ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে বাংলা সফর করেছিলেন। তাঁর বর্ণনায় তিনি নদীপথে ১৫ দিন ধরে সিলেট থেকে সোনারগাঁও পর্যন্ত ভ্রমণকালে ডানে ও বামে ফলবাগান, উন্নত পানিসেচ ব্যবস্থা, সমৃদ্ধ গ্রাম ও বাগবাগিচা দেখতে পান। ভ্রমণপথে দেখা বাংলাকে তিনি তুলনা করেছেন শস্যভাণ্ডারে ভরপুর একটি বাজারের সাথে- ‘যেন আমরা একটি বাজারের মধ্য দিয়ে চলেছি।’
প্রাচীন বাংলা একসময় শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত ছিল। কৃষিনির্ভর বাঙলার প্রাণ ছিল কৃষকরা। মুঘল সম্রাট আকবরের সময়ে কৃষিনির্ভর বাংলার কৃষকদের সুবিধা অসুবিধার কথা বিবেচনা করে নানান পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। বাংলা সনের প্রবর্তন করতে গিয়ে সম্রাট আকবর কৃষকদের কৃষিকাজের সুবিধার কথাই বিবেচনা করেছিলেন। আর আজ এই সময়ে এসে কৃষকদের মধ্যে শুধু হাহাকার। সার সংকট, সেচ সংকট, জ্বালানী সংকট, কৃষি সরঞ্জামের সংকট ইত্যকার নানান সংকটে কৃষকেরা দিশাহারা। শষ্যের উৱপাদন কমে যাচ্ছে। কিঙভা বলা যায় জনাসংখ্যাধিক্যের কারণে উৱপাদিত শষ্য দেশের মানুষের প্রয়েঅজন মটোতে পারছে না। আর তাই আজ চারিদিকে নীরব দুর্ভিক্ষ চলছে।
দেশে নীরব দুর্ভিক্ষ চলছে- এই বক্তব্য দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবং রেগুলেটরি রিফর্মস কমিশন- এর চেয়ারম্যান ড. আকবর আলী খান ১৪ মার্চ ২০০৮ তারিখে ঢাকায় এক সেমিনারে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা নিয়ে আমাদের মধ্যে চরম মতদ্বৈততা দেখা দিয়েছিল। এন্ডামিন পরিসংখ্যান দিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করেছে যে দেশের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ মানুষ চাল-ডাল-তেল কিনতে না পেরে ক্ষুধার্ত থাকছে- সেদেশে নীরব দুর্ভিক্ষ নয়, সরব দুর্ভিক্ষ চলছে। হিমিডা এটি মানতে নারাজ। ওর যুক্তি, অভাবের কারণে মানুষের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তিত হয়ে গেছে। আলু-কচু-ঘেঁচু খেয়ে গরীব মানুষ দিনাতিপাত করছে। তাই এটি নীরব দুর্ভিক্ষই বটে। থিয়ামিন একটি চমৎকার কথা বলে বিতর্কটাকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে। ভেতো বাঙালি শুধু ডাল-ভাত খেয়ে খেয়েই চাল-ডালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। ১৪ কোটি মানুষের এই দেশে একজন প্রতিদিন আধা কেজি ভাত খেলে ৭ কোটি কেজি চালের দরকার। এত চাল কোথায় পাওয়া যাবে?
