রূপের কথা নয়, নিছক রূপকথাও নয়!
অনেক তো কথা হলো। ফুলের কথা, গাছের কথা, জীবনের কথা। রূপ-অরূপের কথাও তো হয়েছে কত! এসো না আজ পড়ি একটা নিছক রূপকথা! কিভাবে শুরু করা যায়, বলো তো? আচ্ছা ঠিক আছে। সেই চিরন্তন রূপকথার আদলেই হোক এ রূপকথার শুরু!
এক দেশে ছিল দোর্দণ্ড প্রতাপশালী এক রাজা। রাণী? না, সে রাজার রাণীদের কথা আজ বলবো না। বলবো তার বাগানের কথা। হ্যাঁ, সেই রাজার ছিল এক বিরাট বাগান। যে সে বাগান নয়। রাজ্যের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত সে বাগান। পৃথিবীর প্রায় সব ধরণের গাছ ছিল সেই বাগানে। তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় যে গাছটি সে বাগানে ছিল, সেটা হচ্ছে একটা আপেল গাছ। আর সব আপেল গাছের সাথে এ গাছের তেমন কোনই পার্থক্য ছিল না। পার্থক্য ছিল এর আপেলের রঙে। সে গাছে ধরতো সোনালী রঙের আপেল। না থাক, বাগান আর আপেলের কথা। কারণ সে আপেলের প্রায় সবই খেয়ে ফেলতো চোরে।
রাজার এত পাইক-পেয়াদা, উজির-নাজির, সৈন্য-সামন্ত কেউ সে চোরের সন্ধান করতে পারতো না। চোর ধরার সকল কৌশল ব্যার্থ হলে রাজা তার রাজকুমারকে চোর ধরার দায়িত্ব দিলেন। রাজকুমার চললেন রাত জেগে বাগান পাহারা দিতে। বাগানে তার জন্য উপযুক্ত ব্যাবস্থা করা হলো। রাজকুমার তীর-ধনুক নিয়ে প্রস্তুত হলেন চোর ধরার জন্য। গভীর রাত, আকাশ মেঘে ঢাকা। অন্ধকার এতই ঘন যে নিজের হাতের আঙ্গুলও দেখা যায় না। চারদিক নীরব নিস্তব্ধ সুনসান। রাজকুমারের চোখ ঘুমে ঢুলুঢুলু। হঠাৎ চারদিক আলোয় আলোয় ভরে উঠলো। রাজকুমারের তন্দ্রা ছুটে গেল। অবাক হয়ে দেখলো, একটা ‘আলোর পাখী’ চারদিক আলোকিত করে উড়ে এসে আপেল গাছে বসলো।
রাজকুমার হাতের তীর-ধনুক ফেলে দিল। মৃত নয়, জ্যান্ত সোনার পাখী ধরে রাজার কাছে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা তার। ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে লাগলো সাহসী রাজপুত্র আপেল গাছের দিকে। একেবারে চুপিসারে এগিয়ে যেয়ে হাত বাড়িয়ে পাখীটাকে ধরেই ফেললো বুঝি! পাখী টের পেয়ে গেল, সে দিল উড়াল। রাজকুমারের হাতে রইল অপূর্ব সুন্দর একটা মাত্র লেজের পালক। পালক থেকে তখনও বের হচ্ছে আলোর আভা। রাজার কাছে নিয়ে গেল পালক। পালকের আলো দেবার ক্ষমতা তখন কমতে কমতে তখন প্রায় শেষের দিকে।
-তারপর?
