ভা লো থে কো
আজ মালতীর চতুর্থ বিয়ে বার্ষিকি। এই সময়টা বাড়িতে স্বামীর অথবা আত্মীয় স্বজনের সাথে আনন্দে কাটাবার কথা। কিন্তু ভাগ্যে সেই মিলনের আবেশ ধরা দেয়নি। মনের মাঝে স্বপ্নের সঙ্গম সুখ হয়ে আসেনি, ভোরের আলোর মত নতুন জীবন শুরু হয়ে বুকে জড়িয়ে নেয়নি। বাঁকা কালো জল তার জীবনের সোহাগের সাথে হিংসা করেছে। সকালের শিশির সিক্ত বাতায়ন ধিক্কার দিয়ে ওর কাছ থেকে চলে গেছে। কোথায় গেছে তা মালতী জানে না।
আজ মালতী পেছনের সব দুঃখ ভুলে যেতে চায়। কিন্তু দুঃখ তো ভোলা যায় না, কী দিয়ে তা সরাবে? সে তো বারেবারে চলে আসে, আঁচলে ভর করে আসে, চোখের সাথে মাতলামি করে আসে। কোথায় গেল হাত ধরে অবাধে নদীর তীরে হাঁটার কাল ! পূর্ব আকাশে সাদা বকের উড়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখা। সবই আছে কিন্তু ওরা কেউ মালতীকে সাথে নেয় না।
মালতীর ঘুম থেকে জেগে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানালার পানে তাঁকালো। একগুচ্ছ ফুলের সুগন্ধ তার জানালার কাছে এসে আবার বিমুখি হয়ে ফিরে গেল। মালতীর বুকের ভিতরটা এক অজানা তোলপারে ব্যাথির হল।
কিনা কি ভেবে মালতীর মন খুবই খারাপ হয়ে গেল। ভাবে, কে দিয়ে যায় এই যাতনা, কে যথারীতি প্রহার করে এ বুকের মাঝে ! আমি তো একাই আছি আর তো কোন সঙ্গতার মিলতে চাইনা। তবুও কেন আমি বারেবার ফিরে যাই পূর্বের সেই বিরহের তেপান্তরে ! কেন আমার মাঝে জল স্রোতের ব্যর্থ ঢেউ অবিরাম আঘাত করে যায় ! দূরে থাকার যে বাসনা মনে পোষণ করেছি তা নিজের সাথেই অবাধ্য হয়। আর কোন রঙ্গিন স্বপ্ন দেখতে চাইনা। আর কোন সুখের সাগরে ভাসতে চাই না। গত তিন বছর গত হল এই বেদনা বারেবারে আসে যায়। আর কতদিন এভাবে এই একাকি তৃর্ষ্ণার সাথে জীবন পোহাতে হবে ! একটা স্থির আবেশে যাওয়া প্রয়োজন, নইতো জীবনের মূল্য থাকে না।
এতদিন একটা করে গোলাপ ফুল মালতী রেখে দিতো কারো জন্য। সেতো আসে না, সে কে? মালতী তা জানে। তার জন্যই তো জীবনে বেঁচে থাকার আশা এখনো করা হয়। কিন্তু মালতী জানে, একদিন নির্ভিতে এই প্রেম ভাবনার বাতি ঘর ফুরিয়ে যাবে। নীল আকাশটাকে তখন আরও বেশী নীল মনে হবে। কোন রঙ্গিন আলো এই নারীর কাছে ধরা দেবে না। প্রেমের বাতাসে তখন নারীর কান্না শুনতে পাওয়া যাবে। উহাই হবে বাস্তবতার দুয়ারে দাঁড়িয়ে থাকা জাগ্রত যৌবনের ওপর সাদা কাফন।
সকালের নাস্তা শেষ করে মালতী বাহিরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হল। কোথায় যাবে তা স্থির করতেই তার দৃষ্টিখানি পাশ বেয়ে এক রৌদ্র ছায়ায় ঠেকলো। কে যেন বাধার প্রাচীর দিল, কিছুতেই দৃষ্টি সরানো গেল না। এই তো সেদিনের কথা, এখানেই তার সাথে শেষ দেখা হয়েছিল। সেই শেষ কথার আঙ্গিনা যেন এখনও জীবন্ত হয়ে মালতীর পানে চেয়ে রয়েছে।
গায়ে জড়ানো শাড়ির আঁচলের কিছু অংশ ঘরের দুয়ার থেকে মাটি ঘেসে কিছুদূর গেল। সেদিকে মালতীর খেয়াল নেই। যেখানে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল তাতে আর মন চলছে না। বৃথাই ভর করছে। চোখের কোনায় ক'ফোটা জল এসেছিল তাও শুকিয়ে গেল।
আজ এই দিনটা কী শুধুই অবহেলায় কাটবে ! কোন মধু পিয়াসে মিলতে পারবে না। এই হৃদয়ের নীলে কোন আশার চাদর জড়াতে পারবে না ! অথচ প্রথম বিয়ে বার্ষিকিতে কতইনা মজা করেছিল। বিকেলে দু-জনে অনেক জায়গায় হেঁটেছিল। সাইদ বলতো এই দিনটির কথা ভুলে যাওয়ার নয়। কালো ধুলোর মাঝে আমি তোমাকে আলো রুপে পেয়েছি, হাজারো নতুন ফুলের আগমন হলেও তোমার থেকে দূরে যাবো না। হে প্রিয় ! রেখো বেঁেধ জনম জনমে রক্তগতির আত্মার সাথে।
