‘অবলার মুখই বল’ ...
‘অবলার মুখই বল’ বাংলা ভাষায় প্রচলিত নারীবিষয়ক এ প্রবাদটির অর্থ দাড়ায় নারী হচ্ছে অবলা বা পশুর মত, তার মুখেই শক্তি। তবে সমাজ ও বাস্তবতা তা থেকে ভিন্ন। প্রকৃত অর্থে প্রবাদটি দ্বারাও নারীকে ব্যঙ্গ করার নেতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্যণীয়। কারণ পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় শতাব্দি ধরে নারীরা পুরুষের কথা নীরবে শুনে এসেছে (মৃনাল নাথ, ১৯৯৯ পৃ: ১০৫)। প্রসঙ্গত চলে আসে ভাষার কথা। মানুষের সৃষ্টির বিমূর্ত প্রতীকগুলোর মধ্যে সেরা সৃষ্টি হলো ভাষা। এই ভাষাই মানুষকে অনন্যতা দান করেছে এবং সৃষ্টির অন্য সব কিছু থেকে করেছে বিশিষ্ট। ভাষাকে সামাজিক জীবনের একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবেও ধরা হয়। ভাষার সাথে সমাজের একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ব্যবহৃত ভাষার মাধ্যমেই সমাজ বাস্তবতার ছবি ফুটে উঠে। পৃথিবীর সব সমাজেই নারী ও পুরুষের মধ্যে যথেষ্ঠ সামাজিক ব্যবধান রয়েছে। পুরুষের অপ্রতিহত অগ্রযাত্রা আর নারীর পশ্চাৎপদ গৃহবন্দিরূপ ভাষার উপরও প্রভাব ফেলেছে। ফলে সৃষ্টি হয়েছে নারী-পুরুষের ভাষার মূল কথাই হল এর বৈচিত্র্য, দেশ কাল-পাত্রভেদে ভাষার এ বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়। এই বৈচিত্র্য যেমন একটি ভাষার সাথে অন্য ভাষার, তেমনি একটি ভাষার এক অঞ্চলের সাথে আরেক অঞ্চলের, এক সামাজিক শ্রেণীর সাথে অন্য সামাজিক শ্রেণীর, এক লিঙ্গের সাথে অন্য লিঙ্গের । এগুলোকে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের ভেদরূপ বলা হয়। এসব ভেদরূপগুলোর মধ্যে লিঙ্গ অন্যতম একটি প্রধান ভেদরূপ হিসেবে বিবেচিত। কারণ পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় ভাষা নারী-পুরুষের অবস্থানকে প্রতিফলিত করে।
নারী-পুরুষের ভাষা বিষয়ক বিভিন্ন গবেষণার দেখা যায় যে, একই সামাজিক শ্রেণীর নারী পুরুষের ভাষা ব্যবহার ভিন্নতা রয়েছে। নারীর ভাষা ব্যবহারে একান্তই এমন কিছু সহজাত বৈশিষ্ট্য থাকে যা পুরুষের ভাষায় থাকে না। যদিওবা পুরুষেরা কখনও সেটি ব্যবহার করে তখন তা হাস্যকর বলে মনে হয়। আবার পুরুষের ভাষা ব্যবহারে এমন কিছূ অভিব্যক্তি রয়েছে যা নারীরা বোঝা সত্ত্বেও কখনও বলে না। সমাজে পুরুষের শক্তিশালী অবস্থানের মত তাদের ব্যবহৃত ভাষাও শক্তিশালী। অন্যদিকে কোমলমতি নারীদের ভাষা দুর্বল ও কোমল। নারীর প্রাত্যহিক জীবনে জুড়ে দেওয়া ‘মেয়েলী’ বিশেষণ যেমন: মেয়েলী