বৃহস্পতিবার ১৭ এপ্রিল ২০১৪, ৪ বৈশাখ, ১৪২১ সাইনইন | রেজিস্টার |bangla font problem


ঊনযাজক – ১


মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক গল্প ঊনযাজক, গল্পটির প্রতিটি চরিত্র কাল্পনিক।

আতশবাজির আলো ঝলমল রাতের আকাশটা যেন উল্কার মিছিলে পরিণত হয়েছে। চারিদিকে মানুষের কোলাহল উচ্ছ্বাস চিৎকার, আবার হঠাৎ নিস্তব্ধতা, আবারও থেমে থেমে অন্ধকার আকাশটা আলো আঁধারের লুকোচুরিতে কখনো কখনো আলো আঁধারের খেলায় আরও অন্ধকার হয়ে এসেছে। আবার সব স্তব্ধ, হিম ভোরের মত শুনশান নীরবতা। সেই দূরে কোথাও থেমে থেমে উন্মাদ চিৎকার, আবারও কোলাহল আবারও আর্তনাদ। মধ্যরাতের ঘুম ঘুম চোখে এই অবস্থা দেখে কি হচ্ছে প্রথমে বুঝতে একটু অসুবিধা হলেও, পরোক্ষণেই সব বুঝেতে অসুবিধা হয়না ইকবালের। ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দিব, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ’, গত কয়েকদিনের উত্তাল কথাগুলো আজ সত্যি সত্যি বাস্তবিক দেখা যাচ্ছে।

ইকবালের বৃদ্ধ বাবা-মা সহ পরিবারের অন্যান্য সবাই থাকেন তাঁর গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জে। পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে তাঁর উপর অনেক দায়িত্ব, তাই দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে বছর খানেক আগে ঢাকায় এসেছে, এখানে এসে অনেক কিছু করার চেষ্টা করেও সুবিধা করতে পারেনি। তাই শেষ পর্যন্ত ছোট-খাটো একটি কাপড়ের দোকান দিয়ে নিজেই ব্যবসা শুরু করেছে। সংসারের টানাপোড়নে লেখাপড়া তেমন করতে পারেনি, স্কুলের আঙিনা পার হতেই সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিতে হয়েছে। নয় ভাই বোনের বিশাল সংসারে সবার বড় সন্তান হিসেবে ইকবালের অনেক দায়িত্ব, তাই তো সেই দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে ঢাকা শহরে এসেছে। অনেক স্বপ্ন ইকবালের, সে অনেক বড় হতে চায়, অনেক টাকার মালিক হতে চায়। তাঁর মতে টাকা হলেই গরীবের সব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব, টাকার জন্যই তো তাঁর ঢাকায় আসা।

ঢাকায় নাকি টাকা উড়ে, তাই তো সেই স্বপ্ন-বিভোর হয়ে নববধূকে সাথে নিয়ে এই বিশাল ঢাকায় চলে এসেছে। গ্রামের বাড়িতে যেটুকু জমিজমা আছে তা দিয়ে সারা বছরের খোঁড়াক চলেনা। ছোট ছোট ভাই বোনদের লেখাপড়া চালিয়ে যেতে হবে, ওদের মানুষের মত মানুষ করতে হবে এই ব্রত নিয়ে নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও সবাইকে শিক্ষিত করতে চায় ইকবাল। তাই তো তাঁর অনেক টাকা চাই, আর টাকার জন্যই এই ঢাকায় আসা।

মর্টার, ট্যাঙ্ক আর কামান শেলের শব্দে যেন কানে তালা লেগে যাওয়ার অবস্থা। উল্কা বৃষ্টির মত আকাশে উড়ছে কামানের গুলাগুলো, তাই দেখেই ইকবালের কাছে আকাশে আতশবাজি আর বিজলিবাতির উল্কা মাতম মনে হয়েছিল।

বাহির থেকে তড়িঘড়ি করে ঘরে ফিরেই তড়িঘড়ি বউকে ঘুম থেকে তুলে দিয়ে, ইকবাল আবার ঘরের বাহিরে চলে গেল। সারা ঢাকা শহর যেন উন্মাদ উন্মাদনার শহরে পরিণত হয়েছে। চারিদিকে মর্টার, কামান, গুলা-গুলির শব্দ আর মানুষের চিৎকার শুনা যাচ্ছে, কোলাহল-কান্নার শব্দে যেন কেয়ামত নেমে এসেছে। ঘরে ফিরে বউকে তাড়াতাড়ি তৈরি হতে বলে, সকাল হলে অবস্থা বুঝে গ্রামের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে যাবে।