একবার মালতী বিশেষ কারণে কোথায় যেন গিয়েছিল, দু-দিন তাই সাইদের সাথে যোগাযোগ ছিল না। সাইদ তার কারণে সে কী অভিমান ! কিছূতেই নিজেকে বুঝ দিতে পারেনি যে, সে ফিরে আসবে তোমারি আত্মার নিগাঢ়ে। মালতী ফিরে এলে সাইদ বলল, তুমি জানো না তোমায় ছাড়া আমার বেঁচে থাকা হয় না। প্রতিটি সময় অজস্র যুগের মত মনে হয়। প্রতিটি প্রহর যেন সাদা কাফনে ভরা বিরহের দোসর। হে প্রিয়া ! আর কখনো আমায় রেখে যেও না। আজকের দিনটা যেমন সত্য ঠিক তেমনি তুমি ও আমি সত্য। মালতী নিজের ঠোঁট নেড়ে বলতো, কে শিখিয়েছে তোমায় এমন পাকা পাকা কথা? আমি তো তোমায় নিজের করে নিয়েছি আপন আলোয়। কালের মহাকালে ভাঙ্গা গড়ার পথে পথে আমি তোমারি থাকব।
প্রখর রোদে মালতীর কপাল বেয়ে ঘাম পড়ছে। যা ভেবে সকালে বের হয়েছিল তা আর হল না। মালতী আজ আকাশি রঙের শাড়ির সাথে হালকা কমলা রঙের ব্লাউজ পড়েছে। ঠোঁটে বিভিন্ন ধরনের পালিশ মেখেছে। পায়ে কালো রঙের জুতা পড়া। দেখতে যেন, চাঁদের গায়ে আরেক চাঁদের মিলন হয়েছে। যৌবনের দুয়ারে এক নব বর্ষার ঝিলিমিলি সভ্যতার চাদর গায়ে পথে দাঁড়িয়ে আছে।
মালতী এক রিক্সাওয়ালাকে বলল, যাবেন? মালতীর কথায় লোকটা কোন সাড়া দিল না। মালতী নীলক্ষেত যাবে। ক’টা বই কিনবে, কিন্তু কার লেখা বই তা জানা নেই। অনেক লেখকের বই ভালো লাগে তবে আজ কোন প্রিয় লেখকের নাম মনে আসছে না। মালতীর আগে বই পড়ার অভ্যাস ছিল না। প্রথম পরিচয়ে সাইদ ওকে একটা কবিতার বই দিয়েছিল, কেন জানি বইটা পড়ার পর নেশাটা আরও বেড়ে যায়। তারপর সাইদ অনেক বই কিনে দিয়েছিল। রাত যখন দ্বি-প্রহর পেরিয়ে যেতো মালতী তখনও বই পড়তো। আশেপাশে দুঃর্ঘটনা হলেও তার কানে বইয়ের ভাবনা ছাড়া কিছু ঢুকতো না।
আজ সাইদ অনেক দূরে, মালতীকে আর বই কিনে দেয় না। কিন্তু মালতী বই পড়ার অভ্যাসটা ছাড়তে পারেনি। একা ঘর একটা জীবন, বই একমাত্র সঙ্গি। হঠাৎ আকাশ থেকে রোদ পালিয়ে মেঘের উদয় হল। বাতাসের মাঝে সেই খাঁ খাঁ ভাবটা নেই। বুঝা যায় বৃষ্টির নামবে। শাহবাগ থেকে নীলক্ষেত মালতী রিক্সায় যেতে পারল না। এই শহরটা অনেক পরিচিত, এই তো সেদিনের কথা। গভীর রাত পর্যন্ত রাস্তার পাশে বসে সাইদের সাথে গল্প করতো, এক গল্প শেষ হলে আরেক গল্প শুরু হতো। সাইদ মালতীর নজরে এক ধ্যানে তাঁকিয়া থাকতো। সাইদ বলতো, আমি তাকে দেখছি এক মানবীর রূপ, জীবনের সাথে যাকে আমি বেঁধেছি ভালবাসায়।
মালতী গত তিন বছর একুশে বইমেলায় যায়নি, তবে মেলার কারণে বই কেনা থেমে থাকেনি। একুশে বই মেলা মানে মালতীর আত্মার সঙ্গম ছিল, কিন্তু আক্ষেপে মনের দুঃখে আর যাওয়া হয়নি। একবার মালতী না বলে বাবার পকেট থেকে টাকা নিয়ে বই কিনেছিল তার জন্য ওকে অনেক বকেছিল কিন্তু তাতে মালতীর কোন দুঃখ হয়নি। মালতীর থাকার ঘরটা ছোট ধরনের একটা লাইব্রেরী মত। কবি নজরুলের ”বিদ্রোহী” কবিতা মালতীর কমছে কম হাজার বার পড়া হয়েছে। কিছুতেই যেন সাধ মেটে না, আরও পড়তে ইচ্ছে করে।
মালতীর বই কেনা আজ হল না। প্রিয় লেখকের বই যেন আজ হারিয়ে গেছে, হয়তো হাতের কাছে নড়াচড়া করা হয়েছে কিন্তু বুঝা যায়নি। সত্যি বলতে কী মালতীর মনটা যেন কোথায় হারিয়ে গেছে, কোন অজানা পিয়াসের ঘাটে ! কোন ছায়াতলে, যেখানে সাইদের ভালবাসা ছাড়া কিছুই নেই।
বৃষ্টির জলে মালতীর দেহ ভিজে গেছে। এক জীবন্ত দামিনী হয়ে যৌবন ফুটে ওঠেছে। মালতীর সারা দেহে জলরাশিগুলো তাদের নিজেদের মুখের স্পর্শ দিচ্ছে। তা থেকে ক’ফোটা জলরাশি ধীর বেগে বুকের ওপর খেলায় মেতেছে। গায়ের জামা কাপড়টা যেন নেহাত ঢাকনা, তা কোন ভাবেই মালতীর দেহের চামরা ঢাকতে পারছে না। তা দেখে যেন ধরণী বলল, হে নারী ! তোমায় স্রষ্টা যা দিয়েছে তা কী নিজে চেয়ে দেখেছো ! তুমি তোমার পুরুষকেই উহা দেখাইও দিবস রাতে, অন্যকে নয়।
বৃষ্টির কারণেও মালতী দৌড়ালোনা। চারপাশে তাঁকিয়ে এক গলি পথ দিয়ে যাওয়া শুরু করল। একটা রিক্সাওয়ালা পেয়ে চড়ে বসল। তিনি বললেন, কোথায় যাবেন আপা?
মহাখালী।
হায় এতো দূর রিক্সায় চড়ে যাবেন?
কেন টাকা দিব যাবেন কী না বলেন?
