অ পু র কা ল বে লা (উপন্যাস)-২
(দুই)
এই অপু কদম ফুল খাবি? কিছুক্ষণ আগে গাছ থেকে পেড়ে এনেছি। ফুলের রং এখন কিছুটা নষ্ট হয়ে গেছে তবে খাওয়া যাবে। দাঁড়িয়ে রইলি যে? না হ কিছু একটা বল। নয়তো অন্য কাউকে দিয়ে দিবো। তুই আমার কাছের মানুষ তাই তোর জন্য এনেছি। আনতে কি কষ্টটাই না আমার হয়েছে ! কত বড় গাছ। তার মধ্যে অসংখ্য পিঁপড়া। তোর কথা ভেবে ঐ পিঁপড়ার কামড় আমায় কিছুই করতে পারেনি। এখন তুই ফুলগুলো নিলেই আমি চলে যাবো। আমার কত কাজ পড়ে আছে। গত তিন দিন ধরে আমার চার পুতুলের কাপড় ধোয়া হয় না। এখন গরম কাল, ঘামে কাপড় ভিজে গন্ধ হয়ে যায়।
একটা পুতুলের গত পরশু এক বাচ্চা হয়েছে। সে ময়লা কাপড় এখনো ধোয়া হয়নি। রক্তে কাপড় ভরে গেছে। ওরা তো কাপড় ধোতে পারেনা। আমি অনেকবার বলেছি নিজের কাপড় নিজেই ধোয়া ভালো। কি আর করা, এখন ক’দিন ধোয়ে দেই তারপর বলব, আমি পারবোনা। বিয়ে করেছে অথচ নিজের কাপড় ধোতে পারেনা, ইহা কি হয়? বাচ্চা তো জন্ম দিতে পারে। এই পুতুলের ইহা তৃতীয় বাচ্চা। বাপ থাকতেও নেই। বাচ্চাদের খোঁজ খবর বেশী রাখেনা। মাঝে মাঝে এসে বঊয়ের সাথে জল খেলে যায়। তাতেই একের পর এক বাচ্চার জন্ম হচ্ছে। পুতুলের নাম বানু, তার তিন বাচ্চার নাম বীণা, রিনা এবং গীতা। আমি অনেক বার বলেছি ঐ স্বামীকে আর কাছে নেওয়ার দরকার নেই। ও বলে, এবার তাই করবো। যদি আমার কাছে আসে তবে বাহিরে দাঁড়া করে রাখবো।
কদম ফুল আবার খাওয়া যায়, এমন কথা আগে অপু কখনও শুনেনি। সে পরীর এমন অবিরাম কথায় জোরে ধমক দিল। কদম ফুল ও পুতুলের ব্যাপার নিয়ে কি শুরু করেছিস? পুতুলের আবার বাচ্চা হয় নাকি, ওদের কোন সংসার আছে? পুতুল তো খেলনার জিনিস। ছোট ছেলে মেয়েরা উহা দিয়ে খেলাখুলা করে। তুই অনেক বড় হয়েছিস, তাহলে তোর কাছে পুতুল থাকে কেন? কোথায় পুতুল রেখেছিস, আজ সব পুতুল ভেঙে ফেলবো। তাই তোর সব পাগলামি চলে যাবে।
পরী অপুর মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাঁকিয়ে বলল, তুই আমার সব পুতুল ভাঙতে পারবি? ঐ পুতুলগুলো ভাঙা মানেই আমার মনটা ভেঙে ফেলা। তা তুই করতে পারবি? তোর মনে কি একটু দয়া হবে না?
-এতো ভালো করে কথা বলতে পারিস তবে মাঝে মাঝে পাগলামি করিস কেন?
-আমি আবার পাগলামি করলাম কখন, পাগলেরা কি মানুষ হয়? আমি তো মানুষ। মানুষের মতো হাত পা চোখ কান মুখ দাঁত সবই তো আছে। আসল কথাটা আবার বলি, তাহলে কদম ফুল তুই নিবি না, আমার কষ্টটা বৃথাই যাবে?
-যাবেনা, দে আমি নেবো।
-এই ল। খাইতে অনেক মজা পাবি। আমার পেট দেখ, আমিও সকালে খেয়েছি। এখনো ক্ষুধার নাম নেই। মনে হয় দুপুরেও আর কিছু খাওয়া দরকার হবে না।
-চোখে কাজল পড়েছিস কেন?
-আমি কাজল পড়বোনা তো তুই পড়বি নাকি? কাজল তো মেয়েরাই পড়ে। আর ছেলেরা তা দেখে মাতাল হয়ে যায়। মেয়েদের সাথে প্রেমের টাঙ্কি মারতে ঘুর ঘুর করে।
-তুই কোন ছেলেকে মাতাল করতে আজ চোখে কাজল পড়েছিস, এমন কেঊ থাকলে বল? আমি তোর রাজকুমারকে জোর করে ধরে নিয়ে আসবো।
-এখন বলবোনা আমার লজ্জা করছে।
-লজ্জা কোথায় থাকে রে?
-কেন নাকের ঢগায়।
-তুই দেখি সবই জানিস। আমি এখন বাড়ি যাই পরে কথা বলবো, তোর মা কেমন আছে রে? আমার কথা বলিস, সালাম দিয়েছি। আর তোর মা তোকে মনে হয় খোঁজছেন, বাড়ি যা।
পরীর বাবা নেই। মায়ের একমাত্র সন্তান পরী। অভাবের সংসারে দু-বেলা দু-মুঠো খেয়ে বেঁচে আছে। কখনো তাও জোটেনা। মা মেয়ে দুজনেই পরের বাড়ি কাজ করে যা পায় তাই দিয়ে সংসার চলে। কীসের সংসার ! যে ঘরে বেঁচে থাকার জন্য নূনতম প্রয়োজনিয় জিনিস নেই তা সংসার হতে পারে? তবুও ওদের কোন দুঃখ নেই। হায় হায় করে না। নেই নেই করতে শোনা যায় না।
ক’ দিন হয়ে গেল পরী গোছল করেনা। পরীর পড়ার মত কোন কাপড় নেই। গ্রামের বর্তমান চেয়ারম্যান সাহেব, মা ও মেয়েকে গত বৎসর এক জোড়া করে কাপড় দিয়েছিলেন, তাই ওরা এখনো পড়ছে। তা বিভিন্ন জায়গায় ছিঁড়ে গেছে। উহা পড়লে দুষ্ট ছেলেরা পরীর পানে ভোগের দৃষ্টিতে তাঁকায়। পরী ছোট না যে দৌড় দিয়ে নগ্ন ভাবে পুকুরে নেমে গোছল সারবে। পরীর চুলগুলো অগোছালো। কত দিন যেন চুলে তেল মাখানো হয় না। পরীর সুন্দর শরীরের রং কালচে হয়ে যাচ্ছে। যে সুন্দর চামরার ওপর সৃর্যের আলো প্রতিফলিত হতো এখন তা সৃর্যের আলো গ্রহণ করে।
পরীকে অপু কাপড়সহ মাঝে মাঝে অন্যান্য সহযোগিতাও করে। গরিবদেরকে কিছু দিলে ওদের কমবে না। বাবা মায়ের অজানায় অপু অনেক কিছু পরীদের বাড়িতে দিয়ে আসে। পরীর মা তখন বলেন, কেন বাবা তুমি আমাদের এসব দাও? স্রষ্টা আমাদের যা দেননি আমরা তা ছাড়াই থাকবো। এক সময়তো ভালোই ছিল, পরীর বাপ নেশায় মজে সব শেষ করেছে, আজ নেই।
এক দিন অপু পরীর বাড়িতে খাবার কিছু জিনিস দিতেছিল তখন পরীর মা বললেন, এই দেখো না গায়ের কাপড়ের কি দশা। কাপড়ের জন্য লজ্জা ঢেকেও রাখা যাচ্ছে না। আমি না হয় বুড়ো হয়ে গেছি কিন্তু পরীর জন্য তো আর এভাবে চলে না। যদি পারো তবে তার জন্য একটা কাপড়ের ব্যবস্থা করো।
অপু আর তখন কোন কথা বলতে পারল না। দ্রত নিজের বাড়িতে গিয়ে অনুকে বলল, মা এমন একটা সমস্যা, কি করা যায়? অপু কথায় অনুর থেকে ভালো কোন জবাব পাওয়া হল না। মেয়েদের দুঃখও মেয়েরা বুঝেনা। মাঝে মাঝে মায়ের প্রতি অপুর রাগ হয়। যদি মায়ের গরিব কারো সাথে বিয়ে হতো, না খেয়ে না পড়ে থাকতে হতো তাহলে বুঝতো কষ্টটা কোথায় ! হাজার টাকার শাড়ি গহনা তখন স্বপ্নের মত হতো।
অপুর বাপ ধনী হলেও অপু তো সেই পথে ঘাটের মানুষই হয়ে আছে, কোন টাকা পয়সা নেই। ভাবছে, পরীর কাপড় কেনার জন্য কোথায় টাকা পাই? এখন কী করি? যে করেই হোক পরী ও পরীর মাকে কাপড় কিনে দিতেই হবে। নয়তো পুরুষ হয়ে মায়ের জাতির ওপর অসম্মান দেখতে হবে। বাবার কাছ থেকে টাকা চেয়ে পাবে না তা জানে। দিন মুজুরি খাটবে? কিন্তুু আশেপাশের কেউতো ওকে কাজে নেবে না। তাছাড়া তা সময়ের ব্যাপার। বাপের পকেট থেকে টাকা নিবে, তা অপুর বিবেকে বাধে। ভালো কাজ ভালো দিয়েই করতে হয় নয়তো তার মূল্য থাকেনা।
সারাদিন ঘুরে অপু দিনমুজুরের কোন কাজ পেলো না। তবে কি পরী ও পরীর মাকে কাপড় কিনে দিতে পারবে না? এখানে তো পরাজয় হওয়া চলবে না। ভাবল, অনেক কাপড় দোকানদারের সাথে আমার পরিচয় আছে। তাঁদের কাছে থেকে কাপড় নিয়ে দেই, বলবো পরে টাকা দিবো। অপু তাই করল, নিজের ইচ্ছা পূরণ হল। নতুন কাপড় পেয়ে পরীর সে কি নাঁচন ! পরীর আনন্দে অপুর চোখে জল এসে গেল। পরী নতুন কাপড় গায়ে হালকা ভাবে জড়িয়ে সামনে এসে বলল, দেখতো আমায় কেমন লাগছে?
অপু দু-হাতে পরীর মুখখানি ধরে বলল, ভালো মেয়েকে ভালো কাপড়ে আরও ভালো দেখায়। কথা শুনে পরী আরও খুশি হল। বলল, আবার কখন এমন কাপড় কিনে এনে দিবি?
-তুই যখন বলবি তখনই কিনে দিবো।
-তাহলে এতো দিন এনে দেসনি কেন?
-আমি তো বুঝতে পারিনি তুই এতো বড় হয়ে গেছিস, কাপড় পড়ার বয়স হয়েছে।
-আমি এখন গোছল করবো, তারপর এই নতুন কাপড় পড়ে তোরে দেখাবো। তুই ততক্ষণ কিন্তু যাবি না।
-পরে এসে দেখে যাবো।
-না, এক্ষুণি দেখতে হবে নয়তো আমি তোর কাপড় পড়বো না।
-তুই গোছল করতে থাক আমি কিছুক্ষণের মধ্যে আবার আসছি।
চৈত্র মাস। চারদিকে খাঁ খাঁ রব। গাছগুলো পাতাহীন ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছে ওরা বড় অসহায়। ওদের পাশে কেউ নেই। পথের ধারে শুকনো পাতার আওয়াজ। মাথার ওপর সৃর্যের প্রখর তাপ। মনে অপুর অনেক ভাবনা, তবে গন্তব্য জানেনা। ধনী বাপের ছেলে হয়েও লেখাপড়া করা তেমন হয়নি। বাবা মা কেউই তেমন জোর দিয়ে পড়তে বলেনি। তাছাড়া ওকে নিয়ে তাদের কোন ভাবনাই নেই। অপু যে তাদের ছেলে, তা শুধু রক্তের ভিতরে কিন্তু মনের মাঝে নেই। বাড়ি গেলে অনু খাওয়ার কথা বলে না। কোথায় গিয়েছিলি কিংবা শরীর ভালো আছে কিনা কিছুই জানতে চায় না। নিজের ক্ষুধার তাড়নায় শুধু বাড়ি গিয়ে খেয়ে আসে অপু। তাছাড়া বাড়িতে এক মুহূর্ত থাকা হয়না। বাড়িতে ওর ভালো লাগেনা।
এতোটুকু জীবনে মায়ের গল্প অনেক শুনেছে অপু। তাদের সারিতে তো অনুর মত এমন মায়ের সন্ধান পায়নি। তবে কী এই মায়ের জন্য নতুন কিছু রচনা হবে ! কিন্তু সেই লেখকের খোঁজ কোথায় পাবে? তিনি যদি এই অনুর ধ্যান ধারনা কাছে থেকে বুঝতে ও জানতে না পারেন তবে তো সত্য কথা লেখা তাঁকে দিয়ে হবেনা। অপু তো লিখে রাখতে চায় কিন্তু লেখার ভাবটা তো ওর মাঝে নেই।
পৃথিবীতে যত কবি ও সাহিত্যিকের জন্ম হয়েছে তাঁরা মা সম্পর্কে ভালো বাণী উচ্চারণ করেছেন। তাঁদের সাধ্যে মা সম্পর্কে খারাপ কথা লেখার সাহস হয়নি। তাহলে কী অপুর মা তথা অনুর কাহিনী গোপন থাকবে? কত কষ্ট করে যে মা সন্তানদেরকে নিজের গর্ভে রাখেন। সেই মায়ের কি সন্তানের প্রতি কোন দায়িত্ব নেই? এ কেমন পরিণতি? যদি মা অনাহারে অর্ধাহারে থাকতেন তবে না হয় অন্য কথা। কিন্তু অপুর মা তো তেমন ভাবে নেই। সুখের সংসারে বসত করছে। অথচ অপুর প্রতি মা বাবা উভয়েনই নেতিবাচক দৃষ্টি। কিন্তু কেন?
