মঙ্গলবার ২১ মে ২০১৩, ৭ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২০ সাইনইন | রেজিস্টার |bangla font problem


তেপান্তরের পাথার পেরোয়

এইমাত্র ছেলে রাতুলের মৃত্যুর খবর শুনলেন শাহানারা। একটু আগে আসরের নামাজ সেরে তিনি রান্না ঘরে গেলেন রাতুলের জন্য পায়েস তৈরি করতে। তখনই এই সংবাদ। প্রথমে শোনার পর শাহানারার চারপাশ একটু দুলে উঠলেও মনে হল এটা সত্যি নয়। তিনি স্বপ্ন দেখছেন। কী যে আজেবাজে স্বপ্ন ইদানিং দেখছি! মনে মনে নিজেকে বলতে লাগলেন। তাঁর সামনে রাতুলের দুই বন্ধু যারা কিনা রাতুলের মৃত্যুর খবর নিয়ে এসেছে, খুব ধীরে ধীরে নিচু গলায় বলল কিভাবে দুর্ঘটনাটা ঘটেছে। শাহানারা স্থির চোখে সব শুনলেন। একবার মনে হল তিনি পড়ে যাবেন। বুকের ভিতর থেকে কান্না দলা পাকিয়ে উপরে উঠে আসছে যেন।কিন্তু এটা তো সত্য নয় তাই না! এটা তো দুঃস্বপ্ন। কিছুক্ষণ পর ঘুম থেকে জেগে উঠে দেখবেন রাতুল এইমাত্র ফিরে ওর পোশাক পালটাচ্ছে। বলবে, মা তুমি এই বিকেলবেলায় ঘুমাচ্ছিলে কেন? রিনি খালাদের ওখান থেকেও তো ঘুরে আসতে পারতে। -নারে, ভাবছিলাম তোর জন্য একটু পায়েস করব। কিন্তু নামাজ পড়ে একটু কাহিল লাগায় বিছানায় শুই আর কী যে আজে বাজে স্বপ্ন দেখলাম তোকে নিয়ে। আমার খুব ভয় করে। একটু সাবধানে চলতে পারিস না! এত জোরে মোটর সাইকেল চালাস তুই! রাতুল হাসবে।-মা তুমি শুধু শুধু এত টেনশন কর কেন বল তো।এই জন্যই তো এসব আজে বাজে স্বপ্ন দেখ। আমার কিচ্ছু হবে না দেখো তুমি।
রাতুলটার চেহারায় এখনও খোকা খোকা ভাব। মনেই হয়না এই দু মাস পরে তেইস পেরিয়ে চব্বিশে পড়বে। হাসলে গালে টোল পড়ে। এখনও মাঝে মাঝে শাহানারার হাতে ভাত খায়। আজ দুপুরেও তো খেল। খেতে খেতে মায়ের দুটো ছবিও তুলল মোবাইলে। -হয়েছে আর ছবি তুলতে হবে না। ভার্সিটি বন্ধ, কোথায় একটু মা’র কাছে থাকবি, তা না। সারাদিন শুধু বাইরে বন্ধুদের সাথেই ঘুরে বেড়াস। রাতুল হাসে। -চল মা, কাল তোমায় নিয়ে কোথাও থেকে ঘুরে আসি। তুমি তো বের হতেই চাওনা। শাহানারা চুপ থাকেন। আসলেই। রাতুলের বাবা মারা যাবার পর গত কয়েক বছর কোথাও তিনি খুব একটা বের হন না। চলনা মা, কাল কোথাও থেকে ঘুরে আসি। দেখো, তোমার ভাল লাগবে। -ঠিক আছে যাব।এত করে বলছিস যখন।
শাহানারা কিচেন থেকে টলতে টলতে বের হলেন। একটু আগে কি শুনলেন! কি বলছে রাতুলের বন্ধুরা! নাকি পুরোটাই তার কল্পনা। রাতুলকে নিয়ে সারাদিন খুব টেনশন হয় যে,তাই হয়তো! টেনশন হবে না কেন। রাতুল ছাড়া কে আছে তার এ দুনিয়ায়। শাহানারা তার নিজের রুমে গেলেন। আচ্ছা, রাতুলকে একটা ফোন করি। ফোন করলেই ওপাশ থেকে রাতুল ধরবে বলে তার মনে হচ্ছে। সব শুনে রাতুল বলবে, ‘মা কী যে হল তোমার। সারাদিন ঘরে থাক বলেই এ অবস্থা’। শাহানারা মোবাইল হাতে নিয়ে বসেছেন।