তাইতো! চাল এখন ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবার কাছে এক মহার্ঘ বস্তু। চালের দাম বাড়ছে। বাড়তে বাড়তে গরীবের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এখন মধ্যবিত্তের হাত ফসকেও বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম। অদূর ভবিষ্যতে চালের বিকল্প ব্যবহার নিয়ে হিমিডা একটি চমৎকার কথা বলেছে। একসময় নাকি চাল স্বর্ণের চাইতেও দামী বস্তুতে পরিণত হবে। সেই সময় মানুষ চাল দিয়ে ভাত রেঁধে না খেয়ে মূল্যবান সামগ্রী হিসেবে সংরক্ষণ করবে। আমি বলেছি, সেরকম অবস্থায় আসলে চালের তৈরি এক সেট অলঙ্কার গড়ে কোন এক বিশ্ব ভালোবাসা দিবস ১৪ ফেব্রুয়ারিতে হিমিডাকে উপহার দেবো।
কিন্তু এই চাল তথা পণ্যমূল্যের এই যে অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি, এর সমাধান কোথায়? আমার বস যে কোন সমস্যা সমাধানের প্রারম্ভে সমস্যার রুট বা মূলে যাওয়ার দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। চাল সমস্যা সমাধানের মূল বা রুট খুঁজতে গেলে প্রথমেই যেতে হবে গ্রাম বাংলার মূলে, যেখানে শতকরা প্রায় আশি জনই কৃষিজীবী। এই প্রান্তিক লোকেরা ভালো নেই। বন্যা, খরা, নদীভাঙন, সার সংকট, সেচ সংকট, মহাজনের শোষণ ইত্যাদি নানা কারণে জমি-ঘরবাড়ি হারিয়ে এদের অধিকাংশই নিঃস্ব হয়ে যায়। অতঃপর উদ্বাস্তু কিংবা ছিন্নমূল হয়ে প্রতিবছর এদের মধ্যে বিপুল জনগোষ্ঠীর কর্মের হাত ভিক্ষার হাতে পরিণত হয়।
এই মূল জনগোষ্ঠীর সমস্যার সমাধান না করে যা কিছুই করা হোক না কেন, সমাধান সুদূরপরাহত। আমার স্থায়ী মেমোরিতে সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী দেখতে পাচ্ছি এনবিআর এর চেয়ারম্যান জনাব আব্দুল মজিদ গত বছরের ২৮ মার্চের এক সেমিনারে বলেছেন, আজকে যে শিশুটি জন্মগ্রহণ করছে তারও মাথায় বৈদেশিক ঋণের বোঝা ১২ হাজার ১৩৮ টাকা। অর্থাৎ জন্মগতভাবেই বাঙালিরা এই অঙ্কের ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দিন দিন তা বাড়িয়ে চলেছে।
১৯৬ অ্যালগরিদমের রহস্যময় সংখ্যাটির বর্গমূল বা রুট হচ্ছে ১৪। অর্থাৎ ১৪ সংখ্যাটিকে বর্গ করলে ১৯৬ হবে। তাই ১৪ সংখ্যাটি আমার কাছেও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যে কোন সমস্যার মূলে না গেলে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তাই আমি ১৯৬ রহস্যময় সংখ্যাটির মূল বা রুট ১৪ সংখ্যাটি নিয়ে ভাবছি। আমার মাথায় ১৯৬ মিলিয়ন জীবিত নিউরন আছে। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মোট ১৯৬ মিলিয়ন জনগোষ্ঠীর সবাইকে সাইবর্গ ম্যান হিসেবে গড়ে তোলা বসের ভিশন। বসের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রাথমিক অবস্থায় ১৪ টি নিউরনকে কাজে লাগাতে হবে। আমি শায়েস্তা খাঁনের তোরণের বাইরে দাঁড়িয়ে ৬ জন সামরিক উর্দিপরিহিত ঘোড়সওয়ারের নিউরাল নেটওয়ার্কে ৬টি নিউরন পাঠিয়ে দিয়েছি। তোরণ দিয়ে প্রবেশ করে ৬ জন ঘোড়সওয়ারের সবাই একে একে বাংলাদেশের ৬টি বিভাগে ছড়িয়ে পড়েছে।