সারাদিন এদিক সেদিক ঘুরে সন্ধ্যা হয়ে এলো। নিজের বাড়ি থাকতে অন্যের বাড়িতে রাত কাটানো ভালো না, এতে লোকে মন্দ বলে। অপুর তবুও থাকতে হয়। নিজের বাড়িতে ওর মন বসে না। ওখানে থাকাটা যেন বিষাক্ত মনে হয়। ভাবল, খালার বাড়ি গেলে কেমন হয় ! ওখানে অনেক দিন যাওয়া হয়না। তবে ঐ বাড়ির সকল খবরই অপুর জানা আছে। খালা ওকে খুবই আদর করেন। খালার এক ছেলে ও তিন মেয়ে। মেয়েরা সবাই অপুর বড়। বড় মেয়ে আমেনার বিয়ে হয়েছে, এখন বাকিদের জন্যও ভালো পাত্র খোঁজা হচ্ছে। অপু ওদের ছোট হলে কি হবে, ওরা সবাই অপুকেভাই বলে ডাকে। বাড়িতে গেলে ওকে নিয়ে ওদের তাড়াহুড়ি লেগে যায়, খাওয়ার সময়ও দেয় না।
খালা তখন বলেন তোরা ছেলেটাকে কি পেয়েছিস? ওরা বলে আমাদের ভাইকে আমাদের মনে যা চায় তাই করবো তুমি মা এখন যাও তো। অপু অবাক হয়ে ওদের কথা শুনে। ভালোই তো লাগে ওদের সাথে মজা করতে।
এখানেই সন্ধ্যা হয়ে গেল তাহলে যাবে কিভাবে? যাক, একটু পড়েই তো আকাশের বুক জুড়ে জোছনা উঠবে তাছাড়া রাস্তা দিয়ে এখনও অনেক লোক যাতায়াত করছে। এই পথ অপুর জানা শোনা। চোখ বুজে যেতেও সমস্যা হবে না। আগে কতবার যাওয়া হতো। আমির যখন বেঁচে ছিল তখন তো অপু সারাদিন ওদের বাড়িতে থাকতো। তিন বোনের পর আমিরের জন্ম। একমাত্র ভাইকে সবাই অনেক আদর করতো। আমির অপুর সামান্য ছোট হলেও দেখতে বড় দেখাতো।
সারাদিন দু-ভাই মিলে খালে বিলে গিয়ে মাছ ধরতো। মাছ কি আর ধরা যায়, যেন এক আনন্দে বেলা পার। গায়ের কাপড় কাদায় ভরে বাড়ি ফিরতো। খালা বলতেন আমার বুকের মানিকরা কি মাছ ধরে নিয়ে এলো? যদি দু-ভাই মিলে ভালো মাছ পেতো তবে দৌড়ে আমির আগে ওর মায়ের কাছে গিয়ে দেখাতো আর যদি মাছ না পেতাম তবে অপুকে আগে বাড়ি যেতে বলতো।
ওরা দুজন একাই বিছানায় ঘুমাতো। শীতের সময় এক লেপের ভিতরে দুজন থাকতো। কখনো লেপ বাদ দিয়ে নিজেদের লুঙ্গি গায়ে জড়িয়ে ঘুমাতো। রাতে লেপ খুঁজে পাওয়া যেতোনা। ভাবতো, কোথায় গেল লেপ? বিছানায়েই তো ছিল। কোন ভূতের আছর পড়ল না তো?
আমির একটু ভীতু ছিল। সে রাতে কোন দিন বাহিরে বের হতোনা, এমন কি পেচ্ছাব করার জন্যও না। যদি অপু যেতো তবে তার সাথে মাঝে মাঝে বের হতো। অপু তো আবার আলাদা ধরনের লোক। রাতের অন্ধকারের সাথে কথা বলে। রাত গভীর হলে হঠাৎ অপুকে বিছানায় পাওয়া যাবে না। হয়তো উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে নয়তো পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে আকাশের তারা গুনছে কিংবা অন্ধকারের মাতামাতি করছে। একদিন রাতে আমির বলল, তুই এতোক্ষণ কোথায় ছিলি?
-পাগলদের কোন ঠিক ঠিকানা থাকে না।
-তুই তো পাগল না, তোর ভাবটা পাগল।
-আগামী কাল এক জায়গায় খাওয়ার দাওয়াত আছে যাবি?
-কোথায়, তোদের বাড়িতে?
-আরে না। এক পরিচিত মেয়ের বাড়িতে, সে তার বিয়ের দাওয়াত দিয়েছে। নাম মিতা।
-এ কোন মিতা রে?
-ঐতো তোদের গ্রামের উত্তর পাশের শেষ বাড়িটা তাদের।
-তুই তো দেখি মাগার জটিল পোলা। ঐ ধনী লোকের মেয়ের সাথে তোর আবার ভাব হল কেমনে?
-যোগ্যতা লাগে, আমার যোগ্যতা আছে বলেই হয়েছে। তোর অবশ্য সে যোগ্যতা নেই। যে ছেলে ভূতের ভয়ে রাতে বাহিরে বের হয়না তার দ্বারা মেয়ের সাথে সম্পর্ক করা সম্ভব না। মেয়েদের সাথে কথা বলার আগেই তোর ডান পায়ের সবগুলো আঙ্গুল কাঁপতে থাকবে।
-বাজে কথা রাখ, ওর সাথে তোর কেমনে ভাব হল তাই বল?
-একদিন মিতা আমাদের গ্রামে এক আত্মীয় বাড়ি বেড়াতে যায়। সেখানেই ওর সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয়। মিতা গোছল করতে নেমেছে পুকুরে, হঠাৎ এক কুকুড় এসে ওর শুকনো কাপড় কামড় দিয়ে নিয়ে দৌড়ায়, আর এদিকে ওতো নেমেছে পুকুরে, শরীর ভেজা। আমি আবার ঐ পথ দিয়ে যাচ্ছিলাম। মিতার ডাকাডাকিতে সব বুঝলাম। পরে ওর কাপড় উদ্ধার করে ফিরিয়ে দেই। সেই থেকেই পরিচয়।
-তোর ভাগ্যটাই ভালো, অমন সুযোগ আমার কপালে হবেনা।
-হবে কেমনে, তুই তো কুকুড়ের ঘেউ ঘেউ শুনে ভয়ে কাপড় উদ্ধার করতিনা। তুই তো শিয়াল দেখেও ভয় পাস।
-তুই সত্যি বলেছিস, আমি কুকুরকে খুব ভয় পাই। যদি কামড় দেয় তখন আবার নাভির কাছে একে একে চৌদ্দটা সূচ ঢুকাতে হবে। আমি তার আগেই মরে যাবো। তবে কবে কখন শিয়াল দেখে ভয় পেয়েছিলাম?
-প্রমাণ দেখবি?
-হ দেখবো।
-তাহলে আজ রাতেই প্রমাণ হয়ে যাবে।
আমির জানে অপু যা বলে তাহা করেই ছাড়ে। তাই সে নিজের মাঝে কিছুটা ভয় পেলো। শিয়াল ব্যাপার বাদ দিয়ে অন্য প্রসঙ্গে কথা বলল অপু। খালা এসে বললেন, তোরা কি সারা রাত গল্পই করবি, ঘুমাবিনা? অপু বললাম আজ কোন ঘুম হবেনা, আজ শিয়ালের খেলা হবে। খালা বললেন, কীসের শিয়াল?
অপু বলল, ও তুমি বুঝবে না, যে বুঝার তাকে আজ বুঝাবো। খালা চলে গেলেন। খালার তিন মেয়ে আগেই ঘুমিয়েছে। আঁধার রাত। আমির ও অপু ঘুমে কিছুটা অচেতন। তবে অপু অচেতন হলেও গুপ্ত অচেতন। ধীরে ধীরে অপু বিছানা ছেড়ে উঠোনে গেল। অপু আবার নিজের মুখে শিয়ালের মত ডাকতে পারে। ওরা যে ঘরে শুয়েছে তা পাটখড়ি দিয়ে বেড়া, মাঝে মাঝে ভাঙা ফাঁকা আছে। অপু খেয়াল করল খালা খালু ও বোনেরা সবাই গভীর ঘুমে আছে।
প্রথমে বেড়ার কাছে গিয়ে শব্দ করল, যে কেউ মনে করবে মাটি খুড়া হচ্ছে। তারপর শিয়ালের মত ডাকাডাকি। তারপর ঘরে চকির নিচে গিয়ে হুঙ্কার দিতে লাগলাম।
আমিরের ঘুম ভেঙে গেল। আমির ভাবলো, চকির নিচে কীসের শব্দ হয় ! শিয়াল কি চকির নিচে আসতে পারে ! দরজা তো বন্ধই আছে। তাহলে কি ভূত এলো? অপুকে না পেয়ে আমির কাঁদবে না কি করবে ভেবে পেলো না। রাতের প্রতিজ্ঞা কথা মনে করল, অপু যদি করে তবে কেন চকির নিচে? এমন কিছূ ভেবে আমির বারেবার নিজের বুকে থুঁ থুঁ দিতে লাগলো। সব ভয় ফেলে আমির ওর মাকে ডাকলো।
অপু চকির নিচ থেকে বের হয়ে বলল, ভয় দেখাতে পেরেছি তো?
খালা এসে দরজায় কাছে ডাকছেন, কি হয়েছে রে আমির? অপু বলল, কিছু হয়নি খালা, কোন স্বপ্ন হয়তো ও দেখেছে তাই। অপু এক গ্লাস জল আমিরকে দিল। সে এক টানে তা খেয়ে ফেললো। সকালে উঠেই আমির অপুকে বলল, তুই না আজ বিয়েতে যাবি বললি, তা কখন যাবি?
-ভাবছি যাবো কিনা?
-তুই না যাস তবে তোর বদলে আমায় পাঠিয়ে দে।
-তোকে দিয়ে কি আর আমার কাজ হবে? কত যে হবে তা তো রাতেই বুঝা গেল।
-দেখ অপু,তুই কিন্তু আমায় অপমান করছিস।
জেরিন এসে বলতেছে তোরা আবার কি নিয়ে ঝগড়া করছিস? খেতে আয় মা ডাকছে। জেরিন আমিরের তিন বোনের মধ্যে ছোট। ওর নাকটা একটু লম্বা। চোখটা কবির চোখে কবিতার ভাবনায় যেমন দেখায় তেমন, মানে হরিণির মত। হরিণির মত কোন মেয়েদের চোখ হতে পারে নাকি ! হরিণির চোখ দেখতে কেমন? এই কথা সব কবিরা বলে থাকেন। কিন্তু কেউ সত্যিকারে ভেবে দেখেন না। জেরিন একটু নীরব ধরনের, ও তেমন বেশী কথা বলে না প্রয়োজন ছাড়া কারো সাথে।
দু-ভাই মিলে মিতার বিয়েতে যাচ্ছে। খালি হাতে গেলে কি চলে? ওসব ভাবনা অপুর করা আছে। পকেটে টাকা নেই তবুও মিষ্টি কেনা হয়ে যাবে। তবে একটা বুদ্ধি খাটাতে হবে। তবে যেতে হবে বর পক্ষের সাথে। বর পক্ষ যে মিষ্টি নিয়ে যাবে তা ওরা ছিনিয়ে নিবে। আমির ভুরু কুঁচকে বলল, তা কেমনে সম্ভব?
অপু বলল, চল আমার পিছে পিছে।
বরের বাড়ি কিছুটা দূরে মিতা অপুকে আগেই বলেছে। ভাঙা রাস্তা তাই বর পক্ষের লোকেরা মিতাদের বাড়ির কাছের পথটুকু হেঁটে আসবে। ওরা তাদের সাথে মিশে যাবে, যার কাছে মিষ্টির ব্যাগ তার সাথে মিল দিলেই কাজ হয়ে যাবে।
মূদু অন্ধকার। অপু এক বুড়ো লোককে বলল, দাদা মিষ্টির ব্যাগটা আমার হাতে দেন আপনি কেন কষ্ট করে নিবেন? তিনি অপুকে না চিনেই মিষ্টির ব্যাগ হাতে দিলেন। কিছু দূর তিনির সাথে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে অপু পিছিয়ে পড়ে। বর পক্ষ সামনে আর অপুরা পিছনে। ধীরে ধীরে অন্য রাস্তা দিয়ে মিষ্টি নিয়ে দ্রত মিতার বাড়িতে হাজির হল ওরা দুজন। বাড়িতে বিয়ের আমেজ চলছে। রাস্তায় ছিল ওরা দুজন সাধারণ সার্ট গায়ে আর পরে পড়েছে ভিন্ন সার্ট। বর পক্ষ ওদেরকে চেনার উপায় নেই।
বাড়িতে কোথাও মিতাকে পাওয়া গেল না। তবুও অপু লাজ শরম ফেলে বাড়ির পেছনে সামনের মানুষদেরকে জিঙ্গাসা করে মিতার খবর জানতে চাইল। এক লম্বা মেয়ে শরীরে নেই এক খন্ড মাংস, নাম তনু। সে অপুকে বলল, আরে অপু ভাই আপনি এখানে কেমনে এলেন? চলেন একটু গল্প করি।
অপু তনুর কথার কোন জবাব না দিয়ে শুধু জানতে চাইল, মিতা কোথায় কোন ঘরে আছে? তনু হাত দিয়ে দেখিয়ে দিলো। অপুকে দেখেই মিতা অবাক হয়ে বলল, আপনি এসেছেন আমি খুব খুশি হয়েছি। আমি জানতাম আপনি আসবেন।
-এতো বিশ্বাসের কারণ?
