ঝর্ণার গান

নভেম্বর
২৪

অণুগল্পঃ একটি মৃত্যু ও কিছু প্রশ্ন

গল্প


বছর পাঁচেক হল বিন্দুর বিয়ে হয়েছে। বর সুমন প্রতিষ্ঠিত ব্যাবসায়ী। এরই মধ্যে কোল আলো করে এসেছে একমাত্র মেয়ে অর্পা। শ্বশুর শ্বাশুড়ী দেবর ননদ নিয়ে ভরা সংসার ওর। দুপুরের খাবার পর্ব শেষ করে কেবল বাচ্চাকে ঘুম পাড়িয়েছে, এরই মধ্যে অস্থির ডোরবেল বেজে উঠল ডিং ডিং ডিং। কে হতে পারে? সুমন নয়তো? বিয়ের পর পর ও ঠিক সন্ধেয় বাড়ী ফিরত। সারাটা দিনের জমে থাকা কথার পাহাড় ভাঙ্গাভাঙ্গি চলত দুজনের মধ্যে। এখনও মাঝে মাঝেই ওকে সারপ্রাইজ দিতে অসময়ে এসে হাজির হয় মহাব্যাস্ত সুমন। চন্চল পায়ে গিয়ে দরজা খুলল বিন্দু।
-কি আশ্চর্য অনিতা তুই? এতদিন পরে আমার কথা মনে পড়ল বুঝি।
-ভিতরে ঢুকতে দিবি কি দিবি না বল।
-আয় আয় বাব্বা কত্তদিন পরে এলি। চুটিয়ে গল্প করা যাবেখন। আমার রুমে চল।
ওরা দুজনে সেই যে কথা শুরু করল আর শেষ হতেই চায়না। বুয়া এসে নাস্তা দিয়ে গেল। বিন্দুর স্কুলের সময়কার বান্ধবী, ভার্সিটি পর্যন্ত একসাথে পড়েছে দুজনে। সারাটা জীবন হরিহর আত্মা হয়ে ছিল। বিয়ের পর ছাড়াছাড়ি। দুজনেই ঘর সংসার নিয়ে ব্যাস্ত। গল্প করার সময় কোথায়। হঠাৎ কথার সুর পাল্টাল অনিতা। আসলে ও একটা খারাপ খবর শুনে এসেছে। -তন্ময় মারা গেছে জানিস, বলল ও।
বিন্দুর মাথায় কিছুই ঢুকল না। কোন তন্ময়? প্রশ্ন করল সে।
-আমাদের ভার্সিটির তন্ময়, তোর তন্ময়।
হঠাৎ করে মাথাটা পুরোপুরি ফাঁকা হয়ে গেল যেন। কি শুনল কিছুই বুঝতে পারছে না। স্মৃতি তাকে টেনে নিয়ে গেল বছর দশেক আগের সময়ে। চোখের সামনে সুদর্শন সদা হাস্যোজ্জল তন্ময়ের মুখটা ভেসে উঠল। এমন সুপুরুষ ছেলে ও জীবনে খুব কমই দেখেছে। যেমন দেখতে তেমনি তার ব্যাক্তিত্ব। প্রথম দেখাতেই ওকে খুব ভাল লেগে গিয়েছিল। ছয় ফিট উচ্চতার এখহারা গড়ন, সোনালী বাদামী চুল, ক্যাটস আই আর মিশুক তন্ময়কে সবাই খুব পছন্দ করতো। ভাললাগা থেকে ধীরে ধীরে ভালবাসায় রূপ নেয় ওদের সম্পর্কটা।
কতদিন দুজনে মিলে লং ড্রাইভে গেছে ঘুরতে। গান শুনতে শুনতে দুজনে কোথায় হারিয়ে যেত কোন সুদূর কল্পনার রাজ্যে। দুজনের প্রিয় গান ছিল 'যদি হিমালয় আল্পসের সমস্ত জমাট বরফ একদিন গলেও যায় তবুও তুমি আমার'। দক্ষ হাতে গাড়ী চালাত ও। এক বৃষ্টিভেজা দুপুরে পার্কে ভিজতে ভিজতে দিজনে খুব ঝগড়া বেঁধে গেল, সিরিয়াস ঝগড়া বাচ্চা নিয়ে। তন্ময়ের ইচ্ছা ওদের দুটি ফুটফুটে মেয়ে হবে আর বিন্দুর ছেলের সখ। শেষে দফা করতে চাইল একটা ছেলে আর একটা মেয়ে হবে ওদের। কিন্তু তন্ময় কিছুতেই রাজী হচ্ছিল না। শেষমেষ রেগে গিয়ে একটা চড় কষিয়ে দিল বিন্দু, ঘটনার আকষ্মিকতায় স্তব্দ হয়ে গেল তন্ময়।
কত বিবর্ন সব স্মৃতি হিরন্ময় হয়ে উঠতে লাগল ওর মানসপটে। বুকফাটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। চিৎকার করে কাঁদার কোন উপায় নেই। অভিজাত ঘরের অতি আদরের মেয়ে বিন্দু। মধ্যবিত্ব ঘরে ওর বিয়ে দিতে কিছুতেই মা বাবা রাজী হলেন না। ওর অমতে জোর করে সুমনের সাথে মেয়ের বিয়ে দিলেন। একবুক কষ্ট নিয়ে সংসার শুরু করতে হল ওকে। নতুন বিয়ে তাও অনুভূতি ছিল শূন্যতার। তন্ময়কে কোনদিনও ভুলতে পারেনি ও। এক মুহুর্তের জন্যেও না। এমনকি যেদিন অর্পার জন্ম হল সেদিনও অব্যাক্ত কষ্টের মাঝেও প্রিয়মুখটাই দেখার ইচ্ছে হয়েছিল ভীষণ। কাউকে বলেনি সে কথা, বলতে পারেনি বিন্দু।

