শুক্রবার ২৪ মে ২০১৩, ১০ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২০ সাইনইন | রেজিস্টার |bangla font problem


এবার শুনুন নাছির উদ্দিন হোজ্জার আসল কথা

অনেকে ছোটবেলায় পড়েছেন মোহাম্মদ নাসির আলী রচিত ‘ভিনদেশি এক বীরবল’ - আজো মজার মজার সেই চুটকি গল্পগুলো হয়তো সবার মনে আছে। নিজেদের জীবনেও মাঝে মাঝে এইরকম মজার ঘটনা ঘটে গেলে মনে পড়ে যেত সেই ভিনদেশির কথা। ১৭০০ সালের দিকে গোপাল ভাঁড় ছিল কৃষ্ণনগরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভায়, তারও আগে (১৫২৮-১৫৮৩) মোগল বাদশাহ আকবরের রাজসভায় ছিল বীরবল (আসল নাম মহেশ দাশ)। কিন্তু সেই ভিনদেশী বীরবল হল সারা দুনিয়াখ্যাত তুরস্কের মোল্লা নাসিরুদ্দিন হোজ্জা।


আকশেহির বলে আর একটা শহর আছে। সেটা হল মোল্লা নাসিরউদ্দিন হোজ্জার শহর আকশেহির। তুর্কি ভাষায় শেহির হল শহর, আর আকশেহির হল- সাদা শহর। এখানে রাস্তা পারার প্রথম ক্লু হল- রাস্তায় গাধার গাড়ি। হুবহু এই রকম গাড়ি আঁকা ছিল সেই ছোটবেলায় পড়া ভিনদেশি বীরবলের বইটাতে। চালাচ্ছেও মনে হয় হোজ্জা নিজেই। পোশাক আশাক, জাব্বা-জোব্বা একদম হোজ্জার মত। আমার মনে হয় টাইম মেশিনে করে আমি সাতশ’ আটশ’ বছর আগে চলে গিয়েছি। ছোট শহরটা দেখলে মনে হয় সবাই ঘুমুচ্ছে বা আলসেমী করে দিন কাটাচ্ছে, কোনদিকে কারো কোন ব্যসত্মতা, ছুটোছুটি নেই। আধুনিক মোটর গাড়ি আছে, কিন্তু এর পাশাপাশি গাধার গাড়ি বা গাধার পিঠে আরোহী সবই আছে! এরপর দেখা যায় রাস্তার মোড়ে মোড়ে হোজ্জার স্ট্যাচু, লাইটপোস্টে হোজ্জার ছবিসহ ব্যানার। এমনকি রাস্তার কিছু কিছু সাইনেও হোজ্জার ছবি। এই শহরের সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যক্তিকে তারা তুলে ধরে রেখেছে এবং যথোপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন করছে।
নাসিরউদ্দিনের জন্ম কিন্তু হয়েছিল এখান থেকে অনেক দূরে আনাতোলিয়া ইভর্টমদহট অঞ্চলের এস্কিশেহির ইরপধ্রণদধর প্রদেশের সিভরিহিসার ওধশরধদধ্রটর শহরের উপকণ্ঠে হোর্তু ঔমর্রল গ্রামে ১২০৮ সালে। উপস্থিত বুদ্ধি ও চালাকি- চতুরতার জন্য এই গ্রামের লোকদের খুবই নামডাক ছিল সারা দেশব্যাপী। তাঁর বাবা আব্দুল্লাহ ছিলেন গ্রামের মসজিদের ইমাম এবং বাবার পদাঙ্ক অনুসরণে ইমাম হওয়ার জন্য সেখানেই তিনি প্রথম থেকে ধর্মীয় শিক্ষালাভ শুরু করেন। বাবার মৃত্যুর পর তিনি ১২৩৭ সালে আকশেহিরে আসেন। নিকটবর্তী কনিয়া তখন রুমির প্রবর্তিত সুফি মতবাদের তীর্থ স্থান, এছাড়াও সেখানে অনেক ধর্মীয় মাদ্রাসা ছিল। সেগুলোর থেকে শিক্ষালাভ করে নাসিরউদ্দিন মোল্লা উপাধি পান। তিনি আকশেহিরে এসে ইমামতি, মাদ্রাসার শিক্ষকতা ও ইসলাম ধর্ম শিক্ষা ও প্রচারের কাজ ইত্যাদি করা শুরু করেন। তাঁর গল্পগুলো থেকে ধারণা হয় যে তিনি শহরের বিচারক বা কাজী হিসেবেও কাজ করতেন। উপস্থিত বুদ্ধির জোরে তীক্ষ্ণ জবাব, বা চটুল মন্তব্য, হাস্য-কৌতুক ইত্যাদির কারণে ধীরে, ধীরে জনগণের মাঝে তাঁর প্রসিদ্ধতা বৃদ্ধি পায়। সবাই তাঁকে খুবই পছন্দ করত এবং ছোট শহরের অল্প কয়েকজন বিদ্বান ও শিক্ষিত