-আপনি কথা দিয়ে কথা রাখেন।
ওদের দুজনকে মিতা আলাদা ঘরে বসতে দিল। আমির ঘরে বসে রইলো না, সে তনুর কাছে গেল। আমিরের ভাব দেখে অপু বলল তুই ওর কাছে যাস না, ও মেয়ে হিসেবে ভালো না। ওর সম্পর্কে আমি অনেক জানি।
-কি জানিস বল, নয়তো আমি যাবোই। কি সুন্দর রুপ ওর ! হয়তো একটু হালকা, তাতে তেমন সমস্যা না।
-আরে রুপ দেখেই কি পাগল হইলি ভিতরটা তো দেখা হয়নি।
-ভিতরটা আমার দরকার নেই আমি ওর সাথে ভাব করবই। তুই যা মিতার সাথে গল্প কর আমি আমার কাজে যাই।
তনুর প্রতি অপুর অনিহার এক কারণ আছে। তনুর স্বভাব ভালো কিনা জানে না। তবে সে নিজেকে মেলাতে সামান্য দ্বিধা করেনা। একদিন ওকে নিয়ে অপু কিনা বিপদে পড়েছিল। অপুর কাছে প্রকৃতি দেখতে ভালো লাগে। তাই মাঝে মাঝেই নদীর ধারে বসে বিস্তর জলরাশি দেখে কিংবা পথ ধরে গাছ গাছালির পানে তাঁকিয়ে থাকে। গাছের সাথে কথা বলে, গাছও ওর কথায় সাড়া দেয়। অপু আম গাছের কাছে আম চাইলে তা পাই, কাঁঠাল গাছের কাছে কাঁঠাল চাইলেও সে দেয়।
তখন দুপুর গড়ায়নি। সৃর্যটা মাথার ঠিক উপরে তীর্জক ভাবে আছে। অপু এক লিচু গাছের নিচে বসে ওপরে হা করে তাঁকিয়ে আছে। অনেকক্ষণ হয়ে গেল মুখের মধ্যে লিচু পড়ছেনা। অপুবিরক্ত হয়ে গাছের গোড়ায় ক’টা লাথি দিচ্ছিল, তাতে বরং ও নিজেই আঘাত পেলো। ভাবল, আগে তো কখনো এমন হয়নি। গাছেরা কি ফল দেওয়া বাদ দিয়ে দিল ! অপু ভাবনা বেড়ে গেল।
ঐ পথ দিয়েই যাচ্ছিলো তনু। তনু তো মুক্ত মেয়ে। মা মরা। বাপ থাকতেও নেই। ও যেখানেই যায় কোন পিছু টান নেই। কেউ খোঁজ নেবেনা। বরং কোথাও দুটো খেতে পেলেই হলো। গাছের সাথে অপুর রাগারাগি দেখে তনু বলল কিরে পোলা, গাছের সাথে লেগেছিস কেন? আমার সাথে আয়, তখন দেখেবি কে পায়।
তনুর কথা শুনে অপুর রাগ আরও বেড়ে গেল। বলল তুমি কে? তোমার কাজে তুমি যাও আমার কাজে হাত দিতে হবেনা।
আমি তনু, অন্যের কাজে হাত দেওয়াই আমার কাজ, তোর কাজে হাত দিতেও আমার খুব ইচ্ছে করছে। এই দেখ আমার হাত কেমন নড়াচড়া করছে। তোকে ধরতে চায়, ধরতে দিবি?
অপু গাছের সাথে ঝগড়া বাদ দিয়ে এবার তনুর সামনে এসে দাঁড়াল। তনু মুখে পান পুওে দিয়ে চিবাচ্ছে। আর মুখ থেকে জর্দার গন্ধ বের হচ্ছে। গন্ধটা অপুর খুবই ভালো লাগছে। যদিও ও অন্য সময় জর্দার গন্ধ সহ্য করতে পারে না। অপু বললাম আরও পান আছে?
-না, যাকে সরে যেতে বললি তার হাতের পান খেতে চাস কেন?
-আচ্ছা পান চাইনা এখন তুমি যাও।
তনু সেলোয়ার কামিজ পড়া ছিল। ওড়না বুক থেকে সরিয়ে তনু তা নিজের কোমড়ে শক্ত করে বেঁধে নিল। অপু নিজের চোখ ঘসতে ঘসতে উহা দেখছে। হঠাৎ তনু গর্জে অপুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। অপুর পিঠ গিয়ে পড়লো শুকনো পাতার উপর। মেয়েদের কখনো এতো শক্তি হয় নাকি? কোন ভাবেই নিচ থেকে অপু উঠতে পারল না। পা দুটোকে এমন ভাবে আটকিয়েছে যে ছাড়ার উপায় নেই। অপু বুঝতে পারল নিজের পায়ের তলা কাঁপছে। অপু ক্ষমা চাইল। তনু বলল আমি ছাড়ার বান্দা নই। যাকে ধরি তার থেকে কিছু নিয়ে ছাড়ি। তাছাড়া তুই মালটা মাগার খারাপ না।
অপু শরীরের সব শক্তি দিয়ে হুঙ্কার করে তনুকে ছিটকে দিল। তনু লিচু গাছের সাথে ধাক্কা খেলো। অপু দ্রত দৌড়াতে থাকে আর পেছনে পেছনে তনু ওকে ধরতে মরিয়া।
মিতারা মধ্যম শ্রেণীর ধনী। যে ছেলের সাথে মিতার বিয়ে আগে তাকে মিতা দেখেনি, শুধু বাপের মতামতে রাজি হয়েছে। শুনেছে গ্র্যাজুয়েট পাস করা, কোথাও চাকুরি করে
মিষ্টি ছাড়াই বর পক্ষ বিয়ে বাড়িতে হাজির হল। আশেপাশে ছোট ছোট অন্যান্য দোকান থাকলেও কোন মিষ্টি দোকান না পেয়ে ফিরে আসে। নিজেদের মান বাঁচাতে মিষ্টি হারানোর কাহিনী সব খুঁলে বলেন। আড়াল থেকে অপু সব শুনে মুছকি হাসে।
বিয়ের পর্ব শুরু হয়ে গেল। বরকে এখনও অপুর ভালোভাবে দেখা হয়নি। ছেলে মেয়েকে এক ঘরে নেওয়ার সময় অপু নিজের মাথায় হাত দিয়ে ভাবল, আরে ওতো সেই চোর। আমাদের গ্রামে এক মুরগি চুরি করার সময় ধরা পড়েছিল। আমিও মেরেছিলাম, ওর পিঠে একটা থাপড় দিয়েছিলাম। তাতে আমিই ব্যাথা বেশী পেয়েছিলাম। চোরদের শরীর নাকি অনেক শক্ত। কথা সত্য, ফলাফলও পেয়েছিলাম।
মিতার বরের নাম আবির। সে অপুকে খেয়াল করেনি। নিজেকে দেখানোর জন্য আবিরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল অপু। তবুও আবিরের মাঝে কোন ভাবনার উদয় হল না। স্বাভাবিক ভাবে অপুর সাথে কথা বলল। অপু ভাবল, আমার কি ধারনা ভুল? ভূল হবার কথা না তো ! তাহলে কি আবির দেখেও না দেখার ভাব করছে বিয়ের জন্য? চোরদের আবার অনেক বুদ্ধি থাকে। ওরা পাতিলের উল্টো পিঠে চাল ভাজি করে খায়। চাল ভাজি যদি বেশী পুড়ে যায় তবে বুদ্ধি বেড়ে যায়। এভাবে অন্য কেউ চাল ভাঁজতে পারে না।
বিয়ে যেহেতু হয়ে গেছে তাই আর মিতাকে কথাটা বলা ঠিক হবেনা, এমনটা ভাবল অপু। পরে এক সময় বলা যাবে। আমিরকে বিয়ের আসরে পাওয়া গেলেনা। হয়তো জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছে তনুর সাথে। যে মেয়ের খপ্পরে আমির পড়েছে আজ মেয়ে কি জিনিস ও বুঝাবে। না আবার আমিরের নতুন প্যান্টটা তনু খুঁলে নিয়ে যায় !
মিতার কাছ থেকে পরে তনুর ব্যাপারে সব জানল অপু। যা ভেবেছিল সব উল্টো। তনু খুবই সাধারণ একটা মেয়ে। ছেলেদের সাথে অমন দুষ্টামি করাই ওর কাছে ভালো লাগে তবে খারাপ কাজ করে না। একা মেয়ে তো। ওর কি ছেলেদের সাথে আড্ডা দিতে ইচ্ছে করে না ! ওর তো একটা মন আছে। কোন ছেলের সাথে তা মিলাতে চায়। হয়তো সমাজ গ্রহণ করে না।
মিতার বিদায় পর্ব শেষ হয়ে গেল। এমন সময় আমিরকে অপু খুঁজতেই দেখল, ও খুশি খুশি মনে ওর দিকে আসছে। ওর খুশি মানে খবর খারাপ না তো? আবার তনুকে ও কিছু করলো না তো? অপু বললাম, কিরে তুই এলি বিয়ের অনুষ্ঠানে অথচ তোকে পাওয়া যাচ্ছে না। কোথায় ছিলি এতোক্ষণ? তোর কথা তো মিতা জানতে চাইলো। আমি মিথ্যে বলেছি, বলেছি সে হয়তো কোথাও কোন ছেলের সাথে আড্ডা দিতেছে।
-মিথ্যেটা বেশী হয়নি, ঐ ছেলের জায়গায় মেয়ে বসালেই হল।
-আচ্ছা চল এখন বাড়ি যাই। মিতাকে বিদায় দেওয়া হয়েছে।
রাতে অপু আর আমির বাড়ি গিয়েই শুয়ে পড়ল। রাতে আমিরের বিষণ জ্বর হল। পেটেও ব্যাথা। অপু ভাবল নিশ্চই বিয়ে বাড়িতে বেশী খাওয়ায় এমন ফলাফল হয়েছে। তেল জাতীয় খাবারের জন্য হজমে গন্ডগোল হচ্ছে। অপু কিছু কবিরাজি জানত, কিন্তু তখন কিছুই মনে পড়ল না। কোন গাছে কি হয় কিছুই জানা নেই। ক্রমেই আমির ব্যাথায় বোনেরাসহ ওর মা বাবা বলে চিৎকার করছেন।
অনেকদিন আগে অপুদের গ্রামে এক নাঁচ ও গানের অনুষ্ঠানে গিয়ে জেনেছিল। যে কোন ঔষধের বোতলেই সামান্য জল কিংবা শরবত নিয়ে সেই বোতল ঝাঁকি দিয়ে পায়ের তলায় ঘসা দিয়ে উত্তরমুখী হয়ে খেলেই একটু পরে সকল ব্যাথা ভালো হয়ে যায়। অপুর চিন্তাকিছু দূর হল। খালাকে বলল কোন ঔষধসহ বোতল কিংবা খালি বোতল আছে নাকি?
