লোকমানের দিন রাত্রি ও একটি কৌতুক
দৈনন্দিন কার্যসূচির ধারাবাহিকতায় প্রতিদিন সকালবেলা নাস্তা করতে যাই প্রশাসনিক ভবনের স্টাফ ক্যান্টিনে। প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে। আটটা থেকে সাড়ে আটটা সাধারণত পার হয়না। স্টাফ ক্যান্টিন হলেও, এই সময়টায় ছাত্রদরেই বেশি দেখা যায় এখানে। স্টাফদের ভীড় বাড়ে সাড়ে আটটার পর থেকে। বিষয়টা একটু পরিষ্কার করি। আমি থাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্য সেন হলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস সম্বন্ধে যাদের ধারণা আছে, তারা জানেন, প্রশাসনিক ভবন আর সূর্য সেন হল একেবারেই পাশাপাশি।
আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ব্যাপ্তিকাল সাত বছরের মতো। প্রথম থেকেই আমার এই ক্যান্টিনে কমবেশি আসা যাওয়া ছিলো। তখন থেকেই একটা ছেলেকে এখানে কাজ করতে দেখে আসছি। বয়সে আমার চেয়ে হয়তো দু এক বছরের ছোটোই হবে। অক্লান্ত পরিশ্রমী। ক্যান্টিনে যাতায়াতের এ সময়টাতে কোনোদিনও অকারণ বসে সময় নষ্ট করতে কিংবা কাজে ফাঁকি দিতে দেখিনি। নাম লোকমান। এখানে সে খাবার পরিবেশনের কাজ করে। লোকমানের সাথে আমার পরিচয়ের পর থেকে অনেক ক্যান্টিন কর্মচারীই কাজ হারিয়েছে। কিন্তু লোকমান আজো বহাল আছে।এই সাত বছর সময়ে তার সাথে কাজের কথা ছাড়া বাড়তি একটি কথাও এতদিন হয়নি। প্রতিদিন বিকেলবেলা, সন্ধ্যেটা ঘনিয়ে আসার ঠিক আগের সময়টায়, হলের গেইটে তাকে চানাচুর বিক্রি করতে দেখি। মাঝে মাঝে বন্ধুরা মিলে যে পাঁচ দশ টাকার কিনে খাইনা, তাও নয়। কিন্তু আধুনিক জনবিচ্ছিন্ন সমাজের নগর জীবনের নাগরিক আমি। ওর সাথে বাড়তি কোনো কথার কোনো প্রয়োজনই কখোনোই বোধ করিনি। ইট-কাঠ-পাথর আর কংক্রিটের নগর জীবনের আর চৌদ্দটা মানুষের ব্যতিক্রম আমি নই। সারাক্ষণ আত্মকেন্দ্রিক চিন্তাধারা আর নিজের ক্ষূদ্র জগৎ ছেড়ে, আকাশের বিশালতা দেখার সুযোগ মেলেনা। আকাশের কথা নাই বা বললাম- সাত বছর হল বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের। পাশের কক্ষের ছেলেটার সাথেওতো পরিচয় নেই; এমনকি তার নামটা পর্যন্ত জানিনা-কারো সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, ভালোলাগা-মন্দলাগার অনুভূতিগুলো ভাগাভাগিতো অনেক দূরের কথা। শহর এবং এখানকার মানুষ সম্বন্ধে আমার একটা ধারণা একেবারে বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছে। মনে হয় এখানে হাত আছে আদর নেই; মানুষ আছে মানস নেই, অন্তর আছে আন্তরিকতা নেই। সত্তা বলতে শুধু একটাই ‘আমি’।
