রোগের ওষুধ, ওষুধের রোগ

একটা গল্প শুনেছেন নিশ্চয়ই: এক লোক খুব ঘন ঘন ডাক্তারের কাছে যান বলে এক বন্ধু জানতে চাইলো সমস্যাটা কী। তো সে বলে যে, ‘আরে, ডাক্তারদের খেয়ে-পরে বাঁচতে হবে না!’ বন্ধু জিজ্ঞাসা করলো, তাহলে ওষুধ কিনছে কেন? ‘কারণ ফার্মেসির লোকজনের খেয়ে-পরে বাঁচতে হবে তাই!’ তাহলে, বন্ধু আবার জানতে চাইলো, ওষুধ কিনে সে বাসায় আনছে, কিন্তু ওষুধ খাচ্ছে না কেন? হাসিমুখে ভদ্রলোক বললেন, ‘আরে, আমাকেও তো বাঁচতে হবে নাকি?’
গল্পটা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে। অবশ্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ব্যাপারটা তো নতুন নয়। বহু আগ থেকেই এ বিষয়ে বলা হয়ে আসছে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে ব্যাপারটা খুব বেশি বেড়ে গেছে। সারাজীবন আমরা পালন করে এসেছি ‘অমুক রোগ-তমুক রোগ নির্মূল’ দিবস। আর এ বছর ৭ এপ্রিল পালন করলাম ‘এন্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার প্রতিরোধ’ দিবস। প্রশ্ন আসতেই পারে, এরকম একটা দিবস ঘটা করে পালন করার কী দরকার? রোগের সাথে সাথে এখন ওষুধও প্রতিরোধ করতে হবে কেন? কারণটা হলো রোগের যে ওষুধ, সেটাই যেন রোগের কারণ হতে না পারে সেজন্যে সবাইকে সচেতন করে তোলা। এর পেছনে আছে নানাবিধ কারণ: ওষুধের তীব্র পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া যেমন আছে, তেমনি আছে ওষুধে-ওষুধে প্রতিক্রিয়া। আবার অতিরিক্ত ওষুধ সেবনে কার্যকারিতা কমে যাওয়াও একটা কারণ। আর এটা কেবল এন্টিবায়োটিকের জন্যই নয়, মোটামুটি সবরকম ওষুধের বেলায়ই সমানভাবে প্রযোজ্য।
অনেকে হয়তো বলবেন যে বাংলাদেশে যেখানে মানুষের খাওয়া-পরার টাকা নেই সেখানে কি তারা বেশি ওষুধ খেতে পারে? বরং ওষুধ না খেয়ে মারা যাওয়াটা কি বেশি চিন্তার নয়? অবশ্যই তাই। কিন্তু অনেক মানুষ যেমন একেবারেই চিকিৎসা পাচ্ছেনা, তেমনি অনেক মানুষ, বিশেষত সমাজের মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত অংশ, একটা রোগ থেকে বাঁচতে গিয়ে আরও বেশি করে আক্রান্ত হচ্ছেন।
এক্ষেত্রে ডাক্তারদের ভূমিকা কতটুকু? হেলথ ওয়াচ নামের একটা সংস্থার জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশে একজন ডাক্তার প্রত্যেক রোগীর পেছনে গড়ে সময় দেন মাত্র ৫৪ সেকেন্ড! এতটুকু সময়ের মধ্যে কি আসলেই সম্ভব সঠিকভাবে রোগ নিরূপন? আবার দোষের ভাগীদার কিন্তু আমরাও। যখন রোগে ভুগি তখন সাময়িক উপশমের জন্য দেদারসে ওষুধ গিলি। বেশিরভাগই এন্টিবায়োটিকের কোর্স শেষ করি না। আবার কয়েকমাস পর একই উপসর্গ দেখা দিলে সহজে কিন্তু ডাক্তারের কাছে যাই না; আগের ওষুধটা নিজে নিজে খেয়ে ফেলি। কখনও কখনও পরিচিতদের ‘পরামর্শে’ নিজেরাই ডাক্তার বনে যাই- ‘অমুক ভাই’ উপকার পেয়েছেন বলে আমরাও আশ্বস্ত হই এবং প্রেসক্রিপশন ছাড়াই ওষুধ খাই।
মূল সমস্যাটা হলো আমাদের অতিরিক্ত ওষুধ নির্ভরতা। ডা. জন রবিন্স এ অবস্থার জন্যে চিকিৎসাবিজ্ঞান সম্পর্কে রোগীদের ভ্রান্ত ধারণাকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, এরা মনে করে যে, সুস্বাস্থ্য বা নিরাময় ডাক্তার, ড্রাগস্টোর বা হাসপাতালে রয়েছে। ডাক্তার তাদেরকে ধন্বন্তরী ট্যাবলেট, ক্যাপসুল বা ইনজেকশন দিয়ে ভালো করে দেবেন। এ আশায় রোগীরা ডাক্তারের পর ডাক্তার আর ওষুধের পর ওষুধ বদলায়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের অবস্থা দিনের পর দিন একই থাকে।