ব্যক্তির মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। তবে তাঁর জীবন কেটেছে দারিদ্র্যের মাঝেই, ধন-দৌলত কখনোই তাঁর হয়নি। পিতৃ-প্রদত্ত নাম নাসিরউদ্দিন, মানে ‘ধর্মের বিজয়’। মাদ্রাসায় পড়ালেখা শেষ করে, ইমামতি ও ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান করতেন বলে আসেত্ম আসেত্ম ‘মোল্লা’ নাম যুক্ত হয়। এরপর তাঁর বুদ্ধিমত্তার জন্য তাকে বিশেষ গুণিজন হিসেবে তখনকার দিনে বহুল প্রচলিত উপাধি ‘হোজ্জা’ দেওয়া হয়।
ঔই শহরের একমাত্র পার্কে- নাসিরউদ্দিন হোজ্জার পার্ক। চারিদিকে স্ট্যাচু দিয়ে সাজানো- প্রতিটা স্ট্যাচুই বানানো হয়েছে হোজ্জার এক একটা গল্পের অনুসরণে। যেমন গাধার পিঠে হোজ্জা উল্টাদিকে মুখ করে চলেছে। মুখভর্তি সাদা দাড়ি আর মাথায় হোজ্জার ট্রেড মার্ক বিশাল বোঁচকার মত টুপি। অবশ্য এই টুপি মৌলানা জালালউদ্দিন রুমিও মাথায় পরতেন। তখনকার দিনের তুরস্কে এটাই ছিল জ্ঞানী ব্যক্তিদের নিদর্শন। কোন স্ট্যাচু দেখাচ্ছে হোজ্জা গাছের ডালে বসে ডালটা এমনভাবে কাটছে যে ঐটা কাটা হলে নিজেই সে মাটিতে পড়ে যাবে। অন্য আর একটায় আছে তার সেই বিশাল বড় ডেকচিতে ছোট্ট একটা কুপিবাতি দিয়ে রান্না করার ঘটনা। যেইদিকেই তাকান, একটা না একটা কিছু আছেই। দেখতে খুবই মজার, নিজেকে ছোটবেলাকার দিনগুলোর মাঝে হারিয়ে ফেলা যায়।
পার্কে ঢুকে মাঝখানের দিকে মোল্লা নাসিরউদ্দিন হোজ্জার কবর আছে সেখানে। সেটা অবাক করার মত।। বিশাল একটা তালা লাগানো দরজা দেওয়া কবরে, কিন্তু ঐ দরজাই খালি আছে, কারণ দরজার পাশে কোন দেয়াল নেই, ঢুঁ ঢু ফাঁকা। এইটাই হল হোজ্জার সমুচিত উদাহরণ। ভাল লাগল, একটু থেমে কবরের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর উদ্দেশ্যে মনে মনে দোয়া পড়লাম। হোজ্জার সবকিছুই উল্টাপাল্টা, তাঁর কবরের স্মৃতিফলকে মৃত্যুর বছর লেখা ৩৮৬ হিজরি। এটা সম্ভব না, একটু খটকা লাগে- জন্মের আগেই তাঁর মৃত্যু! কিন্তু যদি চিন্তা করা হয় গাধার পিঠে তাঁর উল্টা হয়ে বসার ঘটনা, তাহলে এই সনটাও হল উল্টা করে লিখা। তার মানে ৩৮৬ হবে ৬৮৩ হিজরি বা ১২৮৪/১২৮৫ খ্রিস্টাব্দ। তাঁর জীবনকে উপলক্ষ করে ১৯০৫ সালে একটা সুন্দর কথা লিখা আছে স্মৃতিফলকে ‘এখানে একজন মানুষ নয়, একটা জীবন নয়, একটা জীবন দর্শন শুয়ে আছে’
পাশেই মাটির মাঝে একটা গোল চিহ্ন দেওয়া। লেখা আছে হোজ্জার মতে এই স্থানটাই হল পৃথিবীর কেন্দ্রস্থল। এটাও এসেছে তাঁর এক গল্প থেকে। একবার হোজ্জাকে জিজ্ঞেস করা হল পৃথিবীর কেন্দ্র কোথায়? হোজ্জার চটপট উত্তর- আমার গাধার পিছনের বাঁ পায়ের নিচে। প্রমাণ চাইলে, হোজ্জা বলল একটা মাপবার ফিতা দিয়ে সারা দুনিয়া মেপে দেখ, দেখবে ঠিকই আমার গাধার বাঁ পায়ের তলায় এর কেন্দ্র। সেই জায়গাটাকে অমর করে রেখেছে এই পার্কের ভিতর।
