বার্থ ডে ট্রিট
অনিন্দ্য অন্তর অপু

ঢং ঢং ঢং। ঘড়ির কাটা জানিয়ে দেয় রাত বারোটা
“মধুর আমার মায়ের হাসি...” মোবাইলে বাজে রিংটোনটা।
মায়ের ফোন, “বাবা আর একটা বছর পার করলি
আর একটু দায়িত্ব বেড়ে গেল তোর। আর একটু বড় হলি।”
একটু পর পর মামুন, মাসুদ, ইকবাল, রমি ফোন করে
ওরা শুভেচ্ছা জানায়, ট্রিটের জন্য বায়না ধরে।
কিন্তু কিছুতেই ওদের মাঝে মিল হয়না,
এক একজনের এক একরকম বায়না।
মামুন কেএফসি তে খাবে,
গরম চিকেন উইংসের সাথে ফ্রেঞ্চ ফ্রাইটা
নাকি দারুণ হয় ওখানে।
মাসুদের কেএফসি তে আপত্তি।
ওর পছন্দ পিজা হাট।
হালকা ভাপে তুলতুলে পিজা শর্মার স্বাদ নাকি ভোলা যায়না।
ইকবালের পছন্দ গুলশানের মোভেনপিকের সুইস আইসক্রিম।
এই শীতেও নাকি ওখানকার স্ট্রবেরি আর চকোলেট ভ্যানিলা
মাতাল করে দেবে।
রমির মোলায়েম গলা, “দোস্ত পঁচিশটা বছর পার করলি
নগদ একটা চাকুরীও পেয়ে গেলি।
এবার অন্তত ফুয়াং ক্লাবে চল।
নিয়ন আলোয় ব্লাক লেভেলে চুমুক দিতে দিতে
উন্মুক্ত নৃত্য দেখতে দেখবি কত্ত শান্তি।
জীবনে একবার অন্তত টেস্টটা নিলি।”
আজ আমার ২৫ তম জন্মদিন।
বন্ধুরা ধরেছে বার্থ ডে ট্রিট দিতে হবে।
আমি ওদের কাউকে নিরাশ করিনা,
“যা। কাল তোদের নিয়ে আমি আমার
জীবনের সেরা বার্থ ডে ট্রিট দেব।”
কুয়াশার চাদর মোড়া ভোরে আমরা পাঁচজন বের হই,
নিউ মার্কেট থেকে বাচ্চাদের শীতের কাপড় কিনি,
কিছু খেলনা নেই, কিছু ফল।
টিএসসি ক্যান্টিন থেকে কয়েকটা লান্স প্যাকেট নেই।
ওরা বহন করে। ওরা অবাক হয়।
আমার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়।
আমি স্মিত হাসি হেসে ওদের নিশ্চিত করি
আমি আমার দেয়া কথাটা ভুলিনি।
সত্যি ওদেরকে জীবনের সেরা বার্থ ডে ট্রিট দেব।
হাইকোর্টের সামনে, কার্জন হলের পাশে
ফুটপাতের উপর ছোট্ট খুপড়ির মত কয়েকটা ঘর।
শীতে কাপা উলঙ্গ কিছু বাচ্চা
ওদের মা ফুপিদের কোলে উষ্ণতা খুঁজছে।
আমি ওদের পাশে বসে পাঁচটা ছেলেমেয়েদের কাছে ডাকলাম।
ওরা কাপা শরীরে কোল থেকে বেড়িয়ে আসে।
আমি ওদের গায়ে শীতের কাপড় জড়িয়ে দেই।
ওরা কেউ আমাকে জড়িয়ে ধরে, কেউবা
শীতের জড়তাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মায়েদের
কোল ছেড়ে নিজেদের মত হাসে, খেলে, ঘুরে বেড়ায়।
নীলক্ষেতের মোড়ে ভিক্ষার থালা হাতে