তারপর এই কাহিনী নানান ভাবে নানান দিকে ছড়িয়ে পড়লো। এক গল্প থেকে তৈরী হল হাজারো কাহিনী। সাধারণ মানুষ ছাড়াও গির্জার ধর্মযাজকরাও কোথাও কোথাও এমন ‘আগুনের পাখী’ দেখেছে বলে শোনা যেতে লাগলো। এমন কি, এমন একটা পাখী একবার মারাও পড়লো। সে পাখীটাকে ঘরে নিয়ে আসার পরে ধীরে ধীরে তারও আলোক বিচ্ছুরণ থেমে গেল। কিন্তু রহস্যের কোন কুল-কিনারা হলো না।
থাক, এ গল্প বাদ দিই। আরেকটা গল্প শুনাই এবারে।
পৃথিবীতে আশ্চর্য সব ঘটনা ঘটে একেক সময়ে। অলৌকিক সে সব কাহিনী শুনে মানুষ অভিভূত হয়, ভীত হয়। কল্পনার ডানায় ভর করে সে সব কাহিনী শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে ছড়িয়ে পড়ে দিক-দিগন্তে। তেমনই এক ঘটনা ঘটেছিল ভারত মহাসাগরে অবস্থিত নিউগিনিতে। ষোড়শ শতাব্দীতে আবিস্কৃত হলেও ঘন দুর্ভেদ্য জঙ্গল আর দুর্ধর্ষ স্থানীয় আদিবাসীদের বাধা প্রদানের কারণে প্রায় তিন শ বছর এখানে কোন বহিরাগত বসতি স্থাপন করতে সক্ষম হয়নি। উনিশ শতকের শেষের দিকে ওলন্দাজ দখলদারগণ নিউগিনির পশ্চিম উপকুলে তাদের ছোট্ট একটা কলোনী স্থাপন করে। সম্পূর্ণ প্রতিকুল পরিবেশে তাদের বেশ ঝুঁকি নিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছিল। স্থানীয় পাপুয়ানদের এমন পরিবেশে যুগের পর যুগ বসবাসের অভ্যাস আর তাদের হাতের বিষাক্ত তীরের অব্যার্থ লক্ষ্যভেদ, উভয়ই ছিল ইউরোপাগতদের জন্য ভীতির কারণ। পাপুয়ানবাসীদের সারা শরীরের কালো টাট্টু আর নাক-কানের অদ্ভুত অলঙ্কার তাদের চেহারায় যোগ করেছিল ভয়ঙ্করতা। ইউরোপিয়ানদের আগমন ও বসতি স্থাপনে ক্ষুব্ধ স্থানীয় আদিবাসীরা সুযোগ পেলেই তাদের উপরে চড়াও হতো। ধরে নিয়ে যেয়ে চাকরের কাজে লাগাতো বা পুড়িয়ে খেয়ে ফেলতো। এদের চলাফেরা এত নিঃশব্দে আর গোপনে সমাধা হতো যে, দখলদারদের অজ্ঞাতেই তারা এ সব কাজ শেষ করে চলে যেত। ওলন্দাজদের কাছে এ বিষয়টাকে মনে হতো একেবারে ভৌতিক। তাই তারা এই দ্বীপকে বলতো ‘দানবের দ্বীপ’।
নিরাপত্তার বিবেচনায় অভিবাসীরা বেছে নিয়েছিল অপেক্ষাকৃত নিরাপদ এক এলাকা। সমুদ্র উপকুলে তিন দিকে প্রায় তিরিশ মাইল অভেদ্য জঙ্গল পরিবেষ্টিত সে এলাকায়ও তারা সদা সতর্ক অবস্থায় থাকতে বাধ্য হতো। মাঝে মাঝেই পাপুয়ানরা অভেদ্য জঙ্গল ভেদ করে এদের আক্রমণ করে বসতো। কখনও বা তারা আক্রান্ত হতো সমুদ্রের দিক থেকেও। এ জন্য রাখা হয়েছিল সার্বক্ষণিক সতর্ক পাহারার ব্যবস্থা।
