বুধবার ২৩ এপ্রিল ২০১৪, ১০ বৈশাখ, ১৪২১ সাইনইন | রেজিস্টার |bangla font problem


শুদ্ধ উচ্চারণ বিষয়ক বক্তৃতা : এ কোথায় অ্যা এর সূত্র - অধ্যাপক নরেন বিশ্বাস

পর্ব : ৬

এ কোথায় অ্যা


আজকে নাতিদীর্ঘ সরস বক্তৃতার ঢেউ না তুলে ভূমিকাপর্বটি একটু পাল্টে ফেললেন যতীন স্যার। একবার জোরে ‘এ’ বলোতো। পেটের থেকে আওয়াজ বেরিয়ে দেওয়ালে মেঝেতে ধাক্কা খেয়ে কেঁপে উঠলো ঘর। দাড়িগোঁফের ফাঁক গলিয়ে খুশীর ঝিলিক ছড়িয়ে পড়লো স্যারের মুখে। সেটা ধরে রেখেই বললেন, এবার তোমরা ‘অ্যা’ বলোতো ওরকম জোরের সাথে। মূহুর্তে সারা ঘর প্রকম্পিত হলো ‘অ্যা’ ধ্বনিতে।
নাক কুঁচ্কে প্রশ্ন করলেন, তোমরা কয়টি বর্ণ উচ্চারণ করলে বলতে পারবে? ফস্ করে মিনা বলে উঠলো, স্যার দুটো বর্ণ। হেসে ফেললো অনেকেই। জহির কুণ্ঠাভরে বললো, না স্যার, বর্ণ একটিই। তবে ধ্বনি দুটো। একবার ‘এ’-এর মতো করে আরেকবার ‘অ্যা’-এর মতো উচ্চারণ করলো। খুব খুশী হলেন স্যার। সামনে এগিয়ে এসে জহিরের পিঠ চাপ্ড়ে বলতে লাগলেন, বাঙলা স্বরবর্ণে ‘এ’ নামে একটিমাত্র স্বরবর্ণ আছে। কিন্তু তার দুটি উচ্চারিত রূপ আছে। কোথাও ‘এ’ বর্ণটি ‘এ’-এর মতোই অবিকৃত উচ্চারণ হয়। কিন্তু কোথাও কোথাও ‘অ্যা’-এর মতো উচ্চারিত হয়। যেমন : এক (অ্যাক) কিন্তু একটি (এক্টি)। এজন্য ‘এ’ এর উচ্চারণের ব্যাপারে প্রায়শই বিভ্রান্তি দেখা দেয়। ‘অ্যা’ আমাদের উচ্চারণে আছে, বচনে আছে, কথায় আছে, কিন্তু লেখায় নেই। তাই সমস্যা থাকবেই, তবে ‘এ’-এর উচ্চারণের বিষয়ে পাকাপোক্ত কোন বিধি বা নিয়ম আমাদের জানা নেই। কিন্তু বোঝার সুবিধার জন্য প্রাথমিকভাবে কিছু সাধারণ সূত্র বা নিয়ম আমরা দাঁড় করাতে পারি।

সূত্র এক : এ-কারের পরে যদি ই-কার, উ-কার কিংবা এ-কার থাকে, তাহলে সাধারণত পূর্বের এ-কার বিকৃত হয় না বা অ্যা-কার রূপে উচ্চারিত হয় না। যেমন
খেলা (খ্যালা) কিন্তু খেলি (খেলি)
বেলা (ব্যালা) কিন্তু বেলি (বেলি)
ঠেলা (ঠ্যালা) কিন্তু ঠেলি (ঠেলি)
দেখ (দ্যাখ) কিন্তু দেখি (দেখি)
দেখা (দ্যাখা) কিন্তু দেখুন (দেখুন)
এক (অ্যাক্) কিন্তু একটি (এক্টি)
একটা (অ্যাক্টা) কিন্তু একটু (একটু)
টেংরা (ট্যাংরা) কিন্তু টেংরি (টেংরি)
লেংড়া (ল্যাংড়া) কিন্তু লেংড়ি (লেংড়ি)
ভেংচানো (ভ্যাংচানো) কিন্তু ভেংচি (ভেংচি)
গেছে (গ্যাছে) কিন্তু গেছি (গেছি)
একটানা উদাহরণগুলো বলে একটা পান মুখে দিলেন স্যার। চোখ-বন্ধ করে চুক্ চুক্ শব্দ তুলে এক মনে চিবোতে থাকলেন পান। নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে বন্যা বললো : এ-কারের পরে এ-কার দিয়ে কোন উদাহরণ তো দিলেন না স্যার। ধ্যান ভেঙ্গে চোখ্ মেলে তাকালেন। তড়াক করে উঠেই দুলে দুলে হাঁটতে হাঁটতে বলতে লাগলেন, এ যে মেয়ে সেজে এসেছে। বন্যা তখনো বসে নি। দাঁড়িয়েই বললো, স্যার আর বলতে হবেনা। একেবারে এ-কারের বন্যা বয়ে গেছে। হাল্কা হেসে বললেন স্যার, এ-কার অ্যা-কার মিলিয়ে একটা বাক্য এবার তুমি বলো। সপ্রতিভ বন্যা সাথে সাথেই বলে ফেললো, সকাল বেলায় (ব্যালায়) খেয়ে এসেছি টেংরা (ট্যাংরা) মাছের ঝোল। হাসির বন্যার মাঝে তলিয়ে গেল বন্যার গলা। পরে কি যেন বললো শুনতে পাওয়া গেল না।