এক থুড়থুড়ে বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে শীতে কাঁপছে।
গাছের ছায়া এড়িয়ে যেন একটু রোদের উষ্ণতা খুঁজছে।
আমরা ওকে একটা শীতের কাপড় দিলাম।
বৃদ্ধা নির্বাক। আমায় জড়িয়ে ধরে বলল,
“দাদু, খোদা তোর অনেক ভালা করব রে।”
বৃদ্ধার ঝাপসা চোখ আরও ঝাপসা হয়ে আসে।
নোংরা বস্ত্রহীন দেহ নিয়ে একটা পাগল রাস্তার পাশে
ডুকরে কাঁদছে। আমরা ওর পাশে দাড়ালাম।
ওকে এক প্যাকেট খাবার দিতেই ও ওর
নোংরা হাত দিয়ে খাবারটা গিলতে দেরী করেনা।
ওর দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে কত্তদিন খায়নি ও,
ওর বোধহীন নির্বাক চোখে শুধুই কৃতজ্ঞতা।
সোহরাওয়ার্দী উদ্দ্যানে আপন মনে খেলছিল কিছু পথশিশু।
ওদের সবাইকে কিছু অপরিচিত কিছু ফল দিলাম।
আপেল, কমলা, বেদনা, আঙ্গুর; ওদের কাছে অপরিচতই তো।
কেউ বলে লাল ফল, কেউ বলে কালা ফল,
কেউ বলে মিষ্টি। আহা আরাম; টসটস।
ছোট্ট কয়েকটা বাচ্চা ওদের বড় ভাই বা বোনের কোলে
টিপ টিপ করে দেখছিল। ওদের ঝুনঝুনি দিলাম,
বেলুন দিলাম, ছোট্ট কয়েকটা গাড়ি, রাজহাঁস, কিছু পুতুল।
ওরা যেন স্বর্গ সুখ পেল, আমরা যেন স্বর্গে এলাম।
এই স্বর্গে অনেক পরী, অনেক দেবদূত, অনেক সুখী মানুষ।
এত অল্পে মানুষ এত খুশী, এত সুখী হয় কি করে?
ছোট্ট চোখগুলো, ছোট্ট সোনা মুখগুলো
অবাক হয়ে দেখছিল। কেউ আমাদের জড়িয়ে
ধরছিল, কেউ ভাইয়া বলে কোলে উঠে আসছিল।
হাত বাড়ালেই বাচ্চাগুলো কোলে ঝুলে পড়ে।
যেন আমরা কত আপন, কত প্রিয়, কত কাছের।
বন্ধুদের নিয়ে খোলা মাঠের মধ্যে বসলাম,
টিএসসি ক্যান্টিনের ২০ টাকা বার্থ ডে ট্রিট প্যাকেট
সবার হাতে হাতে। ওরা আমার বন্ধু।
ওরা বলে, “দোস্ত সত্যি আজীবন থাকবে মনে।
তুই কিছু সুখ কিনে দিলি; খাদ্যবস্তুর সুখ একদিনের।
মনের সুখ, আত্মিক সুখ সারা জীবনের।”
কেএফসি, পিজা হাট, মোভেন পিক, ফুয়াং ক্লাবের
কয়েক মিনিটের মাত্র পাঁচজনের সুখটাকে
ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে বিলিয়ে দিলাম সবার মাঝে।
সুখের অংশ তাতে কমেনি, বেড়েছে হাজার গুনে।
ছোট্ট খাওয়ার সুখটাকে ত্যাগের সুখ দিয়ে খুব
সহজেই বাড়িয়ে নেয়া যায় অনেকগুনে।
খুব অল্প দামে, খুব অল্প দামে সুখ কেনা যায়,
সত্যি কিছু সুখ কেনা যায়, কিছু সুখ বিলানো যায়।