কোন এক রাতের কথা। যে রাতের কথা নিউগিনির এই অভিবাসীরা বহুদিন ভুলতে পারেনি। সে রাতটা ছিল দুর্যোগপূর্ণ। বিকেল থেকেই ভারী কালো মেঘ আকাশ ঢেকে রেখেছিল। সন্ধ্যার পরপরই তা হয়ে উঠলো একেবারে নিকষ কালো। বাতাসের আলোড়ন আর সমুদ্রের গর্জনের আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছিল আর সব শব্দ। উপকুলের দিকে দায়িত্বরত পাহারাদার একাকী থাকায় বেশ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল। অনিচ্ছা সত্ত্বেও সমুদ্রের ঢেউয়ের ঝাপ্টা থেকে নিজেকে বাঁচাতে সে ক্রমেই সেটে যাচ্ছিল পার্শ্ববর্তী গৃহের সাথে। এই গাঢ় অন্ধকার রাতেও সে তার চোখকে সজাগ রেখেছিল, যাতে কোন কিছুই তার চোখ এড়িয়ে না যায়। বাতাসের শনশন আর সাগরের গর্জনের পরেও যেন কোন অস্বাভাবিক শব্দ তার কানকে ফাঁকি দিতে না পারে, সে জন্য সে অত্যন্ত সতর্ক ছিল।
এমন সময় তার দৃষ্টি আকৃষ্ট হলো সৈকতে অস্পষ্ট এক সারি আলোর দিকে। সে আলোক রেখা আবার ক্রমেই তার দিকে এগিয়ে আসছে বলে মনে হচ্ছিল। প্রহরীর কাছে যতই এগিয়ে আসে ততই যেন তা উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়। পর মুহূর্তেই তার আরও কাছে এগিয়ে এলো সে আলোক সারি। আরো কাছাকাছি এলে লক্ষ্য করে সে দেখতে পেল যে, নিঃসন্দেহে এগুলো মানুষের পায়ের ছাপ এবং প্রতিটি ছাপ থেকে বের হচ্ছে বেশ উজ্জ্বল আলো। আকস্মিক ভাবে উদিত এ পায়ের ছাপ অল্পক্ষণ পরেই ম্লান হতে শুরু করলো এবং মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মাঝে একেবারে উধাও হয়ে গেল।
প্রহরী তো প্রায় জ্ঞানহীন অবস্থায় তার পরবর্তী জনের অপেক্ষায় রইল। ওদিকে সকাল হলে যখন জানা গেল যে, পাশ্ববর্তী ঘরের এক ব্যক্তি রাতে বাইরে গিয়েছিল- সে আর ফিরে আসেনি, তখন ভীতির মাত্রা উঠে গেল কল্পনা ছাড়িয়ে আরও বহু দূরে। এ যে দানবের পায়ের ছাপ এতে কারো কোন সন্দেহ রইল না আর। স্থানীয় অধিবাসীদের ধরে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তারা জানিয়ে দিল যে, এটা দানব, এর নাম সোয়াঙ্গী। এর পর থেকে সোয়াঙ্গীর দর্শন মিলতে লাগলো প্রায়ই, বেলাভূমিতে দেখা যেতে লাগলো তার পায়ের ছাপ। সোয়াঙ্গী নিশ্চয়ই সাগরের দানব, কারণ সাগর পাড়েই এর পায়ের ছাপ পড়তে দেখা যায়। ঝড়ো অন্ধকার রাতে এই দানবের আগমন ঘটে বেশি। আর যেদিনই তার আগমন হয়, সেদিনই কোন না কোন অঘটন ঘটেই থাকে। কোন রাতে কারো নৌকা ভেসে চলে যায় সাগরে। কোন রাতে কারো শূকর পালিয়ে চলে যায়, হারিয়ে যায় বনের আঁধারে।
