মঙ্গলবার ২২ জুলাই ২০১৪, ৭ শ্রাবণ, ১৪২১ সাইনইন | রেজিস্টার |bangla font problem


বিশ্বকবির শিক্ষাভাবনা



আজ ২৫ বৈশাখ । বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম জয়ন্তীতে কবির প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি । গৌতম বুদ্ধের মর্মবাণী উপলব্ধি করে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন,‘ আপনারে দ্বীপ করি জ্বালো/ দুর্গম এ সংসারেতে অন্ধকারে দিতে হবে আলো / সত্যে লক্ষ্যে অসত্যের বিঘ্ন করি দূর/ জীবনের বীণা যন্ত্রে বেসুরে আনিতে হবে সুর।’ আনন্দ,বেদনা,উৎসাহ.অনুপ্রেরণা,মানবদর্শন,শিক্ষাদর্শন,জীবনদর্শন-সবখানেই আছে রবি রশ্মির ছোঁয়া।

সক্রেটিস-প্লেটো থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক ডিউই পর্যন্ত শিক্ষাবিদদের কথা যদি আমরা চিন্তা করি তাহলে তাঁদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) অনন্য বৈশিষ্ট্যের দাবিদার। কেননা, রবীন্দ্রনাথ শুধু একটি শিক্ষাতত্ত্ব দিয়ে বিষয়টিকে পুঁথিগত রাখেননি, তা নিয়ে বাস্তবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন, তত্ত্বের প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। তাঁর শিক্ষা ও সমাজকর্মের দিকে পন্ডিতসমাজের মনোনিবেশও আমাদের দৃষ্টি এড়ায় না।


রবীন্দ্র জীবনে যখন শিক্ষার সূচনা ঘটে তখন ভারত উপমহাদেশ ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা পরিব্যাপ্ত। প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষাধারা মেকলে মডেলে সুপ্রতিষ্ঠিত। এ ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার মুখোমুখি দাঁড়িয়েই রবীন্দ্র শিক্ষাচিন্তার সূচনা। রবীন্দ্র শিক্ষাচিন্তার প্রথম প্রকাশ আমরা দেখতে পাই ১৮৭৭ সালে যখন তাঁর বয়স মাত্র ১৬ বৎসর।

তখন মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদ বধ কাব্যের একটি সমালোচনা লিখতে গিয়ে তিনি লিখেন-
‘বঙ্গদেশে এখন এমনি সৃষ্টিছাড়া শিক্ষাপ্রণালী প্রচলিত হইয়াছে যে তাহাতে শিক্ষিতেরা বিজ্ঞান দর্শনের কতকগুলি বুলি এবং ইতিহাসের সাল ,ঘটনা ও রাজাদিগের সামাবলী মুখস্ত করিতে পারিয়াছেন বটে, কিন্তু তাহাতে তাঁহাদের রুচিরও উন্নতি করিতে পারেন নাই বা স্বাধীনভাবে চিন্তা করিতেও শিখেন নাই।’

এ ‘সৃষ্টিছাড়া শিক্ষাপ্রণালী‘র তিনি মুখোমুখি হয়েছিলেন নিতান্ত শৈশবে। তাঁর জীবনস্মৃতির পাঠমাত্রই জানেন যে তাঁর সে শিক্ষালাভের অভিজ্ঞতা কী নিদারুণ, নিষ্করুণ হয়েছিল। প্রাণহীন, আনান্দহীন, যান্ত্রিক সে শিক্ষার বিড়ম্বনা তাঁর আজীবন মনোযন্ত্রণার কারণ হয়েছিল। তারপর ১২ বৎসর বয়স পর্যন্ত মাথা হেট করা বাংলা মাধ্যমের নর্মাল স্কুলে পড়ালেখা করলেও ইংরেজি বিদ্যালয়ে প্রবেশমাত্রই ঊর্ধ্বশ্বাসে পালিয়েছিলেন।

