বৃহস্পতিবার ০২ অক্টোবর ২০১৪, ১৭ আশ্বিন, ১৪২১ সাইনইন | রেজিস্টার |bangla font problem


“ সাবাস বাংলাদেশ; এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়; জ্বলে পুড়ে মরে ছারখার; তবু মাথা নোয়াবার নয়”



[১৫ আগস্ট ছিলো বোধনের কবি সুকান্তের জন্মদিন। দেরীতে হলেও আজ এই পোস্টের মাধ্যমে তাকে শ্রদ্ধা।]

১৯৪৭ সাল। ঐতিহাসিক এক কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে। বাংলা কবিতার সংগ্রামী কবি, বাংলা কাব্যসাহিত্যের বিরল প্রতিভা সুকান্ত ভট্টাচার্য কবি তখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ছাড়পত্র প্রকাশের আনন্দ তার কাছে তখন তেমন গুরুত্ব বহন করছে না। কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশের কয়েক সপ্তাহ আগে মাত্র ২১ বছর বয়েসে সুকান্ত অকালপ্রয়াত হন।

তবু সামান্য সময়ে তাঁর সৃষ্টি মহাকালকে স্পর্শ করতে সক্ষম হয়েছে। ‘ছাড়পত্র’, ‘ঘুম নেই’, ‘পূর্বাভাস’, ‘হরতাল’ কাব্যসমূহে সুকান্ত কখনও বিষন্ন, কখনও আশায় উন্মুখ, কখনও আঘাতে বিক্ষত, কখনও বা অপ্রকাশ্য। তবে তিনি ছিলেন আত্মবিশ্বাসী। তাঁর আত্মবিশ্বাস কখনও কখনও অহংকারস্পর্শী হয়েছে, যুক্তিও আবেগের কাছে পরাজিত হলেও বিষয়ের গভীরতা থেকে তিনি পিছুপা হননি। অন্তরবোধ শাণিত হতে যখন অপেক্ষা অবশ্যম্ভাবী তখনও তিনি অন্যের বোধকে সজোরে নাড়া দিতে সক্ষম হয়েছেন। আজও তাই প্রতিনিয়ত তাঁর কবিতা মহৎ সম্ভাবনায় সিক্ত হয়। বোধনের শূন্যতা পরিপূর্ণ করতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে।

কাব্যপ্রেমীরা সুকান্তকে ‘আশ্চর্য প্রতিভা’র স্বীকৃতি দিয়েছেন। ১৫ আগস্ট ১৯২৬ সালে কলকাতার কালীঘাটে মামার বাড়িতে সুকান্তের জন্ম। তাঁর পিতার নাম ছিল নিবারণচন্দ্র ভট্টাচার্য। মায়ের মুখে মহাভারত আর রমায়ণপাঠ শুনে সুকান্তের ছেলেবেলা সমৃদ্ধ হয়েছিল। সংস্কারমুক্ত খোলামেলা পরিবেশে সুকান্ত বেড়ে ওঠার সুযোগ পেয়ে মাত্র দশ বছর বয়সেই ছড়া লিখে বন্ধুমহলে খ্যাতি পান। স্কুলবন্ধু যশস্বী কবি অরুণাচল বসু পরে তা অকপটে স্বীকার করেছেন।

শহুরে শৈশবেও গাছ-পালা, মাঠ আর উন্মুক্ত আকাশ ছিল সুকান্তের প্রিয় অনুভব। মাত্র ১৭ বছর বয়েসে তিনি কাব্যপ্রতিভায় উজ্জ্বল স্বাক্ষর রাখেন। ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৭ সালের মধ্যে তাঁর লেখা ১৫৫টি কবিতা-ই মানুষসৃষ্ট দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ, ধর্মীয়-দাঙ্গা ইত্যাদি বিষয়বস্তুতে ঋদ্ধ। তিনি সচেতনভাবেই কবিতাগুলো বিশ্বব্যাপী সংগঠিত যুদ্ধে মানবতার অবক্ষয়রোধে নিবেদন করেছেন। ভগ্নস্বাস্থ্য উপেক্ষা করে গণ-মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাঁর কাব্যাত্মা ছিল সদা সচেষ্ট। সুকান্তের বিপ্লবসিক্ত ছন্দময় রাজনৈতিক-সামাজিক কাব্যভাষায় সে সময় অনেকেই প্রভাবিত হয়েছিলেন।

‘হে মহাজীবন আর এ কাব্য নয়/ এবার কঠোর কঠিন গদ্যে আনো.../; কিংবা ‘অবাক পৃথিবী অবাক করলে তুমি/জন্মে দেখি ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি’/; কিংবা ‘বিদ্রোহ আজ বিদ্রোহ চারিদিকে...’ ইত্যাদি স্তবকে তৎকালীন সময়ের বহমান অবয়ের বিরুদ্ধে মানুষ যেমন আন্দোলিত হয়েছিল তেমনি তদপরবর্তী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির প্রেরণাও জাগ্রত হয়েছিল।

বাংলাদেশের স্বৈরশাসন বিরোধি (১৯৮৩-১৯৯০) উত্তাল দিনগুলিতে তাঁর লেখা ‘কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি/ ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়/পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝল্সানো রুটি’ কিংবা “ সাবাস বাংলাদেশ/ এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়/ জ্বলে পুড়ে মরে ছারখার/ তবু মাথা নোয়াবার নয়” স্তবকসমূহে দেয়াললিখন বোধনের স্লোগান হয়ে গণ-আন্দোলনকে বেগবান করেছিল।