কোন রহস্যই অনাবৃত থাকে না। এক সময় সোয়াঙ্গী রহস্যের কিনারা হলো। সেও এক রহস্যময় কাণ্ডের মাধ্যমেই। উত্তাল সাগরের সৈকতে তার নৌকা ঠিক মত বাঁধা আছে কিনা, তা দেখতে গেল সন্ধ্যার পরে এক ব্যক্তি। কেউ কেউ তাকে কিছুটা পিছনে থেকে সঙ্গ দিচ্ছে, আবার কেউ বা দূরে দাঁড়িয়ে দেখছে, ওরা ঠিক মত ফিরে আসে কিনা। সঙ্গদানকারীদের চোখ পড়লো অগ্রগামী ব্যক্তির পায়ের ছাপে, তাতে জ্বলছে আলো। তারা ভাবলো, এই ব্যক্তির সাথে নিশ্চয়ই দানবের যোগাযোগ আছে, সংস্রব আছে। এমন ব্যক্তির জন্য একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড! কিন্তু দণ্ড প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগেই, দূর থেকে অবলোকনকারীরা দেখতে পেলো অনুসরনকারী/সঙ্গদানকারীদের পায়ের ছাপেও জ্বলছে আলো। এর পরে সৈকতে অন্যান্যরা হাঁটাহাটি করে দেখলো যে সবাই এমন জ্যোতির্ময় পদচ্ছাপ ফেলতে সক্ষম। ওলন্দাজ অভিবাসীরা ক্রমে বুঝতে পারলো যে, দুর্যোগপূর্ণ রাতে সমুদ্র সৈকতে কেউ হেঁটে গেলে পায়ের ছাপ থেকে আলো নির্গত হয়।
কিন্তু কে এই ‘সাগরের সোয়াঙ্গী’ যে এমন করে পায়ের ছাপ থেকে আলোক নির্গত করতে পারে, ভেজা বালিকে দ্যুতিময় করে তুলতে পারে? সেই যে পাখীর পালক থেকে আলোক বিচ্ছুরণ আর চুপচুপে ভেজা বালি থেকে আলোকের আভা নির্গমন এ রহস্যের সমাধান কী? সমাধানের জন্য অবশ্য অপেক্ষা করতে হয়েছে বেশ কিছুদিন, বিজ্ঞানীরা রহস্যের কিনারা না করে কিছুতেই ছাড়তে নারাজ।
রূপকথা জটিল আকার ধারণ করেছে আমার অজান্তেই, দৈর্ঘ্যেও বেশ বেড়ে উঠেছে। শেষ করার আগে একটা প্রশ্ন। যারা সমুদ্র দেখেছেন, যারা সমুদ্রের আশপাশে বসবাস করেন, তারা কি রাতের সমুদ্রে ঢেউয়ের তালে তালে আলোক রাশি নাচতে দেখেছেন? কেউ কেউ হয়তো না বলতে পারেন, তবে আমি নিশ্চিত যে সবাই বলবেন এটা তো নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার! এর সাথে আবার সোয়াঙ্গীর সম্পর্ক কি? সম্পর্ক আছে বৈকি! সাগরের ঢেউয়ের আলোকমালা, পাখীর পালকের আলোক বিচ্ছুরণ, আর পায়ের ছাপের জ্যোতির্ময়তা, সবই ঘটিয়ে থাকে যারা, তারা অনুজীব, তারা ব্যাকটিরিয়া।
শুধু কি ব্যাকটিরিয়ায় এমন করে আলো তৈরী করতে পারে? না, না। প্রাণিজগতে এমন আরো হাজার বারো শ’ প্রজাতির প্রাণী আছে যারা দেহ থেকে আলো ছড়িয়ে থাকে। সে আলো কখনও আত্মরক্ষায়, কখনও শিকার ধরায়, কখনও সঙ্গী/সঙ্গিনীকে আকৃষ্ট করা, বা জীবন ধারণের জন্য অন্য কোন কাজে ব্যাবহৃত হয়ে থাকে।