১৮২৪ সালে গণশিক্ষা বিষয়ক কমিটি ফর পাবলিক ইন্সস্ট্রাকশন গঠিত হয়। এ সময় ভারতবর্ষের ভাইসরয় হয়ে আসেন লর্ড বেন্টিঙ্ক। তিনি ভারতবর্ষের শিক্ষার বাস্তব পরিস্থিতি বুঝার জন্য উইলিয়াম এ্যাডাম কে দায়িত্ব দেন শিক্ষা জরিপের । উইলিয়াম এ্যাডাম জরিপ করে দুটি রিপোর্ট জমা দেন ১৮৩৫ ও ১৮৩৮ সালে। এ্যাডাম তার জরিপে বলেন শুধু বাংলা ও বিহার অঞ্চলেই শিক্ষার জন্য দেশজ শিক্ষাধারার এক লক্ষ বিদ্যালয় রয়েছে। অর্থাৎ তখন টোল, চুতস্পাঠী, মক্তব-মাদ্রাসা, পাঠশালা মিলিয়ে একটি সমৃদ্ধ দেশজ শিক্ষাব্যবস্থা বিরাজ করছিল। ঠিক এ সময় গভর্নর হয়ে আসেন লর্ড মেকলে।

আমরা জানি মেকলে ভারতবিদ্যা সম্পর্কে খুবই উন্নাসিক ছিলেন। তিনি মন্তব্য করেছিলেন, সারা প্রাচ্যের জ্ঞান ইউরোপের একটি বইয়ের তাকের সমান। তিনি তখন শিক্ষায় তাঁর বিখ্যাত চুঁইয়ে পড়া নীতি পেশ করে। তিনি বলেন, ভারতবর্ষের শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে এমন একশ্রেণী তৈরি করা যারা শুধু চামড়ায় হবে ভারতীয়, কিন্তু মন মানসিকতায় হবে ইউরোপীয়। শিক্ষার সুযোগ দেয়া হবে উচ্চতর শ্রেণীকে। এদের মাধ্যমে শিক্ষা নীচু শ্রেণীর মধ্যে চুঁইয়ে পড়বে।

লর্ড বেন্টিঙ্ক শিক্ষায় এ্যাডামের পর্যবেক্ষণকে গুরুত্ব না দিয়ে মেকলের নীতি কে গ্রহণ করেন। শিক্ষার মাধ্যম হয় ইংরেজী। বিদ্যার বিষয়বস্তু হয় প্রাশ্চাত্যবিদ্যা। হারিয়ে যেতে থাকে দেশজ শিক্ষাধারা। কাজী শহীদুল্লাহর ভাষায় পাঠশালা হয়ে ওঠে স্কুল । লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় মডেলে প্রতিষ্ঠিত হয় কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় । শিক্ষার উপর থেকে নীচ পর্যন্ত ঘটে ঔপনিবেশিকরণ । ভারতবর্ষের আত্মা থেকে শিক্ষার বিচ্ছেদ ঘটে। বঙ্গিমচন্দ্র পরে দু:খ করে বলেছিলেন, ‘শিক্ষিতে, অশিক্ষিতের হৃদয় বুঝে না।’ অর্থা পরগাছা শ্রেণীর ইংরেজদের কেরাণি তৈরি হতে থাকে।

রবীন্দ্রনাথ এ শিক্ষার অন্ত:সার শূন্যতা শুরুতেই ধরতে পেরেছিলেন। তাঁর কাছে শৈশবেই মনে হয়েছে এ শিক্ষা প্রাণহীন যান্ত্রিক। তিনি একে বলেছিলেন কলে ছাঁটা বিদ্যা। ফলে তিনি এ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জীবনের শুরুতেই দাঁড়িয়েছিলেন। শিক্ষা বিষয়ে তাঁর প্রথম প্রবন্ধ শিক্ষার হেরফের (১৮৯২) থেকে জীবনের অন্তিমে লেখাটি পর্যন্ত তাঁর এ মনোভাব আমরা লক্ষ করি। মেকলে শিক্ষা পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য ছিল ঔপনিবেশিক শাসন যন্ত্রের কেরানি তৈরি। যারা হবে স্বসমাজ বিচ্ছিন্ন। রবীন্দ্রনাথ শিক্ষাব্যবস্থার এ ত্র“টি তাঁর শিক্ষা বিষয়ক প্রথম প্রবন্ধেই তুলে ধরেছিলেন।

