জীবনের প্রতিটি মুহুর্ত বেঁচে থাকার জন্য ...............।

আগস্ট
২৭

আমাদের দুর্দিনের সুহৃদ


যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি মারা গেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়ানো এই নেতার বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর। পরিবার থেকে বলা হয়েছে, এডওয়ার্ড কেনেডি মঙ্গলবার রাতে ম্যাসাচুসেটসের হাইয়ানিস পোর্টে নিজের বাসায় মারা গেছেন। তিনি ব্রেইন ক্যান্সারে ভুগছিলেন। ২০০৮ সালের মে মাসে তার ব্রেইন ক্যান্সার ধরা পড়ে।

উদার রাজনীতি, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রবক্তা এডওয়ার্ড মুর ‘টেড’ কেনেডির জন্ম যুক্তরাষ্ট্রের এক এতিহ্যবাহী রাজনীতিক পরিবারে। এই পরিবার সারাদেশের মানুষের অগাধ ভালোবাসা পেলেও দুর্ভাগ্য তাদের পিঁছু ছাড়েনি। তিনি ১৯৩২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি বোস্টনে জন্ম গ্রহণ করেন । শৈশব কেটেছে ম্যাসাচুসেটস, নিউইয়র্ক ও ফোরিডায়। শিক্ষা গ্রহণ করেছেন হার্ভার্ড ও ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়া স্কুল অব ল’তে। ১৯৫৮ সালে বিয়ে করেন ভার্জিনিয়া জোয়ান বেনেটকে। অবশ্য পরে তার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হযে যায়। পারিবারিক ঐতিহ্য অনুসারেই তার ডেমোক্র্যাট রাজনীতিতে প্রবেশ। ১৯৬০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভাই জন এফ কেনেডির প্রচারণা অভিযানের সফল ম্যানেজার ছিলেন টেড। এরপর ১৯৬২ সালে সিনেট নির্বাচনে তার জয়লাভ। এভাবেই টেড কেনেডির জীবনের রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা। ১৯৬২ সালে তার ভাই তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির ছেড়ে দেয়া সিনেট আসন পূর্ণ করতে যে বিশেষ নির্বাচন হয়েছিল, তাতেই জয়লাভ করেন তিনি। এরপর ১৯৬৪ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত টানা আটবার তিনি পূর্ণ মেয়াদে সিনেটর নির্বাচিত হন। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে তিনিই সবচেয়ে দীর্ঘকাল সিনেটর হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

টেড কেনেডির ভাই জন এফ. কেনেডি ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রেসিডেন্টদের একজন। তবে ক্ষমতায় থাকাকালেই ১৯৬৩ সালে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন তিনি। তার অপর সহোদর সিনেটর রবার্ট কেনেডি ১৯৬৮ সালে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসাবে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর সময় হওয়ার পর ডেমোক্রেটিক পার্টির ধারক-বাহক হন এডওয়ার্ড কেনেডি।

এ মার্কিন রাজনীতিক বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পশ্চিমবঙ্গে শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেন। প্রায় ৯ লাখ বাংলাদেশী শরণার্থীর দুর্দশা সম্পর্কে তিনি এ সময় সিনেটে অত্যন্ত মর্শস্পর্শী প্রতিবেদন জমা দিয়েছিলেন।
পূর্ববঙ্গে সন্ত্রাসের রাজত্ব চলছে বলে মন্তব্য করেছিলেন এডওয়ার্ড। সেইসঙ্গে পূর্ববঙ্গে মানবিক ও রাজনৈতিক দুর্দশার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানের (ইসলামাবাদ) প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন দুষ্কর্মে সহযোগিতা করার চেয়ে কোনো অংশে কম নয় বলেও কড়া সমালোচনা করেছিলেন তিনি। এডওয়ার্ড শুধু এ ইতিহাসের সাক্ষীই নন। শরণার্থীদের প্রতি বিশ্বের মনোযোগ আকৃষ্ট করা এবং তাদের সাহয্যের ব্যবস্থা করারও চেষ্টা করেন তিনি। তার এই বিদায়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ হারাল এক অকৃত্রিম সুহৃদকে। মুক্তি সংগ্রামের সেই কঠিন দিনগুলোতে তিনি স্বেচ্ছায় পাশে দাঁড়িয়েছিলেন এদেশের মুক্তিপাগল জনমানুষের। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ঘোর বিরোধিতা ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি মুক্তিকামী সাড়ে সাত কোটি অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করেননি। ঘোর বিরোধিতা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র বলে পরিচিত পাকিস্তানি সামরিক জান্তার নিপীড়নের। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত শরণার্থী শিবিরে ঘুরে ঘুরে অভয় দিয়েছেন বাঙালিদের। স্বদেশে ফিরে গিয়ে মার্কিন সিনেটে এক আবেগমথিত বক্তৃতায় তিনি বলেন, পূর্ব বাংলার মানুষ আজ হায়নার কবলে। পাকিস্তানকে দেয়া যুক্তরাষ্ট্রের জোরালো সমর্থন ও সাহায্য পূর্ব বাংলার জনগণের জন্য মানবিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয়ই ডেকে এনেছে শুধু। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও তিনি বিভিন্ন দেশে গিয়ে বাংলাদেশের শরণার্থীদের জন্য সাহায্য চেয়েছেন, বলেছেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্মম নির্যাতনের কথা। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে এডওয়ার্ড সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশে আসেন। এখানে তিনি একটি শোভাযাত্রায় অংশ নেন এবং ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ে ভাষণ দেন।

