বৃহস্পতিবার ২৪ এপ্রিল ২০১৪, ১১ বৈশাখ, ১৪২১ সাইনইন | রেজিস্টার |bangla font problem


গল্প লেখার গল্প


“অসময়ের গল্প”- এবারের অমর একুশে বই মেলায় আমার প্রথমবারের মত প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ। জিজ্ঞাস্য হতে পারে, এই গল্পগ্রন্থটির শিরোনাম “ অসময়ের গল্প” নির্ধারন করা হল কেন?
এই গল্পগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত প্রত্যেকটি গল্পই খুব স্বচ্ছভাবেই বর্তমান কালের প্রেক্ষাপটে লেখা। পুচ্ছ ধরে টেনে এদেরকে সুদূর অতীতে যেমন টেনে নিয়ে যাওয়া হয় নি ঠিক তেমনি ভাবে সুন্দর ভবিষ্যত কল্পনার লেপন দিয়ে এগুলোর অবয়ব গড়ে তোলার চেষ্টাও সুদূর পরাহত থেকেছে সবসময়। প্রকৃতি, সমাজ ও মানব অস্তিত্বের ভেতর দিয়ে বর্তমান কালের যে প্রবাহমানতা তাকে আমার সময় বলে বোধ হয়নি, অসময় বলেই ঠাহর হয়েছে বার বার। কাল তার সুনির্দিষ্ট গতিতে এগিয়ে যায় সবসময় – চলতে চলতে মিশে যায় মহাকালের গর্ভে। কালের প্রবাহমানতা সবসময় পরিবর্তনমানতা সূচিত করে অগ্রসর হয়-তার আওতার মধ্যে পড়ে এমন সকল কিছুকে সে পরিবর্তিত করে ফেলে। সুন্দর ফুটফুটে শিশু থেকে আমাদের লোলচর্ম বৃদ্ধে পরিণত করে তোলে। বহন করে নিয়ে আসে নব জীবন, প্রকৃতির নতুন বার্তা; পুরাতন বার্তা, পুরাতন জীবনকে ধীরে ধীরে খসিয়ে ফেলতে তার সামর্থ্যের অবধি নেই- গাছের হলুদ মলিন পাতা ঝরিয়ে ফেলে সবুজ সজীব কচি পাতার গজানোর মতই যেন অনেকটা। কাল যেমন তার স্বধর্ম অনুযায়ী বিরামহীন গড়িয়ে চলছে তেমনি তার আওতার মধ্যেকার সকল কিছুকে পরিবর্তন করার চেষ্টার দিকেও কোন ত্রুটি দেখা যায় না। কিন্তু মানব অস্তিত্বের বিবর্তমান পথ চলার আলাদা একটি আপেক্ষিকতা আছে, কালের প্রবাহমানতার সাথে সমান্তরালে সবসময় সে বয়ে চলতে পারেনা। প্রকৃতির মত অন্ধ দুর্দমনীয় শক্তি তার মধ্যে অনুপুস্থিত- প্রকৃতির সাথে মানব অস্তিত্বের এখানেই তার মূল পার্থক্য সূচিত হয়ে থাকে। তার এগিয়ে চলার জন্য কালের প্রবাহমানতার সাথে সাথে দরকার পড়ে নানা ধরনের মননশীল সচেতন প্রয়াসের। কাল নিরবিচ্ছিন্নভাবে এগিয়ে চললেও মননশীল সচেতন প্রয়াসের অভাব হলে মানব অস্তিত্ব সঠিকভাবে এগিয়ে যেতে ব্যার্থ হয়। “সময়” ধারনাটির সাথে মানব অস্তিত্বের এগিয়ে চলার বিষয়টি অনেকটাই সম্পৃক্ত। বর্তমান কাল প্রবাহমানতাকে আমার এজন্যেই অসময় বলে ঠাহর হয়েছে কারন আমার ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে বর্তমান