ইউনেস্কো ১৯৯৬ সালকে মোল্লা নাসিরউদ্দিন হোজ্জার বছর বলে ঘোষণা দিয়েছিল। প্রতি বছর জুলাই মাসের ৫ থেকে ১০ তারিখ পর্যনত্ম আকশেহির শহরে হোজ্জা ফেস্টিভ্যাল অনুষ্ঠিত হয়। ভক্তরা নানা রকম হাস্য কৌতুকের মধ্য দিয়ে এটা উদযাপন করে থাকে। তুরস্ক তাদের এই বিখ্যাত ব্যক্তিত্বকে অবিস্মরণীয় করে রাখার জন্য তাঁর ছবিসহ স্মারক ডাকটিকিট বের করেছে। আরো করেছে পয়সা- এই পয়সার একপিঠে হোজ্জার মুখ ও গাধার পশ্চাদ্দেশ দেখা যাচ্ছে। আর অন্য পিঠে গাধার মুখ ও উল্টা মুখী হোজ্জা। এই গল্পটাই মনে হয় সবচেয়ে বেশি প্রচলিত।
হোজ্জাকে নিয়ে টানা হেঁচড়াও কম হয় না। অনেক অনেক দেশ দাবি করে যে হোজ্জা সেই দেশের অধিবাসী ছিল। এটা বিশেষ করে এশিয়া ও এশিয়া-মাইনরের দেশগুলো, যেমন আফগানিস্তান, ইরান, আলবেনিয়া, উজবেকিস্তান, আজারবাইজান, তাজিকস্তান ইত্যাদি দেশেই বেশি। আকশেহির ছিল বিখ্যাত সিল্ক রোডের মাঝের একটা শহর- প্রচুর অভিযাত্রী পার হত ওই শহর দিয়ে পূর্ব থেকে পশ্চিমে বা উত্তর থেকে দক্ষিণে বা অন্য সকল পথে। ধারণা করা হয়, হোজ্জার গল্পগুলো লোকমুখে এতই প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল যে, ঐ সমসত্ম ভ্রমণকারী, ব্যবসায়ীদের দ্বারা দেশে বিদেশে এগুলো ছড়িয়ে পড়ল। সকল দেশই নিজের নিজের মত করে এক কাল্পনিক চরিত্রের মুখে এই গল্প ধরিয়ে দিয়েছিল, লোকগাথার মত। ক্রমশঃই যুগ যুগ ধরে এরকম চলে এমনই হল যে স্থানীয় লোকেরা আসল হোজ্জার হদিস ভুলে ধরেই নিল যে হোজ্জা তাদের নিজেদের দেশেরই একজন। উজবেকিস্তানের আদিবাসীদের খুবই দৃঢ় বিশ্বাস যে হোজ্জা তাদের স্বগোত্রীয় ও স্বদেশীয়। সেখানেও হোজ্জার পার্ক
হোজ্জার চুটকিগুলো শুধুই যে চটুল হাসির জন্য তা নয়, এগুলোর প্রতিটাতেই সূক্ষ্ম অনত্মর্নিহিত বাণী থাকত। মানবসমাজের বা জীবনের অসামঞ্জস্য চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিত, সঙ্গে থাকত কোন নীতিকথা, অনেকটা ঈশপের গল্পগুলোর মতই। অনেক দেশে এগুলোকে চুটকি বা ‘লতিফা’ বা ‘আফেন্দী’ বলে। মোল্লা নাসিরউদ্দিনের হাস্যকর কীর্তিকলাপ সম্পর্কে মন্তব্য করা হয়ে থাকে যে এগুলো অযৌক্তিক হলেও যৌক্তিক, অজ্ঞতার ছাপের মধ্যেই বিজ্ঞতা ফুটে বের হয়, কাণ্ডজ্ঞানহীনতার মাঝেই থাকে বুদ্ধির পরিচয়, বোকার মত হলেও সেগুলো সূক্ষ্ম মেধার স্বাক্ষরযুক্ত। তবে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিশেষত্ব হল যে তার সেই ছোট ছোট চুটকির মাধ্যমে তিনি ঠিকই তাঁর শিক্ষামূলক বাণী সবার কাছে পৌঁছে দিতে পারতেন; এবং শুধু বাণীটুকু নয় আরো বেশি কিছু। আর তারপরেও তখনকার দিনের সমাজের প্রচলিত রীতি-নীতি বহির্ভূত, সংস্কারমূলক কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়বস্তুতে ভরপুর ছিল তার গল্পগুলো, যেগুলোর আবেদন সার্বজনীন। এই ব্যাপারে তিনি কখনোই কাউকে ছেড়ে দিতেন না- রাষ্ট্র, সমাজ ব্যবস্থা, ধর্ম, এমনকি নিজকে নিয়েও তাঁর হাস্য কৌতুক চলত। আর আশেপাশের মানুষ জনের ব্যাপারে তো কথাই নাই। তবে তাঁর সম-সাময়িক সকলেই তাঁকে ভালবাসত, ভক্তি শ্রদ্ধা করত। তাঁর মৃত্যুর সাতশ’ আটশ’ বছর পরেও এখনো পৃথিবীর দেশে দেশে প্রচলিত আছে তার চুটকিগুলো, হারিয়ে যায়নি কালের স্রোতে, বা সেগুলোর শিক্ষা বা আপীল কমে নাই আমাদের বর্তমান যুগের এই আধুনিক সমাজেও। এখানেই তাঁর স্বার্থকতা, সফলতা।
- টলিডো, ওহাইও, ২০০৯