প্রতিদিনের থেকে আমার আজকের সকালটা কিছুটা ভিন্ন। কেন জানি সকাল সকালই ঘুমটা ভেঙে গেলো। শিয়রের কাছ থেকে মোবাইলটা টেনে নিয়ে দেখি সবে পৌনে সাতটা বাজে। চোখ মেলতেই বাইরে অনেক আলো চোখে পড়লো। তবুও কেন যেন ‘ভোর ভোর’ই মনে হলো আমার কাছে। মোবাইলটা রেখে আরেকটু ঘুমাতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু নাহ! ঘুম আর এলোনা। বিছানাটা গুছিয়ে, গোসল সেরে, পা বাড়ালাম প্রশাসনিক ভবনের দিকে। লক্ষ্য একটাই- উদরপূর্তি।
আমি যখন ক্যান্টিনে পৌঁছলাম, তখনও সাড়ে সাতটা বাজতে বেশ কয়েক মিনিট বাকি। অন্যান্য দিনের চেয়ে একেবারেই আজ ভিন্ন চিত্র। জনতার ভীড় একেবারেই নেই। হাতে গোনা তিন থেকে চারজন লোক নাস্তা করছে। পাশের একটা টেবিলে বসে কয়েকজন ক্যান্টিন-বয় আড্ডা দিচ্ছে। কারো তেমন কোনো ব্যস্ততা নেই। ব্যস্ততা শুধু খাবার প্রস্তুতকারীদের। কিছুক্ষণ পরেই লোকজনের চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাবে তারা। এসময়টা তাদের মজুদ বাড়ানোর।
ক্যান্টিনের একটি টেবিলে বসে লোকমান। সে নাস্তা করছে। আমি ডান বাম না ভেবে, ওর সামনের চেয়ারটায় বসলাম। ওর খাবারের সময় না হলে, আমার জন্য খাবার আনতে সেই যেতো। কিন্তু এখন সে অর্ডার দিলো অন্যজনকে। প্রথম কয়েক মিনিট বসে রইলাম কোনো কথা নেই। আবার কথা ছাড়া সময়টা ভালোও কাটছিলোনা। অগত্যাই জিজ্ঞেস করে বসলাম, ‘লোকমান তোর গ্রামের বাড়ি কোথায়রে?’
প্রথমে একটু ইতস্তত করে, পরক্ষণেই পুরোপুরি স্বাভাবিকভাবে উত্তর দিলো ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া’। আবার একরাশ নীরবতা। সেটা ভাঙলাম আমিই। বললাম, ‘কতদিন ধরে আছিস, এখানে?’ দেখলাম ছেলেটি বেশ সদালাপী। কথায় কথায় অনেক কথাই হলো। সে জানালো যে সে এখানে কাজ করছে দীর্ঘ নয় বছর ধরে। এক বোন আর চার ভাই নিয়ে বড় সংসার। বয়স্ক বাবার পক্ষে সংসার চালানো অসম্ভব। বোনটা সবার বড়। বিয়ে হয়েছে পাশের গ্রামেই। ভাইদের মধ্যে সে দ্বিতীয়। ছা-পোষা সংসারে পড়ালেখা করার সুযোগ হয়নি বড় দুই ভাইয়ের একজনেরও। বড় ভাই বিয়ে করে বউ নিয়ে আলাদা। এখন তার ওপরই সংসারের পুরো ভার।
এতগুলো কথাও হয়তো তার সাথে আমার হতোনা। আগামিকাল (২৫ নভেম্বর ২০১২) বিশ্ববিদ্যালয়ে আশুরার ছুটি। এনিয়ে সে বলছিলো, ‘ছুটি থাকলে, বাল্লাগেনা’।
-কেনরে?
-এই মনে করেন, ছুটির দিনে ব্যাতন নাই, কাম নাই, কাইজ নাই…
-‘ক্যানো! ছুটির দিনে বেতন দেয়না?’ আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
-নাহ! মনে করেন, এইহানে কাম করি দিন হিসাবে, মাস হিসাবে না।
-‘দিন কত দেয় তোকে?’ অসভ্যের মতো প্রশ্ন করলাম।
-৪২০ ট্যাকা। ওর সরল উত্তর।
কথা হলো সংসার নিয়ে। জিজ্ঞেস করলাম এই টাকায় তার সংসার চলে কিনা।
-না চইল্লা করবো কী! দ্যাহেন্ইত, বাই- বিকালে চ্যানাছুর বেছি। এই ট্যাহা আর ঐ ট্যাহা মিল্যা চলে বালাই।
-চানাচুর চলে ক্যামন?