বাকি ৮টি নিউরনকে বাংলাদেশের সবগুলো জেলায় ছড়িয়ে দিতে হবে। বাংলাদেশে ৬৪ টি জেলা আছে। আরে......৬৪ সংখ্যাটির বর্গমূল ৮। কাকতালীয়ভাবে মিলে যাচ্ছে। আমি বাকি ৮টি নিউরন ৬৪ জেলার মূলে পাঠিয়ে দেওয়ার মনস্থির করে ফেলেছি। আমি একটি তালিকা তৈরি করছি মনে মনে। বাংলাদেশে ৮টি শ্রেণী গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে এমন ৮ জন প্রতিনিধির এই তালিকা। এই তোরণ দিয়ে যে ৮ শ্রেণী-গোষ্ঠীর প্রতিনিধি প্রবেশ করবে তাদের প্রত্যেকের নিউরাল নেটওয়ার্কে একটি করে নিউরন পাঠিয়ে দেবো।
সামরিক উর্দিপরা সেনারা ছড়িয়ে গিয়েছে ৬টি বিভাগে। আমাকে ছড়িয়ে পড়তে হবে গ্রামে গ্রামে। গ্রামই হচ্ছে বাংলাদেশের মূল। গ্রামের কৃষকরাই হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। গ্রামে উৎপাদিত শস্য এবং পণ্যই বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর খাবারের মূল যোগানদাতা। এই মূলেই আমাকে ছড়িয়ে পড়তে হবে। ১৯ কোটি ৬০ লক্ষ জনগোষ্ঠীকে ২০৩৪ সালের মধ্যে মূল গ্রামীণ অর্থনৈতিক শক্তিকে চিনিয়ে দিতে হবে। বসের সেরকমই নির্দেশনা। (সংক্ষিপ্ত)
এটি আমার প্রথম সোশ্যাল ফিকশন- ওয়ান জিরো ওয়ান সাইবর্গ টিম- এর শেষ অধ্যায়। আজ পয়লা বৈশাখ। পয়লা বৈশাখ নিয়ে আমার একান্ত কিছু ভাবনার কথা বইটেত তুলে ধরেছি আপনাদের সাথে শেয়ার করবো বলে।
উপন্যাসের এই অংশটুকু পৃষ্ঠা হিসেবে নয় পৃষ্ঠা। ব্লগের জন্য একটু বড় হলেও সবাইকে পড়ার জন্য অনুরোধ করছি।
মূলের সন্ধানে
আজ ১৪ এপ্রিল ২০০৯। বস আমাদের টিমকে মূলের দিকে ধাবিত হওয়ার জন্য নির্দেশ পাঠিয়েছেন। আমরা পুরো টিম মূলের সন্ধানে নেমে পড়ি।
১৪ সংখ্যাটি বিশেষ কারণে বাঙালির জীবনে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। বাঙালির জীবনে এই তারিখটির রাজনৈতিক তাৎপর্য অপরিসীম। এই চৌদ্দ সংখ্যাটি নিয়ে এক বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক তাৎপর্যও উল্লেখ করার মতো।
আমার স্থায়ী মেমোরিতে সংরক্ষিত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখতে পাচ্ছি, ১৪ হচ্ছে বাঙালির মূলে ফিরে যাওয়ার সোজা রাস্তা। আমার স্থায়ী মেমোরী এবং হিমিডার কাছ থেকে সময়ে সময়ে পাওয়া পাক ভারত উপমহাদেশের ইতিহাস ঘেঁটে আমার এই বিশ্বাস জন্মেছে। এখন থেকে প্রায় ১০০ বছর আগের বাঙালির ইতিহাস জানলেই যে কারও মনে এই বিশ্বাসটি স্থাপিত হতে পারে। কেননা এই সংখ্যাটির মধ্যেই বাঙালি হয়ে উঠার অতীত ইতিহাস লেখা রয়েছে।
