গোলকিপারঃ একেকজন ইস্পাত কঠিন গ্ল্যাডিয়েটর, দুর্গ রক্ষার শেষ প্রহরী।
রক্ষণভাগের খেলোয়াড়দের পর গোলকিপাররাই হচ্ছেন যেকোনো দলের জন্য শেষ ভরসা। গোওলির অসাধারন নৈপুণ্যে একটি দল খাদের কিনারা থেকেও ফিরে আসতে পারে আবার তার চুল পরিমান ভুল একটি দলকে চরমভাবে ভোগাতে পারে। বর্তমানে যেকোনো পেশাদার দলে গোলকিপারকে প্রশিক্ষিত করতে আলাদা কোচ নিয়োগ করা হয়ে থাকে। ইউরোপের দলগুলি নিজেদের অপ্রতিরোধ্য করে তুলতে সবসময়ই ভাল গোলকিপারের খুজে থাকে। স্ট্রাইকারদের পাশাপাশি অনেক গোলকিপারেরাও তারকা খেতাব পেয়েছেন যেমন লেভ ইয়াসিন, পিটার শিলটন, গায়কোছিয়া, বার্থেজ, স্মাইকেল, কাসিলাস তাদের অন্যতম।
আধুনিক ফুটবলে গোলকিপারেরা যেকোনো দলের প্রান। অনেককেই আবার দলপতি হিসাবেও দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। আয় রোজগারের দিক থেকে কিপিং কোনও কালেও ভাল পেশা ছিলোনা। তবে রাশিয়ান প্রিমিয়ার লীগ থেকে মেজর লীগ সকার পর্যন্ত সবার অবস্থা এক রকম না। প্রতিযোগিতার দিক থেকে ইংলিশ লীগ সবথেকে আকর্ষণীয় ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ । বিশ্বের তাবৎ বাঘা বাঘা গোলকিপারেরা খেলে থাকেন এই লীগে সেটা অর্থের জন্যই হোক বা নিজেকে পরীক্ষা করে নেয়ার ইচ্ছা থেকে। ভাল মান বা পারিশ্রমিকের জন্য কিপারেরা যেভাবে বড়দলগুলির দিকে তাকিয়ে থাকে তেমনি দলগুলিও নিজেদের অপ্রতিরোধ্য করে তুলতে ভাল কিপারের খুজে থাকে।
পিটার স্মাইকেল ছিলেন কিংবদন্তিতুল্য গোলকিপার, তার ৬ ফুট ৩ ইঞ্ছির লম্বা শরীর আর নেতৃত্বের গুন দিয়ে এক দশকের ছেয়েও বেশি সময় দর্শকদের বিনোদন দিয়ে গেছেন। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে একটানা ২২ ম্যাচ কোনও গোল না হতে দিয়ে রেকর্ড গড়েছিলেন। তাকে যেকোনো ম্যানেজার বা কোচ দলে টানতে চাইবে। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কোচ এল্যাক্স ফারগুসন তাকে ১৯৯১ সালে মাত্র ৫ লাখ পাউন্ডে দলে ভিড়িয়ে বলেছিলেন এটা “শতাব্দীর সবচেয়ে সেরা ক্রয়”, কেন তিনি তা বলেছিলেন তা পাঠক ভাল করেই জানেন। ১৯৯৯ সালে চ্যাম্পিয়নস লীগের ফাইনালে জার্মানির ব্রায়ার্ন মিউনিখকে হারাতে তার ভুমিকা ছিল অসামান্য। নিয়মিত দলপতি রয় কিন না থাকায় আর্ম ব্যান্ড ছিল তার হাতে, দল ১-০তে পিছিয়ে, খেলা শেষ হতে আর কিছুক্ষণ মাত্র বাকি, কর্নার পাওয়ার পর ছুটে গেলেন বিপক্ষের গোল সীমানায়, হতচকিত রক্ষণভাগ, গোল দিয়ে সমতা আনলেন সতীর্থ শেরিংহাম। উজ্জীবিত ম্যানইউ শেষ পর্যন্ত ২-১ গোলে ম্যাচ জিতেছিল সলস্কারের গোলের বদৌলতে। পিটার স্মাইকেল ছিলেন খুবই মেধাবি একজন গোলকিপার সবসময় সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে পছন্দ করতেন। তার ছেলে ক্যাসপারও বাবার পথে হাঁটছে।