সূত্র দুই : ধাতু (ক্রিয়ার মূল) কিংবা প্রতিপাদিকে (শব্দের মূল) ই-কার কিংবা ঋ-কার ছিল, পরবর্তী ধ্বনির প্রভাবে সেই ই-কার কিংবা ঋ-কার একবার এ-কার পরিণত হলে, আর কখনো কোন অবস্থাতেই সেই এ-কার অ্যা-কারান্ত উচ্চারিত হবে না।
যেমন :
কিন্ থেকে কেনা কিন্তু ক্যানা নয়
মিল্ থেকে মেলা কিন্তু ম্যালা নয়
লিখ্ থেকে লেখা কিন্তু ল্যাখা নয়
গিল্ থেকে গেলা কিন্তু গ্যালা নয়
মিশ্ থেকে মেশা কিন্তু ম্যাশা নয়
জিলা থেকে জেলা কিন্তু জ্যালা নয়
শিখ্ থেকে শিখা কিন্তু শ্যাখা নয়
মিষ্ থেকে মেষ কিন্তু ম্যাষ নয়
পিট্ থেকে পেটা কিন্তু প্যাটা নয়
রিচ্ থেকে রেচক্ কিন্তু র‌্যাচক নয়
লিহ্ থেকে লেহন্ কিন্তু ল্যাহন্ নয়
বিদ্ থেকে বেদ্ কিন্তু ব্যাদ নয়
নী থেকে নেতা কিন্তু ন্যাতা নয়
দিশ্ থেকে দেশ্ কিন্তু দ্যাশ নয়
মিদ্ থেকে মেদ্ কিন্তু ম্যাদ নয়
চিল্ থেকে চিল্লানো কিন্তু চ্যাল্লনো নয়
মিরাজ্ থেকে মেরাজ্ কিন্তু ম্যারাজ্ নয়
কিতাব্ থেকে কেতাব্ কিন্তু ক্যাতাব নয়
সিতার থেকে সেতার কিন্তু স্যাতার নয়
বিতার থেকে বেতার কিন্তু ব্যাতার নয়
মিজাজ্ থেকে মেজাজ্ কিন্তু ম্যাজাজ্ নয়
ইন্সাফ্ থেকে এন্সাফ্ কিন্তু অ্যানসাফ্ নয়
বিয়াদব্ থেকে বেয়াদব্ কিন্তু ব্যায়াদব নয়
বিতমিজ্ থেকে বেতমিজ্ কিন্তু ব্যাতমিজ্ নয়
ইনামুল্ থেকে এনামুল্ কিন্তু অ্যানামুল নয়
ইবাদত্ থেকে এবাদত্ কিন্তু অ্যাবাদত নয়
নৃপাল্ থেকে নেপাল্ কিন্তু ন্যাপাল নয়
গরম চা কখন রাখা হয়েছিল এতক্ষণ খেয়াল করেন নি স্যার। হঠাৎ দেখতে পেয়ে থেমে গেলেন তিনি। দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে বাম হাতে চায়ের গ্লাস তুলে নিয়ে সুখ সুখ ভাব করে দিলেন লম্বা চুমুক। গ্লাসের অর্ধেক শেষ করে ঘুরে দাঁড়ালেন আবার। চা ঠাণ্ডা কি গরম তাতে কিছু আসে যায় না কখনো। গ্লাস ধরেই শুরু করলেন ফের।