না।
মালতী নেমে আবার হাঁটছে। মালতী অবশ্য মন থেকে মহাখালি যাবার কথা বলেনি, মুখ থেকে বের হয়ে গেছে, তা রিক্সাওয়ালা যাওয়ার পরে বুঝলো। যে কটা টাকা ছিল তাও তো প্রায় শেষ। বৃষ্টিতে দেহখানি ভিজে একাকার হয়ে গেছে। চুলগুলো বাম হাতের স্পর্শে ছড়িয়ে দিল। হঠাৎ মালতীর দৃষ্টিখানি রাস্তার ডানপাশে দু-তলা ছাদের ওপর বসা এক অতি চেনা মানুষের ওপর পড়ল। মানুষটা যে সাইদ তাতে মালতীর কোন সন্দেহ রইলো না। মালতী নিজের মাঝেই অনেক প্রশ্নের সম্মুখিন হল। কিন্তু নিজের দৃষ্টিখানি মালতী ফেরাতে পারেনি। ডানবামে গাড়ির হর্ণ বাজছে। তবুও সে রাস্তা থেকে সরে দাঁড়ায়নি। অতঃপর একটা ছোট বাসের ধাক্কায় মালতী রাস্তার ডান পাশে ধুমড়ে মুচড়ে পড়লো। একটা বিষণ চিৎকার হল।
একটা ভালবাসার মানুষের মন কী মনের মানুষের সঙ্গ না পেয়ে হারিয়ে যাবে ! তাহলে তো প্রেমের ভূবন অপূর্ণতায় যুগে যুগে ধ্বংস হতে থাকবে। হে আত্মার প্রেম রবি, তুমি কোথায় গেলে ! তোমার একজন তো হারিয়ে যাচ্ছে, তাকে ফেরাও। সে ঘুমাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে, তাকে জাগাও। প্রেমের কাব্যে তো দুঃখ নিয়ে দুনিয়া ছাড়তে পারে না।
মালতীকে হাসপাতালে নেওয়া হল। তার অগোছালো কথা বার্তা হাসপাতালের সবাইকে ভাবনার ফেলে দিল। বিছানা ছেড়ে উঠতেই বুঝতে পারল পায়ের নিচের অংশে কিছু একটা হয়েছে। ঠিক তাই, হাঁটুর নিচের অংশ কেটে ফেলা হয়েছে। পা আর ফিরে পাবার আশা নেই। মালতীর চিকিৎসা চলছে।
ডাঃ লুবনা, মালতীর মেজর অপারেশনটা করেছে। সে কোন ভাবেই মালতীর পরিচয় জানতে পারল না। মালতী বারেবার বলছে, আমিই আমার ঠিকানা, আমার আপন বলতে আমিই আমার। ডাঃ লুবনা কর্তৃপক্ষের সকল পাওনা মিটিয়ে মালতীকে নিজের বাসায় নিয়ে গেল।
এতো দিন একা ছিলাম, দুঃখ কষ্টগুলো আমার কাছেই থাকতো, কোন ভাগ কাউকে দিতে চাইনি। একটা চাকুরি করতাম। স্রষ্টা যেন তাতে কু-দৃষ্টি রাখলেন। এই বলে কাঁদতেই ডাঃ লুবনা চক্ষুদ্বয় মুছে দিয়ে বলল, যতদিন ইচ্ছে তুমি এখানে থাকো, কোন করুণা নয় বরং সাহায্যের হাত।
মালতী কোন কথা বলল না। ভাবছে, কেমন করে ধীর পায়ে সব শেষ হয়ে যাচ্ছে। সেই বুকে বাঁধা ভালবাসার পান্ডুলিপি, যৌবনের তারুণ্যতা আমায় আর খুঁজে ফেরে না। কোথায় গেল সেই উত্তাল মহনা ! আমি তো দুঃখ পেতে চাইনি, আমি তো ভালবাসা পেতে চেয়েছি। ক্্রমেই মরণের দিকে যাচ্ছি। হে খোদা ! তুমি কেন আমায় এই কষ্ট দিচ্ছো? মালতী নিজেকে স্বাভাবিক করে নিয়ে ডাঃ লুবনাকে বলল, তোমার কথা বল? তোমার সাহেব ও সন্তানদের কী খবর?
ডাঃ লুবনা বলল, ওতো সারাদিন ব্যবসার কাজে ব্যাস্ত। আমাকে সময়ই দেয় না। গভীর রাতে বাসায় ফেরে। তবে এক ছেলে ও স্বামীকে নিয়ে আমি সুখী। ছেলে টুটুল, বয়স দেড় বছর। ওকে বূয়ার কাছে রেখে কাজে যাই।
ওদের দুজনের মাঝে ভালো জমে উঠছে। মালতীকে আর আগের কথা মনে করে কষ্ট পেতে হচ্ছে না। মালতীর তো একটা স্বপ্ন সুখের সংসার করার সাধ ছিল, যেখানে স্বামী ও সন্তানের ভালবাসায় নিজের মাতিয়ে রাখবে। চোখের কোনায় জল দেখে ডাঃ লুবনা বলল, আবারও কান্না ! স্বামীর কথা মনে পড়েছে বুঝি? মনে করে আর কী হবে ! সে তো তোমার কাছে নেই, হয়তো খুব দূরে নয়, এই শহরেই থাকে।
তার দেখা যেহেতু পেয়েছি তাকে পাবোই, হয়তো মরণের দুয়ারে গিয়ে। তবুও আশা রাখি।
কোন ছবি আছে তার?
কোন ছবি প্রয়োজন পড়বে না, সময়ের সাথে সে নিশ্চই আমার সামনে হাজির হবে। আচ্ছা, সপ্তাহ পেরিয়ে গেল অথচ তোমার সাহেবের সাথে আমার দেখাই তো হল না। তিনি এতোই ব্যাস্ত লোক?
কী আর বলব, বলি এতো টাকা দিয়ে কী হবে। ও এর কোন জবাবই দেয় না। আমি অবশ্য একবার তোমার কথা ফোনে বলেছি, ও বলেছে দু-দিন পরেই আসবে তোমাকে না যেতে বলেছে।
মালতী বলল, তোমার যদি ছুটি থাকে তবে চল না বাহিরে একটু ঘুরে আসি? কতদিন যেন মুক্ত আকাশে তাঁকানো হয় না। বিহঙ্গোদের নাঁচের তালে মজতে পারি না। জানো লুবনা আগে কত গান শুনতাম, কবিতা লিখতাম, তার কিছুই এখন হয় না। প্রথম স্কুল জীবনে আমার গান শুনে প্রধান শিক্ষক আমায় আর্শিবাদ করেছিলেন। আমি নাকি চেষ্টা করলে অনেক বড় শিল্পি হতে পারব। শিল্পি না ছাই। এখন নিজেরই জায়গা নেই।
সাইদের সাথে মালতীর প্রথম দেখা হয়েছিল এক সমুদ্র সৈকতে বনভোজনে যাওয়ার পর। সাইদই প্রথম মনের কথা বলেছিল। এই সেই সমুদ্র সৈকত। তারপর আরও দু-বার ওরা এখানে এসেছিল। একবার স্রোতের মুখে মালতী জল খেয়েছিল। কী নুনতা ! আজ তা মালতীর শুধুই স্মৃতি। ডাঃ লুবনা বলল, চলো একটু ওদিক থেকে হেঁটে আসি। মালতী তো আর হাঁটতে পারে না। সে দু-পাশে স্টিলের লাঁঠিতে ভর করে চলে। এতোক্ষণ বসেছিল। ডাঃ লুবনার কথায় মালতী আর বসে থাকতে পারল না। কী সুন্দর সূর্য ডুবার দৃশ্য ! পাশেই ছোট ছেলে মেয়েরা শামুকের মালা হাতে নিয়ে বিক্রয় করার জন্য ঘুরছে। এখানে যত ধরনের যা পাওয়া যায় তার বেশীর ভাগই শামুকের। মালতী একটা বড় শামুক কিনে তার মাঝে সাইদ শব্দ লিখে নিল।
ডাঃ লুবনার সাহেব ফোন করেছে। সে আজই ঢাকায় ফিরবে। ব্যবসার কাজে সিঙ্গাপুর গেছে। লুবনা বলল, চলো মালতী ঢাকায় আজই ফিরতে হবে। সাহেব ফিরে যেতে বলেছে।
তুমি বুঝি তোমার সাহেবকে ছাড়া একটুও থাকতে পারো না?