আয়াক্স, জুভেন্টাস, ফুলহ্যাম এর মত বড় ক্লাবে সফলতার সাথে খেলে এডউইন ভেন ডার ছার ২০০৫ এ ম্যানইউতে যোগ দেন। ক্লাবের ৬ বছরের ক্যারিয়ারে তিনি দুর্দান্তভাবে গোলপোস্ট আগলে রেখেছিলেন। ২০০৭ এ একটি পেনাল্টি রুখে লীগ শিরোপা ঘরে তুলে আনেন। ২০০৮ এ আবার পেনাল্টি রুখে এবার ঘরে তুলে আনেন চ্যাম্পিয়নস লীগ। যতদিন খেলেছেন ততদিন ক্লাবগুলির জন্য ছিলেন আস্থার প্রতীক। একটানা ১৩০২ মিনিট কোনও গোল হতে না দিয়ে এক অনন্য রেকর্ড করেছিলেন। ২০০৮-০৯ মৌসুমে তিনি ২৭ ম্যাচ কোনও গোল হজম করেননি যার জন্য তিনি ঐ মৌসুমে সেরা কিপারের মর্যাদাও পেয়েছিলেন। বয়সও তার কাছে হার মেনেছিল, ৪১ বছর বয়সে তিনি চ্যাম্পিয়নস লীগ শিরোপা জিতেছিলেন।
আরকেজন গোলকিপারের কথা আপনাদের হয়ত মনে আছে “হোর্হে কেম্পোস” মাত্র ৫ ফুট ৮ ইঞ্ছি উচ্চতা নিয়ে তিনি ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ভাল খেলে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। লীগ ম্যাচে গোলবারের নিচে সুযোগ পেতেন না তাই কোচকে রাজি করিয়ে স্ট্রাইকারের ভূমিকায় মাঠে নেমে পরতেন। প্রথম মৌসুমে ১৪ গোল করে সবাইকে হতবাক করে দিয়েছেইলেন। জাতীয় দলের হয়ে ৯৪’র বিশ্বকাপে তাকে গোলকিপারের থেকেও বেশি মনে হত। যখন তখন বল নিয়ে বিপক্ষের সীমানায় হানা দিতেন। নিজের পোশাক নিজেই ডিজাইন করতেন। তার উজ্জ্বল উপস্থিতি মেক্সিকানদের উজ্জীবিত করত।

কলাম্বিয়ার গোলকিপার রেনে হিগুইতাত ছিলেন রিতিমত তারকা খেলোয়াড়। গোলকিপার হয়েও হাত দিয়ে বল ধরতে প্রায়ই অনিহা দেখাতেন আর এর জন্যই দর্শকেরা হরহামেশা তার আশ্চর্যরকম কারিকুরি দেখতে পেতেন। জাতীয় দলের হয়ে প্রায়ই ফ্রি কিক, পেনাল্টি নিতেন, লম্বা চুলের এই খেলোয়ারের এক ভুলের কারনে কলাম্বিয়া ৯০’র বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয়। অযথা ঝুকি নিয়ে দলকে প্রায়শই বিপদে ফেলতেন বলে লোকজন তাকে “পাগল গোলকিপার” নামে ডাকত। তবে এটা স্বীকার করতে হবে যে, তার উপস্থিতিতে দর্শকরা বেজায় মজা পেতেন।
২০০৩ এ চেলসি ৭ মিলিয়ন পাউন্ডে গোলকিপার পিটার চেককে কিনে নেয়। ২০০৪ সালে চেলসির প্রথম গোলকিপার কুডুচিনি ইনজুরিতে পড়লে তার ভাগ্যে শিকে ছিড়ে। ২১ ম্যাচে ১ হাজার মিনিটেরও বেশি সময় কোনও গোল হজম না করে রেকর্ড করেন পরে যদিও ম্যানইউর ভ্যান ডার ছার তা নিজের নামে করে নেন। ২০০৬ সালে রিডিংযের সাথে এক ম্যাচে মাথায় মারাত্বক আঘাত পান, আঘাতটা এতটা গুরুতর ছিল যে তার মাথার হাড় দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই বলেত গোলপোস্ট ছাড়া যাবে না, এদানিং তিনি মাথায় রাগবির বিশেষ ক্যাপ পরে মাঠে নামেন ।