-চলে বালাই। মনে করেন, তিন চাইশ্শ ট্যাকা বেছলে, অর্দেক থাহে আরকি। আরকি, খুব বেশি কষ্ট অয়, বুজলাইন বাই। সকাল বিকাল দুই বেলা এইহানে কাম করনের পরে, সারাডা বিকাল খাড়ইয়া (দাঁড়িয়ে) থাহা সহজ না।
এতদিন ধরে এই ছেলেটাকে ঠিক এই কাজগুলোই করে আসতে দেখছি- কখনও এক গভীরভাবে ভাবিনি।
একথাগুলোর পর আরও অবাক হলাম যখন সে বললো যে রাতে সে অন্য আরেক জায়গায় কাজ করে। সে কাজের ধরণও আবার পুরোপুরি ভিন্ন। রাতে সে একটা ডেকোরেশানের (সাজসজ্জা) কাজ করে। সেখান থেকে সে কিছু পারিশ্রমিক পায়। কাজের পাশাপাশি সে কাজের ছেলেপেলেও সরবরাহ করে থাকে। প্রতি চার পাঁচজন ছেলের জন্য তাকে অতিরিক্ত ২০০ টাকা দেওয়া হয়। তার গল্প শুনে অবাক বিষ্ময়ে হতবাক হলাম। একটা মানুষের কতটা জীবনীশক্তি থাকলে সে এতটা কর্মঠ হতে পারে! তারপরও তার স্বপ্ন দেখা থেমে নেই। সে জানালো, ছোটো ভাইটা এবার মেট্রিক দেবে। তাকে নিয় অনেক আশা তার। তার আশা ছোটো ভাই দুটোকে একটু গুছিয়ে দিয়ে, সংসারটা সাজিয়ে, তারপর ঘরে আনার ইচ্ছে মানস-সুন্দরী- একটা টুকটুকে বউ।
ইতোমধ্যে আমার নাস্তা শেষ। লোকমানের গল্প শুনতে শুনতে কাটাচ্ছিলাম আরো কিছুটা সময়। এখন প্রায় আটটা বাজতে চললো। মানুষের ভীড় আস্তে আস্তে বাড়তে শুরু করেছে। চেয়ার ছেড়ে উঠে আমি রওনা দিলাম হলের দিকে। লোকমান তার প্রাত্যহিক কাজে মন দিলো।
হলে আসার পথটাতে মনে মনে ভাবলাম, এতদিন আমি ভাবতাম আমি খুব প্রাণশক্তিসম্পন্ন একটা ছেলে। আর লোকমানরে গল্প শুনে আমার একটা কৌতুক মনে পড়ে গেলো। হয়তো আপনারা সবাই এটা শুনে থাকবেন। তারপরও বলি। অশিতীপর এক বৃদ্ধ ভাবলেন এখন বয়স হয়েছে। কখন ওপারের ডাক আসে বলাতো যায়না। এই ভেবে তিনি তীর্থ যাত্রায় রওনা হলেন। পথে যাত্রাকালে তিনি তার চেয়ে কম বয়সী অনেক তীর্থযাত্রী দেখে ভাবলেন যে তিনি ঠিকই করেছেন, আর দেরি করা উচিৎ হতোনা। পথিমধ্যে হঠাৎ এক বাড়ির কাছে গিয়ে তিনি অবাক হলেন। তারও চেয়ে অনেক বেশি বয়োঃবৃদ্ধ এক ভদ্রলোক বসে কাঁদছেন। ভদ্রলোকের কাছে তিনি জানতে চাইলেন কেন তিনি কাঁদছিলেন। ভদ্রলোক বললেন, “দাদারে তামুক বানাইয়া দেইনাই বইলা, আব্বায় আমারে মারছে।” আমার ভাবনাটা ছিলো সেই অশিতীপরের মতো।
আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ব্যাপ্তিকাল সাত বছরের মতো। প্রথম থেকেই আমার এই ক্যান্টিনে কমবেশি আসা যাওয়া ছিলো। তখন থেকেই একটা ছেলেকে এখানে কাজ করতে দেখে আসছি। বয়সে আমার চেয়ে হয়তো দু এক বছরের ছোটোই হবে। অক্লান্ত পরিশ্রমী। ক্যান্টিনে যাতায়াতের এ সময়টাতে কোনোদিনও অকারণ বসে সময় নষ্ট করতে কিংবা কাজে ফাঁকি দিতে দেখিনি। নাম লোকমান। এখানে সে খাবার পরিবেশনের কাজ করে। লোকমানের সাথে আমার পরিচয়ের পর থেকে অনেক ক্যান্টিন কর্মচারীই কাজ হারিয়েছে। কিন্তু লোকমান আজো বহাল আছে।এই সাত বছর সময়ে তার সাথে কাজের কথা ছাড়া বাড়তি একটি কথাও এতদিন হয়নি। প্রতিদিন বিকেলবেলা, সন্ধ্যেটা ঘনিয়ে আসার ঠিক আগের সময়টায়, হলের গেইটে তাকে চানাচুর বিক্রি করতে দেখি। মাঝে মাঝে বন্ধুরা মিলে যে পাঁচ দশ টাকার কিনে খাইনা, তাও নয়। কিন্তু আধুনিক জনবিচ্ছিন্ন সমাজের নগর জীবনের নাগরিক আমি। ওর সাথে বাড়তি কোনো কথার কোনো প্রয়োজনই কখোনোই বোধ করিনি। ইট-কাঠ-পাথর আর কংক্রিটের নগর জীবনের আর চৌদ্দটা মানুষের ব্যতিক্রম আমি নই। সারাক্ষণ আত্মকেন্দ্রিক চিন্তাধারা আর নিজের ক্ষূদ্র জগৎ ছেড়ে, আকাশের বিশালতা দেখার সুযোগ মেলেনা। আকাশের কথা নাই বা বললাম- সাত বছর হল বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের। পাশের কক্ষের ছেলেটার সাথেওতো পরিচয় নেই; এমনকি তার নামটা পর্যন্ত জানিনা-কারো সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, ভালোলাগা-মন্দলাগার অনুভূতিগুলো ভাগাভাগিতো অনেক দূরের কথা। শহর এবং এখানকার মানুষ সম্বন্ধে আমার একটা ধারণা একেবারে বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছে। মনে হয় এখানে হাত আছে আদর নেই; মানুষ আছে মানস নেই, অন্তর আছে আন্তরিকতা নেই। সত্তা বলতে শুধু একটাই ‘আমি’।
প্রতিদিনের থেকে আমার আজকের সকালটা কিছুটা ভিন্ন। কেন জানি সকাল সকালই ঘুমটা ভেঙে গেলো। শিয়রের কাছ থেকে মোবাইলটা টেনে নিয়ে দেখি সবে পৌনে সাতটা বাজে। চোখ মেলতেই বাইরে অনেক আলো চোখে পড়লো। তবুও কেন যেন ‘ভোর ভোর’ই মনে হলো আমার কাছে। মোবাইলটা রেখে আরেকটু ঘুমাতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু নাহ! ঘুম আর এলোনা। বিছানাটা গুছিয়ে, গোসল সেরে, পা বাড়ালাম প্রশাসনিক ভবনের দিকে। লক্ষ্য একটাই- উদরপূর্তি।