ডাক্তার বলেছিলেন বিন্দু কখনো মা হতে পারবেনা। খবরটা শুনে দুজনে মিলে সেকি কান্না। বাচ্চার খুব শখ ছিল তন্ময়ের। ও আজমীর শরিফে গিয়ে দোয়া করা এসেছে যেন বিন্দুর মেয়ে হয়। ছোট্ট একটা ভুল করেছিল সেদিন তন্ময়। দুজনের জন্য মেয়ে চাইতে ভুলে গেছল, কেবল বিন্দুর জন্য দোয়া করে এসেছিল সেদিন। কখনো ভাবতেই পারেনি বিন্দুর কোল আলো করে আসবে অন্য কারো সন্তান। ফুটফুটে মেয়ের গর্বিত পিতা হতে চেয়েছিল সেদিন। বিধাতা ওর প্রার্থনা শুনেছিলেন আর মুচকি হেসেছিলেন সেদিন। বিন্দুর কোলজুড়ে তাই বছর না ঘুরতেই এল অর্পা আর আহত তন্ময় সেই খবরটা শুনল। তারপর কতদিন ফোনকরে মেয়েকে একনজর দেখতে চেয়েছে। বিন্দু ভয়ে রাজী হয়নি, যদি বাচ্চা নিয়ে ও চলে যায় তাহলে কি নিয়ে থাকবে বিন্দু।
তন্ময়ের মৃত্যুভয় দেখিয়েই ওকে বিয়েতে রাজী করান হয়েছিল। আর যাই হোক এই মৃত্যু ওর অসহ্য ছিল চিরকালই। ও রাজী হয়েছিল অচেনা কাউকে বিয়ে করতে শুধু তন্ময়কে বাঁচিয়ে রাখার জন্যই। আজ সব কিছু শেষ হয়ে গেল। ওর সব বিসর্জনকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে চলে গেল তন্ময়। বিন্দুর বিয়ের পর হতাশাগ্রস্থ হয়ে নেশার রাজ্যে ক্রমশ ডুবে যেতে থাকে ছেলেটা। বিয়ে করতে রাজী হয়নি কিছুতেই। বিন্দুকে রাঙাবউ বলে ডাকত। অবশেষে সৃষ্টির আমোঘ নিয়মের মত বরণ করে নিল স্বেচ্ছামৃত্যুকে। বিন্দুকে সারা জীবনের মত মুক্তি দিয়ে গেল। বিয়ের আগে বিন্দু আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল কয়েকবার, সফল হয়নি। বিজয়ীর বেশে তন্ময় চলে গেল আর সমাজের কাছে রেখে গেল কিছু প্রশ্ন। ভালবাসা বড় নাকি আভিজাত্যের অহংকার? সুখ কাংখিত নাকি স্বাচ্ছন্দ্য? জীবনের সার্থকতা প্রাপ্তিতে নাকি বিসর্জনে ? কে দেবে এর উত্তর ? সংসার শৃংখলে আষ্ঠেপৃষ্ঠে বাঁধা বিন্দুর জীবনটাই বৃথা করে দিল পাথর সময়। তন্ময়ের বহু কাংখিত অর্পাকে বুকে নিয়ে তন্ময়ের স্বপ্নের বাস্তব রূপ দিতেই যেন পৃথিবীতে রয়ে গেল বিন্দু।