কম আলোচিত গোলকিপারদের মধ্যে ফিনল্যান্ডের ইউসি এস্কেলাইনেনের নাম উল্লেখ করার মত। তার গোলকিপিং ক্যারিয়ারের অনেকটা সময় বোলটন ওয়ান্ডারার্সের হয়ে খেলেছেন (৪৭৪ ম্যাচ) এখন আছেন লন্ডনের ক্লাব ওয়েস্ট হ্যামে। এই ৬ ফুট ৪ ইঞ্ছি লম্বা গোলকিপারের অজেয় ভাবটা আমার দারুন লাগে। তাকে ফাকি দেয়া চাট্টিখানি কথা না। তার একটি সেভ ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগের ২০ বছরের ইতিহাসে ৩য় সেরা বলে বিবেচিত হয়েছে। ওয়েস্ট হ্যামের খেলা থাকলে তার খেলা আপনারা দেখতে পারেন, তার গোলকিপিং আপনাকে মুগ্ধ না করে পারবেনা। ফ্রিদেল, আল হাবসির কিপিংও ভাল লাগার মত।

ইংল্যান্ড জাতীয় দলের গোলকিপার রবার্ট গ্রিনকে ভাল কিপারই মনে হয়। তবে আর আট-দশটা ইংলিশ খেলোয়াড়দের মত কেন জানি একটু অন্যমনস্ক। ওয়েস্ট হ্যামকে এইবার প্রিমিয়ার লীগে ফিরিয়ে আনতে তার আসামান্য ভুমিকা ছিল। পরে জানতে পারলাম লন্ডনের আরেক ক্লাব কিউপিআরে নাম লিখিয়েছেন। প্রথম ম্যাচেই ৫ গোল হজম করেছেন, হতাশাজনক তিনটি ম্যাচ খেলে এখন সাইডবেঞ্ছে। তার জায়গায় কিউপিআর ম্যানেজার মার্ক হিউজ ব্রাজিলের জাতীয় দলের কিপার জুলিয়াস সিজারকে নিয়ে এসেছেন।
তবে ঠিক বিপরীত অবস্থানে আছেন তারই জাতীয় দলের সতীর্থ জো হার্ট, বিজ্ঞানের ভাল ছাত্র আর ক্রিকেট খেলোয়াড় হিসাবেও যার সুখ্যাতি আছে। ২০০৩ সালে নিজ শহর শোর্সবারী ফুটবল দলের সাথে বাইরে খেলতে গিয়ে প্রফেশনাল ফুটবলে নাম লিখিয়েছিলেন ১৭ বছর বয়সে আর মাত্র ১৯ বছর বয়সেই ১৫ লাখ পাউন্ডের বিনিময়ে যোগ দেন ম্যানসিটিতে। পরপর দুইবছর প্রিমিয়ার লীগের সেরা গোলকিপারের সম্মান পেয়েছেন।



বেশিরভাগ ভাল গোলকিপারেরা উঠে আসছেন স্পেন থেকে। পেপ রাইনা, ইকার কাসিলাস, ভিক্টর ভালদেজ, ডেভিড ডি গেয়া তাদের মধ্যে অন্যতম। পেপ রাইনাত লিভারপুলের প্রান ভোমরা তাকে ছাড়া প্রথম একাদশ কল্পনাই করা যায় না আর জাতীয় দলে ইকার কাসিলাসের পর তিনিই দেল বস্কের (কোচ) প্রথম পছন্দ। রিয়াল মাদ্রিদের দলপতি ইকার কাসিলাস তার দলের হয়ে এই পর্যন্ত ৪৫০’র বেশি ম্যাচ খেলেছেন। ক্লাব আর জাতীয় দলের সফলতার জন্য দুইবার ইউরোপ সেরা খেলোয়াড়ের খেতাবও পেয়েছেন। বার্সিলোনার কিপার ভিক্টর ভালদেজ তার দলের ইতিহাসের সেরা গোল কিপার, তিনি তার দলের হয়ে এই পর্যন্ত ১৯টির মত শিরোপা জিতেছেন, যা যে কারোর জন্যই ঈর্শনীয়। ১৭ মিলিয়ন পাউন্ডের ট্রান্সফার ফিতে ম্যানইউতে যোগ দিয়ে তরুন ডি গেয়াত চারদিকে হইছই ফেলে দেন। এত টাকার ট্রান্সফার ফির ভালই প্রতিদান দিচ্ছেন এই কিপার। দেখা যাক স্পেন থেকে আর কোনও নতুন কিপার উঠে আসে কি না?