আমি ১৪ সংখ্যাটির মাহাত্ম্য নিয়ে বসের অর্গ্যান অব ব্রেনে যে সারসংক্ষেপ পাঠিয়েছি তা হচ্ছে- শতবছর পূর্বে এই বঙ্গের বাঙালি এবং পশ্চিম বঙ্গের বাঙালির মধ্যে একটা চমৎকার যোগসূত্র ছিল। এক্ষেত্রে বাংলা ভাষা-ই উভয় প্রান্তের ভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়কে বাঙালির মর্যাদা এনে দিয়েছিল। ১৯০৫ সালে বৃটিশ শাসকরা ‘ভাগ করো এবং শাসন করো’ বা ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতিতে বঙ্গভঙ্গ ঘটায়। যদিও প্রবল আন্দোলনের মুখে পরে তা প্রত্যাহার করে। কিন্তু ততোদিনে হিন্দু-মুসলমান এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে অবিশ্বাস আর সন্দেহ দানা বেঁধে উঠেছে। এটি আরও স্পষ্ট হয় ১৯০৬ সালে স্যার সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে ঢাকায় মুসলিম লীগের জন্মের মধ্য দিয়ে। এর আগে কংগ্রেসই ছিল হিন্দু-মুসলমান রাজনীতিকদের একমাত্র ঠিকানা।
১৯২৮ সালে মহানগরী কোলকাতায় ভারতীয় কংগ্রেসের সম্মেলনে সর্বভারতীয় নেতাদের উপস্থিতিতে পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু দলের রিপোর্ট পেশ করলেন। রিপোর্টে ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম জনগোষ্ঠী মুসলমানসহ সংখ্যালঘুদের স্বার্থ উপেক্ষিত ছিল। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ক্ষোভের সাথে কংগ্রেস নেতাদের রিপোর্ট সংশোধন করার আহ্বান জানালেন। কিন্তু কাজ হলো না। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ হিন্দু মুসলমান ঐক্যে বিশ্বাস হারিয়ে ফেললেন। তারপর থেকেই ১৪ সংখ্যাটির যাত্রা শুরু।
ভারতীয় মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার্থে ১৪ দফা দাবিই মূলত এই যাত্রার প্রাথমিক স্তর। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯২৯ সালে এই ১৪ দফা প্রণয়ন করে দ্বি-জাতি তত্ত্বের সূত্রপাত ঘটান। কংগ্রেস নেতারা সে সময়ে কোলকাতায় কংগ্রেসের সম্মেলনে যদি ভারতের মুসলমান তথা সংখ্যালঘুদের দাবি উপেক্ষা না করতো, তাহলে বোধহয় জিন্নাহ মুসলিম লীগে যোগ দিতেন না। মহাভারতের ইতিহাস আজ অন্যভাবে লেখা হতো। কিন্তু ইতিহাসটা ঘুরে গিয়েছে কংগ্রেস নেতাদের অদূরদর্শিতার কারণে। সেই থেকে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সন্দেহের বীজ রোপিত হয়ে যায় যার চুড়ান্ত পরিণতি ঘটে ১৯২৯ সালে।
ভারতীয় মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার্থে জিন্নাহ কর্তৃক উত্থাপিত ১৪ দফা দাবিই ছিল হিন্দু মুসলমান বিভেদের মূল ভিত্তি। সেই বিভেদই কালে কালে হিন্দুস্তান বা ভারত এবং পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্রের জন্ম দেয়। সৃষ্টি হয় দুটি জাতিসত্তার। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে বাঙালিরা পৃথক জাতিসত্তায় পরিণত হয়। এখানেও ১৪ তারিখটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