এক দেশে ছিল দোর্দণ্ড প্রতাপশালী এক রাজা। রাণী? না, সে রাজার রাণীদের কথা আজ বলবো না। বলবো তার বাগানের কথা। হ্যাঁ, সেই রাজার ছিল এক বিরাট বাগান। যে সে বাগান নয়। রাজ্যের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত সে বাগান। পৃথিবীর প্রায় সব ধরণের গাছ ছিল সেই বাগানে। তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় যে গাছটি সে বাগানে ছিল, সেটা হচ্ছে একটা আপেল গাছ। আর সব আপেল গাছের সাথে এ গাছের তেমন কোনই পার্থক্য ছিল না। পার্থক্য ছিল এর আপেলের রঙে। সে গাছে ধরতো সোনালী রঙের আপেল। না থাক, বাগান আর আপেলের কথা। কারণ সে আপেলের প্রায় সবই খেয়ে ফেলতো চোরে।
রাজার এত পাইক-পেয়াদা, উজির-নাজির, সৈন্য-সামন্ত কেউ সে চোরের সন্ধান করতে পারতো না। চোর ধরার সকল কৌশল ব্যার্থ হলে রাজা তার রাজকুমারকে চোর ধরার দায়িত্ব দিলেন। রাজকুমার চললেন রাত জেগে বাগান পাহারা দিতে। বাগানে তার জন্য উপযুক্ত ব্যাবস্থা করা হলো। রাজকুমার তীর-ধনুক নিয়ে প্রস্তুত হলেন চোর ধরার জন্য। গভীর রাত, আকাশ মেঘে ঢাকা। অন্ধকার এতই ঘন যে নিজের হাতের আঙ্গুলও দেখা যায় না। চারদিক নীরব নিস্তব্ধ সুনসান। রাজকুমারের চোখ ঘুমে ঢুলুঢুলু। হঠাৎ চারদিক আলোয় আলোয় ভরে উঠলো। রাজকুমারের তন্দ্রা ছুটে গেল। অবাক হয়ে দেখলো, একটা ‘আলোর পাখী’ চারদিক আলোকিত করে উড়ে এসে আপেল গাছে বসলো।
রাজকুমার হাতের তীর-ধনুক ফেলে দিল। মৃত নয়, জ্যান্ত সোনার পাখী ধরে রাজার কাছে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা তার। ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে লাগলো সাহসী রাজপুত্র আপেল গাছের দিকে। একেবারে চুপিসারে এগিয়ে যেয়ে হাত বাড়িয়ে পাখীটাকে ধরেই ফেললো বুঝি! পাখী টের পেয়ে গেল, সে দিল উড়াল। রাজকুমারের হাতে রইল অপূর্ব সুন্দর একটা মাত্র লেজের পালক। পালক থেকে তখনও বের হচ্ছে আলোর আভা। রাজার কাছে নিয়ে গেল পালক। পালকের আলো দেবার ক্ষমতা তখন কমতে কমতে তখন প্রায় শেষের দিকে।
-তারপর?
তারপর এই কাহিনী নানান ভাবে নানান দিকে ছড়িয়ে পড়লো। এক গল্প থেকে তৈরী হল হাজারো কাহিনী। সাধারণ মানুষ ছাড়াও গির্জার ধর্মযাজকরাও কোথাও কোথাও এমন ‘আগুনের পাখী’ দেখেছে বলে শোনা যেতে লাগলো। এমন কি, এমন একটা পাখী একবার মারাও পড়লো। সে পাখীটাকে ঘরে নিয়ে আসার পরে ধীরে ধীরে তারও আলোক বিচ্ছুরণ থেমে গেল। কিন্তু রহস্যের কোন কুল-কিনারা হলো না।
থাক, এ গল্প বাদ দিই। আরেকটা গল্প শুনাই এবারে।