একজন ভাল মানের খেলোয়াড় কিনতে অনেক টাকা খরছ করতে হয় কিন্তু খুব কম পয়সাতেই একজন ভাল গোলকিপার পাওয়া যায়। গোল কিপারেরা জীবনের ঝুকি নিয়ে গোলবার আগলে রাখেন। স্ট্রাইকারেরা রক্ষণবুহ্য ভেদ করে ষাঁড়ের মত যখন ছুটে আসেন তখন গোল কিপারই শেষ ভরসা। গোল বাচাতে পারলে সবাই স্ট্রাইকারের তোলাধুনা করেন আবার গোল করলেও স্ট্রাইকারকে নিয়ে মেতে থাকেন, গোলকিপারেরা এখানে পর্দার আড়ালের কুশীলব মাত্র। আমার কাছে তারা একেকজন ইস্পাত কঠিন গ্ল্যাডিয়েটর, দুর্গ রক্ষার শেষ প্রহরী!
তথ্য সূত্রঃ বিভিন্ন ক্লাবের ওয়েব পেজ।
সুনামগঞ্জ, ৪ অক্টোবর, ২০১২
zakariatanveer@gmail.com
আধুনিক ফুটবলে গোলকিপারেরা যেকোনো দলের প্রান। অনেককেই আবার দলপতি হিসাবেও দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। আয় রোজগারের দিক থেকে কিপিং কোনও কালেও ভাল পেশা ছিলোনা। তবে রাশিয়ান প্রিমিয়ার লীগ থেকে মেজর লীগ সকার পর্যন্ত সবার অবস্থা এক রকম না। প্রতিযোগিতার দিক থেকে ইংলিশ লীগ সবথেকে আকর্ষণীয় ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ । বিশ্বের তাবৎ বাঘা বাঘা গোলকিপারেরা খেলে থাকেন এই লীগে সেটা অর্থের জন্যই হোক বা নিজেকে পরীক্ষা করে নেয়ার ইচ্ছা থেকে। ভাল মান বা পারিশ্রমিকের জন্য কিপারেরা যেভাবে বড়দলগুলির দিকে তাকিয়ে থাকে তেমনি দলগুলিও নিজেদের অপ্রতিরোধ্য করে তুলতে ভাল কিপারের খুজে থাকে।
পিটার স্মাইকেল ছিলেন কিংবদন্তিতুল্য গোলকিপার, তার ৬ ফুট ৩ ইঞ্ছির লম্বা শরীর আর নেতৃত্বের গুন দিয়ে এক দশকের ছেয়েও বেশি সময় দর্শকদের বিনোদন দিয়ে গেছেন। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে একটানা ২২ ম্যাচ কোনও গোল না হতে দিয়ে রেকর্ড গড়েছিলেন। তাকে যেকোনো ম্যানেজার বা কোচ দলে টানতে চাইবে। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কোচ এল্যাক্স ফারগুসন তাকে ১৯৯১ সালে মাত্র ৫ লাখ পাউন্ডে দলে ভিড়িয়ে বলেছিলেন এটা “শতাব্দীর সবচেয়ে সেরা ক্রয়”, কেন তিনি তা বলেছিলেন তা পাঠক ভাল করেই জানেন। ১৯৯৯ সালে চ্যাম্পিয়নস লীগের ফাইনালে জার্মানির ব্রায়ার্ন মিউনিখকে হারাতে তার ভুমিকা ছিল অসামান্য। নিয়মিত দলপতি রয় কিন না থাকায় আর্ম ব্যান্ড ছিল