কালে মানব অস্তিত্বের এগিয়ে চলার বিষয়টি খুব একটা ধরা পড়ে নি। কে জানে- হয়তোবা এগিয়ে চলছে-কিন্তু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উলম্ফনের যুগে যে গতিবেগ প্রত্যাশিত ছিল সে গতিবেগ যে নেই তা মোটামুটি নিশ্চিত। এই গল্পগ্রন্থের অন্তর্ভূক্ত গল্পগুলো বর্তমান কালের এবং বর্তমান কাল আমার কাছে অসময়ের মত প্রতিভাত হয়েছে বিধায় এগুলোকে আমি “অসময়ের গল্প” নাম দিয়েছি। মননশীল পাঠক হয়ত আমার চেয়ে ভালো বলতে পারবেন এগুলো আসলেই অসময়ের গল্প নাকি কিছুটা হলেও সময়ের গল্প। এই প্রশ্নের মীমাংসা হওয়া জরুরী এবং সে ভার মননশীল পাঠকের হাতে রইল।
আরেকটি প্রশ্ন আবশ্যিকভাবেই এসে পড়ে তা হল- কেন আমি এই গল্পগুলো কেন লেখতে গেলাম, কিই বা দরকার ছিল, না লিখলে তো কোন ক্ষতি বৃদ্ধি হতনা, আর এই গল্পগ্রন্থের আবির্ভাবের ফলে অসময় রুপান্তরিত হয়ে সময়ে পর্বসিত হয়েও যাবেনা। অযথা কেন তাহলে কালি, কাগজ খরচ- শুধু শুধু প্রুফ রিডিং, কম্পোজ, প্রচ্ছদ আঁকা, প্রিন্টিং, বাঁধাই, আরো নানা ঝুট ঝামেলা-কি দরকার! আসলে এই গল্পগুলো যখন ধীরে ধীরে আমার মগজের ভেতর জমে উঠছিল- এক কথায় বলতে গেলে, না লেখে আমি পারিনি। মাথার ভেতরে ধীরে ধীরে পরিণত হয়ে উঠা গল্পগুলোর ভূমিষ্ট হওয়ার জন্য তড়পানি একজন মহৎ শিল্পীর সৃষ্টিশীলতার বেদনার মতই বোধ হয়েছে আমার কাছে। গল্পগুলোকে তখন সাদার মধ্যে কালো অক্ষরে চিত্রিত করতে অনেকটাই বাধ্য হয়েছি। এভাবেই আমাকে যন্ত্রনার প্রশমন করতে হয়েছে। পুরো দেড়টি বছর জুড়ে বিভিন্ন সময় ধরে গল্পগুলো লেখা হয়েছে- তীব্র শীতের রাতে ঠক ঠক করে কাঁপতে কাঁপতে, প্রচন্ড ভ্যাপসা গরমে ঘেমে নেয়ে উঠে, গ্রামের বাড়িতে বর্ষার সময় টিনের চালে মধুর তালে বৃষ্টির রিমঝিম একটানা শব্দ শুনতে শুনতে। জানালার পাশের টেবিলটাতে কখনও সকালের একফালি রোদ এসে পড়েছে, গভীর রাতে কখনও বা মেটে জ্যোৎস্না আলতোভাবে এলিয়ে পড়েছে কালো কি-বোর্ডের উপর। আর ওদিকে সম্মোহিতের মত আমার আঙ্গুলগুলো মৃদু শব্দ তুলে কি-বোর্ডের বোতামের উপর দিয়ে গড়িয়ে চলছে। কম্পিউটার স্ক্রিনে গল্পের লাইনগুলো খুচরো পয়সার মত ঝরে পড়ছে ঝর ঝর করে। ব্যাডমিন্টন খেলার মাঠে প্রায় জিতে যাওয়া ম্যাচে প্রতিপক্ষকে অবাক করে খেলা থামিয়ে দিয়ে, আনমনে নদীর পাশ দিয়ে হেঁটে বেড়ানোর সময় হঠাৎ চলা থামিয়ে, খুব তাড়াতাড়ি এস্ট্রেতে সিগারেট গুঁজে দিয়ে, প্রেমিকার আলিঙ্গন থেকে দ্রুত মুক্ত হয়ে কম্পিউটার স্ক্রীনের সামনে চলে এসেছি- শুধুমাত্র গল্প লিখব বলে। অনেক সময় পাঠে মনোনিবেশ অবস্থায় গল্প বা উপন্যাসের কোন একট ঘটনা প্রবাহ ধাক্কা দিয়ে আমার ভেতরের গল্পটিকে তড়িৎ জাগিয়ে দিয়েছে।