এডওয়ার্ড কেনেডি’র স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক বটগাছটি এখনও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। স্বাধীনতার প্রথম পতাকা উত্তোলক জাসদ নেতা আসম আবদুর রব জানান, তার আমন্ত্রণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে এডওয়ার্ড কেনেডি-ই একমাত্র রাজনীতিবিদ যিনি সস্ত্রীক এসে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন। তখন তিনি ওই বটগাছটি রোপন করেন। এসময় আবদুল কুদ্দুস মাখন-ও ছিলেন তাদের সঙ্গে।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সম্মান মেলেনি এডওয়ার্ড কেনেডির স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়ানো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রবীণ সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডিকে এ পর্যন্ত কোন রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানো হয়নি। কয়েকবার উদ্যোগ নেয়া হলেও তা আর ফলপ্রসূ হয়নি। গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বাংলাদেশের এ সুহৃদ মার্কিন রাজনীতিককে সম্মানিত করার উদ্যোগ নেন তৎকালীন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ড. ইফতেখার আহমদ চৌধুরী। বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবে পরীক্ষিত বিশিষ্ট বিদেশী নাগরিকদের ‘ফ্রেন্ড অফ বাংলাদেশ’ শিরোনামের একটি বিশেষ পুরস্কার প্রবর্তনের উদ্যোগ নেয়া হয়। ওই পুরস্কারের মূল্যমান নির্ধারণ করা হয়েছিল এক লাখ মার্কিন ডলার। প্রথমবারের মতো এ পুরস্কারে ভূষিত করার ক্ষেত্রে মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডির কথা ভাবা হয়েছিল। বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উদ্ধারে এ ধরনের উদ্যোগ নেয়ার কথা ভাবা হয়েছিল। এ ব্যাপারে সিনেটরের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগও নেয়া হয়। পরে দেশের পরিস্থিতি পাল্টে যাওয়ায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এ উদ্যোগ ধামা চাপা পড়ে যায়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র মতে, ফাইলবন্দি ওই প্রস্তাব নিয়ে বর্তমান সরকার এ মুহূর্তে কোন চিন্তাভাবনা করছে না। এ পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারিভাবে প্যালেস্টাইনি মুক্তি সংগ্রামের নেতা ইয়াসির আরাফাত, দক্ষিণ আফ্রিকার কিংবদন্তিতুল্য রাষ্ট্রনায়ক নেলসল ম্যান্ডেলা সহ বেশ কয়েকজনকে রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত করলেও মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে যেসব বিদেশী রাষ্ট্রনায়ক বা রাজনীতিক বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন তাদের সম্মান জানাতে কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এরকমই একজন বাংলাদেশের বন্ধু মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি গতকাল রাতে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন।

আসুন আমাদের দুর্দিনের এই সুহৃদকে চিরকাল সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করে তার আত্নার শান্তি কামনা করি।


৬টি মন্তব্য

  • ‍রানা বলেছেন ২০০৯/০৮/২৭ ১০:৩৪:২৩

    উনার জন্য দোয়া করতে পারি।

    আপনজন বলেছেন ২০০৯/০৮/২৭ ১১:৪৪:২৮

    জ্বি । তার অবদান বিশাল । ধন্যবাদ মন্তব্যের জন্য ।

  • সুমাইয়া শারমিন বলেছেন ২০০৯/০৮/২৭ ১০:৪০:০৬

    সকালে খবরে দেখলাম। খারাপ লাগছে ওনার জন্য।

    আপনজন বলেছেন ২০০৯/০৮/২৭ ১১:৪৮:৫৮

    আমাদের দেশে ক’বে এমন রাজনীতিবিদ হবেন ?

  • আফরোজ আজাদ বলেছেন ২০০৯/০৮/২৭ ১০:৫০:২৮

    দোয়া রইলো উনার জন্য

    আপনজন বলেছেন ২০০৯/০৮/২৭ ১১:৫০:৪০

    তিনি গোটা বিশ্বের মানবতাবাদী এক অনন্য নেতা ছিলেন ।



প্রথম আলো, সিএ ভবন, ১০০ কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা ১২১৫