খালা বোতল এনে দিলেন। অপু তা সেই পদ্ধতিগত ভাবে আমিরকে খাওয়াল। কোন কাজ হলনা। আবার চিন্তায় পড়ে গেল। আশে পাশে তো কোন ডাক্তারও নেই। অপু ঘরের বাহিরে গেল। নিজেই বিভিন্ন গাছের পাতা সংগ্রহ করে একত্রে মিশিয়ে রস বের করে খাওয়াল। অপু জানেনা ওই সব গাছের পাতার কাজ কি। শুধু শান্তনা দেওয়ার জন্যে। তাৎক্ষণিক ভাবে আমিরের ব্যাথা কমে গেল। খালার কান্নার মাঝে খুশির ভাব দেখা গেল।
সকালে অপু নিজ বাড়িতে চলে গেল। তিন দিনের মাথায় আমিরের আবার সেই ব্যাথা শুরু হল। অপুকে খবর দেওয়া হল। সে যাওয়ার আগেই আমিরের ব্যাথা চিরতরে শেষ হয়ে যায়। আমির মারা যায়। আমির ছিল অপুর একমাত্র কাছের বন্ধুু। তার সাথেই অপু সব দুঃখ সুখ শেয়ার করতাম। তারপর দুই বৎসর হয়ে যায় এ মাঝে দু-ঘন্টার জন্য একবার ওদের বাড়িতে যাওয়া হয়েছিল অপুর।
আজ আবার যাচ্ছে। রাস্তা দিয়ে অনেক মানুষ যাচ্ছে বিভিন্ন কাজ সেরে কিন্তু অপুর কোন নিদিষ্ট কাজ নেই। মন চাইছে খালার বাড়ি যাবো তাই যাত্রা। আবার হয়তো অর্ধেক পথে গিয়েই মন না চাইলে ফিরে আসতে পারে। পেটে হালকা ক্ষুধা কিন্তু পকেটে চকলেট খাবার পয়সাও নেই। এভাবে কি কেউ কোন আত্মীয় বাড়ি যায়? মুখে কিছুটা লেগে আছে তিল বাটার অংশ, তা জিহ্ব্ াদিয়ে চাটছে অপু। একেবারে ফকিরি দশা। আসলে অপু সত্যিকারের ফকির। আজকাল ফকিরেরা বেশী ধনী, তাঁদের আয় রোজগার চাকুরি করা থেকে বেশী। আগে যেখানে দোকানদার দশ টাকা ভাঙতি করে থালায় রাখতো, আর সারাদিন যত ফকির আসতো কাউকে দশ পয়সার বেশী করে দিতো না। কিন্তু যুগের সাথে সবই পাল্টেছে। এখন আর ফকিরেরা দু-টাকার নিচে ভিক্ষা নেয় না। যদি কম দেওয়া হয় তবে ফকিরেরা ধমক দিয়ে পয়সা ছুঁড়ে চলে যায়। নিজের মান বাঁচাতে দু-টাকাই ভিক্ষা দেয় দোকানদাররা কিংবা পথিকরা।
দেশের আনাচে কানাচে অনেক ফকির মিসকিন আছে তাঁরা নিজের এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় গিয়ে অন্য বেশে ফকিরি ব্যবসা করে। ওদের হাতে আবার আধুনিক মোবাইল ফোন থাকে। সময় পেলেই অন্য সবার আয়ের খোঁজ খবর নেয়। রাতে দুটো হাই পাওয়ারের ব্যাথা নাশক ট্যাবলেট খেলেই হল, পরের দিন আবার কাজে লেগে যায়। ঐ সব ফকিরদের অনেকের বাড়ির অবস্থা ভালো তবুও তাঁরা এই পেশা ছাড়ে না।
অনেক কথা ভেবে অপুর মনটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। খালার বাড়ি যাবে কিনা দ্বিধায় পড়ে গেল। সব ভাবনা ফেলে খালার বাড়িতে উপস্থিত হল অপু। আমেনা এসেছে ক’দিন হল। ও গর্ভবতি। স্বামী আমেনাকে তেমন ভালোবাসেনা, শুধু নিজের ভালোবাসায় সংসার টিকিয়ে রেখেছে। অনেক দিন পর তিন বোনের সাথে অপু দেখা হল। আমেনা অপুকে ছোট ভাই ভাবলেও বাকি দুজন ওর সাথে হাসি তামাশায় ব্যাস্ত থাকে।
অপু আমিরের ঘরে গিয়ে শুয়ে আছে। ওর পড়ার বইগুলো এখনো টেবিলের ওপর সাঁজানো আছে। ছাত্র তেমন ভালো না হলেও সব কিছু সাঁজিয়ে রাখতো। ঘরের মাঝে কোথাও মাকরশার বাসা খোঁজে পাওয়া যেতো না। খালা এসে বললেন, তুই এসেছিস ভালো হয়েছে, আগামী কাল জামেলাকে দেখতে ছেলে পক্ষ আসবে। আমেনার বিয়েতে তুই এলিনা। যদি মেয়ে দেখে ছেলের পক্ষরা পছন্দ করে তবে কাবিন করে যাবে।
অপু বলল, শুধু কাবিন কেন বিয়ে পড়াতে আসবে না? ছেলে সম্পর্কে সব জেনেছেন? কি করে কোথায় থাকে বাড়ির অবস্থা কেমন ইত্যাদি সব।
-অত সব কি জানা যায়। তবে ছেলেকে তোর খালু দেখেছে। দেখতে নাকি অনেক ভালো, লম্বা, সুন্দর।
-ওভাবে তো দেখলে হবেনা, ছেলের ধ্যান ধারনা কেমন তাই আসল ব্যাপার। কালো ধলো ছেলের ক্ষেত্রে দরকার নেই। আমেনা আপাকে তো সুন্দর ছেলের সাথে বিয়ে দিয়েছেন কোন কিছু না জেনেই, তাতে কি সুখ হয়েছে তার? সুখ ঐ সুন্দরে আসেনা। আমেনা আপা তো আমার কাছে এসে কান্না করল। ওর স্বামী নাকি আবার বিয়ে করতে চায়।
-কই আমাকে তো কিছু বলেনি।
-আপনার কাছে বললে তো আপনি চিন্তা করবেন তাই বলেনি। দুলা ভাই যদি আসে তবে তাঁকে অন্য ভাবে বলে বুঝাবেন, তিনি যেন আপনি বুঝাচ্ছেন তা বুঝতে না পারেন। আচ্ছা টাকা পয়সার ব্যাপারে কোন কথা হয়েছে, কোন দেনাপাওনা?
-তেমন কিছু কথা হয়নি তবে তুই যেহেতু এসেছিস সব বলিস।
রাতের খাবার খেয়ে অপু শুতে গেল। কীসের ঘুম ! দু-চোখে যেন দুনিয়ার ভাবনা ভর করছে। এতো ভাবনা কীসের ! অপুর তো কোন ভাবনা থাকার কথা নয়। ওর না আছে বাড়ির চিন্তা, না আছে সংসারের চিন্তা। যেখানে পায় সেখানে খায়। প্যান্ট সার্ট দু-টো পড়েছে সপ্তাহ হয়ে যায়, বদলানোর নাম নেই। গোছল করলেও সেই ছোট বেলার নিয়মে করে। আমার গোছল হয় সন্ধ্যার পর কোন পুকুরে নেমে।
একবার আমি পুকুর পাড়ে লুঙ্গি খূঁলে গোছল করতে নেমেছে অপু। কাজ সেরে দেখে লুঙ্গি নাই, মহা বিপদে পড়ে গেল। কে নিতে পারে ! আশেপাশে তো কাউকে দেখা গেল না। তাহলে কি ভূতের আসর পড়লো ! অপু সামনের অবস্থা দু-হাত দিয়ে ঢেকে এদিক সেদিক খুঁজতেই হঠাৎ দেখে এক কুকুড় এক গাছের নিচে নিয়ে তার ওপরে শুয়ে আছে। যাক বাবা বাঁচা গেল, নয় মান বাঁচা নিয়ে দায় হতো।
অপু বিছানা ছেড়ে উঠোনে বাহির হল। খালা বুঝতে পারলেন কেউ উঠোনে এসেছে। বললেন কে উঠোনে?
-আমি অপু খালা।
-আবার উঠেছিস কেন? এখন অনেক রাত কোথাও যাস নে আবার। ঘুমিয়ে পড়।
-ঘুম আসছেনা, খালা স্কুল মাঠ থেকে হেঁটে আসি। একটু পরেই ফিরে আসবো।
চারদিক নীরব। আজ ঝি ঝি পোকাগুলো ডাকা বাদ দিয়েছে। তারাই তো রাতটাকে কিছুটা হলেও জাগিয়ে রাখে। স্কুলটা আমিরদের বাড়ির একটু উত্তর দিকে। দু-মিনিট হাঁটলেই স্কুল। স্কুল হিসেবে মাঠটা অনেক বড়। এখানে একটা কলেজের মত জায়গা আছে। অথচ প্রাইমারিটাও ভাঙাচূড়া ভাবের, মাধ্যমিকের আশাও করা যায় না। এই স্কুলটা অনেক পুরানো, সেই কোন কালে কোন জমিদার জায়গা দিয়েছিলেন। স্কুলের দেয়ালের ইটগুলো খসে পড়েছে। দেয়ালের ভাঙার ফাঁকাগুলো এক একটা দরজা হয়ে গেছে, তাই এখন ছাত্রদের আর দরজা দিয়ে যেতে ও বের হতে হয় না।
অপু স্কুলের চারপাশে হাঁটছে। মনে হয় স্কুল পরিদর্শনে এসেছে। এতো রাতে এমন ভাবে স্কুল দেখার কোন মানে হয় ! দেয়ালের ফাঁকায় হাত দিতেই একটা ইটের খন্ড অপুর হাতে পড়ল। উহ্ কি ব্যাথা ! অপু তবুও ভিতরে গিয়ে পড়ার টেবিলে চিত হয়ে কিছুক্ষণ ঘুমের তালে শুয়ে রইল। এখন অন্য কোন ভাবনা নয়। এখন অপু স্কুলে পড়ে। সে হাফ প্যান্ট সার্ট ও সেন্ডেল পড়ে স্কুলে এসেছে। পড়ার ফাঁকে ঘুমাচ্ছে। শিক্ষক অপুকে এসে বলছেন, এই অপু ইহা স্কুল ! কোন ঘুমানোর জায়গা নয়। ঘুমাতে চাও তো বাড়িতে গিয়ে ঘুমাও, এখানে কেন সবাইকে সমস্যা করছো?
অপু বলল, স্যার আপনি পড়ান আমি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে পড়া শুনবো। ঘুমিয়ে পড়ার মজাই আলাদা। তাতে স্বপ্ন দেখা ও বই পড়া উভয়ই হয়। আপনি যদি কখনো এমন না করে থাকেন তবে আমার সাথে শুয়ে পড়েন।
স্যার বললেন, আমি শুয়ে থাকলে পড়াবে কে?
অপ বলল ঠিক বলেছেন, দায়িত্বশীল শিক্ষকরা ছাত্রছাত্রীদের পড়া নিয়ে ভাবেন। আপনাকে আমার মত পড়তে হবেনা, বরং পড়ান।
তিন চার জন ছাত্র মিলে আমাকে পেছনের বেঞ্চে শুয়ে দিল, আমি ঘুমের তালে সবই বুঝতে পারছি। আর স্যার তো পড়াচ্ছেনই। স্যার পড়াচ্ছেন, থাকবো নাকো Ÿদ্ধ ঘরে/ দেখবো এবার জগৎটাকে/ কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগন্তরের ঘূর্ণিপাকে।
অপু বলল, স্যার আমি ঘুমের যুগান্তরে আছি, অন্য কোথাও খুঁজতে হবেনা। স্যার তবুও ছাত্রদের পড়াচ্ছেন, স্যার অনেক ধর্য্যশেীল। স্যার আগামী কালের জন্য পড়া দিলেন, নীল নব গগণে আষাঢ় গগণে/তিল ঠাঁই আর নাহিরে/ওগো আজ তোরা যাসনি ঘরের বাহিরে।
অপু বলল, স্যার, আমি বাহিরে যাইনি ঘরের ভিতরেই আছি। এবার আর স্যার ধর্য্যেশীল হতে পারলেন না। সব কিছুর একটা সীমানা আছে। তিনি রাগে টেবিলের ওপরে রাখা বেত দিয়ে অপুকে জোরে জোরে পেটাতে লাগলেন।
অপু চিৎকার করে উঠে বেঞ্চের ওপর বসল। স্যার তো নেই, তাহলে কে আমায় পেটাতে ছিলেন ! পিঠে হাত দিয়ে দেখল উঁচু নিচু। তবে কি সত্যি স্যার আমায় পিটিয়েছেন? তিনি আমায় মারবেন কেন? আমি তো আর এখন স্কুলে পড়ি না।
অপু ভিতরে এদিক সেদিক তাঁকালো। কই, কেউতো নেই এখানে ! ভাবল আর এখানে থাকা ঠিক হবেনা। কোন ভূতের আছর পড়েছে নিশ্চই। কিন্তু আমি তো কোন ভুত ও শয়তানকে ভয় পাইনা, আমার কাছে তো ওরা আসেই না।
হঠাৎ বাহিরে যেন কীসের চিৎকার দৌড়া দৌড়ি হচ্ছে। শব্দটা হচ্ছে স্কুল ঘরের পশ্চিম দিকে। অপু কিছুক্ষণ ভিতরে চুপ করে বসে থাকল। ক্্রমেই শব্দটা আরও কাছে আসছে স্কুলের দিকে। অপুর মনে ক্ষীণ ভাবনার উদয় হল। সে বের হয়ে স্কুলের বারান্দায় দাঁড়ালা। ক’জন লোক এসে ওকে ধরে ফেলল। সবাই মধ্য বয়স্ক হবে ! ওরা চিৎকার করে বলল, চোর ধরেছি। শালার বেটা বহু খেয়েছিস এবার পেয়েছি। সাথে সাথে অপুকে ঘুসি কিল কয়েকটা বসিয়ে দিলো।
অপু বলল, আরে ভাই আমি চুরি করবো কেন? আমি তো এখানে হাঁটছি। রাতে হাঁটা আমার অভ্যোস। ভবিৎষতে ডায়েবেটিস হওয়ার ঝুঁকি কম হবে।
লোকগুলো বলল, এই সুযোগে চুরিও করা হয় তাই না?
অপু রাগে বলল, দেখেন আর একবার যদি ঐ কথা মুখে উচ্চারণ করেন তবে বত্রিশটা করে তিন জনের ছিয়ানব্বইটা দাঁত তিন ঘুসি দিয়ে খুঁলে ফেলব কিন্তু।
ওদের একজন বলল কি, চুরি করেও গলা বাড়িয়ে কথা?