ঢং ঢং ঢং। ঘড়ির কাটা জানিয়ে দেয় রাত বারোটা
“মধুর আমার মায়ের হাসি...” মোবাইলে বাজে রিংটোনটা।
মায়ের ফোন, “বাবা আর একটা বছর পার করলি
আর একটু দায়িত্ব বেড়ে গেল তোর। আর একটু বড় হলি।”
একটু পর পর মামুন, মাসুদ, ইকবাল, রমি ফোন করে
ওরা শুভেচ্ছা জানায়, ট্রিটের জন্য বায়না ধরে।
কিন্তু কিছুতেই ওদের মাঝে মিল হয়না,
এক একজনের এক একরকম বায়না।
মামুন কেএফসি তে খাবে,
গরম চিকেন উইংসের সাথে ফ্রেঞ্চ ফ্রাইটা
নাকি দারুণ হয় ওখানে।
মাসুদের কেএফসি তে আপত্তি।
ওর পছন্দ পিজা হাট।
হালকা ভাপে তুলতুলে পিজা শর্মার স্বাদ নাকি ভোলা যায়না।
ইকবালের পছন্দ গুলশানের মোভেনপিকের সুইস আইসক্রিম।
এই শীতেও নাকি ওখানকার স্ট্রবেরি আর চকোলেট ভ্যানিলা
মাতাল করে দেবে।
রমির মোলায়েম গলা, “দোস্ত পঁচিশটা বছর পার করলি
নগদ একটা চাকুরীও পেয়ে গেলি।
এবার অন্তত ফুয়াং ক্লাবে চল।
নিয়ন আলোয় ব্লাক লেভেলে চুমুক দিতে দিতে
উন্মুক্ত নৃত্য দেখতে দেখবি কত্ত শান্তি।
জীবনে একবার অন্তত টেস্টটা নিলি।”
আজ আমার ২৫ তম জন্মদিন।
বন্ধুরা ধরেছে বার্থ ডে ট্রিট দিতে হবে।
আমি ওদের কাউকে নিরাশ করিনা,
“যা। কাল তোদের নিয়ে আমি আমার
জীবনের সেরা বার্থ ডে ট্রিট দেব।”
কুয়াশার চাদর মোড়া ভোরে আমরা পাঁচজন বের হই,
নিউ মার্কেট থেকে বাচ্চাদের শীতের কাপড় কিনি,
কিছু খেলনা নেই, কিছু ফল।
টিএসসি ক্যান্টিন থেকে কয়েকটা লান্স প্যাকেট নেই।
ওরা বহন করে। ওরা অবাক হয়।
আমার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়।
আমি স্মিত হাসি হেসে ওদের নিশ্চিত করি
আমি আমার দেয়া কথাটা ভুলিনি।
সত্যি ওদেরকে জীবনের সেরা বার্থ ডে ট্রিট দেব।
হাইকোর্টের সামনে, কার্জন হলের পাশে
ফুটপাতের উপর ছোট্ট খুপড়ির মত কয়েকটা ঘর।
শীতে কাপা উলঙ্গ কিছু বাচ্চা
ওদের মা ফুপিদের কোলে উষ্ণতা খুঁজছে।
আমি ওদের পাশে বসে পাঁচটা ছেলেমেয়েদের কাছে ডাকলাম।
ওরা কাপা শরীরে কোল থেকে বেড়িয়ে আসে।
আমি ওদের গায়ে শীতের কাপড় জড়িয়ে দেই।
ওরা কেউ আমাকে জড়িয়ে ধরে, কেউবা
শীতের জড়তাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মায়েদের
কোল ছেড়ে নিজেদের মত হাসে, খেলে, ঘুরে বেড়ায়।
নীলক্ষেতের মোড়ে ভিক্ষার থালা হাতে
এক থুড়থুড়ে বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে শীতে কাঁপছে।
গাছের ছায়া এড়িয়ে যেন একটু রোদের উষ্ণতা খুঁজছে।
আমরা ওকে একটা শীতের কাপড় দিলাম।
বৃদ্ধা নির্বাক। আমায় জড়িয়ে ধরে বলল,
“দাদু, খোদা তোর অনেক ভালা করব রে।”
বৃদ্ধার ঝাপসা চোখ আরও ঝাপসা হয়ে আসে।
নোংরা বস্ত্রহীন দেহ নিয়ে একটা পাগল রাস্তার পাশে
ডুকরে কাঁদছে। আমরা ওর পাশে দাড়ালাম।
ওকে এক প্যাকেট খাবার দিতেই ও ওর
নোংরা হাত দিয়ে খাবারটা গিলতে দেরী করেনা।
ওর দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে কত্তদিন খায়নি ও,
ওর বোধহীন নির্বাক চোখে শুধুই কৃতজ্ঞতা।
সোহরাওয়ার্দী উদ্দ্যানে আপন মনে খেলছিল কিছু পথশিশু।
ওদের সবাইকে কিছু অপরিচিত কিছু ফল দিলাম।
আপেল, কমলা, বেদনা, আঙ্গুর; ওদের কাছে অপরিচতই তো।
কেউ বলে লাল ফল, কেউ বলে কালা ফল,
কেউ বলে মিষ্টি। আহা আরাম; টসটস।
ছোট্ট কয়েকটা বাচ্চা ওদের বড় ভাই বা বোনের কোলে
টিপ টিপ করে দেখছিল। ওদের ঝুনঝুনি দিলাম,
বেলুন দিলাম, ছোট্ট কয়েকটা গাড়ি, রাজহাঁস, কিছু পুতুল।
ওরা যেন স্বর্গ সুখ পেল, আমরা যেন স্বর্গে এলাম।
এই স্বর্গে অনেক পরী, অনেক দেবদূত, অনেক সুখী মানুষ।
এত অল্পে মানুষ এত খুশী, এত সুখী হয় কি করে?
ছোট্ট চোখগুলো, ছোট্ট সোনা মুখগুলো
অবাক হয়ে দেখছিল। কেউ আমাদের জড়িয়ে
ধরছিল, কেউ ভাইয়া বলে কোলে উঠে আসছিল।
হাত বাড়ালেই বাচ্চাগুলো কোলে ঝুলে পড়ে।
যেন আমরা কত আপন, কত প্রিয়, কত কাছের।
বন্ধুদের নিয়ে খোলা মাঠের মধ্যে বসলাম,
টিএসসি ক্যান্টিনের ২০ টাকা বার্থ ডে ট্রিট প্যাকেট
সবার হাতে হাতে। ওরা আমার বন্ধু।
ওরা বলে, “দোস্ত সত্যি আজীবন থাকবে মনে।
তুই কিছু সুখ কিনে দিলি; খাদ্যবস্তুর সুখ একদিনের।
মনের সুখ, আত্মিক সুখ সারা জীবনের।”
কেএফসি, পিজা হাট, মোভেন পিক, ফুয়াং ক্লাবের
কয়েক মিনিটের মাত্র পাঁচজনের সুখটাকে
ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে বিলিয়ে দিলাম সবার মাঝে।
সুখের অংশ তাতে কমেনি, বেড়েছে হাজার গুনে।
ছোট্ট খাওয়ার সুখটাকে ত্যাগের সুখ দিয়ে খুব
সহজেই বাড়িয়ে নেয়া যায় অনেকগুনে।
খুব অল্প দামে, খুব অল্প দামে সুখ কেনা যায়,
সত্যি কিছু সুখ কেনা যায়, কিছু সুখ বিলানো যায়।