সূত্র তিন : সংস্কৃত থেকে আগত শব্দ অর্থাৎ তৎসম শব্দের ক্ষেত্রে প্রায় ৯০-৯৫ ভাগ শব্দে এ-কারান্ত থাকে। কারণ সংস্কৃতে অ্যা নামক কোন ধ্বনি নেই।
যেমন
প্রেম্ কিন্তু প্র্যাম নয়
বেদ্ কিন্তু ব্যাদ নয়
মেদ্ কিন্তু ম্যাদ নয়
রেবা কিন্তু র‌্যাবা নয়
বেত্র (বেত্ত্রো) কিন্তু ব্যাত্ত্র নয়
মেধা কিন্তু ম্যাধা নয়
সেতু কিন্তু স্যাতু নয়
মেরু কিন্তু ম্যারু নয়
ধেনু কিন্তু ধ্যানু নয়
কেয়ূর কিন্তু ক্যায়ুর নয়
প্রেরক কিন্তু প্র্যারক নয়
তেজ কিন্তু ত্যাজ নয়
হেমন্ত (হেমন্তো) কিন্তু হ্যামন্তো নয়
বেগ্ কিন্তু ব্যাগ নয়
পেচক্ কিন্তু প্যাচক নয়
বেতস্ কিন্তু ব্যাতস নয়
কেতন্ কিন্তু ক্যাতন নয়
কেদার কিন্তু ক্যাদার নয়
চেতনা (চেতোনা) কিন্তু চ্যাতনা হয়
তেজস্বী (তেজোশ্শি) কিন্তু ত্যাজস্বী নয়
দেবকী (দেবোকী) কিন্তু দ্যাবকী নয়
দেবর্ষি (দেবোরসী) কিন্তু দ্যাবরসি নয়
বেনী (বেনী) কিন্তু ব্যানী নয়
ভেদ্দ (ভেদ্দো) কিন্তু ভ্যাদ্দো নয়
মেদিনী (মেদিনী) কিন্তু ম্যাদিনী নয়
মেনকা (মেনোকা) কিন্তু ম্যানকা নয়
রেবতী (রেবোতী) র‌্যাবতী নয়
শেখর (শেখর) কিন্তু শ্যাখর নয়
সেবক (সেবক) কিন্তু স্যাবক নয়

পর্ব : ১
শুদ্ধ উচ্চারণ বিষয়ক বক্তৃতা : অধ্যাপক নরেন বিশ্বাস

পর্ব : ২
শুদ্ধ উচ্চারণ বিষয়ক বক্তৃতা : আদ্য ‘অ’ এর সূত্র - অধ্যাপক নরেন বিশ্বাস

পর্ব : ৩
শুদ্ধ উচ্চারণ বিষয়ক বক্তৃতা : আদ্য ‘অ’ এর অবশিষ্ট সূত্রাবলী - অধ্যাপক নরেন বিশ্বাস

পর্ব : ৪
শুদ্ধ উচ্চারণ বিষয়ক বক্তৃতা : মধ্য ‘অ’ এর সূত্র - অধ্যাপক নরেন বিশ্বাস

পর্ব : ৫
শুদ্ধ উচ্চারণ বিষয়ক বক্তৃতা : অন্ত্য ‘অ’ এর সূত্র - অধ্যাপক নরেন বিশ্বাস

(চলবে)
৪ টি মন্তব্য
deviant_child রাহাবি০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১২, ১৪:৫২
শিখলাম, ধন্যবাদ
Kazi007 কাজী তুষার০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১২, ১৪:৫৩
sopnerferiwala স্বপ্নের ফেরিওয়ালা০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১২, ১৫:২৯
অনেক কিছু সম্বন্ধে জানতে পারলাম........ ধন্যবাদ.... আশা করি আগামিতেও এই ধরনের পোস্ট আশা করছি.... শুভকামনা রইল....
sazzad77 সাজ্জাদ হোসাইন ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১২, ১৬:১১
আয়োজন ভালো লাগলো,শিক্ষণীয়

সাম্প্রতিক পোস্ট Star

সাম্প্রতিক মন্তব্যComment