তার হাতে, দল ১-০তে পিছিয়ে, খেলা শেষ হতে আর কিছুক্ষণ মাত্র বাকি, কর্নার পাওয়ার পর ছুটে গেলেন বিপক্ষের গোল সীমানায়, হতচকিত রক্ষণভাগ, গোল দিয়ে সমতা আনলেন সতীর্থ শেরিংহাম। উজ্জীবিত ম্যানইউ শেষ পর্যন্ত ২-১ গোলে ম্যাচ জিতেছিল সলস্কারের গোলের বদৌলতে। পিটার স্মাইকেল ছিলেন খুবই মেধাবি একজন গোলকিপার সবসময় সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে পছন্দ করতেন। তার ছেলে ক্যাসপারও বাবার পথে হাঁটছে।
আয়াক্স, জুভেন্টাস, ফুলহ্যাম এর মত বড় ক্লাবে সফলতার সাথে খেলে এডউইন ভেন ডার ছার ২০০৫ এ ম্যানইউতে যোগ দেন। ক্লাবের ৬ বছরের ক্যারিয়ারে তিনি দুর্দান্তভাবে গোলপোস্ট আগলে রেখেছিলেন। ২০০৭ এ একটি পেনাল্টি রুখে লীগ শিরোপা ঘরে তুলে আনেন। ২০০৮ এ আবার পেনাল্টি রুখে এবার ঘরে তুলে আনেন চ্যাম্পিয়নস লীগ। যতদিন খেলেছেন ততদিন ক্লাবগুলির জন্য ছিলেন আস্থার প্রতীক। একটানা ১৩০২ মিনিট কোনও গোল হতে না দিয়ে এক অনন্য রেকর্ড করেছিলেন। ২০০৮-০৯ মৌসুমে তিনি ২৭ ম্যাচ কোনও গোল হজম করেননি যার জন্য তিনি ঐ মৌসুমে সেরা কিপারের মর্যাদাও পেয়েছিলেন। বয়সও তার কাছে হার মেনেছিল, ৪১ বছর বয়সে তিনি চ্যাম্পিয়নস লীগ শিরোপা জিতেছিলেন।
আরকেজন গোলকিপারের কথা আপনাদের হয়ত মনে আছে “হোর্হে কেম্পোস” মাত্র ৫ ফুট ৮ ইঞ্ছি উচ্চতা নিয়ে তিনি ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ভাল খেলে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। লীগ ম্যাচে গোলবারের নিচে সুযোগ পেতেন না তাই কোচকে রাজি করিয়ে স্ট্রাইকারের ভূমিকায় মাঠে নেমে পরতেন। প্রথম মৌসুমে ১৪ গোল করে সবাইকে হতবাক করে দিয়েছেইলেন। জাতীয় দলের হয়ে ৯৪’র বিশ্বকাপে তাকে গোলকিপারের থেকেও বেশি মনে হত। যখন তখন বল নিয়ে বিপক্ষের সীমানায় হানা দিতেন। নিজের পোশাক নিজেই ডিজাইন করতেন। তার উজ্জ্বল উপস্থিতি মেক্সিকানদের উজ্জীবিত করত।

কলাম্বিয়ার গোলকিপার রেনে হিগুইতাত ছিলেন রিতিমত তারকা খেলোয়াড়। গোলকিপার হয়েও হাত দিয়ে বল ধরতে প্রায়ই অনিহা দেখাতেন আর এর জন্যই দর্শকেরা হরহামেশা তার আশ্চর্যরকম কারিকুরি দেখতে পেতেন। জাতীয় দলের হয়ে প্রায়ই ফ্রি কিক, পেনাল্টি নিতেন, লম্বা চুলের এই খেলোয়ারের এক ভুলের কারনে কলাম্বিয়া ৯০’র বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয়। অযথা ঝুকি নিয়ে দলকে প্রায়শই বিপদে ফেলতেন বলে লোকজন তাকে “পাগল গোলকিপার” নামে ডাকত। তবে এটা স্বীকার করতে হবে যে, তার উপস্থিতিতে দর্শকরা বেজায় মজা পেতেন।