৩২টি মন্তব্য

  • ‍িমলন বলেছেন ২০০৯/১১/২৪ ১৭:৫৭:৪১

    মনটাই খারাপ করে দিলেন।।
    হৃদয়ছুঁয়ে যাওয়ার মতোই, ধন্যবাদ।

    আফরোজ বলেছেন ২০০৯/১১/২৪ ১৮:০৩:২৬

    কি করবো কখনো জীবন এমনই কঠিন ... ভাল থাকবেন

  • বলেছেন ২০০৯/১১/২৪ ১৮:০১:০৫

    ছালাম নিবেন আপু।
    আশা করি ভাল আছেন।

    আফরোজ বলেছেন ২০০৯/১১/২৪ ১৮:০৪:৩৯

    ওয়ালাইকুম আসসালাম ... আমি ভাল আছি..

  • আলরাহিম বলেছেন ২০০৯/১১/২৪ ১৮:০৮:১৫

    দারুন লিখেছেন আপু।
    তবে তন্ময় বিজয়ীর বেশে যায়নি
    গিয়েছে পরাজিত হয়ে।
    মরে গেলেই সব সমস্যার সমাধান হয়না।
    ধন্যবাদ আপু।

    আফরোজ বলেছেন ২০০৯/১১/২৪ ১৮:১০:৪১

    সেটা তন্ময়কে কে বোঝাবে? ও এখন অনেক দূরের কেউ ... শুভেচ্ছা রইল

  • বদরুল ইসলাম বলেছেন ২০০৯/১১/২৪ ১৮:১৫:১৫

    ছালাম নিবেন

    আফরোজ বলেছেন ২০০৯/১১/২৪ ১৮:১৭:৩১

    ওয়ালাইকুম আসসালাম

  • নীলসাধু বলেছেন ২০০৯/১১/২৪ ১৮:১৮:৫২

    ধন্যবাদ আফরোজ ।
    সুন্দর গল্প সাজিয়েছেন ।
    ভালো লেগেছে।
    ভাল থাকুন।

    শুভেচ্ছা ।

    আফরোজ বলেছেন ২০০৯/১১/২৪ ১৮:২১:৪৬

    আপনাকেও অনেক শুভেচ্ছা

  • এস মাহবুব বলেছেন ২০০৯/১১/২৪ ১৮:৪০:৪৪

    এটা কি স্রেফ গল্প না কি বাস্তব থেকে নিয়েছেন ?