অপু আর সহ্য করতে পারল না। মোটা লোকটাকে নায়ক জসিমের মত এক ঘুসি মারতেই তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন। তারপর চিকন লোকটাকে দিতে এগুতেই সে দৌড় দিলো। বাকি লোকটা অপুকে পেছন থেকে জাপটে ধরল। এখন কিভাবে পেছনেরটাকে আঘাত করতে হবে তা অপু জানে, সিনেমা দেখে শিখেছে। তাছাড়া কিছুদিন ক্যারাতও শিখেছিল, আজ বুঝি তার ব্যবহার হল, আরও হবে। অপু পেছন থেকে ধরা লোকটাকে পেট বরাবর নিজের পা বাঁকা করে বসিয়ে দিল। লোকটা বাবা বলে উহ্ করল। তিন জনেই লুঙ্গি অর্ধ খোঁলেই দৌড়াতে থাকে।
মানুষের কোালাহল শুনে খালা বাহিরে এলেন। দেখলো তখনো অপু শুতে যায়নি। ছেলেটা কোথায় গেল, কোন বিপদ হলনা তো ! যে জন্যে বললাম রাতে বাহিরে যাওয়া ভালো না। কে শুনে কার কথা, এমনটা খালা বললেন।
খালা কয়েকবার অপুর নাম ধরে ডাকলেন। শেষ ডাকে সাড়া দিয়ে বলল, এই তো আমি খালা। খালা বললেন, কোথায় ছিলি এতোক্ষণ, কীসের এতো আনাগোনা রে? আমি বললাম, কার বাড়িতে যেন কি চুরি হয়েছে আর তার জন্য আমায় ধরেছিল।
খালা আগ্রহ নিয়ে বলেন, তারপর আসলি কেমনে? আমি খালাকে বুঝিয়ে সব বললাম।
খালা বলেন, তুই কি যে করিসনা ! এতো রাতে আবার কেন স্কুল মাঠে যেতে হবে? সারাদিন কত সময় পড়ে থাকে তখন বসে থাকিস কোন সমস্যা হবেনা। আচ্ছা এখন গিয়ে ঘুমা অনেক রাত হয়েছে।
এই অপু কদম ফুল খাবি? কিছুক্ষণ আগে গাছ থেকে পেড়ে এনেছি। ফুলের রং এখন কিছুটা নষ্ট হয়ে গেছে তবে খাওয়া যাবে। দাঁড়িয়ে রইলি যে? না হ কিছু একটা বল। নয়তো অন্য কাউকে দিয়ে দিবো। তুই আমার কাছের মানুষ তাই তোর জন্য এনেছি। আনতে কি কষ্টটাই না আমার হয়েছে ! কত বড় গাছ। তার মধ্যে অসংখ্য পিঁপড়া। তোর কথা ভেবে ঐ পিঁপড়ার কামড় আমায় কিছুই করতে পারেনি। এখন তুই ফুলগুলো নিলেই আমি চলে যাবো। আমার কত কাজ পড়ে আছে। গত তিন দিন ধরে আমার চার পুতুলের কাপড় ধোয়া হয় না। এখন গরম কাল, ঘামে কাপড় ভিজে গন্ধ হয়ে যায়।
একটা পুতুলের গত পরশু এক বাচ্চা হয়েছে। সে ময়লা কাপড় এখনো ধোয়া হয়নি। রক্তে কাপড় ভরে গেছে। ওরা তো কাপড় ধোতে পারেনা। আমি অনেকবার বলেছি নিজের কাপড় নিজেই ধোয়া ভালো। কি আর করা, এখন ক’দিন ধোয়ে দেই তারপর বলব, আমি পারবোনা। বিয়ে করেছে অথচ নিজের কাপড় ধোতে পারেনা, ইহা কি হয়? বাচ্চা তো জন্ম দিতে পারে। এই পুতুলের ইহা তৃতীয় বাচ্চা। বাপ থাকতেও নেই। বাচ্চাদের খোঁজ খবর বেশী রাখেনা। মাঝে মাঝে এসে বঊয়ের সাথে জল খেলে যায়। তাতেই একের পর এক বাচ্চার জন্ম হচ্ছে। পুতুলের নাম বানু, তার তিন বাচ্চার নাম বীণা, রিনা এবং গীতা। আমি অনেক বার বলেছি ঐ স্বামীকে আর কাছে নেওয়ার দরকার নেই। ও বলে, এবার তাই করবো। যদি আমার কাছে আসে তবে বাহিরে দাঁড়া করে রাখবো।
কদম ফুল আবার খাওয়া যায়, এমন কথা আগে অপু কখনও শুনেনি। সে পরীর এমন অবিরাম কথায় জোরে ধমক দিল। কদম ফুল ও পুতুলের ব্যাপার নিয়ে কি শুরু করেছিস? পুতুলের আবার বাচ্চা হয় নাকি, ওদের কোন সংসার আছে? পুতুল তো খেলনার জিনিস। ছোট ছেলে মেয়েরা উহা দিয়ে খেলাখুলা করে। তুই অনেক বড় হয়েছিস, তাহলে তোর কাছে পুতুল থাকে কেন? কোথায় পুতুল রেখেছিস, আজ সব পুতুল ভেঙে ফেলবো। তাই তোর সব পাগলামি চলে যাবে।
পরী অপুর মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাঁকিয়ে বলল, তুই আমার সব পুতুল ভাঙতে পারবি? ঐ পুতুলগুলো ভাঙা মানেই আমার মনটা ভেঙে ফেলা। তা তুই করতে পারবি? তোর মনে কি একটু দয়া হবে না?
-এতো ভালো করে কথা বলতে পারিস তবে মাঝে মাঝে পাগলামি করিস কেন?
-আমি আবার পাগলামি করলাম কখন, পাগলেরা কি মানুষ হয়? আমি তো মানুষ। মানুষের মতো হাত পা চোখ কান মুখ দাঁত সবই তো আছে। আসল কথাটা আবার বলি, তাহলে কদম ফুল তুই নিবি না, আমার কষ্টটা বৃথাই যাবে?
-যাবেনা, দে আমি নেবো।
-এই ল। খাইতে অনেক মজা পাবি। আমার পেট দেখ, আমিও সকালে খেয়েছি। এখনো ক্ষুধার নাম নেই। মনে হয় দুপুরেও আর কিছু খাওয়া দরকার হবে না।
-চোখে কাজল পড়েছিস কেন?
-আমি কাজল পড়বোনা তো তুই পড়বি নাকি? কাজল তো মেয়েরাই পড়ে। আর ছেলেরা তা দেখে মাতাল হয়ে যায়। মেয়েদের সাথে প্রেমের টাঙ্কি মারতে ঘুর ঘুর করে।
-তুই কোন ছেলেকে মাতাল করতে আজ চোখে কাজল পড়েছিস, এমন কেঊ থাকলে বল? আমি তোর রাজকুমারকে জোর করে ধরে নিয়ে আসবো।
-এখন বলবোনা আমার লজ্জা করছে।
-লজ্জা কোথায় থাকে রে?
-কেন নাকের ঢগায়।
-তুই দেখি সবই জানিস। আমি এখন বাড়ি যাই পরে কথা বলবো, তোর মা কেমন আছে রে? আমার কথা বলিস, সালাম দিয়েছি। আর তোর মা তোকে মনে হয় খোঁজছেন, বাড়ি যা।
পরীর বাবা নেই। মায়ের একমাত্র সন্তান পরী। অভাবের সংসারে দু-বেলা দু-মুঠো খেয়ে বেঁচে আছে। কখনো তাও জোটেনা। মা মেয়ে দুজনেই পরের বাড়ি কাজ করে যা পায় তাই দিয়ে সংসার চলে। কীসের সংসার ! যে ঘরে বেঁচে থাকার জন্য নূনতম প্রয়োজনিয় জিনিস নেই তা সংসার হতে পারে? তবুও ওদের কোন দুঃখ নেই। হায় হায় করে না। নেই নেই করতে শোনা যায় না।
ক’ দিন হয়ে গেল পরী গোছল করেনা। পরীর পড়ার মত কোন কাপড় নেই। গ্রামের বর্তমান চেয়ারম্যান সাহেব, মা ও মেয়েকে গত বৎসর এক জোড়া করে কাপড় দিয়েছিলেন, তাই ওরা এখনো পড়ছে। তা বিভিন্ন জায়গায় ছিঁড়ে গেছে। উহা পড়লে দুষ্ট ছেলেরা পরীর পানে ভোগের দৃষ্টিতে তাঁকায়। পরী ছোট না যে দৌড় দিয়ে নগ্ন ভাবে পুকুরে নেমে গোছল সারবে। পরীর চুলগুলো অগোছালো। কত দিন যেন চুলে তেল মাখানো হয় না। পরীর সুন্দর শরীরের রং কালচে হয়ে যাচ্ছে। যে সুন্দর চামরার ওপর সৃর্যের আলো প্রতিফলিত হতো এখন তা সৃর্যের আলো গ্রহণ করে।
পরীকে অপু কাপড়সহ মাঝে মাঝে অন্যান্য সহযোগিতাও করে। গরিবদেরকে কিছু দিলে ওদের কমবে না। বাবা মায়ের অজানায় অপু অনেক কিছু পরীদের বাড়িতে দিয়ে আসে। পরীর মা তখন বলেন, কেন বাবা তুমি আমাদের এসব দাও? স্রষ্টা আমাদের যা দেননি আমরা তা ছাড়াই থাকবো। এক সময়তো ভালোই ছিল, পরীর বাপ নেশায় মজে সব শেষ করেছে, আজ নেই।
এক দিন অপু পরীর বাড়িতে খাবার কিছু জিনিস দিতেছিল তখন পরীর মা বললেন, এই দেখো না গায়ের কাপড়ের কি দশা। কাপড়ের জন্য লজ্জা ঢেকেও রাখা যাচ্ছে না। আমি না হয় বুড়ো হয়ে গেছি কিন্তু পরীর জন্য তো আর এভাবে চলে না। যদি পারো তবে তার জন্য একটা কাপড়ের ব্যবস্থা করো।
অপু আর তখন কোন কথা বলতে পারল না। দ্রত নিজের বাড়িতে গিয়ে অনুকে বলল, মা এমন একটা সমস্যা, কি করা যায়? অপু কথায় অনুর থেকে ভালো কোন জবাব পাওয়া হল না। মেয়েদের দুঃখও মেয়েরা বুঝেনা। মাঝে মাঝে মায়ের প্রতি অপুর রাগ হয়। যদি মায়ের গরিব কারো সাথে বিয়ে হতো, না খেয়ে না পড়ে থাকতে হতো তাহলে বুঝতো কষ্টটা কোথায় ! হাজার টাকার শাড়ি গহনা তখন স্বপ্নের মত হতো।
অপুর বাপ ধনী হলেও অপু তো সেই পথে ঘাটের মানুষই হয়ে আছে, কোন টাকা পয়সা নেই। ভাবছে, পরীর কাপড় কেনার জন্য কোথায় টাকা পাই? এখন কী করি? যে করেই হোক পরী ও পরীর মাকে কাপড় কিনে দিতেই হবে। নয়তো পুরুষ হয়ে মায়ের জাতির ওপর অসম্মান দেখতে হবে। বাবার কাছ থেকে টাকা চেয়ে পাবে না তা জানে। দিন মুজুরি খাটবে? কিন্তুু আশেপাশের কেউতো ওকে কাজে নেবে না। তাছাড়া তা সময়ের ব্যাপার। বাপের পকেট থেকে টাকা নিবে, তা অপুর বিবেকে বাধে। ভালো কাজ ভালো দিয়েই করতে হয় নয়তো তার মূল্য থাকেনা।
সারাদিন ঘুরে অপু দিনমুজুরের কোন কাজ পেলো না। তবে কি পরী ও পরীর মাকে কাপড় কিনে দিতে পারবে না? এখানে তো পরাজয় হওয়া চলবে না। ভাবল, অনেক কাপড় দোকানদারের সাথে আমার পরিচয় আছে। তাঁদের কাছে থেকে কাপড় নিয়ে দেই, বলবো পরে টাকা দিবো। অপু তাই করল, নিজের ইচ্ছা পূরণ হল। নতুন কাপড় পেয়ে পরীর সে কি নাঁচন ! পরীর আনন্দে অপুর চোখে জল এসে গেল। পরী নতুন কাপড় গায়ে হালকা ভাবে জড়িয়ে সামনে এসে বলল, দেখতো আমায় কেমন লাগছে?
অপু দু-হাতে পরীর মুখখানি ধরে বলল, ভালো মেয়েকে ভালো কাপড়ে আরও ভালো দেখায়। কথা শুনে পরী আরও খুশি হল। বলল, আবার কখন এমন কাপড় কিনে এনে দিবি?
-তুই যখন বলবি তখনই কিনে দিবো।
-তাহলে এতো দিন এনে দেসনি কেন?
-আমি তো বুঝতে পারিনি তুই এতো বড় হয়ে গেছিস, কাপড় পড়ার বয়স হয়েছে।
-আমি এখন গোছল করবো, তারপর এই নতুন কাপড় পড়ে তোরে দেখাবো। তুই ততক্ষণ কিন্তু যাবি না।
-পরে এসে দেখে যাবো।
-না, এক্ষুণি দেখতে হবে নয়তো আমি তোর কাপড় পড়বো না।
-তুই গোছল করতে থাক আমি কিছুক্ষণের মধ্যে আবার আসছি।
চৈত্র মাস। চারদিকে খাঁ খাঁ রব। গাছগুলো পাতাহীন ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছে ওরা বড় অসহায়। ওদের পাশে কেউ নেই। পথের ধারে শুকনো পাতার আওয়াজ। মাথার ওপর সৃর্যের প্রখর তাপ। মনে অপুর অনেক ভাবনা, তবে গন্তব্য জানেনা। ধনী বাপের ছেলে হয়েও লেখাপড়া করা তেমন হয়নি। বাবা মা কেউই তেমন জোর দিয়ে পড়তে বলেনি। তাছাড়া ওকে নিয়ে তাদের কোন ভাবনাই নেই। অপু যে তাদের ছেলে, তা শুধু রক্তের ভিতরে কিন্তু মনের মাঝে নেই। বাড়ি গেলে অনু খাওয়ার কথা বলে না। কোথায় গিয়েছিলি কিংবা শরীর ভালো আছে কিনা কিছুই জানতে চায় না। নিজের ক্ষুধার তাড়নায় শুধু বাড়ি গিয়ে খেয়ে আসে অপু। তাছাড়া বাড়িতে এক মুহূর্ত থাকা হয়না। বাড়িতে ওর ভালো লাগেনা।
এতোটুকু জীবনে মায়ের গল্প অনেক শুনেছে অপু। তাদের সারিতে তো অনুর মত এমন মায়ের সন্ধান পায়নি। তবে কী এই মায়ের জন্য নতুন কিছু রচনা হবে ! কিন্তু সেই লেখকের খোঁজ কোথায় পাবে? তিনি যদি এই অনুর ধ্যান ধারনা কাছে থেকে বুঝতে ও জানতে না পারেন তবে তো সত্য কথা লেখা তাঁকে দিয়ে হবেনা। অপু তো লিখে রাখতে চায় কিন্তু লেখার ভাবটা তো ওর মাঝে নেই।
পৃথিবীতে যত কবি ও সাহিত্যিকের জন্ম হয়েছে তাঁরা মা সম্পর্কে ভালো বাণী উচ্চারণ করেছেন। তাঁদের সাধ্যে মা সম্পর্কে খারাপ কথা লেখার সাহস হয়নি। তাহলে কী অপুর মা তথা অনুর কাহিনী গোপন থাকবে? কত কষ্ট করে যে মা সন্তানদেরকে নিজের গর্ভে রাখেন। সেই মায়ের কি সন্তানের প্রতি কোন দায়িত্ব নেই? এ কেমন পরিণতি? যদি মা অনাহারে অর্ধাহারে থাকতেন তবে না হয় অন্য কথা। কিন্তু অপুর মা তো তেমন ভাবে নেই। সুখের সংসারে বসত করছে। অথচ অপুর প্রতি মা বাবা উভয়েনই নেতিবাচক দৃষ্টি। কিন্তু কেন?