২০০৩ এ চেলসি ৭ মিলিয়ন পাউন্ডে গোলকিপার পিটার চেককে কিনে নেয়। ২০০৪ সালে চেলসির প্রথম গোলকিপার কুডুচিনি ইনজুরিতে পড়লে তার ভাগ্যে শিকে ছিড়ে। ২১ ম্যাচে ১ হাজার মিনিটেরও বেশি সময় কোনও গোল হজম না করে রেকর্ড করেন পরে যদিও ম্যানইউর ভ্যান ডার ছার তা নিজের নামে করে নেন। ২০০৬ সালে রিডিংযের সাথে এক ম্যাচে মাথায় মারাত্বক আঘাত পান, আঘাতটা এতটা গুরুতর ছিল যে তার মাথার হাড় দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই বলেত গোলপোস্ট ছাড়া যাবে না, এদানিং তিনি মাথায় রাগবির বিশেষ ক্যাপ পরে মাঠে নামেন ।

কম আলোচিত গোলকিপারদের মধ্যে ফিনল্যান্ডের ইউসি এস্কেলাইনেনের নাম উল্লেখ করার মত। তার গোলকিপিং ক্যারিয়ারের অনেকটা সময় বোলটন ওয়ান্ডারার্সের হয়ে খেলেছেন (৪৭৪ ম্যাচ) এখন আছেন লন্ডনের ক্লাব ওয়েস্ট হ্যামে। এই ৬ ফুট ৪ ইঞ্ছি লম্বা গোলকিপারের অজেয় ভাবটা আমার দারুন লাগে। তাকে ফাকি দেয়া চাট্টিখানি কথা না। তার একটি সেভ ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগের ২০ বছরের ইতিহাসে ৩য় সেরা বলে বিবেচিত হয়েছে। ওয়েস্ট হ্যামের খেলা থাকলে তার খেলা আপনারা দেখতে পারেন, তার গোলকিপিং আপনাকে মুগ্ধ না করে পারবেনা। ফ্রিদেল, আল হাবসির কিপিংও ভাল লাগার মত।

ইংল্যান্ড জাতীয় দলের গোলকিপার রবার্ট গ্রিনকে ভাল কিপারই মনে হয়। তবে আর আট-দশটা ইংলিশ খেলোয়াড়দের মত কেন জানি একটু অন্যমনস্ক। ওয়েস্ট হ্যামকে এইবার প্রিমিয়ার লীগে ফিরিয়ে আনতে তার আসামান্য ভুমিকা ছিল। পরে জানতে পারলাম লন্ডনের আরেক ক্লাব কিউপিআরে নাম লিখিয়েছেন। প্রথম ম্যাচেই ৫ গোল হজম করেছেন, হতাশাজনক তিনটি ম্যাচ খেলে এখন সাইডবেঞ্ছে। তার জায়গায় কিউপিআর ম্যানেজার মার্ক হিউজ ব্রাজিলের জাতীয় দলের কিপার জুলিয়াস সিজারকে নিয়ে এসেছেন।