    আফরোজ বলেছেন ২০০৯/১১/২৪ ১৮:৪৮:৩৭

    এটা যাপিত জীবনের গল্প

  • সকাল বলেছেন ২০০৯/১১/২৪ ১৯:১৫:৫০

    দিদিভাই জটিল লিখেছেন
    আচ্ছা আপনি কি বিদেশে থাকেন

    আফরোজ বলেছেন ২০০৯/১১/২৪ ১৯:১৯:১২

    আমি ঢাকায় থাকি... ধন্যবাদ

  • জিয়া রায়হান বলেছেন ২০০৯/১১/২৪ ১৯:২১:৫৮

    লিখতে লিখতে লেখক ।
    বলতে বলতে বক্তা ।
    আপনার লিখা নিয়মিত চাই ।

    আফরোজ বলেছেন ২০০৯/১১/২৪ ১৯:৩২:২৩

    হা হা তারমানে আরও অনেক লিখার পর আমি লেখক হতেও পারি ... ধন্যবাদ

  • মুরুব্বী বলেছেন ২০০৯/১১/২৪ ১৯:২৪:৩৪

    ভালো লাগলো।
    শুভকামনা।

    আফরোজ বলেছেন ২০০৯/১১/২৪ ১৯:৩৩:৩১

    আপনাকেও ধন্যবাদ

  • শেখ নজরুল বলেছেন ২০০৯/১১/২৪ ১৯:২৮:০৫

    আরো ভালো ভালো গল্প চাই। ধন্যবাদ আপা।

    আফরোজ বলেছেন ২০০৯/১১/২৪ ১৯:৩৪:০৪

    লিখতে চেষ্টা করব ... শুভেচ্ছা রইল

  • আমার কবিতা বলেছেন ২০০৯/১১/২৪ ১৯:৩৯:০১

    আমার আসলে ধৈর্য কম ; অল্পতেই অস্থির হয়ে পরি ;আপনাকে ধন্যবাদ ।

    আফরোজ বলেছেন ২০০৯/১১/২৪ ২০:০০:৪১

    আমার নিজেরো ধৈর্য কম ... শুভেচ্ছা রইল

  • ফকির আব্দুল মালেক বলেছেন ২০০৯/১১/২৪ ১৯:৪৬:৫৭

    ভালো লাগল।

    আফরোজ বলেছেন ২০০৯/১১/২৪ ২০:০১:১১

    ধন্যবাদ

  • জিয়া রায়হান বলেছেন ২০০৯/১১/২৪ ২০:১৩:১২

    আপনি এখনি লেখক।
    কিন্তু চাই-
    আপনার নিয়মিত লিখা ।
    শুভেচ্ছা ।

    আফরোজ বলেছেন ২০০৯/১১/২৫ ১৪:১৭:৩১

    সময় পেলে লিখব অবশ্যই...অনেক ধন্যবাদ

  • সুজন বলেছেন ২০০৯/১১/২৪ ২০:৪৯:৩৮

    আমি পড়ার পরে মন্তব্য করবো।

    আফরোজ বলেছেন ২০০৯/১১/২৫ ১৪:১৭:৫৩

    ঠিকাছে

  • সজল শর্মা বলেছেন ২০০৯/১১/২৪ ২১:২৯:৩৩

    কত কাহিনীই চারপাশে এভাবেই ঘটে যায়। শুকরিয়া মহতরমা- স্বল্প পরিসরে পূর্ণাঙ্গ একটি গল্প উপহার দেবার জন্য।

    আফরোজ বলেছেন ২০০৯/১১/২৫ ১৪:২০:০১

    শুকরিয়া সজলদা। শুভেচ্ছা রইল

  • সারওয়ার চৌধুরী বলেছেন ২০০৯/১১/২৫ ০১:৩২:৩৯

    সংসার শৃংখলে আষ্ঠেপৃষ্ঠে বাঁধা বিন্দুর জীবনটাই বৃথা করে দিল পাথর সময়। তন্ময়ের বহু কাংখিত অর্পাকে বুকে নিয়ে তন্ময়ের স্বপ্নের বাস্তব রূপ দিতেই যেন পৃথিবীতে রয়ে গেল বিন্দু।

    আফরোজ বলেছেন ২০০৯/১১/২৫ ১৪:২১:২১

    শুভেচ্ছা রইল



প্রথম আলো, সিএ ভবন, ১০০ কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা ১২১৫