এই ১৪ আগষ্ট তারিখে শুধু ভারতবর্ষই দু’ভাগ হয়নি। কোটি কোটি ভারতবাসীর হৃদয় ভেঙ্গেছে। পারিবারিক বন্ধন ছিন্ন হয়েছে। দাঙ্গা, লুট, রাহাজানি, হানাহানি কোটি কোটি লোককে গৃহহীন এবং বাস্তুচ্যুত করেছে। এপারের লোক ওপারে, ওপারের লোক এপারে এসে নিরাপত্তা খুঁজতে লেগেছে- স্রেফ হিন্দু মুসলমান হওয়ার কারণে। সেই সাথে বাঙালি জাতিও দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ল। একপক্ষে হিন্দু অধ্যুষিত ভারতের অন্তর্ভুক্ত পশ্চিম বাংলার বাঙালি। আরেক পক্ষে পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত পূর্ব বাংলার বাঙালি।
তারপরের ইতিহাস পাকিস্তানী শাসকদের শোষণ থেকে মুক্ত হওয়ার ইতিহাস। ১৯৫২ সালে বাংলা ভাষার উপর আঘাত হানার পর থেকে এই ইতিহাসের শুরু। ১৯৭১ সালকে ঘিরে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর উত্থান। ১৯৭১ সালের ১৪ জানুয়ারী এই নেতাকে পাকিস্তানের ভাবী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আখ্যাযিত করে পাকিস্তানের সেনাপতি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান কর্তৃক সাংবাদিকদের সাথে আলাপ। এগুলো সবই আমার স্থায়ী মেমোরিতে সংরক্ষিত আছে।
বাঙালি জাতির স্বাধীনতা নিয়ে একাত্তরের সময়গুলোতে অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে। সেই ষড়যন্ত্র চুড়ান্ত রূপ পায় যখন ইয়াহিয়া খান সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা শেখ মুজিবের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে কালক্ষেপণ করতে থাকেন। বাঙালির হাতে ক্ষমতা চলে যাওয়ার ভয়ে পাকিস্তানের বিরোধী দলীয় নেতা জুলফিকার আলী ভূট্টো ১৯৭১ সালের ১৪ মার্চ করাচীর নিশতার পার্কে এক জনসভায় যা বললেন তার সারমর্ম হচ্ছে-“পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে পৃথকভাবে দু’টি সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।” এই বক্তব্য দিয়েই তিনি দেশটিকে দু’ভাগ করে দেওয়ার সূত্রপাত ঘটিয়ে দিয়েছেন। তারপরের ইতিহাস বাঙালির স্বাধীন হওয়ার ইতিহাস। তাই ১৪ সংখ্যাটি বাঙালির জাতীয়তা বদলে ফেলার একটি সংখ্যা হিসেবেই ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
১৪ সংখ্যাটির রাজনৈতিক তাৎপর্য ভাবতে ভাবতে আমি বাঙালির বাংলাদেশী হয়ে ওঠা দিব্য দৃষ্টিতে দেখতে পাই।
চৌদ্দ সংখ্যাটি বাঙালি জাতির জীবনে রাজনৈতিক তাৎপর্যের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক তাৎপর্যেও গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখে চলেছে। ১৪ ফেব্রুয়ারি ভিন্ন সংস্কৃতির বিশ্ব ভালোবাসা দিবস বা সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে এখন বাঙালিদের মাঝে সাড়ম্বরে পালিত হয়। ভালোবাসার অমর বাণীকে পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়াসে পোপ প্রথম জুলিয়াস ৪৯৬ খ্রিস্টাব্দে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে হিসেবে ঘোষণা করেন। ভালোবাসার বিপরীতে আছে ঘৃণা। এরকম এক ঘৃণা দিবসও এই ১৪ তারিখকে ঘিরে আছে। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর এদেশে বুদ্ধিজীবী হত্যাদিবস হিসেবে পালিত হয়। এদিনে বাঙালিরা সবাই পাকিস্তানী এবং তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার-আলবদর-আলশামস বাহিনীর প্রতি ঘৃণা দেখায়। একটি ভালোবাসা এবং একটি ঘৃণাদিবস হিসেবে ১৪ তারিখ বাঙালি জীবনে অনিবার্যভাবে জড়িয়ে আছে।