লেখক অনিন্দ্য অন্তর অপু
- অনিন্দ্য অন্তর অপু -এর ব্লগ
- ১২ টি মন্তব্য
- ১১ মার্চ ২০১২, ২২:০৭
- সমাজ
প্রিন্ট করুন
- ১২ টি মন্তব্য
-
সানশাইন ২৫ মার্চ ২০১২, ১০:২৮
আপনার জন্মদিনে এবং আপনার জীবনের প্রতিটি দিনের জন্য অনেক প্রার্থনা থাকছে আপনার জন্য, অনেক আশীর্বাদ!
(প্রতি জন্মদিনেই কি এভাবে কাঁদাবেন?) -
অসংজ্ঞায়িত মেহেদী০৪ ডিসেম্বর ২০১২, ২৩:৪৩
খাদ্যবস্তুর সুখ একদিনের।
মনের সুখ, আত্মিক সুখ সারা জীবনের।”


অন্তর ছুয়ে যাওয়া কবিতা। খুব, খুব ভালো লেগেছে


ঐ বৃদ্ধের মতো আমারও বলতে ইচ্ছে করেছে খোদা তোর অনেক ভালা করব রে।”
-
সাম্প্রতিক পোস্ট
-
সাম্প্রতিক মন্তব্য





নীতিমালা
ব্লগ বই
অভিযোগ
সাম্প্রতিক পোস্ট

ফনেটিক
জন্ম দিনের সত্যিকার আনন্দ এটাই --শুভেচ্ছা