সারাদিন এদিক সেদিক ঘুরে সন্ধ্যা হয়ে এলো। নিজের বাড়ি থাকতে অন্যের বাড়িতে রাত কাটানো ভালো না, এতে লোকে মন্দ বলে। অপুর তবুও থাকতে হয়। নিজের বাড়িতে ওর মন বসে না। ওখানে থাকাটা যেন বিষাক্ত মনে হয়। ভাবল, খালার বাড়ি গেলে কেমন হয় ! ওখানে অনেক দিন যাওয়া হয়না। তবে ঐ বাড়ির সকল খবরই অপুর জানা আছে। খালা ওকে খুবই আদর করেন। খালার এক ছেলে ও তিন মেয়ে। মেয়েরা সবাই অপুর বড়। বড় মেয়ে আমেনার বিয়ে হয়েছে, এখন বাকিদের জন্যও ভালো পাত্র খোঁজা হচ্ছে। অপু ওদের ছোট হলে কি হবে, ওরা সবাই অপুকেভাই বলে ডাকে। বাড়িতে গেলে ওকে নিয়ে ওদের তাড়াহুড়ি লেগে যায়, খাওয়ার সময়ও দেয় না।
খালা তখন বলেন তোরা ছেলেটাকে কি পেয়েছিস? ওরা বলে আমাদের ভাইকে আমাদের মনে যা চায় তাই করবো তুমি মা এখন যাও তো। অপু অবাক হয়ে ওদের কথা শুনে। ভালোই তো লাগে ওদের সাথে মজা করতে।
এখানেই সন্ধ্যা হয়ে গেল তাহলে যাবে কিভাবে? যাক, একটু পড়েই তো আকাশের বুক জুড়ে জোছনা উঠবে তাছাড়া রাস্তা দিয়ে এখনও অনেক লোক যাতায়াত করছে। এই পথ অপুর জানা শোনা। চোখ বুজে যেতেও সমস্যা হবে না। আগে কতবার যাওয়া হতো। আমির যখন বেঁচে ছিল তখন তো অপু সারাদিন ওদের বাড়িতে থাকতো। তিন বোনের পর আমিরের জন্ম। একমাত্র ভাইকে সবাই অনেক আদর করতো। আমির অপুর সামান্য ছোট হলেও দেখতে বড় দেখাতো।
সারাদিন দু-ভাই মিলে খালে বিলে গিয়ে মাছ ধরতো। মাছ কি আর ধরা যায়, যেন এক আনন্দে বেলা পার। গায়ের কাপড় কাদায় ভরে বাড়ি ফিরতো। খালা বলতেন আমার বুকের মানিকরা কি মাছ ধরে নিয়ে এলো? যদি দু-ভাই মিলে ভালো মাছ পেতো তবে দৌড়ে আমির আগে ওর মায়ের কাছে গিয়ে দেখাতো আর যদি মাছ না পেতাম তবে অপুকে আগে বাড়ি যেতে বলতো।
ওরা দুজন একাই বিছানায় ঘুমাতো। শীতের সময় এক লেপের ভিতরে দুজন থাকতো। কখনো লেপ বাদ দিয়ে নিজেদের লুঙ্গি গায়ে জড়িয়ে ঘুমাতো। রাতে লেপ খুঁজে পাওয়া যেতোনা। ভাবতো, কোথায় গেল লেপ? বিছানায়েই তো ছিল। কোন ভূতের আছর পড়ল না তো?
আমির একটু ভীতু ছিল। সে রাতে কোন দিন বাহিরে বের হতোনা, এমন কি পেচ্ছাব করার জন্যও না। যদি অপু যেতো তবে তার সাথে মাঝে মাঝে বের হতো। অপু তো আবার আলাদা ধরনের লোক। রাতের অন্ধকারের সাথে কথা বলে। রাত গভীর হলে হঠাৎ অপুকে বিছানায় পাওয়া যাবে না। হয়তো উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে নয়তো পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে আকাশের তারা গুনছে কিংবা অন্ধকারের মাতামাতি করছে। একদিন রাতে আমির বলল, তুই এতোক্ষণ কোথায় ছিলি?
-পাগলদের কোন ঠিক ঠিকানা থাকে না।
-তুই তো পাগল না, তোর ভাবটা পাগল।
-আগামী কাল এক জায়গায় খাওয়ার দাওয়াত আছে যাবি?
-কোথায়, তোদের বাড়িতে?
-আরে না। এক পরিচিত মেয়ের বাড়িতে, সে তার বিয়ের দাওয়াত দিয়েছে। নাম মিতা।
-এ কোন মিতা রে?
-ঐতো তোদের গ্রামের উত্তর পাশের শেষ বাড়িটা তাদের।
-তুই তো দেখি মাগার জটিল পোলা। ঐ ধনী লোকের মেয়ের সাথে তোর আবার ভাব হল কেমনে?
-যোগ্যতা লাগে, আমার যোগ্যতা আছে বলেই হয়েছে। তোর অবশ্য সে যোগ্যতা নেই। যে ছেলে ভূতের ভয়ে রাতে বাহিরে বের হয়না তার দ্বারা মেয়ের সাথে সম্পর্ক করা সম্ভব না। মেয়েদের সাথে কথা বলার আগেই তোর ডান পায়ের সবগুলো আঙ্গুল কাঁপতে থাকবে।
-বাজে কথা রাখ, ওর সাথে তোর কেমনে ভাব হল তাই বল?
-একদিন মিতা আমাদের গ্রামে এক আত্মীয় বাড়ি বেড়াতে যায়। সেখানেই ওর সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয়। মিতা গোছল করতে নেমেছে পুকুরে, হঠাৎ এক কুকুড় এসে ওর শুকনো কাপড় কামড় দিয়ে নিয়ে দৌড়ায়, আর এদিকে ওতো নেমেছে পুকুরে, শরীর ভেজা। আমি আবার ঐ পথ দিয়ে যাচ্ছিলাম। মিতার ডাকাডাকিতে সব বুঝলাম। পরে ওর কাপড় উদ্ধার করে ফিরিয়ে দেই। সেই থেকেই পরিচয়।
-তোর ভাগ্যটাই ভালো, অমন সুযোগ আমার কপালে হবেনা।
-হবে কেমনে, তুই তো কুকুড়ের ঘেউ ঘেউ শুনে ভয়ে কাপড় উদ্ধার করতিনা। তুই তো শিয়াল দেখেও ভয় পাস।
-তুই সত্যি বলেছিস, আমি কুকুরকে খুব ভয় পাই। যদি কামড় দেয় তখন আবার নাভির কাছে একে একে চৌদ্দটা সূচ ঢুকাতে হবে। আমি তার আগেই মরে যাবো। তবে কবে কখন শিয়াল দেখে ভয় পেয়েছিলাম?
-প্রমাণ দেখবি?
-হ দেখবো।
-তাহলে আজ রাতেই প্রমাণ হয়ে যাবে।
আমির জানে অপু যা বলে তাহা করেই ছাড়ে। তাই সে নিজের মাঝে কিছুটা ভয় পেলো। শিয়াল ব্যাপার বাদ দিয়ে অন্য প্রসঙ্গে কথা বলল অপু। খালা এসে বললেন, তোরা কি সারা রাত গল্পই করবি, ঘুমাবিনা? অপু বললাম আজ কোন ঘুম হবেনা, আজ শিয়ালের খেলা হবে। খালা বললেন, কীসের শিয়াল?
অপু বলল, ও তুমি বুঝবে না, যে বুঝার তাকে আজ বুঝাবো। খালা চলে গেলেন। খালার তিন মেয়ে আগেই ঘুমিয়েছে। আঁধার রাত। আমির ও অপু ঘুমে কিছুটা অচেতন। তবে অপু অচেতন হলেও গুপ্ত অচেতন। ধীরে ধীরে অপু বিছানা ছেড়ে উঠোনে গেল। অপু আবার নিজের মুখে শিয়ালের মত ডাকতে পারে। ওরা যে ঘরে শুয়েছে তা পাটখড়ি দিয়ে বেড়া, মাঝে মাঝে ভাঙা ফাঁকা আছে। অপু খেয়াল করল খালা খালু ও বোনেরা সবাই গভীর ঘুমে আছে।
প্রথমে বেড়ার কাছে গিয়ে শব্দ করল, যে কেউ মনে করবে মাটি খুড়া হচ্ছে। তারপর শিয়ালের মত ডাকাডাকি। তারপর ঘরে চকির নিচে গিয়ে হুঙ্কার দিতে লাগলাম।
আমিরের ঘুম ভেঙে গেল। আমির ভাবলো, চকির নিচে কীসের শব্দ হয় ! শিয়াল কি চকির নিচে আসতে পারে ! দরজা তো বন্ধই আছে। তাহলে কি ভূত এলো? অপুকে না পেয়ে আমির কাঁদবে না কি করবে ভেবে পেলো না। রাতের প্রতিজ্ঞা কথা মনে করল, অপু যদি করে তবে কেন চকির নিচে? এমন কিছূ ভেবে আমির বারেবার নিজের বুকে থুঁ থুঁ দিতে লাগলো। সব ভয় ফেলে আমির ওর মাকে ডাকলো।
অপু চকির নিচ থেকে বের হয়ে বলল, ভয় দেখাতে পেরেছি তো?
খালা এসে দরজায় কাছে ডাকছেন, কি হয়েছে রে আমির? অপু বলল, কিছু হয়নি খালা, কোন স্বপ্ন হয়তো ও দেখেছে তাই। অপু এক গ্লাস জল আমিরকে দিল। সে এক টানে তা খেয়ে ফেললো। সকালে উঠেই আমির অপুকে বলল, তুই না আজ বিয়েতে যাবি বললি, তা কখন যাবি?
-ভাবছি যাবো কিনা?
-তুই না যাস তবে তোর বদলে আমায় পাঠিয়ে দে।
-তোকে দিয়ে কি আর আমার কাজ হবে? কত যে হবে তা তো রাতেই বুঝা গেল।
-দেখ অপু,তুই কিন্তু আমায় অপমান করছিস।
জেরিন এসে বলতেছে তোরা আবার কি নিয়ে ঝগড়া করছিস? খেতে আয় মা ডাকছে। জেরিন আমিরের তিন বোনের মধ্যে ছোট। ওর নাকটা একটু লম্বা। চোখটা কবির চোখে কবিতার ভাবনায় যেমন দেখায় তেমন, মানে হরিণির মত। হরিণির মত কোন মেয়েদের চোখ হতে পারে নাকি ! হরিণির চোখ দেখতে কেমন? এই কথা সব কবিরা বলে থাকেন। কিন্তু কেউ সত্যিকারে ভেবে দেখেন না। জেরিন একটু নীরব ধরনের, ও তেমন বেশী কথা বলে না প্রয়োজন ছাড়া কারো সাথে।
দু-ভাই মিলে মিতার বিয়েতে যাচ্ছে। খালি হাতে গেলে কি চলে? ওসব ভাবনা অপুর করা আছে। পকেটে টাকা নেই তবুও মিষ্টি কেনা হয়ে যাবে। তবে একটা বুদ্ধি খাটাতে হবে। তবে যেতে হবে বর পক্ষের সাথে। বর পক্ষ যে মিষ্টি নিয়ে যাবে তা ওরা ছিনিয়ে নিবে। আমির ভুরু কুঁচকে বলল, তা কেমনে সম্ভব?
অপু বলল, চল আমার পিছে পিছে।
বরের বাড়ি কিছুটা দূরে মিতা অপুকে আগেই বলেছে। ভাঙা রাস্তা তাই বর পক্ষের লোকেরা মিতাদের বাড়ির কাছের পথটুকু হেঁটে আসবে। ওরা তাদের সাথে মিশে যাবে, যার কাছে মিষ্টির ব্যাগ তার সাথে মিল দিলেই কাজ হয়ে যাবে।
মূদু অন্ধকার। অপু এক বুড়ো লোককে বলল, দাদা মিষ্টির ব্যাগটা আমার হাতে দেন আপনি কেন কষ্ট করে নিবেন? তিনি অপুকে না চিনেই মিষ্টির ব্যাগ হাতে দিলেন। কিছু দূর তিনির সাথে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে অপু পিছিয়ে পড়ে। বর পক্ষ সামনে আর অপুরা পিছনে। ধীরে ধীরে অন্য রাস্তা দিয়ে মিষ্টি নিয়ে দ্রত মিতার বাড়িতে হাজির হল ওরা দুজন। বাড়িতে বিয়ের আমেজ চলছে। রাস্তায় ছিল ওরা দুজন সাধারণ সার্ট গায়ে আর পরে পড়েছে ভিন্ন সার্ট। বর পক্ষ ওদেরকে চেনার উপায় নেই।
বাড়িতে কোথাও মিতাকে পাওয়া গেল না। তবুও অপু লাজ শরম ফেলে বাড়ির পেছনে সামনের মানুষদেরকে জিঙ্গাসা করে মিতার খবর জানতে চাইল। এক লম্বা মেয়ে শরীরে নেই এক খন্ড মাংস, নাম তনু। সে অপুকে বলল, আরে অপু ভাই আপনি এখানে কেমনে এলেন? চলেন একটু গল্প করি।
অপু তনুর কথার কোন জবাব না দিয়ে শুধু জানতে চাইল, মিতা কোথায় কোন ঘরে আছে? তনু হাত দিয়ে দেখিয়ে দিলো। অপুকে দেখেই মিতা অবাক হয়ে বলল, আপনি এসেছেন আমি খুব খুশি হয়েছি। আমি জানতাম আপনি আসবেন।
-এতো বিশ্বাসের কারণ?