ডাঃ লুবনা হেসে বলে, তোমার সাহেব কাছে থাকলে তুমিও থাকতে পারতে না, বুঝলে?
বাচ্চাসহ ওরা তিন জন রওনা হল, গাড়ী ফেনী পেরিয়ে যেতেই সমস্যা হল। হঠাৎ এক আত্মচিৎকারে মালতীর ঘুম ভাঙ্গলো, ডা লুবনাকে ডাকতেই ডাকাত দল মালতীর গলা থেকে সোনার হারটা জোর করে কেড়ে নিল। কখন যেন ডাকাতদের ছোরার আঘাতে মাথা রক্তাক্ত হয়ে মালতী গাড়ির সিটেই পড়ে বইলো। ডাকাতরা আরও লোকদের কাছ থেকে টাকা সোনা ও জিনিসপত্র নিয়ে চলে গেল।
রাত গভীর তবে সময়টা জানা গেল না। হাতের ঘড়িটাও ওরা খুঁলে নিয়ে গেছে। গাড়ি থামিয়ে মালতীকে ডাঃ লুবনা পাশের হাসপাতালে ভর্তি করালো। রাতেই লুবনার সাহেব ঢাকায় ফিরেছে। তাকে ফোনে লুবনা সব বলেছে। সাহেব আবার ফেনীর পথে রওনা হয়। ভোর হয়ে গেছে। মালতীর আজ মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। স্বামীর খোঁজে অবশেষে কিনা নিজেই মৃত্যুর মুখে। মালতীর চোখ তবুও সাইদকে খুঁজছে। শেষ বেলায় যদি একবার তার সাথে দেখা পেতো তবে মালতীর আর জীবনে কিছূ চাওয়ার ছিল না।
ডাঃ লুবনার সাহেব হাসপাতালে মালতী যেখানে আছে সেখানে ঢুকতেই সকল দেনাপাওনার মিতালী ঘটলো। ডাঃ লুবনা বলল, তুমি এসেছো, যাক একটা চিন্তা কমলো। সাহেব ডাঃ লুবনার কথার জবাব না দিয়ে মালতীর দিকে তাঁকিয়ে ভাবলো, এ আমি কাকে দেখছি। যাকে খোঁজতে গিয়ে চোখের আলো কমে গেছে। নিজের মাঝে শুধু মিথ্যে রক্তের গতিটা আছে, আর তো কিছুই নাই। সেই আমি আজ তার সামনে ! তাও আবার তার মৃত্যুর মুখে। ডাঃ লুবনার স্বামীর মুখে কথা নেই, ভাবছে, এই মালতী আমার বাসায় এতো দিন অথচ একবারও দেখা হয়নি ! চিৎকার করে বলল, আমি সত্যি পাঁপি আমার শাস্তি হওয়া উচিত। ডাঃ লুবনা এর কিছুই বুঝতে পারলো না।
ডাঃ লুবনার স্বামী আজ যেন সকল ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। ভাবছে, মালতী কী আর বিয়ে করেনি? বিয়ে কেন করবে ! ওতো আমায় কথা দিয়েছিল, জীবনে মরণে শুধু তোমারি রবো। আর কাউকে আমি গ্রহণ করতে পারবো না। অথচ আমি দিব্যি অন্যের সাথে সংসারে করছি। হে স্রষ্টা ! আমায় ওর মতো পঙ্গু করে দাও। আমি আর বাঁচতে চাই না।
চব্বিশ ঘণ্টা পর যখন মালতীর জ্ঞান ফিরলো। চোখে মেলে তাঁকাতেই অবাক হল ! এ আমার সামনে কে ! কোনদিন ভাবিনি আজ আমার এই সংকটকালে সাইদের দেখা পাবো। সাইদ মালতীর থেকে দূরে থাকতে পারলো না। ঝাপসে মালতীকে ধরে কাঁদতে লাগলো। ডাঃ লুবনা নিশ্চুপ, কোন কথা বলতে পারলো না। মালতী চোখ সুখের সাগরের ভাসছে।
আমি ডাঃ লুবনার স্বামী, মালতীকে সাইদ এ কথা বলল। তোমাকে ট্রেন দুর্ঃটনায় হারিয়ে আমি পাগল হয়েছিলাম। আমাকে পাবনায় মানসিক হাসাপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানেই লুবনার সাথে আমার পরিচয়। আমি অবশ্য প্রথমে রাজি ছিলাম না। ওকে বলেছিলাম, আমার একজন আছে, তাকে আমি একদিন পাবোই। সবাই ভেবেছিল তুমি মারা গেছো। তাছাড়া তোমার ওড়নাটাও আমি রক্তাক্ত অবস্থায় পেয়েছিলাম। মালতী তুমি আমায় ক্ষমা করো, আমি তোমায় ধরে রাখতে পারিনি।
থাক না ওসব কথা। আজ আমি প্রেম পূর্ণতায় মরতে পারবো, আমার ভালবাসা স্বার্থক হল। এই দিনটির জন্য আমি অপেক্ষা করেছিলাম। স্রষ্টার তরে লাখো শোকরিয়া। তোমার দুয়ারে দাঁড়িয়ে তোমায় সালাম জানাই ভালো থেকো।
সমাপ্ত
কবি ও লেখক
সাইফুল ইসলাম অপু
ঘাটাইল, টাঙ্গাইল
০১৭১৫-৭৯৩৫৭০