যে কোনধরনের শিল্প সৃষ্টিতে শিল্পীর যে সচেতন প্রয়াস থাকা দরকার তা আমার ক্ষেত্রে এসেছে গল্পগুলো লেখা হয়ে যাওয়ার পর। আঙ্গিক নির্ধারনের সঠিকতা, চরিত্র সৃষ্টির নানা ধরনের জটিলতা সামলানো, নতুন অবয়বে বাক্য গঠন, ছন্দ-অলংকার, উপমা, রূপকের তাল সাজানো, বিরাম চিহ্নের সঠিক ব্যবহার, গল্পের ভেতরে খুঁটিনাটি কিছু পরিবর্তন নিয়ে আসা- মূলকথা শিল্পটিকে সুন্দর করে তোলার বিষয়টি কাজ করেছে গল্পগুলো ভূমিষ্ট হয়ে যাওয়ার পর, কোন প্রকাশনায় প্রকাশিত হওয়ার পূর্বে। অন্নপ্রশানের সময় যেমন ছেলে বা মেয়েকে সাজিয়ে গুজিয়ে নতুন কাপড় চোপড় পড়িয়ে জনসম্মুখে নিয়ে নিয়ে আসা হয়, ঠিক তেমনি আমার গল্পগুলোও পাঠকের সামনে হাজির হতে গিয়ে পরিপাটি ও মসৃন হওয়া প্রয়োজন বোধ করেছিল। তাদেরকে পরিপাটি করার দায়িত্বটি শিল্পী হিসেবে আমার উপরই বর্তেছে, আমি যথাসাধ্য সেই দায়িত্ব সম্পাদনের চেষ্টা করেছি। গল্পগুলো বেশ কয়েকটি প্রকাশনাতে প্রকাশ হওয়ার পর খুব সহজেই একটা সুযোগ হয়ে গেল বইয়ের আদলে প্রকাশিত হওয়ার। ভাবলাম গল্পগুলোকে আরো বেশী মননশীল পাঠকের সামনে উপস্থাপিত করে, গল্পগ্রন্থটির অন্তর্ভূক্ত গল্পগুলো সময়ের না অসময়ের – এই প্রশ্নের কোন কূল কিনারা করা যায় কিনা!
৫ টি মন্তব্য
rodela2012 ঘাস ফুল০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৭:০৪
মেহেদী ভাই আপনার গল্পগ্রন্থ 'অসময়ের গল্প' এর সফলতা আর পাঠক জনপ্রিয়তা কামনা করছি। অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা রইলো আপনার জন্য।
SUKHALOY মো: ওবায়দুল ইসলাম০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৭:০৬
চমৎকার । আপনাকে ধন্যবাদ। ভাল থাকবেন।
mehedimanzur মেহেদী হাসান মঞ্জুর ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৯:৩৮
আপনাদের দুজনকেও ধন্যবাদ।
sulary আলভী০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২০:৫১
mehedimanzur মেহেদী হাসান মঞ্জুর ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ০৫:৪৭
কাদের মোল্লাসহ সকল রাজাকারকে ফাঁসিতে ঝোলানোর পাশা-পাশি তাদের রাজনৈতিক দল জামাতে ইসলামীকে ফাঁসিতে ঝোলাতে হবে।

সাম্প্রতিক পোস্ট Star

সাম্প্রতিক মন্তব্যComment