আমি যখন ক্যান্টিনে পৌঁছলাম, তখনও সাড়ে সাতটা বাজতে বেশ কয়েক মিনিট বাকি। অন্যান্য দিনের চেয়ে একেবারেই আজ ভিন্ন চিত্র। জনতার ভীড় একেবারেই নেই। হাতে গোনা তিন থেকে চারজন লোক নাস্তা করছে। পাশের একটা টেবিলে বসে কয়েকজন ক্যান্টিন-বয় আড্ডা দিচ্ছে। কারো তেমন কোনো ব্যস্ততা নেই। ব্যস্ততা শুধু খাবার প্রস্তুতকারীদের। কিছুক্ষণ পরেই লোকজনের চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাবে তারা। এসময়টা তাদের মজুদ বাড়ানোর।
ক্যান্টিনের একটি টেবিলে বসে লোকমান। সে নাস্তা করছে। আমি ডান বাম না ভেবে, ওর সামনের চেয়ারটায় বসলাম। ওর খাবারের সময় না হলে, আমার জন্য খাবার আনতে সেই যেতো। কিন্তু এখন সে অর্ডার দিলো অন্যজনকে। প্রথম কয়েক মিনিট বসে রইলাম কোনো কথা নেই। আবার কথা ছাড়া সময়টা ভালোও কাটছিলোনা। অগত্যাই জিজ্ঞেস করে বসলাম, ‘লোকমান তোর গ্রামের বাড়ি কোথায়রে?’
প্রথমে একটু ইতস্তত করে, পরক্ষণেই পুরোপুরি স্বাভাবিকভাবে উত্তর দিলো ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া’। আবার একরাশ নীরবতা। সেটা ভাঙলাম আমিই। বললাম, ‘কতদিন ধরে আছিস, এখানে?’ দেখলাম ছেলেটি বেশ সদালাপী। কথায় কথায় অনেক কথাই হলো। সে জানালো যে সে এখানে কাজ করছে দীর্ঘ নয় বছর ধরে। এক বোন আর চার ভাই নিয়ে বড় সংসার। বয়স্ক বাবার পক্ষে সংসার চালানো অসম্ভব। বোনটা সবার বড়। বিয়ে হয়েছে পাশের গ্রামেই। ভাইদের মধ্যে সে দ্বিতীয়। ছা-পোষা সংসারে পড়ালেখা করার সুযোগ হয়নি বড় দুই ভাইয়ের একজনেরও। বড় ভাই বিয়ে করে বউ নিয়ে আলাদা। এখন তার ওপরই সংসারের পুরো ভার।
এতগুলো কথাও হয়তো তার সাথে আমার হতোনা। আগামিকাল (২৫ নভেম্বর ২০১২) বিশ্ববিদ্যালয়ে আশুরার ছুটি। এনিয়ে সে বলছিলো, ‘ছুটি থাকলে, বাল্লাগেনা’।
-কেনরে?
-এই মনে করেন, ছুটির দিনে ব্যাতন নাই, কাম নাই, কাইজ নাই…
-‘ক্যানো! ছুটির দিনে বেতন দেয়না?’ আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
-নাহ! মনে করেন, এইহানে কাম করি দিন হিসাবে, মাস হিসাবে না।
-‘দিন কত দেয় তোকে?’ অসভ্যের মতো প্রশ্ন করলাম।
-৪২০ ট্যাকা। ওর সরল উত্তর।
কথা হলো সংসার নিয়ে। জিজ্ঞেস করলাম এই টাকায় তার সংসার চলে কিনা।
-না চইল্লা করবো কী! দ্যাহেন্ইত, বাই- বিকালে চ্যানাছুর বেছি। এই ট্যাহা আর ঐ ট্যাহা মিল্যা চলে বালাই।
-চানাচুর চলে ক্যামন?
