শিল্পের সাকো “ট্রিবিউট-টু পাবলো পিকাসো’স ব্লু-প্রিয়ড”
শিল্পের নির্দিষ্ট কোন সংজ্ঞা নেই। আমার কাছে যেটা শিল্প কছে আপনার সেটা শিল্প নাও হতে পারে। শিল্পের এই আপেক্ষিকতা নিয়ে মানুষের গবেষনার শেষ নেই, ভিঞ্চির মোনালিসা-লাস্ট সাপার, মাইকেল এঞ্জেলোর সিস্টাইন চ্যাপেল একের পর এক চলছেই। তাতে এবার নতুন মাত্রা করলো ‘সাকো’। ‘সাকো’ হলো বাংলাদেশের প্রথম সারির কয়েকজন শিল্পী, যারা নারী শিল্পী হিসেবে ভিন্ন একটি প্লাটফর্মে নিজেদের দাঁড় করিয়েছেন। তাঁদের শিল্প সংগঠন; যেখানে ফরিদা জামান, নাঈমা হক, নাসরিন বেগম, কনক চাঁপা চাকমা, সুলেখা চৌধুরীর মতো শিল্পীরা রয়েছেন। পিকাসোর ‘ব্লু-প্রিয়ড’ দ্বারা উদ্বুদ্ব হয়ে এইসব নারী শিল্পীগন তাঁদের শিল্পকর্ম সম্পাদন করেছেন।১৯০১ সালের দিকে পিকাসোর ক্যানভাস একটি গভীর সুর এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন গ্রহণ করে এবং তা স্থায়ী ছিলো ১৯০৪ সাল পর্যন্ত। পাবলো পিকাসো এই সময়ের মধ্যে যে সব শিল্পকর্ম করেছেন তা ব্লু-প্রিয়ড নামে পরিচিত। এই সময়ের শিল্প কর্মের মধ্যে পিকাসো একরঙা নীলের ব্যবহার খুব বেশি করেছেন এবং মাঝে মাঝে উষ্ণতা বুঝানোর জন্য নীলের সাথে সবুজ ব্যবহার করেছেন। এই সময়ে ছবি আঁকার বিষয় বস্তু ছিল রাস্তার দরিদ্র মানুষ, ভিখারী, পতিতা, মদ্যপ যারা অস্থিচর্মসার এবং মানষিক ভাবে বিষণœ ও মলিন। পিকাসো স্পেন সফরকালে সেন্ট লজারে নারীদের একটি জেল ও তাঁর বন্ধু কার্লোস ক্যাসাজিমাস এর সুইসাইড দেখে প্রভাবিত হন। এই সময়টা ছিল পিকাসোর কিউবিজম ও বিখ্যাত বিমুর্ত শিল্প জগতের উত্তরনের পূর্ববর্তী সময়।
গাজীপুরের হোতাপাড়ায় এথেনা গ্যালারীর প্রাইভেট গেস্ট হাউস চত্বরে ৫,৬,৭ অক্টোবর ২০১২ এ আয়োজিত আর্ট ক্যাম্পে সাকোর স্থায়ী ৯জন মহিলা সদস্য ও আমন্ত্রিত ৩জন শিল্পী নিজ নিজ শিল্পকর্মে নীল রঙ এর ব্যবহারের প্রাধান্য প্রদর্শন করেছেন। নীল রঙ একজন শিল্পীর ব্যাক্তিগত জীবনকে কিভাবে প্রভাবিত করে ও তাকে শিল্পকর্ম করতে কতটুকু প্রভাবিত করে তা এখানে উঠে এসেছে। তাঁরা দেখিয়েছেন যে শুধু মাত্র নীল রঙ ব্যবহার করে কত সুন্দর কম্পোজিশন করা যায় এবং ছবির বিষয়বস্তুকে কত ভালোভাবে উপস্থাপন করা যায়। এরই সাথে সাথে মনি নাচানো রঙে উঠে এসেছে সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়। যেমন কনক চাপা চাকমার মিক্সড মিডিয়ায় করা “রাইজিং ফ্রম দ্যা অ্যাশেষ অফ রামু” এবং “ব্রোকেন ফেইথ” ছবি গুলোতে স্থান পেয়েছে কিছুদিন আগে ঘটে যাওয়া রামুর ন্যাক্কারজনক ঘটনা, বুদ্বের হাত-পা এখানে ভাঙ্গা, সব কিছু পুড়ে গেছে মাঝখানে ছাইয়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে বুদ্বের মূর্তি কালো কালো দাগ পড়ে গেছে-অদ্ভুত। বুদ্ব এখানে যুক্ত হয়েছেন কোনো ধর্মান্দোলনের প্রেক্ষাপটে নয়, মনুষ্যত্বের অস্তিত্ব রক্ষার সম্মানে। শিল্পী নাসরিন বেগম “ওমেন উইথ ক্যাকটাস-১” এবং “ওমেন উইথ ক্যাকটাস-২” ছবিতে তিনি নারীর স্বাভাবিক প্রকাশভঙ্গী- খোলা চুল, উম্মুক্ত পৃষ্ঠদেশ, প্রশস্ত নিতম্ব দেখাতে গিয়ে সাথে নীরব যন্ত্রণার প্রতীক নীল রঙ এবং কাঁটা যুক্ত ক্যাকটাস ব্যাবহার করেছেন। তবে পিকাসোর ছবিতে বিষয়বস্তুর চেয়ে কম্পোজিশনের ওপর জোর দিয়ে নীল রঙের প্রাধান্যে একটা মনস্তাত্ত্বিক অভিব্যক্তি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে একটা শিল্প আঙ্গিক যেমন প্রধান হয়ে ওঠে, তেমনি এই প্রদর্শনীর শিল্পীদের কাজেও তাদের নিজস্ব শিল্পশৈলীর পথে শৈল্পিক নির্মাণ প্রয়াসটাই প্রধান হয়ে উঠেছে। যদিও তিন দিনের আর্ট ক্যাম্পে তিনটি কাজ করার চাপ থাকায় বেশিরভাগ শিল্পীর ক্যানভাসে তার ছাপ স্পষ্ট। ছবি নির্মাণের চেয়ে গ্যালারির বেঁধে দেওয়া সংখ্যাটি শেষ করার প্রবণতার পরও এই কম সময়ের মধ্যে ফরিদা জামান, নাঈমা হক, কনক চাঁপা চাকমা ও সুলেখা চৌধুরীর কাজে নিয়মিত শিল্পচর্চার যে বৈশিষ্ট্য তার কৌশলগত দক্ষতা প্রকাশের মধ্য দিয়ে একটি পূর্ণ সমাপ্ত কাজের মজা পাওয়া যায়।
কনক চাঁপা চাকমার ভাষায়, ‘সাঁকো মানে সংযোগ। এই সংযোগ নিবেদিত কয়েক প্রজন্মের শিল্পীদের পরস্পর যুক্ত করে একই প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে কাজ করার সুযোগ তৈরি করে। সাঁকো শুধু শিল্পীদের একত্রিত করে না, আমরা সাঁকোর মাধ্যমে যে কোনো ধরনের মতামত ও ধারণার খোলামেলা আদান-প্রদানের একটা মাধ্যম হয়ে ওঠারও চেষ্টা করি’। একই সঙ্গে শিল্পী 'সাঁকো' দ্বারা যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ইস্যুতে ভূমিকা রাখার সঙ্গে সঙ্গে একটা সমাজকল্যাণমূলক সংযুক্তির কথাও উল্লেখ করেন।
গত ১০ই নভেম্বর, শনিবার সন্ধ্যায় উত্তর বাড্ডার এথেনা গ্যালারি অব ফাইন আর্টস ভবনে “সাকোর ট্রিবিউট-টু পাবলো পিকাসোর ব্লু-প্রিয়ড” নামের এই প্রদর্শনীটি উদ্বোধন করেন ক্যানেডিয়ান হাই কমিশনার এইচ,ই, মিস হিথার ক্রুডেন এবং প্রাক্তন এ্যাম্বাসেডার, ফ্ল্যানিং কমিশনারের প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান এবং বাংলাদেশ ইনষ্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের প্রাক্তন ডিরেক্টর জেনারেল মিসেস সালমা খান বক্তব্য রাখেন।
উল্লেখ্য, সাকোর সদস্যগন হচ্ছেন- ফরিদা জামাল, নায়িমা হক, কুহু প্লামন্দন, ফারেহা জেবা, নাসরীন বেগম, কনক চাঁপা চাকমা, সুলেখা চৌধুরী, রেবেকা সুলতানা মলি, ফারজানা ইসলাম মিল্কি। আমন্ত্রিত ৩জন শিল্পী হচ্ছেন রোকেয়া সুলতানা, আজাদি পারভিন ও আফসানা শারমিন।
লেখক এম. এ. মান্নান
- এম. এ. মান্নান -এর ব্লগ
- ৮ টি মন্তব্য
- ২৬ নভেম্বর ২০১২, ১১:০৯
- চিত্রকলা
প্রিন্ট করুন
-
সাম্প্রতিক পোস্ট
-
সাম্প্রতিক মন্তব্য





নীতিমালা
ব্লগ বই
অভিযোগ
সাম্প্রতিক পোস্ট

ফনেটিক
কিছু ছবি এখানে খুবই প্রত্যাশিত ছিলো।
প্রাসঙ্গিক ছবি যুক্ত করতে পারেন। বক্তব্যকে এখন ভিজুয়ালি উপস্থানের প্রচলন এসে গেছে।
অনেক শুভেচ্ছা রইলো।