আজ মালতী পেছনের সব দুঃখ ভুলে যেতে চায়। কিন্তু দুঃখ তো ভোলা যায় না, কী দিয়ে তা সরাবে? সে তো বারেবারে চলে আসে, আঁচলে ভর করে আসে, চোখের সাথে মাতলামি করে আসে। কোথায় গেল হাত ধরে অবাধে নদীর তীরে হাঁটার কাল ! পূর্ব আকাশে সাদা বকের উড়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখা। সবই আছে কিন্তু ওরা কেউ মালতীকে সাথে নেয় না।
মালতীর ঘুম থেকে জেগে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানালার পানে তাঁকালো। একগুচ্ছ ফুলের সুগন্ধ তার জানালার কাছে এসে আবার বিমুখি হয়ে ফিরে গেল। মালতীর বুকের ভিতরটা এক অজানা তোলপারে ব্যাথির হল।
কিনা কি ভেবে মালতীর মন খুবই খারাপ হয়ে গেল। ভাবে, কে দিয়ে যায় এই যাতনা, কে যথারীতি প্রহার করে এ বুকের মাঝে ! আমি তো একাই আছি আর তো কোন সঙ্গতার মিলতে চাইনা। তবুও কেন আমি বারেবার ফিরে যাই পূর্বের সেই বিরহের তেপান্তরে ! কেন আমার মাঝে জল স্রোতের ব্যর্থ ঢেউ অবিরাম আঘাত করে যায় ! দূরে থাকার যে বাসনা মনে পোষণ করেছি তা নিজের সাথেই অবাধ্য হয়। আর কোন রঙ্গিন স্বপ্ন দেখতে চাইনা। আর কোন সুখের সাগরে ভাসতে চাই না। গত তিন বছর গত হল এই বেদনা বারেবারে আসে যায়। আর কতদিন এভাবে এই একাকি তৃর্ষ্ণার সাথে জীবন পোহাতে হবে ! একটা স্থির আবেশে যাওয়া প্রয়োজন, নইতো জীবনের মূল্য থাকে না।
এতদিন একটা করে গোলাপ ফুল মালতী রেখে দিতো কারো জন্য। সেতো আসে না, সে কে? মালতী তা জানে। তার জন্যই তো জীবনে বেঁচে থাকার আশা এখনো করা হয়। কিন্তু মালতী জানে, একদিন নির্ভিতে এই প্রেম ভাবনার বাতি ঘর ফুরিয়ে যাবে। নীল আকাশটাকে তখন আরও বেশী নীল মনে হবে। কোন রঙ্গিন আলো এই নারীর কাছে ধরা দেবে না। প্রেমের বাতাসে তখন নারীর কান্না শুনতে পাওয়া যাবে। উহাই হবে বাস্তবতার দুয়ারে দাঁড়িয়ে থাকা জাগ্রত যৌবনের ওপর সাদা কাফন।
সকালের নাস্তা শেষ করে মালতী বাহিরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হল। কোথায় যাবে তা স্থির করতেই তার দৃষ্টিখানি পাশ বেয়ে এক রৌদ্র ছায়ায় ঠেকলো। কে যেন বাধার প্রাচীর দিল, কিছুতেই দৃষ্টি সরানো গেল না। এই তো সেদিনের কথা, এখানেই তার সাথে শেষ দেখা হয়েছিল। সেই শেষ কথার আঙ্গিনা যেন এখনও জীবন্ত হয়ে মালতীর পানে চেয়ে রয়েছে।
গায়ে জড়ানো শাড়ির আঁচলের কিছু অংশ ঘরের দুয়ার থেকে মাটি ঘেসে কিছুদূর গেল। সেদিকে মালতীর খেয়াল নেই। যেখানে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল তাতে আর মন চলছে না। বৃথাই ভর করছে। চোখের কোনায় ক'ফোটা জল এসেছিল তাও শুকিয়ে গেল।
আজ এই দিনটা কী শুধুই অবহেলায় কাটবে ! কোন মধু পিয়াসে মিলতে পারবে না। এই হৃদয়ের নীলে কোন আশার চাদর জড়াতে পারবে না ! অথচ প্রথম বিয়ে বার্ষিকিতে কতইনা মজা করেছিল। বিকেলে দু-জনে অনেক জায়গায় হেঁটেছিল। সাইদ বলতো এই দিনটির কথা ভুলে যাওয়ার নয়। কালো ধুলোর মাঝে আমি তোমাকে আলো রুপে পেয়েছি, হাজারো নতুন ফুলের আগমন হলেও তোমার থেকে দূরে যাবো না। হে প্রিয় ! রেখো বেঁেধ জনম জনমে রক্তগতির আত্মার সাথে।
একবার মালতী বিশেষ কারণে কোথায় যেন গিয়েছিল, দু-দিন তাই সাইদের সাথে যোগাযোগ ছিল না। সাইদ তার কারণে সে কী অভিমান ! কিছূতেই নিজেকে বুঝ দিতে পারেনি যে, সে ফিরে আসবে তোমারি আত্মার নিগাঢ়ে। মালতী ফিরে এলে সাইদ বলল, তুমি জানো না তোমায় ছাড়া আমার বেঁচে থাকা হয় না। প্রতিটি সময় অজস্র যুগের মত মনে হয়। প্রতিটি প্রহর যেন সাদা কাফনে ভরা বিরহের দোসর। হে প্রিয়া ! আর কখনো আমায় রেখে যেও না। আজকের দিনটা যেমন সত্য ঠিক তেমনি তুমি ও আমি সত্য। মালতী নিজের ঠোঁট নেড়ে বলতো, কে শিখিয়েছে তোমায় এমন পাকা পাকা কথা? আমি তো তোমায় নিজের করে নিয়েছি আপন আলোয়। কালের মহাকালে ভাঙ্গা গড়ার পথে পথে আমি তোমারি থাকব।