কবিবন্ধু সলীল চৌধুরীর সুরে এবং হেমন্ত মুখোপাধ্যয়ের কণ্ঠে ‘বিদ্রোহ আজ বিদ্রোহ চারিদিকে’ (রেকর্ডকাল-১৯৫০), ‘রানার’ (রেকর্ডকাল-১৯৫১), ‘অবাক পৃথিবী অবাক করলে তুমি/জন্মে দেখি ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি’ (রেকর্ডকাল-১৯৫৩), ‘ঠিকানা আমার চেয়েছো বন্ধু/ ঠিকানার সন্ধান’ (রেকর্ডকাল-১৯৭০) প্রভৃতি কবিতা গীত হওয়ার পরপরই মানুষ অন্য এক সুকান্তের সঙ্গে একাত্ম হয়।

কবিতার ভাষায় আজীবন তিনি ঘুণেধরা সামাজ পরিবর্তনের কথা বলেছেন। সাধারণ মানুষের যাপিত জীবন বর্ণনায় ‘রানার’ কবিতাটি মহাকালকে স্পর্শ করেছে। শুধু লেখায়ই নয়; পথের আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে তিনি কিশোর-বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। পথের আন্দোলনেও থেমে থাকেননি। ১৯৪৫ সালে শিশুদের জন্য সাপ্তহিক ‘স্বাধীনতা’র পাতা সম্পাদনা করেছিলেন।

সুকান্ত নীতি এবং আদর্শে ছিলেন অবিচল। তার আগুনরঙা বোধে শৌখিন কবিতার কোন প্রশ্রয়ই ছিল না। ‘ছাড়পত্র’ কবিতায় যার স্পষ্ট প্রমান মেলে।

‘এসেছে নতুন শিশু তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান;/ জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংস্তুপ-পিঠে/চলে যেতে হবে আমাদের।/চলে যাব-তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ/প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,/এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি-/নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।’

সুকান্ত ছিলেন বোধনের কবি। তার আদর্শবাক্য পৃথিবীর বহু মতবাদ এবং আদর্শের চেয়ে বড় হিসেবে অনেকের কাছে স্বীকৃত। প্রথম জীবনের তার অনেক কবিতা দলীয় স্লোগাননির্ভর হলেও তিনি দ্রুত সেই ধারা থেকে বেরিয়ে গভীর সংবেদনশীল কবিতা লেখায় মনযোগি হন। দ্রোহদীর্ঘ ভালোসাসার কবিতায়ও তিনি সফলতার পরিচয় দিয়েছেন। প্রিয়তমেষু কবিতা এর উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত-

‘...অনেক রক্তাক্ত পথ অতিক্রম করে এখানে এসে দাঁড়িয়েছি স্বদেশের সীমানায়/আজ কিন্তু নীলাকাশ আমাকে পাঠিয়েছে আমন্ত্রণ/স্বদেশের হাওয়া বয়ে এনেছে অনুরোধ/কিছুতেই বুঝি না/কী করে এড়াবো তাকে...’ ভাবতেই ভালো লাগে-এমন স্তবক।

সুকান্তের বর্ণিল কাব্যভাবনায় কবিতাবিমুখ পাঠকরাও কাবতায় ফিরতে বাধ্য হয়েছেন। আজও তিনি পাঠকের কাছে সমান জনপ্রিয়; মেহনতী মানুষের আত্মায় সমান উচ্চারিত। তবে সুকান্তের অকাল মৃত্যু বাংলা সাহিত্যের এক অপুরণীয় ক্ষতি।
১০ টি মন্তব্য
sajalchakraborty হাজারি১৬ আগস্ট ২০১০, ১৪:১৩
অশেষ শ্রদ্ধা
sknazrul শেখ নজরুল১৬ আগস্ট ২০১০, ১৪:১৬
ধন্যবাদ। কেমন আছেন?
kutubi নিজাম কুতুবী১৬ আগস্ট ২০১০, ১৫:২৪
অনেক দিন পরে। কেমন আছেন নজরুল ভাই?
sknazrul শেখ নজরুল১৬ আগস্ট ২০১০, ২১:৫৬
অনেক ভালো আছি। আপনি ভালো আছেন তো?
rubel84 রুবেল আহমদ ১৬ আগস্ট ২০১০, ১৫:৩৮
কবিকে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা জানাই ।
sknazrul শেখ নজরুল১৬ আগস্ট ২০১০, ২১:৫৬
Thanks
sknazrul শেখ নজরুল১৬ আগস্ট ২০১০, ২১:৫৯
Valo thakben
che21 চে২১১৬ আগস্ট ২০১০, ১৬:৪৫
আমার সবচেয়ে প্রিয় কবি,,,,,,,,,যার কবিতার প্রেমে আমি সর্বদা হাবুডুবু খাই,,,,,,,,,যার কবিতাই আমাকে চলার পথের শক্তি দেয়,,,,,,,,,,,,,,,,যার কবিতা গুলো আমাকে কবিতা লিখার উৎসাহ দেয়।
sknazrul শেখ নজরুল১৬ আগস্ট ২০১০, ২১:৫৯
Valo laglo shune
ujjwalldhar1 উজ্জ্বল ধর২২ আগস্ট ২০১০, ০২:৩২
যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ/প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,/এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি-/নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।’ -এমন প্রচ্ছন্ন উচ্চারণ শ্রদ্ধায় আপ্লুত করে। বারবার আশ্রয় নিতে ইচ্ছে করে এমন আদর্শের বুকে।

ধন্যবাদ। ভালো লেখায় সাথর্কতা আছে।