তবে ঠিক বিপরীত অবস্থানে আছেন তারই জাতীয় দলের সতীর্থ জো হার্ট, বিজ্ঞানের ভাল ছাত্র আর ক্রিকেট খেলোয়াড় হিসাবেও যার সুখ্যাতি আছে। ২০০৩ সালে নিজ শহর শোর্সবারী ফুটবল দলের সাথে বাইরে খেলতে গিয়ে প্রফেশনাল ফুটবলে নাম লিখিয়েছিলেন ১৭ বছর বয়সে আর মাত্র ১৯ বছর বয়সেই ১৫ লাখ পাউন্ডের বিনিময়ে যোগ দেন ম্যানসিটিতে। পরপর দুইবছর প্রিমিয়ার লীগের সেরা গোলকিপারের সম্মান পেয়েছেন।



বেশিরভাগ ভাল গোলকিপারেরা উঠে আসছেন স্পেন থেকে। পেপ রাইনা, ইকার কাসিলাস, ভিক্টর ভালদেজ, ডেভিড ডি গেয়া তাদের মধ্যে অন্যতম। পেপ রাইনাত লিভারপুলের প্রান ভোমরা তাকে ছাড়া প্রথম একাদশ কল্পনাই করা যায় না আর জাতীয় দলে ইকার কাসিলাসের পর তিনিই দেল বস্কের (কোচ) প্রথম পছন্দ। রিয়াল মাদ্রিদের দলপতি ইকার কাসিলাস তার দলের হয়ে এই পর্যন্ত ৪৫০’র বেশি ম্যাচ খেলেছেন। ক্লাব আর জাতীয় দলের সফলতার জন্য দুইবার ইউরোপ সেরা খেলোয়াড়ের খেতাবও পেয়েছেন। বার্সিলোনার কিপার ভিক্টর ভালদেজ তার দলের ইতিহাসের সেরা গোল কিপার, তিনি তার দলের হয়ে এই পর্যন্ত ১৯টির মত শিরোপা জিতেছেন, যা যে কারোর জন্যই ঈর্শনীয়। ১৭ মিলিয়ন পাউন্ডের ট্রান্সফার ফিতে ম্যানইউতে যোগ দিয়ে তরুন ডি গেয়াত চারদিকে হইছই ফেলে দেন। এত টাকার ট্রান্সফার ফির ভালই প্রতিদান দিচ্ছেন এই কিপার। দেখা যাক স্পেন থেকে আর কোনও নতুন কিপার উঠে আসে কি না?
একজন ভাল মানের খেলোয়াড় কিনতে অনেক টাকা খরছ করতে হয় কিন্তু খুব কম পয়সাতেই একজন ভাল গোলকিপার পাওয়া যায়। গোল কিপারেরা জীবনের ঝুকি নিয়ে গোলবার আগলে রাখেন। স্ট্রাইকারেরা রক্ষণবুহ্য ভেদ করে ষাঁড়ের মত যখন ছুটে আসেন তখন গোল কিপারই শেষ ভরসা। গোল বাচাতে পারলে সবাই স্ট্রাইকারের তোলাধুনা করেন আবার গোল করলেও স্ট্রাইকারকে নিয়ে মেতে থাকেন, গোলকিপারেরা এখানে পর্দার আড়ালের কুশীলব মাত্র। আমার কাছে তারা একেকজন ইস্পাত কঠিন গ্ল্যাডিয়েটর, দুর্গ রক্ষার শেষ প্রহরী!
তথ্য সূত্রঃ বিভিন্ন ক্লাবের ওয়েব পেজ।
সুনামগঞ্জ, ৪ অক্টোবর, ২০১২
zakariatanveer@gmail.com
লেখক মো: জাকারিয়া জামান
- মো: জাকারিয়া জামান -এর ব্লগ
- ৪ টি মন্তব্য
- ২৪ নভেম্বর ২০১২, ১৫:০৫
- ফুটবল
প্রিন্ট করুন
-
সাম্প্রতিক পোস্ট
-
সাম্প্রতিক মন্তব্য





নীতিমালা
ব্লগ বই
অভিযোগ
সাম্প্রতিক পোস্ট

ফনেটিক
ধন্যবাদ।