প্রখর রোদে মালতীর কপাল বেয়ে ঘাম পড়ছে। যা ভেবে সকালে বের হয়েছিল তা আর হল না। মালতী আজ আকাশি রঙের শাড়ির সাথে হালকা কমলা রঙের ব্লাউজ পড়েছে। ঠোঁটে বিভিন্ন ধরনের পালিশ মেখেছে। পায়ে কালো রঙের জুতা পড়া। দেখতে যেন, চাঁদের গায়ে আরেক চাঁদের মিলন হয়েছে। যৌবনের দুয়ারে এক নব বর্ষার ঝিলিমিলি সভ্যতার চাদর গায়ে পথে দাঁড়িয়ে আছে।
মালতী এক রিক্সাওয়ালাকে বলল, যাবেন? মালতীর কথায় লোকটা কোন সাড়া দিল না। মালতী নীলক্ষেত যাবে। ক’টা বই কিনবে, কিন্তু কার লেখা বই তা জানা নেই। অনেক লেখকের বই ভালো লাগে তবে আজ কোন প্রিয় লেখকের নাম মনে আসছে না। মালতীর আগে বই পড়ার অভ্যাস ছিল না। প্রথম পরিচয়ে সাইদ ওকে একটা কবিতার বই দিয়েছিল, কেন জানি বইটা পড়ার পর নেশাটা আরও বেড়ে যায়। তারপর সাইদ অনেক বই কিনে দিয়েছিল। রাত যখন দ্বি-প্রহর পেরিয়ে যেতো মালতী তখনও বই পড়তো। আশেপাশে দুঃর্ঘটনা হলেও তার কানে বইয়ের ভাবনা ছাড়া কিছু ঢুকতো না।
আজ সাইদ অনেক দূরে, মালতীকে আর বই কিনে দেয় না। কিন্তু মালতী বই পড়ার অভ্যাসটা ছাড়তে পারেনি। একা ঘর একটা জীবন, বই একমাত্র সঙ্গি। হঠাৎ আকাশ থেকে রোদ পালিয়ে মেঘের উদয় হল। বাতাসের মাঝে সেই খাঁ খাঁ ভাবটা নেই। বুঝা যায় বৃষ্টির নামবে। শাহবাগ থেকে নীলক্ষেত মালতী রিক্সায় যেতে পারল না। এই শহরটা অনেক পরিচিত, এই তো সেদিনের কথা। গভীর রাত পর্যন্ত রাস্তার পাশে বসে সাইদের সাথে গল্প করতো, এক গল্প শেষ হলে আরেক গল্প শুরু হতো। সাইদ মালতীর নজরে এক ধ্যানে তাঁকিয়া থাকতো। সাইদ বলতো, আমি তাকে দেখছি এক মানবীর রূপ, জীবনের সাথে যাকে আমি বেঁধেছি ভালবাসায়।
মালতী গত তিন বছর একুশে বইমেলায় যায়নি, তবে মেলার কারণে বই কেনা থেমে থাকেনি। একুশে বই মেলা মানে মালতীর আত্মার সঙ্গম ছিল, কিন্তু আক্ষেপে মনের দুঃখে আর যাওয়া হয়নি। একবার মালতী না বলে বাবার পকেট থেকে টাকা নিয়ে বই কিনেছিল তার জন্য ওকে অনেক বকেছিল কিন্তু তাতে মালতীর কোন দুঃখ হয়নি। মালতীর থাকার ঘরটা ছোট ধরনের একটা লাইব্রেরী মত। কবি নজরুলের ”বিদ্রোহী” কবিতা মালতীর কমছে কম হাজার বার পড়া হয়েছে। কিছুতেই যেন সাধ মেটে না, আরও পড়তে ইচ্ছে করে।
মালতীর বই কেনা আজ হল না। প্রিয় লেখকের বই যেন আজ হারিয়ে গেছে, হয়তো হাতের কাছে নড়াচড়া করা হয়েছে কিন্তু বুঝা যায়নি। সত্যি বলতে কী মালতীর মনটা যেন কোথায় হারিয়ে গেছে, কোন অজানা পিয়াসের ঘাটে ! কোন ছায়াতলে, যেখানে সাইদের ভালবাসা ছাড়া কিছুই নেই।
বৃষ্টির জলে মালতীর দেহ ভিজে গেছে। এক জীবন্ত দামিনী হয়ে যৌবন ফুটে ওঠেছে। মালতীর সারা দেহে জলরাশিগুলো তাদের নিজেদের মুখের স্পর্শ দিচ্ছে। তা থেকে ক’ফোটা জলরাশি ধীর বেগে বুকের ওপর খেলায় মেতেছে। গায়ের জামা কাপড়টা যেন নেহাত ঢাকনা, তা কোন ভাবেই মালতীর দেহের চামরা ঢাকতে পারছে না। তা দেখে যেন ধরণী বলল, হে নারী ! তোমায় স্রষ্টা যা দিয়েছে তা কী নিজে চেয়ে দেখেছো ! তুমি তোমার পুরুষকেই উহা দেখাইও দিবস রাতে, অন্যকে নয়।
বৃষ্টির কারণেও মালতী দৌড়ালোনা। চারপাশে তাঁকিয়ে এক গলি পথ দিয়ে যাওয়া শুরু করল। একটা রিক্সাওয়ালা পেয়ে চড়ে বসল। তিনি বললেন, কোথায় যাবেন আপা?
মহাখালী।
হায় এতো দূর রিক্সায় চড়ে যাবেন?
কেন টাকা দিব যাবেন কী না বলেন?