সকাল হতেই চারিদিকে নিশ্চুপ নিস্তব্ধতা, রাস্তায় কোন মানুষ দেখা যাচ্ছে না। মাঝে মাঝে সাইরেন বেজে উঠছে আর রাস্তা কাঁপানো ট্যাংকগুলোর বিকট গর্জনে চলছে মিলিটারির টহল। সারা শহরে কারফিউ চলবে সন্ধ্যা পর্যন্ত। আজ সন্ধ্যার পর ভাগ্যে কি আছে কি জানি, এসব ভাবতে ভাবতে ইকবাল অসহায়ের মত চেয়ে থাকে তাঁর বউয়ের দিকে।

ইকবাল সারাদিন চিন্তা করতে থাকে কিভাবে ঢাকা শহর ছাড়া যায়। প্রাথমিক ভাবে চিন্তা করেছিল সাভার হয়ে পায়ে হেঁটে আরিচার দিকে চলে যাবে। কিন্তু ওই দিকে সেনানিবাসের দীর্ঘপথে সেনা টহলের কথা মনে পড়তেই অন্য পথের চিন্তা করতে থাকে। অন্য কোন পথে বেড়িয়ে যাওয়া যায় তা ভাবতে থাকে। বুড়িগঙ্গা পার হয়ে মাওয়া তারপর অন্য কোথাও আশ্রয় নিবে এমন একটা কিছু ভাবতে ভাবতে সন্ধ্যার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। মাগরিবের নামায পড়ে জায়নামাজেই বসে আছে, ঠিক এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ পেল। কিন্তু সে কোন কথাই বলছেনা। দেশের এমন উত্তাল সময়ে কি করবে বুঝে উঠতে না পেরে চুপচাপই বসে রইল। দরজায় আবারও কড়া নাড়ার শব্দ আরও কয়েকবার তারপর ফিসফিস নারী পুরুষের কানাকানির শব্দও পাওয়া গেল। আবারও কয়েকবার দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ, তারপর বাহির থেকে স্পষ্ট আওয়াজ,

ভিতরে কেউ আছেন? থাকলে দরজাটা একটু খুলুন, আমরা আপনার পাশের বাড়ির লোক।

ইকবালের পাশের বাড়িতে একটি হিন্দু পরিবার থাকেন। ওঁদের দেখেই মনে হয় ওঁরা বেশ পয়সা ওয়ালা, কিন্তু কোনদিন কথা হয়নি। আর তাছাড়া ওঁদের সাথে কোন কথাবার্তা হওয়ার কোন উপলক্ষই তৈরি হয়নি, ওঁরা উঁচুতলার মানুষ, আর সে একজন সামান্য ফুটপাতের দোকানদার, অতিসাধারণ একজন খেটে খাওয়া মানুষ। তাই তো ওঁদের কথা শুনতেই ঝটপট দরজাটা খুলে দিল, দরজাটি খুলতেই পঞ্চাশোর্ধ একজন ভদ্রলোক ও ভদ্র মহিলা ঘরের ভিতর হুড়মুড় করে ঢুঁকে পরলেন।

আমি হরিদাস কুণ্ডু ও আমার স্ত্রী প্রমীলা কুণ্ডু।

কণ্ঠে ভয়ঙ্কর আকুতি, চোখে মুখে চঞ্চলতা দেখেই মনে হয় অত্যন্ত অস্থির দিক বিদিক জ্ঞানশূন্য। ইকবালের হাত ধরেই বললেন, দয়াকরে আমাদের একটু সাহায্য করুন। আজ সকালে আমাদের একটিমাত্র ছেলেটাকে পাক-বাহিনী ধরে নিয়ে গেছে, আমরা কোন রকমে সিন্দুকে লুকিয়ে থেকে রক্ষা পেয়েছি, জানিনা আমার মানিকের কপালে কি আছে, পাক-সেনারা আমাদেরকে পেলেও জানে মেরে ফেলবে, দয়াকরে আপনারা আমাদেরকে বাঁচান, প্লীজ।

ইকবাল নিজেই বড় বিপদের মধ্যে আছে তার উপর এই দুজন বয়স্ক লোক এসে আরও বিপদের মাঝে ফেলে দিল। ইকবাল অনেকক্ষণ চুপচাপ থেকে বলল,

আমি আপনাদের কিভাবে বাঁচাব? আমিতো নিজেই তো বিপদগ্রস্ত।

একথা শুনা মাত্রই পঞ্চাশোর্ধ হরিদাস ইকবালের একেবারে পায়ে ধরে ফেললেন। ছেলেমানুষের মত হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন।

দেখুন আপনারা ছাড়া আমি এমন কাউকে দেখছিনা যারা আমাদের সাহায্য করত পারে। কেউ এখানে এলে আপনারা শুধু বলবেন আমরা আপনার বাব মা। তা নাহলে ওরা আমাদের মেরে ফেলবে। আমরা হিন্দু দয়া করে আমাদের ছেড়ে যাবেন না।