পৃথিবীতে আশ্চর্য সব ঘটনা ঘটে একেক সময়ে। অলৌকিক সে সব কাহিনী শুনে মানুষ অভিভূত হয়, ভীত হয়। কল্পনার ডানায় ভর করে সে সব কাহিনী শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে ছড়িয়ে পড়ে দিক-দিগন্তে। তেমনই এক ঘটনা ঘটেছিল ভারত মহাসাগরে অবস্থিত নিউগিনিতে। ষোড়শ শতাব্দীতে আবিস্কৃত হলেও ঘন দুর্ভেদ্য জঙ্গল আর দুর্ধর্ষ স্থানীয় আদিবাসীদের বাধা প্রদানের কারণে প্রায় তিন শ বছর এখানে কোন বহিরাগত বসতি স্থাপন করতে সক্ষম হয়নি। উনিশ শতকের শেষের দিকে ওলন্দাজ দখলদারগণ নিউগিনির পশ্চিম উপকুলে তাদের ছোট্ট একটা কলোনী স্থাপন করে। সম্পূর্ণ প্রতিকুল পরিবেশে তাদের বেশ ঝুঁকি নিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছিল। স্থানীয় পাপুয়ানদের এমন পরিবেশে যুগের পর যুগ বসবাসের অভ্যাস আর তাদের হাতের বিষাক্ত তীরের অব্যার্থ লক্ষ্যভেদ, উভয়ই ছিল ইউরোপাগতদের জন্য ভীতির কারণ। পাপুয়ানবাসীদের সারা শরীরের কালো টাট্টু আর নাক-কানের অদ্ভুত অলঙ্কার তাদের চেহারায় যোগ করেছিল ভয়ঙ্করতা। ইউরোপিয়ানদের আগমন ও বসতি স্থাপনে ক্ষুব্ধ স্থানীয় আদিবাসীরা সুযোগ পেলেই তাদের উপরে চড়াও হতো। ধরে নিয়ে যেয়ে চাকরের কাজে লাগাতো বা পুড়িয়ে খেয়ে ফেলতো। এদের চলাফেরা এত নিঃশব্দে আর গোপনে সমাধা হতো যে, দখলদারদের অজ্ঞাতেই তারা এ সব কাজ শেষ করে চলে যেত। ওলন্দাজদের কাছে এ বিষয়টাকে মনে হতো একেবারে ভৌতিক। তাই তারা এই দ্বীপকে বলতো ‘দানবের দ্বীপ’।
নিরাপত্তার বিবেচনায় অভিবাসীরা বেছে নিয়েছিল অপেক্ষাকৃত নিরাপদ এক এলাকা। সমুদ্র উপকুলে তিন দিকে প্রায় তিরিশ মাইল অভেদ্য জঙ্গল পরিবেষ্টিত সে এলাকায়ও তারা সদা সতর্ক অবস্থায় থাকতে বাধ্য হতো। মাঝে মাঝেই পাপুয়ানরা অভেদ্য জঙ্গল ভেদ করে এদের আক্রমণ করে বসতো। কখনও বা তারা আক্রান্ত হতো সমুদ্রের দিক থেকেও। এ জন্য রাখা হয়েছিল সার্বক্ষণিক সতর্ক পাহারার ব্যবস্থা।
কোন এক রাতের কথা। যে রাতের কথা নিউগিনির এই অভিবাসীরা বহুদিন ভুলতে পারেনি। সে রাতটা ছিল দুর্যোগপূর্ণ। বিকেল থেকেই ভারী কালো মেঘ আকাশ ঢেকে রেখেছিল। সন্ধ্যার পরপরই তা হয়ে উঠলো একেবারে নিকষ কালো। বাতাসের আলোড়ন আর সমুদ্রের গর্জনের আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছিল আর সব শব্দ। উপকুলের দিকে দায়িত্বরত পাহারাদার একাকী থাকায় বেশ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল। অনিচ্ছা সত্ত্বেও সমুদ্রের ঢেউয়ের ঝাপ্টা থেকে নিজেকে বাঁচাতে সে ক্রমেই সেটে যাচ্ছিল পার্শ্ববর্তী গৃহের সাথে। এই গাঢ় অন্ধকার রাতেও সে তার চোখকে সজাগ রেখেছিল, যাতে কোন কিছুই তার চোখ এড়িয়ে না যায়। বাতাসের শনশন আর সাগরের গর্জনের পরেও যেন কোন অস্বাভাবিক শব্দ তার কানকে ফাঁকি দিতে না পারে, সে জন্য সে অত্যন্ত সতর্ক ছিল।