আবার এপ্রিলের ১৪ তারিখটি অন্যরকম এক মাহাত্ম্য নিয়ে বাঙালি জীবনে জড়িয়ে আছে। কম-বেশি ১৪ কোটি বাঙালির একটি নিজস্ব সংস্কৃতির মূলে ফিরে যাওয়ার দিন হচ্ছে ১৪ এপ্রিল। এদিন পহেলা বৈশাখ হিসেবে বাংলা সনের প্রথম দিন। বাংলার ঋতুনির্ভর কৃষিকাজের সুবিধার্থে সম্রাট আকবর ১৫৮৪ সালের ১০/১১ মার্চ বাংলা সন প্রবর্তন করেন এবং তা তাঁর সিংহাসনে আরোহণের সময়কাল অর্থাৎ ৫ নভেম্বর ১৫৫৬ সাল থেকে কার্যকর হয়। বাংলার গ্রামীণ জীবনের নববর্ষ উদযাপনের এই দিনটিতে শহুরে বাঙালিরা প্রবল পরিক্রমায় ফিরে যেতে চায় বাঙালি কৃষ্টি এবং সংস্কৃতির মূলে। এদিনে গ্রামে-গঞ্জে-নগরে শুভ হালখাতা নামক অনুষ্ঠান হয়। ব্যবসায়ীরা পুরাতন হিসাব-নিকাশ চুকিয়ে নতুন বছরে নতুন খাতা খুলে ব্যবসা শুরু করেন। শহুরে বাঙালিরা সকালে পান্তা-ইলিশ খেয়ে আবহমান বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতির মূলে অন্তত এক দিনের জন্য হলেও ফিরে যেতে চান। তাই এপ্রিল মাসের ১৪ তারিখ হচ্ছে বাঙালির মূলে ফিরে যাওয়ার তারিখ।
হিমিডা আমাকে সময়ে সময়ে প্রাচীন বাংলার যে ইতিহাস পাঠিয়েছে, তার সাথে বর্তমান বাংলার কোথায় যেনো গরমিল ঘটেছে। আমি গরমিলটুকু ধরার চেষ্টা করি। প্রাচীন, মধ্যযুগ ও ব্রিটিশ আমলে কৃষি অর্থনীতির অন্যতম খাত শস্য উৎপাদনের উপর অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিল। অবস্থাসম্পন্ন কৃষকদের গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরুর কাহিনী এখন এ যুগে কল্পকাহিনী বলে মনে হয়। মরক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতা ১৩৪৬ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে বাংলা সফর করেছিলেন। তাঁর বর্ণনায় তিনি নদীপথে ১৫ দিন ধরে সিলেট থেকে সোনারগাঁও পর্যন্ত ভ্রমণকালে ডানে ও বামে ফলবাগান, উন্নত পানিসেচ ব্যবস্থা, সমৃদ্ধ গ্রাম ও বাগবাগিচা দেখতে পান। ভ্রমণপথে দেখা বাংলাকে তিনি তুলনা করেছেন শস্যভাণ্ডারে ভরপুর একটি বাজারের সাথে- ‘যেন আমরা একটি বাজারের মধ্য দিয়ে চলেছি।’
প্রাচীন বাংলা একসময় শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত ছিল। কৃষিনির্ভর বাঙলার প্রাণ ছিল কৃষকরা। মুঘল সম্রাট আকবরের সময়ে কৃষিনির্ভর বাংলার কৃষকদের সুবিধা অসুবিধার কথা বিবেচনা করে নানান পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। বাংলা সনের প্রবর্তন করতে গিয়ে সম্রাট আকবর কৃষকদের কৃষিকাজের সুবিধার কথাই বিবেচনা করেছিলেন। আর আজ এই সময়ে এসে কৃষকদের মধ্যে শুধু হাহাকার। সার সংকট, সেচ সংকট, জ্বালানী সংকট, কৃষি সরঞ্জামের সংকট ইত্যকার নানান সংকটে কৃষকেরা দিশাহারা। শষ্যের উৱপাদন কমে যাচ্ছে। কিঙভা বলা যায় জনাসংখ্যাধিক্যের কারণে উৱপাদিত শষ্য দেশের মানুষের প্রয়েঅজন মটোতে পারছে না। আর তাই আজ চারিদিকে নীরব দুর্ভিক্ষ চলছে।