না।
মালতী নেমে আবার হাঁটছে। মালতী অবশ্য মন থেকে মহাখালি যাবার কথা বলেনি, মুখ থেকে বের হয়ে গেছে, তা রিক্সাওয়ালা যাওয়ার পরে বুঝলো। যে কটা টাকা ছিল তাও তো প্রায় শেষ। বৃষ্টিতে দেহখানি ভিজে একাকার হয়ে গেছে। চুলগুলো বাম হাতের স্পর্শে ছড়িয়ে দিল। হঠাৎ মালতীর দৃষ্টিখানি রাস্তার ডানপাশে দু-তলা ছাদের ওপর বসা এক অতি চেনা মানুষের ওপর পড়ল। মানুষটা যে সাইদ তাতে মালতীর কোন সন্দেহ রইলো না। মালতী নিজের মাঝেই অনেক প্রশ্নের সম্মুখিন হল। কিন্তু নিজের দৃষ্টিখানি মালতী ফেরাতে পারেনি। ডানবামে গাড়ির হর্ণ বাজছে। তবুও সে রাস্তা থেকে সরে দাঁড়ায়নি। অতঃপর একটা ছোট বাসের ধাক্কায় মালতী রাস্তার ডান পাশে ধুমড়ে মুচড়ে পড়লো। একটা বিষণ চিৎকার হল।
একটা ভালবাসার মানুষের মন কী মনের মানুষের সঙ্গ না পেয়ে হারিয়ে যাবে ! তাহলে তো প্রেমের ভূবন অপূর্ণতায় যুগে যুগে ধ্বংস হতে থাকবে। হে আত্মার প্রেম রবি, তুমি কোথায় গেলে ! তোমার একজন তো হারিয়ে যাচ্ছে, তাকে ফেরাও। সে ঘুমাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে, তাকে জাগাও। প্রেমের কাব্যে তো দুঃখ নিয়ে দুনিয়া ছাড়তে পারে না।
মালতীকে হাসপাতালে নেওয়া হল। তার অগোছালো কথা বার্তা হাসপাতালের সবাইকে ভাবনার ফেলে দিল। বিছানা ছেড়ে উঠতেই বুঝতে পারল পায়ের নিচের অংশে কিছু একটা হয়েছে। ঠিক তাই, হাঁটুর নিচের অংশ কেটে ফেলা হয়েছে। পা আর ফিরে পাবার আশা নেই। মালতীর চিকিৎসা চলছে।
ডাঃ লুবনা, মালতীর মেজর অপারেশনটা করেছে। সে কোন ভাবেই মালতীর পরিচয় জানতে পারল না। মালতী বারেবার বলছে, আমিই আমার ঠিকানা, আমার আপন বলতে আমিই আমার। ডাঃ লুবনা কর্তৃপক্ষের সকল পাওনা মিটিয়ে মালতীকে নিজের বাসায় নিয়ে গেল।
এতো দিন একা ছিলাম, দুঃখ কষ্টগুলো আমার কাছেই থাকতো, কোন ভাগ কাউকে দিতে চাইনি। একটা চাকুরি করতাম। স্রষ্টা যেন তাতে কু-দৃষ্টি রাখলেন। এই বলে কাঁদতেই ডাঃ লুবনা চক্ষুদ্বয় মুছে দিয়ে বলল, যতদিন ইচ্ছে তুমি এখানে থাকো, কোন করুণা নয় বরং সাহায্যের হাত।
মালতী কোন কথা বলল না। ভাবছে, কেমন করে ধীর পায়ে সব শেষ হয়ে যাচ্ছে। সেই বুকে বাঁধা ভালবাসার পান্ডুলিপি, যৌবনের তারুণ্যতা আমায় আর খুঁজে ফেরে না। কোথায় গেল সেই উত্তাল মহনা ! আমি তো দুঃখ পেতে চাইনি, আমি তো ভালবাসা পেতে চেয়েছি। ক্্রমেই মরণের দিকে যাচ্ছি। হে খোদা ! তুমি কেন আমায় এই কষ্ট দিচ্ছো? মালতী নিজেকে স্বাভাবিক করে নিয়ে ডাঃ লুবনাকে বলল, তোমার কথা বল? তোমার সাহেব ও সন্তানদের কী খবর?
ডাঃ লুবনা বলল, ওতো সারাদিন ব্যবসার কাজে ব্যাস্ত। আমাকে সময়ই দেয় না। গভীর রাতে বাসায় ফেরে। তবে এক ছেলে ও স্বামীকে নিয়ে আমি সুখী। ছেলে টুটুল, বয়স দেড় বছর। ওকে বূয়ার কাছে রেখে কাজে যাই।
ওদের দুজনের মাঝে ভালো জমে উঠছে। মালতীকে আর আগের কথা মনে করে কষ্ট পেতে হচ্ছে না। মালতীর তো একটা স্বপ্ন সুখের সংসার করার সাধ ছিল, যেখানে স্বামী ও সন্তানের ভালবাসায় নিজের মাতিয়ে রাখবে। চোখের কোনায় জল দেখে ডাঃ লুবনা বলল, আবারও কান্না ! স্বামীর কথা মনে পড়েছে বুঝি? মনে করে আর কী হবে ! সে তো তোমার কাছে নেই, হয়তো খুব দূরে নয়, এই শহরেই থাকে।
তার দেখা যেহেতু পেয়েছি তাকে পাবোই, হয়তো মরণের দুয়ারে গিয়ে। তবুও আশা রাখি।
কোন ছবি আছে তার?
কোন ছবি প্রয়োজন পড়বে না, সময়ের সাথে সে নিশ্চই আমার সামনে হাজির হবে। আচ্ছা, সপ্তাহ পেরিয়ে গেল অথচ তোমার সাহেবের সাথে আমার দেখাই তো হল না। তিনি এতোই ব্যাস্ত লোক?
কী আর বলব, বলি এতো টাকা দিয়ে কী হবে। ও এর কোন জবাবই দেয় না। আমি অবশ্য একবার তোমার কথা ফোনে বলেছি, ও বলেছে দু-দিন পরেই আসবে তোমাকে না যেতে বলেছে।
মালতী বলল, তোমার যদি ছুটি থাকে তবে চল না বাহিরে একটু ঘুরে আসি? কতদিন যেন মুক্ত আকাশে তাঁকানো হয় না। বিহঙ্গোদের নাঁচের তালে মজতে পারি না। জানো লুবনা আগে কত গান শুনতাম, কবিতা লিখতাম, তার কিছুই এখন হয় না। প্রথম স্কুল জীবনে আমার গান শুনে প্রধান শিক্ষক আমায় আর্শিবাদ করেছিলেন। আমি নাকি চেষ্টা করলে অনেক বড় শিল্পি হতে পারব। শিল্পি না ছাই। এখন নিজেরই জায়গা নেই।
সাইদের সাথে মালতীর প্রথম দেখা হয়েছিল এক সমুদ্র সৈকতে বনভোজনে যাওয়ার পর। সাইদই প্রথম মনের কথা বলেছিল। এই সেই সমুদ্র সৈকত। তারপর আরও দু-বার ওরা এখানে এসেছিল। একবার স্রোতের মুখে মালতী জল খেয়েছিল। কী নুনতা ! আজ তা মালতীর শুধুই স্মৃতি। ডাঃ লুবনা বলল, চলো একটু ওদিক থেকে হেঁটে আসি। মালতী তো আর হাঁটতে পারে না। সে দু-পাশে স্টিলের লাঁঠিতে ভর করে চলে। এতোক্ষণ বসেছিল। ডাঃ লুবনার কথায় মালতী আর বসে থাকতে পারল না। কী সুন্দর সূর্য ডুবার দৃশ্য ! পাশেই ছোট ছেলে মেয়েরা শামুকের মালা হাতে নিয়ে বিক্রয় করার জন্য ঘুরছে। এখানে যত ধরনের যা পাওয়া যায় তার বেশীর ভাগই শামুকের। মালতী একটা বড় শামুক কিনে তার মাঝে সাইদ শব্দ লিখে নিল।
ডাঃ লুবনার সাহেব ফোন করেছে। সে আজই ঢাকায় ফিরবে। ব্যবসার কাজে সিঙ্গাপুর গেছে। লুবনা বলল, চলো মালতী ঢাকায় আজই ফিরতে হবে। সাহেব ফিরে যেতে বলেছে।
তুমি বুঝি তোমার সাহেবকে ছাড়া একটুও থাকতে পারো না?