-আপনি কথা দিয়ে কথা রাখেন।
ওদের দুজনকে মিতা আলাদা ঘরে বসতে দিল। আমির ঘরে বসে রইলো না, সে তনুর কাছে গেল। আমিরের ভাব দেখে অপু বলল তুই ওর কাছে যাস না, ও মেয়ে হিসেবে ভালো না। ওর সম্পর্কে আমি অনেক জানি।
-কি জানিস বল, নয়তো আমি যাবোই। কি সুন্দর রুপ ওর ! হয়তো একটু হালকা, তাতে তেমন সমস্যা না।
-আরে রুপ দেখেই কি পাগল হইলি ভিতরটা তো দেখা হয়নি।
-ভিতরটা আমার দরকার নেই আমি ওর সাথে ভাব করবই। তুই যা মিতার সাথে গল্প কর আমি আমার কাজে যাই।
তনুর প্রতি অপুর অনিহার এক কারণ আছে। তনুর স্বভাব ভালো কিনা জানে না। তবে সে নিজেকে মেলাতে সামান্য দ্বিধা করেনা। একদিন ওকে নিয়ে অপু কিনা বিপদে পড়েছিল। অপুর কাছে প্রকৃতি দেখতে ভালো লাগে। তাই মাঝে মাঝেই নদীর ধারে বসে বিস্তর জলরাশি দেখে কিংবা পথ ধরে গাছ গাছালির পানে তাঁকিয়ে থাকে। গাছের সাথে কথা বলে, গাছও ওর কথায় সাড়া দেয়। অপু আম গাছের কাছে আম চাইলে তা পাই, কাঁঠাল গাছের কাছে কাঁঠাল চাইলেও সে দেয়।
তখন দুপুর গড়ায়নি। সৃর্যটা মাথার ঠিক উপরে তীর্জক ভাবে আছে। অপু এক লিচু গাছের নিচে বসে ওপরে হা করে তাঁকিয়ে আছে। অনেকক্ষণ হয়ে গেল মুখের মধ্যে লিচু পড়ছেনা। অপুবিরক্ত হয়ে গাছের গোড়ায় ক’টা লাথি দিচ্ছিল, তাতে বরং ও নিজেই আঘাত পেলো। ভাবল, আগে তো কখনো এমন হয়নি। গাছেরা কি ফল দেওয়া বাদ দিয়ে দিল ! অপু ভাবনা বেড়ে গেল।
ঐ পথ দিয়েই যাচ্ছিলো তনু। তনু তো মুক্ত মেয়ে। মা মরা। বাপ থাকতেও নেই। ও যেখানেই যায় কোন পিছু টান নেই। কেউ খোঁজ নেবেনা। বরং কোথাও দুটো খেতে পেলেই হলো। গাছের সাথে অপুর রাগারাগি দেখে তনু বলল কিরে পোলা, গাছের সাথে লেগেছিস কেন? আমার সাথে আয়, তখন দেখেবি কে পায়।
তনুর কথা শুনে অপুর রাগ আরও বেড়ে গেল। বলল তুমি কে? তোমার কাজে তুমি যাও আমার কাজে হাত দিতে হবেনা।
আমি তনু, অন্যের কাজে হাত দেওয়াই আমার কাজ, তোর কাজে হাত দিতেও আমার খুব ইচ্ছে করছে। এই দেখ আমার হাত কেমন নড়াচড়া করছে। তোকে ধরতে চায়, ধরতে দিবি?
অপু গাছের সাথে ঝগড়া বাদ দিয়ে এবার তনুর সামনে এসে দাঁড়াল। তনু মুখে পান পুওে দিয়ে চিবাচ্ছে। আর মুখ থেকে জর্দার গন্ধ বের হচ্ছে। গন্ধটা অপুর খুবই ভালো লাগছে। যদিও ও অন্য সময় জর্দার গন্ধ সহ্য করতে পারে না। অপু বললাম আরও পান আছে?
-না, যাকে সরে যেতে বললি তার হাতের পান খেতে চাস কেন?
-আচ্ছা পান চাইনা এখন তুমি যাও।
তনু সেলোয়ার কামিজ পড়া ছিল। ওড়না বুক থেকে সরিয়ে তনু তা নিজের কোমড়ে শক্ত করে বেঁধে নিল। অপু নিজের চোখ ঘসতে ঘসতে উহা দেখছে। হঠাৎ তনু গর্জে অপুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। অপুর পিঠ গিয়ে পড়লো শুকনো পাতার উপর। মেয়েদের কখনো এতো শক্তি হয় নাকি? কোন ভাবেই নিচ থেকে অপু উঠতে পারল না। পা দুটোকে এমন ভাবে আটকিয়েছে যে ছাড়ার উপায় নেই। অপু বুঝতে পারল নিজের পায়ের তলা কাঁপছে। অপু ক্ষমা চাইল। তনু বলল আমি ছাড়ার বান্দা নই। যাকে ধরি তার থেকে কিছু নিয়ে ছাড়ি। তাছাড়া তুই মালটা মাগার খারাপ না।
অপু শরীরের সব শক্তি দিয়ে হুঙ্কার করে তনুকে ছিটকে দিল। তনু লিচু গাছের সাথে ধাক্কা খেলো। অপু দ্রত দৌড়াতে থাকে আর পেছনে পেছনে তনু ওকে ধরতে মরিয়া।
মিতারা মধ্যম শ্রেণীর ধনী। যে ছেলের সাথে মিতার বিয়ে আগে তাকে মিতা দেখেনি, শুধু বাপের মতামতে রাজি হয়েছে। শুনেছে গ্র্যাজুয়েট পাস করা, কোথাও চাকুরি করে
মিষ্টি ছাড়াই বর পক্ষ বিয়ে বাড়িতে হাজির হল। আশেপাশে ছোট ছোট অন্যান্য দোকান থাকলেও কোন মিষ্টি দোকান না পেয়ে ফিরে আসে। নিজেদের মান বাঁচাতে মিষ্টি হারানোর কাহিনী সব খুঁলে বলেন। আড়াল থেকে অপু সব শুনে মুছকি হাসে।
বিয়ের পর্ব শুরু হয়ে গেল। বরকে এখনও অপুর ভালোভাবে দেখা হয়নি। ছেলে মেয়েকে এক ঘরে নেওয়ার সময় অপু নিজের মাথায় হাত দিয়ে ভাবল, আরে ওতো সেই চোর। আমাদের গ্রামে এক মুরগি চুরি করার সময় ধরা পড়েছিল। আমিও মেরেছিলাম, ওর পিঠে একটা থাপড় দিয়েছিলাম। তাতে আমিই ব্যাথা বেশী পেয়েছিলাম। চোরদের শরীর নাকি অনেক শক্ত। কথা সত্য, ফলাফলও পেয়েছিলাম।
মিতার বরের নাম আবির। সে অপুকে খেয়াল করেনি। নিজেকে দেখানোর জন্য আবিরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল অপু। তবুও আবিরের মাঝে কোন ভাবনার উদয় হল না। স্বাভাবিক ভাবে অপুর সাথে কথা বলল। অপু ভাবল, আমার কি ধারনা ভুল? ভূল হবার কথা না তো ! তাহলে কি আবির দেখেও না দেখার ভাব করছে বিয়ের জন্য? চোরদের আবার অনেক বুদ্ধি থাকে। ওরা পাতিলের উল্টো পিঠে চাল ভাজি করে খায়। চাল ভাজি যদি বেশী পুড়ে যায় তবে বুদ্ধি বেড়ে যায়। এভাবে অন্য কেউ চাল ভাঁজতে পারে না।
বিয়ে যেহেতু হয়ে গেছে তাই আর মিতাকে কথাটা বলা ঠিক হবেনা, এমনটা ভাবল অপু। পরে এক সময় বলা যাবে। আমিরকে বিয়ের আসরে পাওয়া গেলেনা। হয়তো জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছে তনুর সাথে। যে মেয়ের খপ্পরে আমির পড়েছে আজ মেয়ে কি জিনিস ও বুঝাবে। না আবার আমিরের নতুন প্যান্টটা তনু খুঁলে নিয়ে যায় !
মিতার কাছ থেকে পরে তনুর ব্যাপারে সব জানল অপু। যা ভেবেছিল সব উল্টো। তনু খুবই সাধারণ একটা মেয়ে। ছেলেদের সাথে অমন দুষ্টামি করাই ওর কাছে ভালো লাগে তবে খারাপ কাজ করে না। একা মেয়ে তো। ওর কি ছেলেদের সাথে আড্ডা দিতে ইচ্ছে করে না ! ওর তো একটা মন আছে। কোন ছেলের সাথে তা মিলাতে চায়। হয়তো সমাজ গ্রহণ করে না।
মিতার বিদায় পর্ব শেষ হয়ে গেল। এমন সময় আমিরকে অপু খুঁজতেই দেখল, ও খুশি খুশি মনে ওর দিকে আসছে। ওর খুশি মানে খবর খারাপ না তো? আবার তনুকে ও কিছু করলো না তো? অপু বললাম, কিরে তুই এলি বিয়ের অনুষ্ঠানে অথচ তোকে পাওয়া যাচ্ছে না। কোথায় ছিলি এতোক্ষণ? তোর কথা তো মিতা জানতে চাইলো। আমি মিথ্যে বলেছি, বলেছি সে হয়তো কোথাও কোন ছেলের সাথে আড্ডা দিতেছে।
-মিথ্যেটা বেশী হয়নি, ঐ ছেলের জায়গায় মেয়ে বসালেই হল।
-আচ্ছা চল এখন বাড়ি যাই। মিতাকে বিদায় দেওয়া হয়েছে।
রাতে অপু আর আমির বাড়ি গিয়েই শুয়ে পড়ল। রাতে আমিরের বিষণ জ্বর হল। পেটেও ব্যাথা। অপু ভাবল নিশ্চই বিয়ে বাড়িতে বেশী খাওয়ায় এমন ফলাফল হয়েছে। তেল জাতীয় খাবারের জন্য হজমে গন্ডগোল হচ্ছে। অপু কিছু কবিরাজি জানত, কিন্তু তখন কিছুই মনে পড়ল না। কোন গাছে কি হয় কিছুই জানা নেই। ক্রমেই আমির ব্যাথায় বোনেরাসহ ওর মা বাবা বলে চিৎকার করছেন।
অনেকদিন আগে অপুদের গ্রামে এক নাঁচ ও গানের অনুষ্ঠানে গিয়ে জেনেছিল। যে কোন ঔষধের বোতলেই সামান্য জল কিংবা শরবত নিয়ে সেই বোতল ঝাঁকি দিয়ে পায়ের তলায় ঘসা দিয়ে উত্তরমুখী হয়ে খেলেই একটু পরে সকল ব্যাথা ভালো হয়ে যায়। অপুর চিন্তাকিছু দূর হল। খালাকে বলল কোন ঔষধসহ বোতল কিংবা খালি বোতল আছে নাকি?
খালা বোতল এনে দিলেন। অপু তা সেই পদ্ধতিগত ভাবে আমিরকে খাওয়াল। কোন কাজ হলনা। আবার চিন্তায় পড়ে গেল। আশে পাশে তো কোন ডাক্তারও নেই। অপু ঘরের বাহিরে গেল। নিজেই বিভিন্ন গাছের পাতা সংগ্রহ করে একত্রে মিশিয়ে রস বের করে খাওয়াল। অপু জানেনা ওই সব গাছের পাতার কাজ কি। শুধু শান্তনা দেওয়ার জন্যে। তাৎক্ষণিক ভাবে আমিরের ব্যাথা কমে গেল। খালার কান্নার মাঝে খুশির ভাব দেখা গেল।
সকালে অপু নিজ বাড়িতে চলে গেল। তিন দিনের মাথায় আমিরের আবার সেই ব্যাথা শুরু হল। অপুকে খবর দেওয়া হল। সে যাওয়ার আগেই আমিরের ব্যাথা চিরতরে শেষ হয়ে যায়। আমির মারা যায়। আমির ছিল অপুর একমাত্র কাছের বন্ধুু। তার সাথেই অপু সব দুঃখ সুখ শেয়ার করতাম। তারপর দুই বৎসর হয়ে যায় এ মাঝে দু-ঘন্টার জন্য একবার ওদের বাড়িতে যাওয়া হয়েছিল অপুর।
আজ আবার যাচ্ছে। রাস্তা দিয়ে অনেক মানুষ যাচ্ছে বিভিন্ন কাজ সেরে কিন্তু অপুর কোন নিদিষ্ট কাজ নেই। মন চাইছে খালার বাড়ি যাবো তাই যাত্রা। আবার হয়তো অর্ধেক পথে গিয়েই মন না চাইলে ফিরে আসতে পারে। পেটে হালকা ক্ষুধা কিন্তু পকেটে চকলেট খাবার পয়সাও নেই। এভাবে কি কেউ কোন আত্মীয় বাড়ি যায়? মুখে কিছুটা লেগে আছে তিল বাটার অংশ, তা জিহ্ব্ াদিয়ে চাটছে অপু। একেবারে ফকিরি দশা। আসলে অপু সত্যিকারের ফকির। আজকাল ফকিরেরা বেশী ধনী, তাঁদের আয় রোজগার চাকুরি করা থেকে বেশী। আগে যেখানে দোকানদার দশ টাকা ভাঙতি করে থালায় রাখতো, আর সারাদিন যত ফকির আসতো কাউকে দশ পয়সার বেশী করে দিতো না। কিন্তু যুগের সাথে সবই পাল্টেছে। এখন আর ফকিরেরা দু-টাকার নিচে ভিক্ষা নেয় না। যদি কম দেওয়া হয় তবে ফকিরেরা ধমক দিয়ে পয়সা ছুঁড়ে চলে যায়। নিজের মান বাঁচাতে দু-টাকাই ভিক্ষা দেয় দোকানদাররা কিংবা পথিকরা।
দেশের আনাচে কানাচে অনেক ফকির মিসকিন আছে তাঁরা নিজের এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় গিয়ে অন্য বেশে ফকিরি ব্যবসা করে। ওদের হাতে আবার আধুনিক মোবাইল ফোন থাকে। সময় পেলেই অন্য সবার আয়ের খোঁজ খবর নেয়। রাতে দুটো হাই পাওয়ারের ব্যাথা নাশক ট্যাবলেট খেলেই হল, পরের দিন আবার কাজে লেগে যায়। ঐ সব ফকিরদের অনেকের বাড়ির অবস্থা ভালো তবুও তাঁরা এই পেশা ছাড়ে না।
অনেক কথা ভেবে অপুর মনটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। খালার বাড়ি যাবে কিনা দ্বিধায় পড়ে গেল। সব ভাবনা ফেলে খালার বাড়িতে উপস্থিত হল অপু। আমেনা এসেছে ক’দিন হল। ও গর্ভবতি। স্বামী আমেনাকে তেমন ভালোবাসেনা, শুধু নিজের ভালোবাসায় সংসার টিকিয়ে রেখেছে। অনেক দিন পর তিন বোনের সাথে অপু দেখা হল। আমেনা অপুকে ছোট ভাই ভাবলেও বাকি দুজন ওর সাথে হাসি তামাশায় ব্যাস্ত থাকে।
অপু আমিরের ঘরে গিয়ে শুয়ে আছে। ওর পড়ার বইগুলো এখনো টেবিলের ওপর সাঁজানো আছে। ছাত্র তেমন ভালো না হলেও সব কিছু সাঁজিয়ে রাখতো। ঘরের মাঝে কোথাও মাকরশার বাসা খোঁজে পাওয়া যেতো না। খালা এসে বললেন, তুই এসেছিস ভালো হয়েছে, আগামী কাল জামেলাকে দেখতে ছেলে পক্ষ আসবে। আমেনার বিয়েতে তুই এলিনা। যদি মেয়ে দেখে ছেলের পক্ষরা পছন্দ করে তবে কাবিন করে যাবে।
অপু বলল, শুধু কাবিন কেন বিয়ে পড়াতে আসবে না? ছেলে সম্পর্কে সব জেনেছেন? কি করে কোথায় থাকে বাড়ির অবস্থা কেমন ইত্যাদি সব।
-অত সব কি জানা যায়। তবে ছেলেকে তোর খালু দেখেছে। দেখতে নাকি অনেক ভালো, লম্বা, সুন্দর।
-ওভাবে তো দেখলে হবেনা, ছেলের ধ্যান ধারনা কেমন তাই আসল ব্যাপার। কালো ধলো ছেলের ক্ষেত্রে দরকার নেই। আমেনা আপাকে তো সুন্দর ছেলের সাথে বিয়ে দিয়েছেন কোন কিছু না জেনেই, তাতে কি সুখ হয়েছে তার? সুখ ঐ সুন্দরে আসেনা। আমেনা আপা তো আমার কাছে এসে কান্না করল। ওর স্বামী নাকি আবার বিয়ে করতে চায়।
-কই আমাকে তো কিছু বলেনি।
-আপনার কাছে বললে তো আপনি চিন্তা করবেন তাই বলেনি। দুলা ভাই যদি আসে তবে তাঁকে অন্য ভাবে বলে বুঝাবেন, তিনি যেন আপনি বুঝাচ্ছেন তা বুঝতে না পারেন। আচ্ছা টাকা পয়সার ব্যাপারে কোন কথা হয়েছে, কোন দেনাপাওনা?
