ঐতিহাসিক ও কৌশলগত গিরিপথ : খাইবার পাস

পৃথিবীর সবচেয়ে আকষর্নীয় গিরিপথ খাইবার পাস
খাইবার পাস বা খাইবার গিরিপথ বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দরতম গিরিপথ। বিশেষ করে এর ভূ-রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। এককালে এ গিরিপথের নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে ছিল, তারাই নিয়ন্ত্রণ করতো অত্র অঞ্চলের রাজনীতি। এই একবিংশ শতাব্দীতেও এর কৌশলগত গুরুত্ব একটুও কমেনি।
অবস্থানঃ পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সীমান্তে— অবস্থিত। যে পথটি পাকিস্তানের পেশওয়ার আর আফগানিস্তানের কাবুলকে যুক্ত করেছে তারই মধ্যবর্তী অংশ হলো খাইবার গিরিপথ। অর্থাৎ হিন্দুকুশ পর্বতমালার পাদদেশে এ গিরিপথটি অবস্থিত।
খাইবার গিরিপথের দৈর্ঘ্য ৫৩ কিলোমিটার এবং প্রস্থ সর্বোচ্চ ১৩৭ মিটার।
পৃথিবীতে যতগুলো গিরিপথ রয়েছে সেগুলোর মধ্যে খাইবার পাসের মতো আর একটিও আছে কিনা সন্দেহ। এর ভুপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য বিচিত্র ধরনের। খাইবারের পুরো পথটিই উঁচু-নিচুভাবে এঁকেবেঁকে গেছে। গিরিপথের উত্তর পাশে রয়েছে আকাশছোঁয়া তুষার আবৃত হিন্দুকুশ পাহাড়ের দেয়াল। অধিকাংশ জায়গায়ই রাস্তা চওড়া এবং কিছু দূরে দূরে রয়েছে গিরিখাত। খাইবার গিরিপথের প্রায় পুরোটাই পাহাড়ি দেয়াল দিয়ে দুদিক থেকে আবদ্ধ। এই পাহাড়ের ধার খুবই খাড়া। এসব পাহাড়ি ঢালের উচ্চতা ১০০ মিটার থেকে সর্বোচ্চ ৩০০ মিটার পর্যন্ত।
খাইবার গিরিপথের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব অনস্বীকার্য। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট উপমহাদেশে আসার জন্য খাইবার গিরিপথ ব্যবহার করেছিলেন। ব্রিটিশরাও বুঝেছিল উপমহাদেশের দখল বজায় রাখার জন্য এ গিরিপথের গুরুত্ব। তাছাড়া দশম শতাব্দীতে ফারসি, মোঙ্গল এবং তাতাররা খাইবার গিরিপথ হয়ে উপমহাদেশে এসেছিল। দিগ্বিজয়ী আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট ৩২৬ খ্রিষ্টাপূর্বাব্দে খাইবারের রক্ষ পথ পাড়ি দিয়ে উপমহাদেশে প্রবেশ করেছিলেন। চেঙ্গিস খান এ পথ দিয়েই পারস্য দেশে গিয়ে পৌছেছিল। মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সবুক্তগীন। তারপর তার ছেলে মাহমুদ গজনভী ১০০১ থেকে ১০৩০ সাল পর্যন্ত— একবার দু’বার নয় ১৭বার তার বাহিনী নিয়ে খাইবার গিরিপথ পাড়ি দিয়েছেন। ঘোরী বংশের বিখ্যাত শাসক শাহাবুদ্দিন মুহম্মদ ঘোরী ১১৭৫ সালে খাইবার গিরিপথ দিয়ে ভারত উপমহাদেশে প্রবেশ করেন। ১৯১৩ সালে পৃথ্বিরাজ চৌহানের সঙ্গে নিজের শক্তিকে তুলনা করার জন্য তিনি আরেকবার এ পথ ব্যবহার করেন। এ যুদ্ধের পর উপমহাদেশে মুসলিম সাম্রাজ্যে বিস্তুতি ঘটে। ১৩৯৮ সালে মধ্য এশিয়ার দিগি¦জয়ী আমির তৈমুর খাইবার গিরিপথ দিয়ে তার সেনাবাহিনীকে এনে ভারত জয় করেন। তারই বংশধর জহিরুদ্দিন বাবর প্রথম ১৫০৫ সালে এ পথ দিয়ে ভারতে আসেন এবং আবার ১৫২৬ সালে এ পথ দিয়ে এসে বিখ্যাত মোগল সাম্রাজ্যেও পত্তন ঘটান। ১৬৭২ সালে আজমল খানের নেতৃত্বে আফ্রিদী পাঠান বাহিনী মুহম্মদ আমিন খানের মোগল বাহিনীকে পরাজিত করে। এ যুদ্ধে মোগল বাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। শুধু তাই নয় আফ্রিদীদের হাতে এ সময় ১০,০০০ মোগল সেনা বন্দি হয়। ১৭৩৯ সালে ইরানকে দিল্লির সাথে যুক্ত করার জন্য নাদির শাহ আবদালী ১৭৬১ সালে খাইবার গিরিপথ পাড়ি পানিপথের যুদ্ধে জয়ী হয়ে মারাঠা রাজ্যের পতন ঘটান। ১৮৩৯-১৯১৯ সাল পর্যন্ত— খাইবার অঞ্চলে যুদ্ধ হয়েছে তার আগে কখন এ অঞ্চলে এ অঞ্চলে এত যুদ্ধ হয়েছে কিনা সন্দেহ। প্রথম আফগান যুদ্ধের সময় (১৮৩৯-৪২) জেনারেল পোলক আফগানিস্তানে ব্রিটিশ পতাকা উড়াবার অভিলাষ নিয়ে খাইবার অতিক্রম করেন। ১৮৭৮ সালে ব্রিটিশ বাহিনী আবার খাইবার অতিক্রম করে। শুরু হয় দ্বিতীয় আফগান যুদ্ধ (১৮৭৮-৭৯)। ১৮৯৭ সালে খাইবার এলাকা আবার অশান্ত— হয়ে ওঠে। ১৯১৯ সালে তৃতীয় আফগান যুদ্ধের সূচনায় ব্রিটিশ বাহিনী আবার খাইবার গিরিপথ পাড়ি দেয়। খাইবার এর বীর সন্তানেরা ১৯৩০ সালে ব্রিটিশ বাহিনী কিসসা খাওয়ানী বাজারে আফগানদের কাছ থেকে দাঁতভাঙ্গা জবাব লাভ করে। এরপর যুদ্ধ চলতে থাকে। ১৯৪৭ সালের আগষ্টে পাকিস্তানের স্বাধীনতা লাভের সঙ্গে সঙ্গে এই অশান্ত— অবস্থার অবসান ঘটে। বর্তমানে এ অঞ্চলে ভ্রমনবিলাসী পর্যটকরা শান্তির অনেশ্বণে এখানে আসেন। কিন্তু ২০০১ সালে ১/১১ এর ঘটনার পর নব্য সামাজ্যবাদী আমেরিকা আল-কায়েদা প্রধান ওসামা বিন লাদেনকে আশ্রয় দেওয়ার অযুহাতে তালেবান কর্তৃক শাসিত আফগানিস্তানে আক্রমন করে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বাহিনী। অশান্ত— আবার খাইবার গিরিপথ। প্রত্যাশায় থাকবো যুদ্ধ নয় ভ্রমনবিলাসী পর্যটকরা শান্তির অনেশ্বণেে আবার এখানে আসবেন।