-চলে বালাই। মনে করেন, তিন চাইশ্শ ট্যাকা বেছলে, অর্দেক থাহে আরকি। আরকি, খুব বেশি কষ্ট অয়, বুজলাইন বাই। সকাল বিকাল দুই বেলা এইহানে কাম করনের পরে, সারাডা বিকাল খাড়ইয়া (দাঁড়িয়ে) থাহা সহজ না।
এতদিন ধরে এই ছেলেটাকে ঠিক এই কাজগুলোই করে আসতে দেখছি- কখনও এক গভীরভাবে ভাবিনি।
একথাগুলোর পর আরও অবাক হলাম যখন সে বললো যে রাতে সে অন্য আরেক জায়গায় কাজ করে। সে কাজের ধরণও আবার পুরোপুরি ভিন্ন। রাতে সে একটা ডেকোরেশানের (সাজসজ্জা) কাজ করে। সেখান থেকে সে কিছু পারিশ্রমিক পায়। কাজের পাশাপাশি সে কাজের ছেলেপেলেও সরবরাহ করে থাকে। প্রতি চার পাঁচজন ছেলের জন্য তাকে অতিরিক্ত ২০০ টাকা দেওয়া হয়। তার গল্প শুনে অবাক বিষ্ময়ে হতবাক হলাম। একটা মানুষের কতটা জীবনীশক্তি থাকলে সে এতটা কর্মঠ হতে পারে! তারপরও তার স্বপ্ন দেখা থেমে নেই। সে জানালো, ছোটো ভাইটা এবার মেট্রিক দেবে। তাকে নিয় অনেক আশা তার। তার আশা ছোটো ভাই দুটোকে একটু গুছিয়ে দিয়ে, সংসারটা সাজিয়ে, তারপর ঘরে আনার ইচ্ছে মানস-সুন্দরী- একটা টুকটুকে বউ।
ইতোমধ্যে আমার নাস্তা শেষ। লোকমানের গল্প শুনতে শুনতে কাটাচ্ছিলাম আরো কিছুটা সময়। এখন প্রায় আটটা বাজতে চললো। মানুষের ভীড় আস্তে আস্তে বাড়তে শুরু করেছে। চেয়ার ছেড়ে উঠে আমি রওনা দিলাম হলের দিকে। লোকমান তার প্রাত্যহিক কাজে মন দিলো।
হলে আসার পথটাতে মনে মনে ভাবলাম, এতদিন আমি ভাবতাম আমি খুব প্রাণশক্তিসম্পন্ন একটা ছেলে। আর লোকমানরে গল্প শুনে আমার একটা কৌতুক মনে পড়ে গেলো। হয়তো আপনারা সবাই এটা শুনে থাকবেন। তারপরও বলি। অশিতীপর এক বৃদ্ধ ভাবলেন এখন বয়স হয়েছে। কখন ওপারের ডাক আসে বলাতো যায়না। এই ভেবে তিনি তীর্থ যাত্রায় রওনা হলেন। পথে যাত্রাকালে তিনি তার চেয়ে কম বয়সী অনেক তীর্থযাত্রী দেখে ভাবলেন যে তিনি ঠিকই করেছেন, আর দেরি করা উচিৎ হতোনা। পথিমধ্যে হঠাৎ এক বাড়ির কাছে গিয়ে তিনি অবাক হলেন। তারও চেয়ে অনেক বেশি বয়োঃবৃদ্ধ এক ভদ্রলোক বসে কাঁদছেন। ভদ্রলোকের কাছে তিনি জানতে চাইলেন কেন তিনি কাঁদছিলেন। ভদ্রলোক বললেন, “দাদারে তামুক বানাইয়া দেইনাই বইলা, আব্বায় আমারে মারছে।” আমার ভাবনাটা ছিলো সেই অশিতীপরের মতো।
লেখক মো: আওয়াল হোসেন টুটুল
- মো: আওয়াল হোসেন টুটুল -এর ব্লগ
- ২ টি মন্তব্য
- ২৪ নভেম্বর ২০১২, ১৭:১৩
- নগর জীবন
প্রিন্ট করুন
-
সাম্প্রতিক পোস্ট
-
সাম্প্রতিক মন্তব্য





নীতিমালা
ব্লগ বই
অভিযোগ
সাম্প্রতিক পোস্ট

ফনেটিক
সুন্দর লেখনী ।