কথা, মেয়েলী আচরণ, মেয়েলী হাঁটা, মেয়েলী গল্প, মেয়েলী কাজ, মেয়েলী খেলা ইত্যাদি শব্দগুলো নারীকে প্রতিনিয়ত দূর্বল করেই গড়ে তুলেছে। নারীকে অধস্তন করার প্রক্রিয়া হিসেবে ভাষাকে ব্যবহার করা হয়েছে নানা কৌশলে। দীর্ঘ সময় ধরে প্রচলিত শব্দ, বাক্যবন্ধন, প্রবাদ-প্রবচন যেমন আছে, তেমনি সময়ের পরিবর্তনে পরিবর্তিত আচরণ প্রকাশ করার জন্য অঙ্গভঙ্গিই যথেষ্ট নয়, তার জন্য নতুন শব্দও তৈরি করেছে সমাজ। ভাষা যেমন ভাব প্রকাশের মাধ্যম, তেমনি নির্যাতনের মাধ্যমে হয়েও দাড়ায়। আমাদের সমাজে পুরুষ নারীকে নানাভাবে নির্যাতন করে থাকে। এমনকী শুধু ভাষা দিয়েও নির্যাতন করে থাকে। কবির ভাষায় :
‘হাতে যদি না মারিত
শত মারিত ঠোঁটে।’
আজ নারীকে কেবল পেশী শক্তি দিয়েই নয়, ভাষা শক্তি দিয়েও অসম্মানিত এমনকি লঞ্চিত করা হচ্ছে (নাসরীন ও শিকদার, ২০০৮ পৃ: ১৬) ।তবে সাম্প্রতিককালে নারী শিক্ষার প্রসার, নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি ইত্যাদির প্রভাবে নারীর মধ্যে বেড়েছে সচেতনতা এবং মানসিকতায় এসেছে বিরাট পরিবর্তন। ফলে সর্বত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে নারী-পুরুষ সহাবস্থান। আর এসব কিছুর প্রভাব পড়েছে ভাষা সংগঠনের উপর। ফলে নারী-পুরুষের ভাষায় এসেছে ক্রমউন্নয়ন বা পরিবর্তন।
[নারী-পুরুষের ভাষা- ১
নারীর প্রতি ভাষিক বৈষম্য
(ভাষা যেমন ভাব প্রকাশের মাধ্যম, তেমনি নির্যাতনেরও মাধ্যম)]....চলবে....
লেখক বেহালা
- বেহালা -এর ব্লগ
- ৮ টি মন্তব্য
- ০৪ ডিসেম্বর ২০১২, ১৭:২৯
- নারী
প্রিন্ট করুন
- ৮ টি মন্তব্য
-
ফেরদৌসা০৪ ডিসেম্বর ২০১২, ১৯:৩৯
তবে সাম্প্রতিককালে নারী শিক্ষার প্রসার, নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি ইত্যাদির প্রভাবে নারীর মধ্যে বেড়েছে সচেতনতা এবং মানসিকতায় এসেছে বিরাট পরিবর্তন। ফলে সর্বত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে নারী-পুরুষ সহাবস্থান। আর এসব কিছুর প্রভাব পড়েছে ভাষা সংগঠনের উপর। ফলে নারী-পুরুষের ভাষায় এসেছে ক্রমউন্নয়ন বা পরিবর্তন।
হুম , এখন বাংলাদেশের নারীরা আর অবলা না। অনেক স্বাধীন। -
মাঈনউদ্দিন মইনুল০৪ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৪৯
চমৎকার আলোচনা তুলে ধরেছেন।
তবে নারীর কাম্য অবস্থান এখনও সুদূরপরাহত।
এখনও কর্মস্থলে নারীর অবস্থান সুদৃঢ় হয় নি।
তাই আত্মপ্রসাদের সময় এখনও আসে নি।
-
সাম্প্রতিক পোস্ট
-
সাম্প্রতিক মন্তব্য





নীতিমালা
ব্লগ বই
অভিযোগ
সাম্প্রতিক পোস্ট

ফনেটিক