দেশে নীরব দুর্ভিক্ষ চলছে- এই বক্তব্য দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবং রেগুলেটরি রিফর্মস কমিশন- এর চেয়ারম্যান ড. আকবর আলী খান ১৪ মার্চ ২০০৮ তারিখে ঢাকায় এক সেমিনারে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা নিয়ে আমাদের মধ্যে চরম মতদ্বৈততা দেখা দিয়েছিল। এন্ডামিন পরিসংখ্যান দিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করেছে যে দেশের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ মানুষ চাল-ডাল-তেল কিনতে না পেরে ক্ষুধার্ত থাকছে- সেদেশে নীরব দুর্ভিক্ষ নয়, সরব দুর্ভিক্ষ চলছে। হিমিডা এটি মানতে নারাজ। ওর যুক্তি, অভাবের কারণে মানুষের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তিত হয়ে গেছে। আলু-কচু-ঘেঁচু খেয়ে গরীব মানুষ দিনাতিপাত করছে। তাই এটি নীরব দুর্ভিক্ষই বটে। থিয়ামিন একটি চমৎকার কথা বলে বিতর্কটাকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে। ভেতো বাঙালি শুধু ডাল-ভাত খেয়ে খেয়েই চাল-ডালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। ১৪ কোটি মানুষের এই দেশে একজন প্রতিদিন আধা কেজি ভাত খেলে ৭ কোটি কেজি চালের দরকার। এত চাল কোথায় পাওয়া যাবে?
তাইতো! চাল এখন ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবার কাছে এক মহার্ঘ বস্তু। চালের দাম বাড়ছে। বাড়তে বাড়তে গরীবের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এখন মধ্যবিত্তের হাত ফসকেও বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম। অদূর ভবিষ্যতে চালের বিকল্প ব্যবহার নিয়ে হিমিডা একটি চমৎকার কথা বলেছে। একসময় নাকি চাল স্বর্ণের চাইতেও দামী বস্তুতে পরিণত হবে। সেই সময় মানুষ চাল দিয়ে ভাত রেঁধে না খেয়ে মূল্যবান সামগ্রী হিসেবে সংরক্ষণ করবে। আমি বলেছি, সেরকম অবস্থায় আসলে চালের তৈরি এক সেট অলঙ্কার গড়ে কোন এক বিশ্ব ভালোবাসা দিবস ১৪ ফেব্রুয়ারিতে হিমিডাকে উপহার দেবো।
কিন্তু এই চাল তথা পণ্যমূল্যের এই যে অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি, এর সমাধান কোথায়? আমার বস যে কোন সমস্যা সমাধানের প্রারম্ভে সমস্যার রুট বা মূলে যাওয়ার দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। চাল সমস্যা সমাধানের মূল বা রুট খুঁজতে গেলে প্রথমেই যেতে হবে গ্রাম বাংলার মূলে, যেখানে শতকরা প্রায় আশি জনই কৃষিজীবী। এই প্রান্তিক লোকেরা ভালো নেই। বন্যা, খরা, নদীভাঙন, সার সংকট, সেচ সংকট, মহাজনের শোষণ ইত্যাদি নানা কারণে জমি-ঘরবাড়ি হারিয়ে এদের অধিকাংশই নিঃস্ব হয়ে যায়। অতঃপর উদ্বাস্তু কিংবা ছিন্নমূল হয়ে প্রতিবছর এদের মধ্যে বিপুল জনগোষ্ঠীর কর্মের হাত ভিক্ষার হাতে পরিণত হয়।