এমন সময় তার দৃষ্টি আকৃষ্ট হলো সৈকতে অস্পষ্ট এক সারি আলোর দিকে। সে আলোক রেখা আবার ক্রমেই তার দিকে এগিয়ে আসছে বলে মনে হচ্ছিল। প্রহরীর কাছে যতই এগিয়ে আসে ততই যেন তা উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়। পর মুহূর্তেই তার আরও কাছে এগিয়ে এলো সে আলোক সারি। আরো কাছাকাছি এলে লক্ষ্য করে সে দেখতে পেল যে, নিঃসন্দেহে এগুলো মানুষের পায়ের ছাপ এবং প্রতিটি ছাপ থেকে বের হচ্ছে বেশ উজ্জ্বল আলো। আকস্মিক ভাবে উদিত এ পায়ের ছাপ অল্পক্ষণ পরেই ম্লান হতে শুরু করলো এবং মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মাঝে একেবারে উধাও হয়ে গেল।
প্রহরী তো প্রায় জ্ঞানহীন অবস্থায় তার পরবর্তী জনের অপেক্ষায় রইল। ওদিকে সকাল হলে যখন জানা গেল যে, পাশ্ববর্তী ঘরের এক ব্যক্তি রাতে বাইরে গিয়েছিল- সে আর ফিরে আসেনি, তখন ভীতির মাত্রা উঠে গেল কল্পনা ছাড়িয়ে আরও বহু দূরে। এ যে দানবের পায়ের ছাপ এতে কারো কোন সন্দেহ রইল না আর। স্থানীয় অধিবাসীদের ধরে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তারা জানিয়ে দিল যে, এটা দানব, এর নাম সোয়াঙ্গী। এর পর থেকে সোয়াঙ্গীর দর্শন মিলতে লাগলো প্রায়ই, বেলাভূমিতে দেখা যেতে লাগলো তার পায়ের ছাপ। সোয়াঙ্গী নিশ্চয়ই সাগরের দানব, কারণ সাগর পাড়েই এর পায়ের ছাপ পড়তে দেখা যায়। ঝড়ো অন্ধকার রাতে এই দানবের আগমন ঘটে বেশি। আর যেদিনই তার আগমন হয়, সেদিনই কোন না কোন অঘটন ঘটেই থাকে। কোন রাতে কারো নৌকা ভেসে চলে যায় সাগরে। কোন রাতে কারো শূকর পালিয়ে চলে যায়, হারিয়ে যায় বনের আঁধারে।
কোন রহস্যই অনাবৃত থাকে না। এক সময় সোয়াঙ্গী রহস্যের কিনারা হলো। সেও এক রহস্যময় কাণ্ডের মাধ্যমেই। উত্তাল সাগরের সৈকতে তার নৌকা ঠিক মত বাঁধা আছে কিনা, তা দেখতে গেল সন্ধ্যার পরে এক ব্যক্তি। কেউ কেউ তাকে কিছুটা পিছনে থেকে সঙ্গ দিচ্ছে, আবার কেউ বা দূরে দাঁড়িয়ে দেখছে, ওরা ঠিক মত ফিরে আসে কিনা। সঙ্গদানকারীদের চোখ পড়লো অগ্রগামী ব্যক্তির পায়ের ছাপে, তাতে জ্বলছে আলো। তারা ভাবলো, এই ব্যক্তির সাথে নিশ্চয়ই দানবের যোগাযোগ আছে, সংস্রব আছে। এমন ব্যক্তির জন্য একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড! কিন্তু