ডাঃ লুবনা হেসে বলে, তোমার সাহেব কাছে থাকলে তুমিও থাকতে পারতে না, বুঝলে?
বাচ্চাসহ ওরা তিন জন রওনা হল, গাড়ী ফেনী পেরিয়ে যেতেই সমস্যা হল। হঠাৎ এক আত্মচিৎকারে মালতীর ঘুম ভাঙ্গলো, ডা লুবনাকে ডাকতেই ডাকাত দল মালতীর গলা থেকে সোনার হারটা জোর করে কেড়ে নিল। কখন যেন ডাকাতদের ছোরার আঘাতে মাথা রক্তাক্ত হয়ে মালতী গাড়ির সিটেই পড়ে বইলো। ডাকাতরা আরও লোকদের কাছ থেকে টাকা সোনা ও জিনিসপত্র নিয়ে চলে গেল।
রাত গভীর তবে সময়টা জানা গেল না। হাতের ঘড়িটাও ওরা খুঁলে নিয়ে গেছে। গাড়ি থামিয়ে মালতীকে ডাঃ লুবনা পাশের হাসপাতালে ভর্তি করালো। রাতেই লুবনার সাহেব ঢাকায় ফিরেছে। তাকে ফোনে লুবনা সব বলেছে। সাহেব আবার ফেনীর পথে রওনা হয়। ভোর হয়ে গেছে। মালতীর আজ মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। স্বামীর খোঁজে অবশেষে কিনা নিজেই মৃত্যুর মুখে। মালতীর চোখ তবুও সাইদকে খুঁজছে। শেষ বেলায় যদি একবার তার সাথে দেখা পেতো তবে মালতীর আর জীবনে কিছূ চাওয়ার ছিল না।
ডাঃ লুবনার সাহেব হাসপাতালে মালতী যেখানে আছে সেখানে ঢুকতেই সকল দেনাপাওনার মিতালী ঘটলো। ডাঃ লুবনা বলল, তুমি এসেছো, যাক একটা চিন্তা কমলো। সাহেব ডাঃ লুবনার কথার জবাব না দিয়ে মালতীর দিকে তাঁকিয়ে ভাবলো, এ আমি কাকে দেখছি। যাকে খোঁজতে গিয়ে চোখের আলো কমে গেছে। নিজের মাঝে শুধু মিথ্যে রক্তের গতিটা আছে, আর তো কিছুই নাই। সেই আমি আজ তার সামনে ! তাও আবার তার মৃত্যুর মুখে। ডাঃ লুবনার স্বামীর মুখে কথা নেই, ভাবছে, এই মালতী আমার বাসায় এতো দিন অথচ একবারও দেখা হয়নি ! চিৎকার করে বলল, আমি সত্যি পাঁপি আমার শাস্তি হওয়া উচিত। ডাঃ লুবনা এর কিছুই বুঝতে পারলো না।
ডাঃ লুবনার স্বামী আজ যেন সকল ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। ভাবছে, মালতী কী আর বিয়ে করেনি? বিয়ে কেন করবে ! ওতো আমায় কথা দিয়েছিল, জীবনে মরণে শুধু তোমারি রবো। আর কাউকে আমি গ্রহণ করতে পারবো না। অথচ আমি দিব্যি অন্যের সাথে সংসারে করছি। হে স্রষ্টা ! আমায় ওর মতো পঙ্গু করে দাও। আমি আর বাঁচতে চাই না।
চব্বিশ ঘণ্টা পর যখন মালতীর জ্ঞান ফিরলো। চোখে মেলে তাঁকাতেই অবাক হল ! এ আমার সামনে কে ! কোনদিন ভাবিনি আজ আমার এই সংকটকালে সাইদের দেখা পাবো। সাইদ মালতীর থেকে দূরে থাকতে পারলো না। ঝাপসে মালতীকে ধরে কাঁদতে লাগলো। ডাঃ লুবনা নিশ্চুপ, কোন কথা বলতে পারলো না। মালতী চোখ সুখের সাগরের ভাসছে।
আমি ডাঃ লুবনার স্বামী, মালতীকে সাইদ এ কথা বলল। তোমাকে ট্রেন দুর্ঃটনায় হারিয়ে আমি পাগল হয়েছিলাম। আমাকে পাবনায় মানসিক হাসাপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানেই লুবনার সাথে আমার পরিচয়। আমি অবশ্য প্রথমে রাজি ছিলাম না। ওকে বলেছিলাম, আমার একজন আছে, তাকে আমি একদিন পাবোই। সবাই ভেবেছিল তুমি মারা গেছো। তাছাড়া তোমার ওড়নাটাও আমি রক্তাক্ত অবস্থায় পেয়েছিলাম। মালতী তুমি আমায় ক্ষমা করো, আমি তোমায় ধরে রাখতে পারিনি।
থাক না ওসব কথা। আজ আমি প্রেম পূর্ণতায় মরতে পারবো, আমার ভালবাসা স্বার্থক হল। এই দিনটির জন্য আমি অপেক্ষা করেছিলাম। স্রষ্টার তরে লাখো শোকরিয়া। তোমার দুয়ারে দাঁড়িয়ে তোমায় সালাম জানাই ভালো থেকো।
সমাপ্ত
কবি ও লেখক
সাইফুল ইসলাম অপু
ঘাটাইল, টাঙ্গাইল
০১৭১৫-৭৯৩৫৭০
লেখক সাইফুল ইসলাম (অপু)
- সাইফুল ইসলাম (অপু) -এর ব্লগ
- ৩ টি মন্তব্য
- ১০ নভেম্বর ২০১২, ০২:১০
- গল্প
প্রিন্ট করুন
- ৩ টি মন্তব্য
-
দিশেহারা জীবন১০ নভেম্বর ২০১২, ০৩:০২
সাইফুল ইসলাম অপু ভাই খুব ভালো লাগলো...
তবে একটা অনুরোধ- বড় কোন লেখা দুই কিস্তিতে দিলে ভালো হয়....
শুভেচ্ছা রইলো...
-
সাম্প্রতিক পোস্ট
-
সাম্প্রতিক মন্তব্য





নীতিমালা
ব্লগ বই
অভিযোগ
সাম্প্রতিক পোস্ট

ফনেটিক