ঐতিহাসিক খাইবার গিরিপথের মহাসড়ক

আফগানিস্তানের আদিবাসী, খাইবার পাস

পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে আশ্বারোহী আফগান

আলী মসজিদ, খাইবার পাস, আফগানিস্তান

খাইবার পাস, আফগানিস্তান

বাস্পীয় ইঞ্জিন চালিত ট্রেন, লান্ডি কোটাল

পাহাড়ী পথ, খাইবার পাস

পুঞ্জা, খাইবার পাস

রাস্তায় তালেবান যোদ্ধা, খাইবার পাস

পাহাড়ী রাস্তা দ্বারা যুক্ত পাকিস্তান-আফগানিস্তান
লেখক সোলাইমান ইসলাম নিলয়
- সোলাইমান ইসলাম নিলয় -এর ব্লগ
- ২৪ টি মন্তব্য
- ১৪ মে ২০১২, ১৩:০৭
- ছবি
প্রিন্ট করুন
- ২৪ টি মন্তব্য
-
েমা: রফিকুল ইসলাম১৪ মে ২০১২, ১৫:০৩
সত্যি কথা বলতে অনেক কিছু জানলাম, আপনাকে ধন্যবাদ। এরকম পোষ্ট চাই। -
এক্সপ্লোরার_তাহসিন১১ জুন ২০১২, ১৩:২৬
খাইবার গিরিপথের নামটাই এর আগে শুনেছিলাম। কিন্তু এর সম্পর্কে কোন ধারণাই আমার ছিলনা। বেশ তথ্যবহুল একটা পোস্ট দিয়েছেন। আপনার বর্ণনা শুনে এখন আমার শখ জেগেছে খাইবার গিরিপথ দেখার!
যদি কখনো সুযোগ হয় খাইবার গিরিপথ পরিদর্শনের, তাহলে সুযোগটা আমি কোনভাবেই মিস করবো না...
-
সাম্প্রতিক পোস্ট
-
সাম্প্রতিক মন্তব্য





নীতিমালা
ব্লগ বই
অভিযোগ
সাম্প্রতিক পোস্ট

ফনেটিক