মঙ্গলবার ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৪, ১৮ ভাদ্র, ১৪২১ সাইনইন | রেজিস্টার |bangla font problem


চলুন ঘুরে আসি পুরাতন ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বিউটি বোর্ডিং থেকে এবং স্বাদ নিয়ে আসি সুস্বাদু সর্ষে ইলিশের

এখনকার বিউটি বোর্ডিং বাড়িটি ছিল নিঃসন্তান জমিদার সুধীর চন্দ্র দাসের। দেশভাগের আগে সেখানে ছিল সোনার বাংলা পত্রিকার অফিস। কবি শামসুর রহমানের প্রথম কবিতা মুদ্রিত হয়েছিল এ পত্রিকায়। দেশভাগের সময় পত্রিকা অফিসটি কলকাতায় চলে যায়। এরপর পঞ্চাশের দশকে দুই ভাই প্রদাহ চন্দ্র সাহা ও নলিনী মোহন সাহা এই বাড়ি ভাড়া নিয়ে গড়ে তোলেন বিউটি বোর্ডিং। ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ বিউটি বোর্ডিংয়ে পাকিস্তানি আর্মিদের হাতে নিহত হন প্রহাদ চন্দ্র সাহাসহ ১৭ জন। সেই সময় প্রদাহ চন্দ্রের পরিবার জীবন বাঁচাতে চলে যান ভারতে। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর ১৯৭২ সালে প্রদাহ চন্দ্রের স্ত্রী শ্রমতী প্রতিভা সাহা দুই ছেলে সমর সাহা ও তারক সাহাকে নিয়ে বিউটি বোর্ডিং আবার চালু করেন। বিউটি বোর্ডিংয়ের মুখর আড্ডা আগের মতো না থাকলেও খাবার ঘরে এখনো খদ্দেরের ভীড় লেগেই থাকে। নগরের ভোজনরসিকরা এখানে ছুটে আসেন। আর নিয়মিত খান পুরোনো ঢাকার বইয়ের মার্কেটের নানা শ্রেণীর মানুষ।

অবস্থান
বাংলাবাজার এলাকার এক নম্বর শ্রীশদাস লেনের একটি পুরোনো বাড়ির ভেতরে বিউটি বোর্ডিং অবস্থিত।

এখানে যারা আড্ডা দিতেন
বিউটি বোর্ডিং এর শুরু থেকেই এখানে থাকা-খাওয়ার চমৎকার ব্যবস্থা থাকলেও খাওয়া-দাওয়ার চেয়ে এখানকার আড্ডাটাই আকর্ষণীয় ছিল সবার কাছে। সামান্য কিছু খেয়েই ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা দেওয়া যেত। নগরের প্রধান প্রকাশনা পাড়া বাংলাবাজারে ছিল দেশের কবি, কথাসাহিত্যিক, শিল্পী, সাংবাদিক, অভিনেতা, সঙ্গীতশিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের নিয়মিত যাতায়াত। বাংলাবাজারের পাশেই বিউটি বোর্ডিং এর অবস্থান হওয়ায় আড্ডা জমে ওঠে এখানে। পঞ্চাশের দশকে নিয়মিত এই আড্ডায় যারা আসতেন তাদের মধ্যে বিখ্যাত মানুষের সংখ্যা অগণিত। এখানে যারা আড্ডার আসরে আসতেন এদের মধ্যে কবি শামসুর রাহমান, রণেশ দাসগুপ্ত, ফজলে লোহানী, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, শিল্পী দেবদাস চক্রবর্তী, সমরজিৎ রায় চৌধুরী, ব্রজেন দাস, হামিদুর রহমান, বিপ্লব দাশ, আবুল হাসান, মহাদেব সাহা, আহমেদ ছফা, হায়াৎ মাহমুদ, সত্য সাহা, এনায়েত উল্লাহ খান, আল মাহমুদ, আল মুজাহিদী, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, ড. মুনতাসীর মামুন, ফতেহ লোহানী, জহির রায়হান, খান আতা, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, সৈয়দ শামসুল হক, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, নির্মল সেন, ফয়েজ আহমদ, গোলাম মুস্তাফা, খালেদ চৌধুরী, সমর দাশ, ফজল শাহাবুদ্দিন, সন্তোষ গুপ্ত, আনিসুজ্জামান, নির্মলেন্দু গুণ, বেলাল চৌধুরী, শহীদ কাদরী, ইমরুল চৌধুরী, সাদেক খান, ড. বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, শফিক রেহমান, মহিউদ্দিন আহমেদ, আসাদ চৌধুরী, সিকদার আমিনুর হক, জুয়েল আইচ প্রমুখ।। এখানে আড্ডা দিতে আসতেন খান আতাউর রহমান, প্রবীর মিত্র, নায়করাজ রাজ্জাক।

বর্তমানে প্রহ্লাদ সাহার ছেলে তারক সাহা ও সমর সাহা দুজন মিলে বিউটি বোর্ডিং পরিচালনা করছেন । বিউটি বোর্ডিংয়ের গেট দিয়ে ঢুকতেই চোখে পড়ে সুন্দর সবুজ লন। লনের পাশে এখনো মাথা উচু করে প্রায় ১৫০ বছরের ইতিহাস,ঐতিহ্য ও অহংকার নিয়ে দাড়িয়ে আছে চিরচেনা বিউটি বোর্ডিংয়ের দোতলা ভবনটি।