তার হাত কি কাঁপছে? একবার নাম্বার টিপতে গিয়ে কেন জানি থেমে গেলেন। তারপর আবার কাঁপা কাঁপা হাতে টিপছেন ০১......... আস্তে করে মোবাইলটা কানে ধরলেন। রিং হচ্ছেনা কেন? কিছুক্ষন পর ওপাশ থেকে –দুঃখিত এই মুহূর্তে মোবাইল সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছেনা... শাহানারার বুকটা ধড়াস করে উঠল। একবার ইচ্ছা হল চিৎকার করে কাঁদবেন। কিন্তু কেন কাঁদবেন? রাতুলের কি কিছু হয়েছে! না না, কিছু হয়নি। কিছু হতে পারে না ওর। সবই কল্পনা, দুঃস্বপ্ন তার। ওর কেন খারাপ কিছু হতে যাবে। তবুও যেন কান্না ফুঁপিয়ে আসতে চাইছে। তাঁর চারপাশ যেন আরও বেশি দুলছে এখন। এবং হঠাৎ করে আবার সব কিছু মিথ্যা মনে হচ্ছে। না, না, আসলে কিছুই হয়নি।তাঁর বুক থেকে কষ্টটা যেন কমে আসছে আবার। এসব তো তাঁর মনের ভুল, তাই না? না হলেও রাতুলের চালাকি হবে। এসময় রাতুলের এক বন্ধু শাহানারার ঘরে এসে নিচু মাথায় বলল ‘আনটি, একটু সামনের ঘরে আসবেন। আবারও বুকটা ধড়াস করে উঠল। কিছুটা সময় যেন কিছুই ভাবতে পারছিলেন না। যন্ত্রের মত আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালেন। ধীরে ধীরে দরজা পর্যন্ত এসে থেমে গেলেন। পরদা উঠাতে সাহস হচ্ছে না। কি অপেক্ষা করছে দরজার ওপাশে? ওরা যেন কিছুক্ষন আগে কি বলে গেল রাতুল সম্পর্কে? না, না। কিছুই হয়নি। রাতুলই মনে হয় এখন ওঘরে সোফায় বসে আছে। রাতুলের তো এসময়ই ফিরে আসার কথা। পরদা উল্টালেই রাতুলকে দেখতে পাবেন। রাতুল মিটিমিটি হাসবে। মা দেখ ওদেরকে নিয়ে এসেছি। তুমি না সকালে বলেছিলে আজ বিকেলে পায়েস করবে। তাই ওদের দাওয়াত দিয়ে দিলাম। এখন জলদি দাও। রাতুলের কোন কিছুতেই তর সয়না। একেবারে বাচ্চাদের মত। আচ্ছা তাই, তিনি কপট রাগ করবেন। এভাবে মাকে ভয় পাইয়ে দিলি কেন? রাতুল জোরে হেসে উঠবে। তারপর উঠে এসে তাকে জড়িয়ে ধরবে। আমার লক্ষী মা।
তবু তাঁর হার্ট বিট এত জোরে উঠানামা করছে কেন? পরদা উলটালেই তো রাতুলকে দেখতে পাব, তাই না!হ্যাঁ, হ্যাঁ, তাই তো। তবু পর্দা উল্টাতে পারছেন না তিনি।গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। নিজেকে প্রবোধ দিতে লাগলেন। এসব মিথ্যা,এসব মিথ্যা। এসব মিথ্যা না? হ্যাঁ, এসব মিথ্যা। একটু সাহস যেন বুকে এসে ছড়িয়ে পড়ল। এক ঝটকায় পর্দা সরিয়ে বলে উঠলেন, রাতুল! কিন্তু না। বসার ঘরে ওর বন্ধুরা। কিন্তু, রাতুল কই? রিনি এখন কেন এল এ বাসায়? কে একজন অন্যজনকে বলল, লাশ তো মর্গে। ওনাকে যেতেই হবে। হঠাৎ চারপাশের পৃথিবী লাটিমের মত ঘুরতে লাগল। আর এক পা সামনে না দিতেই মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন শাহানারা। কে জানি কাকে বলছে -এই তাড়াতাড়ি পানি আন। চোখে মুখে পানি ছিটা। কিন্তু জ্ঞান অজ্ঞানের মাঝামাঝিতে তখনও তাঁর মনে হল এটা আসলে শেষ পর্যন্ত একটা দুঃসপ্নই। হ্যাঁ, দুঃস্বপ্নই। অথবা রাতুলের দুষ্টুমি। অথবা......। রাতুলটা যে কী। ও আজ আসুক। ওকে আচ্ছা করে বকে দেব। মাকে এভাবে কষ্ট দিতে আছে?
২ টি মন্তব্য
saddobesi123 ছদ্মবেশী১৪ ডিসেম্বর ২০১২, ১৮:০৬
ভালো লাগেনি বলে দুঃখিত
almasud71 আরাফাত আল মাসুদ১৪ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:০৫
ধন্যবাদ। সোজা শাপটা আপনার মতামত দিয়েছেন। এজন্যই আপনার মতামত ভাল লেগেছে। পাঠক সজাগ থাকলে লেখক আরও সচেতন হয়ে উঠার তাগিদ অনুভব করে। আপনার মতামত আমাকে লেখায় আরও মনোযোগী হয়ে উঠতে সাহায্য করবে।