ইন্টারনেট থেকে
৭ টি মন্তব্য
min শারমিন আসমা০২ ফেব্রুয়ারি ২০১০, ০২:৪৭
এটাতো এনসাইক্লোপিডিয়া হয়ে গেল । অনেক তথ্য জানলাম। ভাল থাকুন
sokal_ratri সকাল০২ ফেব্রুয়ারি ২০১০, ০২:৫৮
:টোকাই
বোকা বকাই
rudrookhhor রুদ্র-অক্ষর০২ ফেব্রুয়ারি ২০১০, ০৩:১৭
অনেক ধন্যবাদ । আমি প্রিয়তে নিলাম ।

এমন পোস্ট গুলো পড়তে কি যে ভালো লাগে

ভালো থাকুন নিরন্তর -
lovelu1977 সাইক্লোন০২ ফেব্রুয়ারি ২০১০, ০৩:১৭
ধন্যবাদ ভালো লাগলো
fuad05 দেবদাস০২ ফেব্রুয়ারি ২০১০, ০৩:২৩
হোজ্জাকে নিয়ে মাভেরিক ভাইয়ের তথ্যবুহুল পোষ্ট দেখুন এখানেঃ http://prothom-aloblog.com/users/base/serendipity/213
sajalchakraborty হাজারি০২ ফেব্রুয়ারি ২০১০, ১২:২৬
গুরু অনেক কিছু জানলাম.......।

ব্লগে কম দেখা যাচ্ছে কেন..........।
lukes ধ্রুবো০২ ফেব্রুয়ারি ২০১০, ১২:৫২
ক্লাস এইট-নাইনের একটা সময় ছিলো সেবা প্রকাশনীর একটা হোজ্জার বই কিনেছিলাম, প্রতিদিন ওই বইটা পড়ে একা একা হাসতাম...