সামনেই অফিস কক্ষ ও ক্যান্টিন। এ ক্যান্টিনের মত সল্প দামে চা,সিঙ্গারা,চপ,কাটলেট আশেপাশের আর কোথাও পাওয়া যেত না। এখনো এখানে যে সকল সুস্বাদু খাবার পাওয়া যায় যা অন্য কোথাও পাওয়া যায়না। ক্যান্টিনে গেলেই পুরোনো ঢাকার বাহারি খাদ্য খানা ও ঢাকার মানুষের বিচিত্র খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে ধারনা মেলে। ক্যান্টিনের ভেতর সারিবদ্ধ চেয়ার টেবিল দেখলেই বোঝা যায় যে,এখানে নিয়মিত খাওয়া দাওয়া হয়।

সর্ষে ইলিশ
এখানে রয়েছে স্টিলের বড় গোলাকার থালায় সাদা ভাত আর মাছের সমারোহ। সর্ষে ইলিশ এখানকার অন্যতম মজাদার তরকারি। এখানকার ইলিশের স্বাদ গ্রহণ করতে আসে দেশি-বিদেশি অনেকেই। ইলিশ ছাড়াও রয়েছে অন্যান্য মাছ, ডাল ও সবজি। এখানে সর্ষে ইলিশ রান্নায় মসলা কম ব্যবহার করা হয়, পেয়াজ-রসুনের ব্যবহার নেই। মাছ মুখে দিয়ে পাওয়া যাবে ইলিশের আসল স্বাদ। ইলিশের সুবাসে মনটা ভরে ওঠে। এক টুকরো মাছে পেটি আর পিঠের দুই অংশই থাকে। তাই এক টুকরোয় পুরো মাছের স্বাদই নেওয়া যায়। বিউটি বোর্ডিংএ সর্ষে ইলিশ রান্না হয় প্রতিদিন। তবে বাজারের বড় মাছ পাওয়া না গেলেও সেদিন আর সর্ষে ইলিশ করা হয় না। এখানে এক টুকরো সর্ষে-ইলিশের দাম ৬০ টাকা থেকে ৮০ টাকা। এই পদটি থাকে শুধু দুপুরের খাবারের সময়। দুপুর বারোটা থেকে বিকাল চারটার মধ্যে পাওয়া যায় এই পদটি। ইলিশ ছাড়াও এখানে থাকে বড়-ছোট নানা রকম মাছ ও নিরামিষের সমাহার।

বিউটি বোর্ডিংয়ে রাতে থাকার ব্যবস্থাও রয়েছে। যার ভাড়া ১০০ থেকে ২২০ টাকার মধ্যে।


পুরাতন ঢাকার আরও কিছু বিখ্যাত ও সুস্বাদু খাবার সম্পর্কে জানতে নিচে দেখুন

* বিউটি লাচ্ছি ফালুদা
* মানিক সুইটমিট (জনসন রোড)
* নবাববাড়ির সাচি পান
* জাফরান মিষ্টি
* ঢাকার পানীয়
৯ টি মন্তব্য
KohiNoor মেজদা২৭ নভেম্বর ২০১২, ১৬:৫৫
আমার খুব ইচ্ছা আছে একদিন সবাই মিলে বিউটি বোর্ডিং যাব।
ধন্যবাদ মাহিন আহমেদ ভাই।
kamaluddin কামাল উদ্দিন২৭ নভেম্বর ২০১২, ১৮:৫৪
এতো নাম শুনলাম, আজো যাওয়া হলো না, যাবো একদিন ।
Maeen মাঈনউদ্দিন মইনুল২৭ নভেম্বর ২০১২, ১৯:০১
হুম, বিউটি বোর্ডিংয়ে অনেক স্মৃতি লিখিত আছে বিভিন্ন মাধ্যমে। এর অবস্থান মূলত তখনকার ঢাকার কেন্দ্রস্থলে, আর আমরা আছি বিস্তৃত ঢাকায়।

অনেক তথ্যপূর্ণ একটি লেখা, সত্যিকার ব্লগীয় পোস্ট।
lnjesmin লুৎফুন নাহার জেসমিন২৮ নভেম্বর ২০১২, ০৩:১৮
তেমন একটা জানা ছিল না । তাহলে তো যেতে হবে । ততদিন আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখুক ।

ধন্যবাদ , সুন্দর একটি পোস্টের জন্য ।
abdulhairahat আবদুল হাই রাহাত ২৮ নভেম্বর ২০১২, ১৩:৫৮
সুন্দর একটি পোস্ট সেয়ার করার জন্য আন্তরিক অভিন্দন ।
RasadulHassan রাসেদুল হাসান২৮ নভেম্বর ২০১২, ২৩:০৯
ভাবছি একটা আড্ডা দিব সর্ষে ইলিশ দিয়ে শুরু করে চা,সিঙ্গারা,চপ,কাটলেট দিয়ে খতম করবো।
khanbahadur খান বাহাদুর০২ ডিসেম্বর ২০১২, ১২:৩৮
ভাই আমি আজকেই প্রথম নাম শুনলাম, পুরাতন ঢাকা আমি তেমন একটা চিনিনা, তবে আপনার পোষ্ট পড়ে আমার যেতে ইচ্ছে করছে।

ধন্যবাদ আপনাকে
jadumoni জাজাফী০৩ ডিসেম্বর ২০১২, ২৩:৩৩
কত দিন ভেবেছি ঘুরতে যাব তা আর যাওয়া হয়নি। এখানেই শামসুর রাহমান আল মাহমুদ আরো কত কত জন আড্ডা দিত। ভাবতেই কেমন যেন অন্যরকম লাগে।
arefinfathin1 ফাতিন আরেফিন০৪ ডিসেম্বর ২০১২, ১০:২৬
তথ্যপূর্ন পোস্টের জন্যে ধন্যবাদ......
ইচ্ছে হল একদিন ঘুরে আসার......
ভালো থাকবেন......।।