আসলে রোগ ও অসুস্থতা থেকে মুক্তির জন্য প্রথম প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গি বা জীবন চেতনার পরিবর্তন। অপনাকে জানতে হবে যে, নিরাময়ের ক্ষমতা আপনার নিজের ভেতরেই আছে, ডাক্তার কেবল সহায়ক শক্তি মাত্র। যতক্ষণ নিজে বিশ্বাস করতে না পারছেন যে আপনিও সুস্থ হতে পারেন ততক্ষণ কোনো চিকিৎসাই আপনাকে সুস্থ করতে পারবেনা। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যে, শতকরা ৭৫ ভাগ রোগের কারণই হচ্ছে মনোদৈহিক। অর্থাৎ কোনো ঘটনার প্রেক্ষিতে আপনার মানসিক প্রতিক্রিয়াই ৭৫ ভাগ রোগ সৃষ্টির কারণ। শতকরা ১৫ ভাগ রোগের কারণ হচ্ছে ইনফেকশন, ভাইরাস আক্রমণ, ভুল খাদ্য গ্রহণ ও ব্যায়াম না করা। শতকরা ১০ ভাগ রোগের কারণ হচ্ছে দৈহিক আঘাত, ওষুধ ও অপারেশনের প্রতিক্রিয়া। তাই শতকরা ৭৫ ভাগ রোগই শুধুমাত্র দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে সুস্থ জীবনদৃষ্টি গ্রহণের মাধ্যমে নিরাময় হতে পারে। অন্যান্য রোগ নিরাময়েও ওষুধ, সার্জারির পাশাপাশি সুস্থ জীবনদৃষ্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তাই এখন থেকে কম ওষুধ খাবেন। অবশ্যই জটিল অসুখের ব্যাপারটা আলাদা। কিন্তু সামান্য অসুখে অতিরিক্ত ব্যস্ত হয়ে যাওয়াটা ঠিক নয়। সেক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাস বা জীবনাচার পরিবর্তন আপনাকে সুস্থ করে তুলতে পারে।
লেখক ছদ্মবেশী
- ছদ্মবেশী -এর ব্লগ
- ৩৪ টি মন্তব্য
- ১৮ মে ২০১২, ১৯:৫৫
- পরামর্শ
প্রিন্ট করুন
- ৩৪ টি মন্তব্য
-
মোহাম্মদ এনামুল কবির১৮ মে ২০১২, ২০:৪৭
আমি এই পোস্টের কয়েকটা বিসয়ের সাথে একমত । এন্টিবায়োটিকের কোর্স অনেকেই শেষ করে না । কোন কোন ক্ষেত্রে দেখা যায় রোগীরা তাদের পছন্দ মতো ওষুধ খাচ্ছে । এই প্রবণতা গ্রাম অঞ্চলে বেশি । বিশেষ করে গরিব মানুষেরা এটা করে থাকে । মানুষ রোগ মুলত সৃষ্টি হয়ে মন । মন সুস্থ থাকলে শরীর সুস্থ । বিশ্বাস না থাকলে ওষুধে রোগ ভালো হয় না । ভাই দারুণ একটা পোস্ট দিয়েছেন । আশা করি অনেকেই ওষুধ এবং রোগ সম্পর্কে ভালো ধারণা পাবে । আপনাকে ধন্যবাদ । -
নীলসাধু১৮ মে ২০১২, ২১:০৩
শুভেচ্ছা -
আমি লেখাটি পুর্বে কোথাও পড়েছি এমন লাগছে।
তবে পোষ্টের বক্তব্যের সঙ্গে সহমত।
প্রয়োজনীয় একটি বিষয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষনীয় এই প্রচেষ্টায় ধন্যবাদ রইলো।
ভালো থাকুন। শুভেচ্ছা - -
ফৈরা দার্শনিক১৮ মে ২০১২, ২১:০৭
পোষ্টটা খুবই ভালো লাগল।
ওষধ সম্পর্কে ব্লগার ভুতের আছড় কিছু দিন আগে একটা পোষ্ট দিয়েছিল।
মোট কথা সাধারণ মানুষ ছোট মোট ব্যাপারে ডাক্তারের কাছে না গিয়ে ফার্মেসি থেকেই ওষধ
নিয়ে নেই। আর ঝামেলা বাধে সেখানেই।
এছাড়া তাদের কাছে কোন উপায়ও থাকে না। যেমন মাথা ধরা বা সামান্য জ্বরের জন্য ডাকাতারের
কাছে যাওয়া সম্ভব না কারণ ডাক্তারদের ফিস অনেক বেশি। -
রব্বানী চৌধুরী১৮ মে ২০১২, ২১:১৬
বিশুদ্ধ পানি পান ও শরীর চর্চা - সব চেয়ে উত্তম ওষুধ বলেই মনে হচ্ছে।
আপনাকে। শুভেচ্ছা রইল। ভালো থাকবেন। -
রাশেদ আবদুল্লাহ অনু১৯ মে ২০১২, ০২:০১
ভাইয়া, আপনার ধারনা ভুল। আমি প্রতিটি লেখা মনোযোগ দিয়ে পরি। আমার ভালো লাগে বলেই মন্তব্য দেই, হয়তো তা খুব ছোট।
আমার মাঝে কোন প্রতিজগিতামুলক মনোভাবও নেই।
আমার ব্লগ পড়তে ভালো লাগে, ভালো লাগে লিখতেও। ভালো লাগে পরিচিত হতে সবার সাথে।
অল্প কোথায় পোস্টের প্রশংসা করি বলে, আমি লেখা পরি না তা বলা এবং ভাবা মতেই ঠিক না।
আপনার এই উপকারি পোস্টটি অনেকের কাজে লাগবে, ধন্যবাদ। - আমি এটাই লিখতাম আপনার এই পোস্টের মন্তব্যে, আপনার বিভ্রান্তি দূরীকরণে এতো কথা লিখলাম।
ভালো থাকুন। -
সফিকুল১৯ মে ২০১২, ১০:৫১
ওষুধে আবার ভেজাল ঠুকে গেছে। গত কয়েকদিন আগে এক সংসদীয় কমিটি ৬২ টি ওষুধ কোম্পানীর একটি তালিকা তৈরী করেছে যারা মান সম্মত ভাবে ্ওষুধ তৈরী করে না। তাহলে ভাবুন অবস্থাটা কি? ওনারা যদি এদের তালিকাটা প্রকাশও করতেন তাও আমরা বুঝতে পারতাম বা তাদের তৈরী ্ওষুধ কিনতাম না। আসলে সবাই ব্যবসায়ীদের পক্ষে। -
সাজ্জাদ হোসাইন ২১ মে ২০১২, ১৬:৫০
বাংলাদেশে একজন ডাক্তার প্রত্যেক রোগীর পেছনে গড়ে সময় দেন মাত্র ৫৪ সেকেন্ড!
ভয়ানক ব্যপার।
আর সত্যি শুধু হাসপাতাল আর ডাক্তার এর কাছেই সুস্থ জীবন কামনা না করে দরকার নিজের ও স্বাস্থ্য সম্মত উপায়ে জীবন জাপন করা।
শুভেচ্ছা এবং শুভকামনা