এই মূল জনগোষ্ঠীর সমস্যার সমাধান না করে যা কিছুই করা হোক না কেন, সমাধান সুদূরপরাহত। আমার স্থায়ী মেমোরিতে সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী দেখতে পাচ্ছি এনবিআর এর চেয়ারম্যান জনাব আব্দুল মজিদ গত বছরের ২৮ মার্চের এক সেমিনারে বলেছেন, আজকে যে শিশুটি জন্মগ্রহণ করছে তারও মাথায় বৈদেশিক ঋণের বোঝা ১২ হাজার ১৩৮ টাকা। অর্থাৎ জন্মগতভাবেই বাঙালিরা এই অঙ্কের ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দিন দিন তা বাড়িয়ে চলেছে।
১৯৬ অ্যালগরিদমের রহস্যময় সংখ্যাটির বর্গমূল বা রুট হচ্ছে ১৪। অর্থাৎ ১৪ সংখ্যাটিকে বর্গ করলে ১৯৬ হবে। তাই ১৪ সংখ্যাটি আমার কাছেও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যে কোন সমস্যার মূলে না গেলে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তাই আমি ১৯৬ রহস্যময় সংখ্যাটির মূল বা রুট ১৪ সংখ্যাটি নিয়ে ভাবছি। আমার মাথায় ১৯৬ মিলিয়ন জীবিত নিউরন আছে। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মোট ১৯৬ মিলিয়ন জনগোষ্ঠীর সবাইকে সাইবর্গ ম্যান হিসেবে গড়ে তোলা বসের ভিশন। বসের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রাথমিক অবস্থায় ১৪ টি নিউরনকে কাজে লাগাতে হবে। আমি শায়েস্তা খাঁনের তোরণের বাইরে দাঁড়িয়ে ৬ জন সামরিক উর্দিপরিহিত ঘোড়সওয়ারের নিউরাল নেটওয়ার্কে ৬টি নিউরন পাঠিয়ে দিয়েছি। তোরণ দিয়ে প্রবেশ করে ৬ জন ঘোড়সওয়ারের সবাই একে একে বাংলাদেশের ৬টি বিভাগে ছড়িয়ে পড়েছে।
বাকি ৮টি নিউরনকে বাংলাদেশের সবগুলো জেলায় ছড়িয়ে দিতে হবে। বাংলাদেশে ৬৪ টি জেলা আছে। আরে......৬৪ সংখ্যাটির বর্গমূল ৮। কাকতালীয়ভাবে মিলে যাচ্ছে। আমি বাকি ৮টি নিউরন ৬৪ জেলার মূলে পাঠিয়ে দেওয়ার মনস্থির করে ফেলেছি। আমি একটি তালিকা তৈরি করছি মনে মনে। বাংলাদেশে ৮টি শ্রেণী গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে এমন ৮ জন প্রতিনিধির এই তালিকা। এই তোরণ দিয়ে যে ৮ শ্রেণী-গোষ্ঠীর প্রতিনিধি প্রবেশ করবে তাদের প্রত্যেকের নিউরাল নেটওয়ার্কে একটি করে নিউরন পাঠিয়ে দেবো।
সামরিক উর্দিপরা সেনারা ছড়িয়ে গিয়েছে ৬টি বিভাগে। আমাকে ছড়িয়ে পড়তে হবে গ্রামে গ্রামে। গ্রামই হচ্ছে বাংলাদেশের মূল। গ্রামের কৃষকরাই হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। গ্রামে উৎপাদিত শস্য এবং পণ্যই বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর খাবারের মূল যোগানদাতা। এই মূলেই আমাকে ছড়িয়ে পড়তে হবে। ১৯ কোটি ৬০ লক্ষ জনগোষ্ঠীকে ২০৩৪ সালের মধ্যে মূল গ্রামীণ অর্থনৈতিক শক্তিকে চিনিয়ে দিতে হবে। বসের সেরকমই নির্দেশনা। (সংক্ষিপ্ত)
লেখক আজমান আন্দালিব
- আজমান আন্দালিব -এর ব্লগ
- ৮ টি মন্তব্য
- ১৪ এপ্রিল ২০০৯, ০৭:২৪
- বিবিধ
প্রিন্ট করুন
-
সাম্প্রতিক পোস্ট
-
সাম্প্রতিক মন্তব্য





নীতিমালা
ব্লগ বই
অভিযোগ
সাম্প্রতিক পোস্ট

ফনেটিক