আমরা যে শিক্ষায় আজন্মকাল যাপন করি সে কেবল যে আমাদিগকে কেরানিগিরি অথবা কোনো একটা ব্যবসায়ের উপযোগী করে মাত্র, যে সিন্দুকের মধ্যে আপিসের শামলা এবং চাদও ভাঁজ করিয়া রাখি সেই সিন্দুকের মধ্যেই যে আমাদের সমস্ত বিদ্যাকে তুলিয়া রাখিয়া দিই, আটপৌরে দৈনিক জীবনে তাহার যে কোন ব্যবহার নাই, ইহা বর্তমান শিক্ষাগুণে অবশ্যম্ভাবী হইয়া উঠিয়াছে। (শিক্ষার হেরফের)

আবার যে শিক্ষাব্যবস্থা ছাঁচে গড়া কেরানি তৈরি করে তাও ভীষণ ছাঁচে গড়া, বৃত্তাবদ্ধ আর যান্ত্রিক। রবীন্দ্রনাথ এ শিক্ষাব্যবস্থার চিত্র কৌতুকপূর্ণভাবে তুলে ধরেছেন-
ইস্কুল বলিতে আমরা যাহা বুঝি সে একটা শিক্ষা দেবার কল। মাস্টার এই কারখানার একটা অংশ। সাড়ে দশটার সময় ঘন্টা বাজাইয়া কারখানা খোলে। কল চলিতে আরম্ভ হয়, মাস্টারেরও মুখ চলিতে থাকে। চারটের সময় কারখানা বন্ধ হয়, মাস্টার কলও তখন মুখ বন্ধ করেন; ছাত্ররা দুইপাতা কলে-ছাঁটা বিদ্যা লইয়া বাড়ি ফেরে। তার পর পরীক্ষার সময় এই বিদ্যার যাচাই হইয়া তাহার উপরে মার্কা পড়িয়া যায়। (শিক্ষাসমস্যা)

রবীন্দ্রনাথ ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার চারটি দিকের সমালোচনা করেছেন। সেগুলো হল-ঔপনিবেশিক শিক্ষার লক্ষ্য, বিষয়বস্তু, পাঠদান পদ্ধতি ও শিক্ষার মাধ্যম। আমরা ইতোমধ্যে উল্লেখ করেছি মেকলে-বেন্টিঙ্ক পরিকল্পিত ঔপনিবেশিক শিক্ষার মূল লক্ষ্য ছিল পশ্চিমা ভাবাপন্ন ইংরেজ দোসর হিসেবে কিছু কেরানি তৈরি করা। কিন্তু শিক্ষার উদ্দেশ্য কখনও তা হতে পারে না। শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে পরিপূর্ণ মানুষ তৈরি করা। শিক্ষা মানুষকে তার সমাজ, প্রকৃতি ও মানুষকে বুঝতে সাহায্য করবে ,লগ্ন করবে কিন্তু ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করছিল। শিক্ষার বিষয়বস্তু ছিল ইউরোপীয় জ্ঞান ।

রবীন্দ্রনাথ বিশ্বজ্ঞান ভান্ডার থেকে জ্ঞান আহরণের বিপক্ষে ছিলেন না বরং ভীষণভাবে পক্ষে ছিলেন। তাঁর আপত্তি ছিল নিজেদের না জানার। রবীন্দ্রনাথের তৃতীয় আপত্তি ছির ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা ও পাঠদান পদ্ধতির। কবি আঁর জীবন অভিজ্ঞতা থেকে বুঝে ছিলেন এ ব্যবস্থা বড় যান্ত্রিক, আনন্দহীন। তাঁর শেষ আপত্তির বিষয় ছিল শিক্ষার মাধ্যমের । বেন্টিঙ্কের সিদ্ধান্তের পর থেকে ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার মাধ্যম ছিল ইংরেজি। রবীন্দ্রনাথ সারা জীবন এর তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তাঁর মতে শিক্ষা হবে মাতৃভাষায়। আজও আমরা জানি রবীন্দ্রনাথের এ মতই বিজ্ঞানসম্মত।