-তেমন কিছু কথা হয়নি তবে তুই যেহেতু এসেছিস সব বলিস।
রাতের খাবার খেয়ে অপু শুতে গেল। কীসের ঘুম ! দু-চোখে যেন দুনিয়ার ভাবনা ভর করছে। এতো ভাবনা কীসের ! অপুর তো কোন ভাবনা থাকার কথা নয়। ওর না আছে বাড়ির চিন্তা, না আছে সংসারের চিন্তা। যেখানে পায় সেখানে খায়। প্যান্ট সার্ট দু-টো পড়েছে সপ্তাহ হয়ে যায়, বদলানোর নাম নেই। গোছল করলেও সেই ছোট বেলার নিয়মে করে। আমার গোছল হয় সন্ধ্যার পর কোন পুকুরে নেমে।
একবার আমি পুকুর পাড়ে লুঙ্গি খূঁলে গোছল করতে নেমেছে অপু। কাজ সেরে দেখে লুঙ্গি নাই, মহা বিপদে পড়ে গেল। কে নিতে পারে ! আশেপাশে তো কাউকে দেখা গেল না। তাহলে কি ভূতের আসর পড়লো ! অপু সামনের অবস্থা দু-হাত দিয়ে ঢেকে এদিক সেদিক খুঁজতেই হঠাৎ দেখে এক কুকুড় এক গাছের নিচে নিয়ে তার ওপরে শুয়ে আছে। যাক বাবা বাঁচা গেল, নয় মান বাঁচা নিয়ে দায় হতো।
অপু বিছানা ছেড়ে উঠোনে বাহির হল। খালা বুঝতে পারলেন কেউ উঠোনে এসেছে। বললেন কে উঠোনে?
-আমি অপু খালা।
-আবার উঠেছিস কেন? এখন অনেক রাত কোথাও যাস নে আবার। ঘুমিয়ে পড়।
-ঘুম আসছেনা, খালা স্কুল মাঠ থেকে হেঁটে আসি। একটু পরেই ফিরে আসবো।
চারদিক নীরব। আজ ঝি ঝি পোকাগুলো ডাকা বাদ দিয়েছে। তারাই তো রাতটাকে কিছুটা হলেও জাগিয়ে রাখে। স্কুলটা আমিরদের বাড়ির একটু উত্তর দিকে। দু-মিনিট হাঁটলেই স্কুল। স্কুল হিসেবে মাঠটা অনেক বড়। এখানে একটা কলেজের মত জায়গা আছে। অথচ প্রাইমারিটাও ভাঙাচূড়া ভাবের, মাধ্যমিকের আশাও করা যায় না। এই স্কুলটা অনেক পুরানো, সেই কোন কালে কোন জমিদার জায়গা দিয়েছিলেন। স্কুলের দেয়ালের ইটগুলো খসে পড়েছে। দেয়ালের ভাঙার ফাঁকাগুলো এক একটা দরজা হয়ে গেছে, তাই এখন ছাত্রদের আর দরজা দিয়ে যেতে ও বের হতে হয় না।
অপু স্কুলের চারপাশে হাঁটছে। মনে হয় স্কুল পরিদর্শনে এসেছে। এতো রাতে এমন ভাবে স্কুল দেখার কোন মানে হয় ! দেয়ালের ফাঁকায় হাত দিতেই একটা ইটের খন্ড অপুর হাতে পড়ল। উহ্ কি ব্যাথা ! অপু তবুও ভিতরে গিয়ে পড়ার টেবিলে চিত হয়ে কিছুক্ষণ ঘুমের তালে শুয়ে রইল। এখন অন্য কোন ভাবনা নয়। এখন অপু স্কুলে পড়ে। সে হাফ প্যান্ট সার্ট ও সেন্ডেল পড়ে স্কুলে এসেছে। পড়ার ফাঁকে ঘুমাচ্ছে। শিক্ষক অপুকে এসে বলছেন, এই অপু ইহা স্কুল ! কোন ঘুমানোর জায়গা নয়। ঘুমাতে চাও তো বাড়িতে গিয়ে ঘুমাও, এখানে কেন সবাইকে সমস্যা করছো?
অপু বলল, স্যার আপনি পড়ান আমি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে পড়া শুনবো। ঘুমিয়ে পড়ার মজাই আলাদা। তাতে স্বপ্ন দেখা ও বই পড়া উভয়ই হয়। আপনি যদি কখনো এমন না করে থাকেন তবে আমার সাথে শুয়ে পড়েন।
স্যার বললেন, আমি শুয়ে থাকলে পড়াবে কে?
অপ বলল ঠিক বলেছেন, দায়িত্বশীল শিক্ষকরা ছাত্রছাত্রীদের পড়া নিয়ে ভাবেন। আপনাকে আমার মত পড়তে হবেনা, বরং পড়ান।
তিন চার জন ছাত্র মিলে আমাকে পেছনের বেঞ্চে শুয়ে দিল, আমি ঘুমের তালে সবই বুঝতে পারছি। আর স্যার তো পড়াচ্ছেনই। স্যার পড়াচ্ছেন, থাকবো নাকো Ÿদ্ধ ঘরে/ দেখবো এবার জগৎটাকে/ কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগন্তরের ঘূর্ণিপাকে।
অপু বলল, স্যার আমি ঘুমের যুগান্তরে আছি, অন্য কোথাও খুঁজতে হবেনা। স্যার তবুও ছাত্রদের পড়াচ্ছেন, স্যার অনেক ধর্য্যশেীল। স্যার আগামী কালের জন্য পড়া দিলেন, নীল নব গগণে আষাঢ় গগণে/তিল ঠাঁই আর নাহিরে/ওগো আজ তোরা যাসনি ঘরের বাহিরে।
অপু বলল, স্যার, আমি বাহিরে যাইনি ঘরের ভিতরেই আছি। এবার আর স্যার ধর্য্যেশীল হতে পারলেন না। সব কিছুর একটা সীমানা আছে। তিনি রাগে টেবিলের ওপরে রাখা বেত দিয়ে অপুকে জোরে জোরে পেটাতে লাগলেন।
অপু চিৎকার করে উঠে বেঞ্চের ওপর বসল। স্যার তো নেই, তাহলে কে আমায় পেটাতে ছিলেন ! পিঠে হাত দিয়ে দেখল উঁচু নিচু। তবে কি সত্যি স্যার আমায় পিটিয়েছেন? তিনি আমায় মারবেন কেন? আমি তো আর এখন স্কুলে পড়ি না।
অপু ভিতরে এদিক সেদিক তাঁকালো। কই, কেউতো নেই এখানে ! ভাবল আর এখানে থাকা ঠিক হবেনা। কোন ভূতের আছর পড়েছে নিশ্চই। কিন্তু আমি তো কোন ভুত ও শয়তানকে ভয় পাইনা, আমার কাছে তো ওরা আসেই না।
হঠাৎ বাহিরে যেন কীসের চিৎকার দৌড়া দৌড়ি হচ্ছে। শব্দটা হচ্ছে স্কুল ঘরের পশ্চিম দিকে। অপু কিছুক্ষণ ভিতরে চুপ করে বসে থাকল। ক্্রমেই শব্দটা আরও কাছে আসছে স্কুলের দিকে। অপুর মনে ক্ষীণ ভাবনার উদয় হল। সে বের হয়ে স্কুলের বারান্দায় দাঁড়ালা। ক’জন লোক এসে ওকে ধরে ফেলল। সবাই মধ্য বয়স্ক হবে ! ওরা চিৎকার করে বলল, চোর ধরেছি। শালার বেটা বহু খেয়েছিস এবার পেয়েছি। সাথে সাথে অপুকে ঘুসি কিল কয়েকটা বসিয়ে দিলো।
অপু বলল, আরে ভাই আমি চুরি করবো কেন? আমি তো এখানে হাঁটছি। রাতে হাঁটা আমার অভ্যোস। ভবিৎষতে ডায়েবেটিস হওয়ার ঝুঁকি কম হবে।
লোকগুলো বলল, এই সুযোগে চুরিও করা হয় তাই না?
অপু রাগে বলল, দেখেন আর একবার যদি ঐ কথা মুখে উচ্চারণ করেন তবে বত্রিশটা করে তিন জনের ছিয়ানব্বইটা দাঁত তিন ঘুসি দিয়ে খুঁলে ফেলব কিন্তু।
ওদের একজন বলল কি, চুরি করেও গলা বাড়িয়ে কথা?
অপু আর সহ্য করতে পারল না। মোটা লোকটাকে নায়ক জসিমের মত এক ঘুসি মারতেই তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন। তারপর চিকন লোকটাকে দিতে এগুতেই সে দৌড় দিলো। বাকি লোকটা অপুকে পেছন থেকে জাপটে ধরল। এখন কিভাবে পেছনেরটাকে আঘাত করতে হবে তা অপু জানে, সিনেমা দেখে শিখেছে। তাছাড়া কিছুদিন ক্যারাতও শিখেছিল, আজ বুঝি তার ব্যবহার হল, আরও হবে। অপু পেছন থেকে ধরা লোকটাকে পেট বরাবর নিজের পা বাঁকা করে বসিয়ে দিল। লোকটা বাবা বলে উহ্ করল। তিন জনেই লুঙ্গি অর্ধ খোঁলেই দৌড়াতে থাকে।
মানুষের কোালাহল শুনে খালা বাহিরে এলেন। দেখলো তখনো অপু শুতে যায়নি। ছেলেটা কোথায় গেল, কোন বিপদ হলনা তো ! যে জন্যে বললাম রাতে বাহিরে যাওয়া ভালো না। কে শুনে কার কথা, এমনটা খালা বললেন।
খালা কয়েকবার অপুর নাম ধরে ডাকলেন। শেষ ডাকে সাড়া দিয়ে বলল, এই তো আমি খালা। খালা বললেন, কোথায় ছিলি এতোক্ষণ, কীসের এতো আনাগোনা রে? আমি বললাম, কার বাড়িতে যেন কি চুরি হয়েছে আর তার জন্য আমায় ধরেছিল।
খালা আগ্রহ নিয়ে বলেন, তারপর আসলি কেমনে? আমি খালাকে বুঝিয়ে সব বললাম।
খালা বলেন, তুই কি যে করিসনা ! এতো রাতে আবার কেন স্কুল মাঠে যেতে হবে? সারাদিন কত সময় পড়ে থাকে তখন বসে থাকিস কোন সমস্যা হবেনা। আচ্ছা এখন গিয়ে ঘুমা অনেক রাত হয়েছে।
লেখক সাইফুল ইসলাম (অপু)
- সাইফুল ইসলাম (অপু) -এর ব্লগ
- ২ টি মন্তব্য
- ০৯ নভেম্বর ২০১২, ১৯:৩৮
- উপন্যাস
প্রিন্ট করুন
-
সাম্প্রতিক পোস্ট
-
সাম্প্রতিক মন্তব্য





নীতিমালা
ব্লগ বই
অভিযোগ
সাম্প্রতিক পোস্ট

ফনেটিক
আপনার জন্য অবিরাম শুভকামনা।