-
আছিব চৌধুরী২৩ মে ২০১২, ১৩:১৭
রোগের ওষুধ, ওষুধের রোগ
বাহ !!! বেশ শিরোনাম হয়েছে,আমরা ছোট বেলা জেনেছি ব্যাথার জায়গায় ব্যাথা পেলে নাকি ব্যাথা ভালো হয়ে যায়


-
পরিব্রাজক খোকন০৩ জুন ২০১২, ১৪:৫৬
এক্ষেত্রে ডাক্তারদের ভূমিকা কতটুকু?
যদিও ঔষধের ব্যাপারে ডাক্তারদের প্রেসক্রিপশন সম্পর্কে কিছু বলা হয় নাই।
আমার একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি :
মহাখালি আয়েশা মেমোরিয়াল হাসপাতালে আমার এক রোগী ভর্তি ছিলো।
প্রথম ৩ দিনে সেই রোগীকে ২৩ হাজার টাকার ঔষধ খাওয়ানো হয়েছে বা ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে।
৩০০/৫০০ টাকা দামের কিছু ঔষধ বা ইনজেকশন ছিলো। এর চেয়ে বেশি দামের কোনো ঔষধ লিখে নাই।
দেখে মনে হলো মানুষ বেঁচে থাকে ঔষধের জন্য।
তখন মনে হলো বাংলাদেশ ঔষধ শিল্পে এতটা এগুলো কিভাবে? এভাবে চলতে থাকলে ঔষধ শিল্পে বিশ্বের প্রথম স্থান অধিকার করতে বাংলাদেশের খুব বেশি দিন লাগবে না। এটাও তো দেশের উন্নতি। তাই না? -
ভূতের আছড় ০৬ জুন ২০১২, ০৮:৫৬
ছদ্ম খুব ভালো সচেতনতামূলক পোস্ট দিয়েছেন? শুভেচ্ছা রইলো
এই পোস্টে চোখ রাখতে পারেন------------- "মানব কল্যাণে মানুষের গলা কাটি"
-
সাম্প্রতিক পোস্ট
-
সাম্প্রতিক মন্তব্য





নীতিমালা
ব্লগ বই
অভিযোগ
সাম্প্রতিক পোস্ট

ফনেটিক
আপনাকে আগেই বলে দেই
আপনি কোনো লেখা না পড়েই মন্তব্য দেন সেরা তালিকায় উঠার জন্য।
দয়া করে আমার পোস্ট না পড়ে ভালো লাগলো মার্কা মন্তব্য না দিলে আমারো ভালো লাগবে এরকম অশুভ প্রতিযোগিতা ভালো লাগেনা
ধন্যবাদ