হরিদাস কুণ্ডের কথাগুলো শুনে ইকবালের গল্পের মত মনে হল। হরিদাস সাহেবের কিংকর্তব্য ছলছল চোখগুলোর দিকে নির্বিকার চেয়ে থাকে। নিজের অক্ষমতা জেনেও হাতটা আদরে চলে যায় হরিদাস কুণ্ডের কাঁধে।

কি করছেন এসব। এখন কি এসব করার সময়। আপনি আমার বাবার চেয়েও বড়, আপনি কিনা। সে যাই হোক চিন্তা করবেন না। যদি বাঁচি তাহলে একসঙ্গেই বাঁচব আর যদি মরি তাহলেও একসঙ্গে।


হরিদাস সাহেব এমনভাবে ইকবালকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন যেন হারিয়ে যাওয়া সন্তানকে আঁকড়ে ধরেছেন। আবার না যেন হারিয়ে যায়। সবার চোখে জল। ইতিমধ্যে প্রমীলা হাতের বালা শাঁখা খুলে ফেলেছেন। মাথার সিঁদুর আগে থেকেই মুছা আছে। তারপরও নিশ্চিত হওয়ার জন্য বারবার হাতের তালু দিয়ে সিঁথিতে ঘসতে লাগলেন। প্রমীলার পড়নের কাপড়টাও অনেক দামি কিন্তু ঐ বয়সের কাপড় তো ইকবালের বউ শিরিনের কাছে নেই।

হরিদাস সাহেব বললেন, আমার বাড়িতে কাজের লোকদের কিছু পুরনো কাপড় আছে। সেগুলো আনতে পাড়লে ভাল হয়, তাছাড়া তাড়াহুড়োর মধ্যে বেড়িয়ে এসেছি বলে আমরাও কোন টাকা পয়সা আনতে পারিনি। এই বলেই হরিদাস কুণ্ড ইকবালের ডান হাতটি ধরে নিয়ে তাঁর বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলেন।

হরিদাস বাবু খুব দ্রুত উপরে উঠে গেলেন। কিছুক্ষণ পর লক্ষ্য করলেন ইকবাল নিচের বসার ঘরে দাঁড়িয়ে আছে। হরিদাস বাবু ইকবালকে ইশারায় উপরে উঠে আসতে বলেই অন্য এক কামড়ায় চলে গেলেন। ইকবাল উপরে উঠার সাহস হয় না। এত বড় বাড়ি। বিশাল বসার ঘর। বসার ঘরে দামি দামি আসবাব পত্র। বসার ঘর হয়ে সিঁড়ি উঠে গেছে উপরের ঘরগুলোতে।

সিঁড়ি দিয়ে উঠতেই চোখে পড়ল হরিদাস বাবু যেন কোন এক ঘরে নিমিষেই হারিয়ে গেলেন। সেদিকে ইকবালের কোন লক্ষ্যই নেই। মনে হচ্ছে ধীরে ধীরে এই বাড়িটা তাঁর চোখে লেগে যাচ্ছে। চারিদিকে যতই দেখছে ততই সে যুদ্ধ পরিস্থিতি মন থেকে হাড়িয়ে যাচ্ছে।

হঠাৎ হরিদাস বাবুর ডাকে যেন চৈতন্য ফিরে এলো ইকবালের। হরিদাস বাবু হাতের ইশারায় তাঁর দিকে যেতে বললেন। সেখানে গিয়েই তাঁর চোখ চরাক গাছ। তাঁর চোখ যেন কপালে উঠে গেল। একটি ঘরের মধ্যে একটি গোপন ঘর। সে ঘরে একটি বিশাল চৌকাঠের সিন্দুক। হরিদাস বাবু সিন্দুক খুলে দাঁড়িয়ে আছেন। একা এই সিন্দুকের দরজা তোলা যায়না, অনেক ভারী, তাই তাড়াতাড়ি হাত লাগাতে হল ইকবালকে। কাঠের চৌকাঠটি খুলতেই ভিতরের সোনা গহনা আর টাকার পরিমাণ দেখে ইকবাল যেন হতবাক হয়ে গেল। হরিদাস বাবু কয়েকটি টাকার বাণ্ডিল হাতে নিয়ে চৌকাঠের দরজাটা বন্ধ করে দিলেন। কিন্তু ইকবালের চোখের সামনে লীলায়িত চোখটি বন্ধ হল না। যেন পলকহীন চোখ দুটি চকচক করতে লাগল।
১ টি মন্তব্য
sulary আলভী০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৯:৫৫