দণ্ড প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগেই, দূর থেকে অবলোকনকারীরা দেখতে পেলো অনুসরনকারী/সঙ্গদানকারীদের পায়ের ছাপেও জ্বলছে আলো। এর পরে সৈকতে অন্যান্যরা হাঁটাহাটি করে দেখলো যে সবাই এমন জ্যোতির্ময় পদচ্ছাপ ফেলতে সক্ষম। ওলন্দাজ অভিবাসীরা ক্রমে বুঝতে পারলো যে, দুর্যোগপূর্ণ রাতে সমুদ্র সৈকতে কেউ হেঁটে গেলে পায়ের ছাপ থেকে আলো নির্গত হয়।
কিন্তু কে এই ‘সাগরের সোয়াঙ্গী’ যে এমন করে পায়ের ছাপ থেকে আলোক নির্গত করতে পারে, ভেজা বালিকে দ্যুতিময় করে তুলতে পারে? সেই যে পাখীর পালক থেকে আলোক বিচ্ছুরণ আর চুপচুপে ভেজা বালি থেকে আলোকের আভা নির্গমন এ রহস্যের সমাধান কী? সমাধানের জন্য অবশ্য অপেক্ষা করতে হয়েছে বেশ কিছুদিন, বিজ্ঞানীরা রহস্যের কিনারা না করে কিছুতেই ছাড়তে নারাজ।
রূপকথা জটিল আকার ধারণ করেছে আমার অজান্তেই, দৈর্ঘ্যেও বেশ বেড়ে উঠেছে। শেষ করার আগে একটা প্রশ্ন। যারা সমুদ্র দেখেছেন, যারা সমুদ্রের আশপাশে বসবাস করেন, তারা কি রাতের সমুদ্রে ঢেউয়ের তালে তালে আলোক রাশি নাচতে দেখেছেন? কেউ কেউ হয়তো না বলতে পারেন, তবে আমি নিশ্চিত যে সবাই বলবেন এটা তো নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার! এর সাথে আবার সোয়াঙ্গীর সম্পর্ক কি? সম্পর্ক আছে বৈকি! সাগরের ঢেউয়ের আলোকমালা, পাখীর পালকের আলোক বিচ্ছুরণ, আর পায়ের ছাপের জ্যোতির্ময়তা, সবই ঘটিয়ে থাকে যারা, তারা অনুজীব, তারা ব্যাকটিরিয়া।
শুধু কি ব্যাকটিরিয়ায় এমন করে আলো তৈরী করতে পারে? না, না। প্রাণিজগতে এমন আরো হাজার বারো শ’ প্রজাতির প্রাণী আছে যারা দেহ থেকে আলো ছড়িয়ে থাকে। সে আলো কখনও আত্মরক্ষায়, কখনও শিকার ধরায়, কখনও সঙ্গী/সঙ্গিনীকে আকৃষ্ট করা, বা জীবন ধারণের জন্য অন্য কোন কাজে ব্যাবহৃত হয়ে থাকে।
লেখক নাজমুল হুদা
- নাজমুল হুদা -এর ব্লগ
- ৬ টি মন্তব্য
- ১৫ নভেম্বর ২০১২, ২৩:০২
- জানা-অজানা
প্রিন্ট করুন
- ৬ টি মন্তব্য
-
রঙপেন্সিল ১৫ নভেম্বর ২০১২, ২৩:৫৬
খুব ভালো লাগলো লেখাটি পড়ে। বিষয় বৈচিত্র্য লেখাটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে নির্দ্বিধায়।
-
রব্বানী চৌধুরী১৬ নভেম্বর ২০১২, ১০:০০
ভালো লাগলো আপনার জানা-অজানা পোষ্টটি,
আপনার প্রথম পোষ্টটির জন্য আপনাকে অভিনন্দন। নিয়মিত লিখবেন, শুভেচ্ছা জানবেন। ভালো থাকবেন।
-
সাম্প্রতিক পোস্ট
-
সাম্প্রতিক মন্তব্য





নীতিমালা
ব্লগ বই
অভিযোগ
সাম্প্রতিক পোস্ট

ফনেটিক