রবীন্দ্রনাথ ঔপনিবেশিক শিক্ষার বিরোধিতা করেই বসে থাকেননি। প্রতিষ্ঠা করছিলেন তাঁর প্রতিকল্প শিক্ষাব্যবস্থার নজির । গড়ে তুলেছেন আশ্রম বিদ্যালয় থেকে বিশ্বভারতী।

শিক্ষা বিষয়ে তাঁর অসংখ্য প্রবন্ধ, শিশুসাহিত্য, ব্যঙ্গনাটক, স্মৃতিকথা, ডায়েরি, প্রতিক্রিয়া, সমালোচনা, অভিভাষণ, চিঠিপত্র ও ছোট গল্প রয়েছে । তার মধ্যে আমার যে কয়টি মনে পড়ছে তা হচ্ছে শিক্ষার হেরফের, ছাত্রদের প্রতি সম্ভাষণ, শিক্ষা সংস্কার, শিক্ষা সমস্যা, জাতীয় বিদ্যালয়, আবরণ, তপোবন, ধর্মশিক্ষা, শিক্ষাবিধি, লক্ষ্য ও শিক্ষা, স্ত্রী শিক্ষা, শিক্ষার বাহন, ছাত্র শাসনতন্ত্র, অসন্তোষের কারণ, বিদ্যার যাচাই, বিদ্যা সমবায়, শিক্ষার মিলন, বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপ, শিক্ষার বিকিরণ, শিক্ষার সাঙ্গীকরণ, আশ্রমের শিক্ষা, ছাত্র সম্ভাষণ, ইচ্ছাপূরণ, তোতা কাহিনী, ছাত্রের পরীক্ষা ।
১২ টি মন্তব্য
mhasan77 নাম (বাংলায়) মাহমুদুল হাসান (সুমন)০৮ মে ২০১৩, ১৮:৩৬
বাংলার কবি রবীন্দ্রনাথের ১৫২তম জন্মবার্ষিকীতে সশ্রদ্ধ প্রণতি...
UnmuktowMonir উনমুক্ত মনির ০৮ মে ২০১৩, ২২:০৬
সুমন ভাই সামনের দিনগুলিতে পাশে চাই। আশা করি পাশেই পাব।
Rabbani রব্বানী চৌধুরী০৮ মে ২০১৩, ২১:২২
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম জয়ন্তীতে কবির প্রতি আমাদের কোটি শ্রদ্ধা।

শুভেচ্ছা রইল সকল সময়ের জন্য।
UnmuktowMonir উনমুক্ত মনির ০৮ মে ২০১৩, ২২:০৪
প্রিয় রব্বানী ভাই, ধন্যবাদ, আশা করি সব সমযই পাশে পাব
UnmuktowMonir উনমুক্ত মনির ০৮ মে ২০১৩, ২২:০৭
ssangramm গোলাম মোস্তফা০৯ মে ২০১৩, ০২:১২
শুভেচ্ছা রইল
UnmuktowMonir উনমুক্ত মনির ০৯ মে ২০১৩, ১৮:৩৫
সালাম গোলাম মোস্তফা ভাই। আগামী দিনেও পাশে পাব। সেই প্রত্যাশা করছি। আপনাকে ধন্যবাদ।
rodela2012 ঘাস ফুল০৯ মে ২০১৩, ০৬:৪২
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম জয়ন্তীতে কবির প্রতি আমাদের কোটি শ্রদ্ধা।

কবি গুরুকে নিয়ে আপনার লেখা খুব লাগলো। ধন্যবাদ মনির ভাই।
UnmuktowMonir উনমুক্ত মনির ০৯ মে ২০১৩, ১৮:৩২
ধন্যবাদ । প্রিয় ঘাসফুল।
আপনার অবিরাম পাশে থাকা আমাকে উৎসাহিত করছে।
BABLA মোহাম্মদ জমির হায়দার বাবলা ০৯ মে ২০১৩, ২১:০৮
বাংলার কবি রবীন্দ্রনাথের ১৫২তম জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা।
লেখককে শ্রদ্ধা।
calvertbrett calvertbrett১৩ মে ২০১৩, ২০:২৫
Yeah, it's just what I need, I'm about to have a new one
calvertbrett calvertbrett১৩ মে ২০১৩, ২০:২৫
Yeah, it's just what I need, I'm about to have a new one