শুক্রবার ২৫ এপ্রিল ২০১৪, ১২ বৈশাখ, ১৪২১ সাইনইন | রেজিস্টার |bangla font problem


আমার বন্ধু ইমন

জোহরের নামাজ শেষে অফিসে ফিরছি। অজান্তেই মনের ভেতর গতকালের কিছু স্মৃতি এসে নাড়া দিতে শুরু করল। নিজে নিজে মুচকি হেসে ফেললাম। ইমন (ছদ্মনাম) আমার বন্ধু। ওয়াসার প্রকৌশলী। ওয়াসা কর্তৃক আয়োজিত ব্যাডমিন্টন প্রতযোগিতায় সে একজন প্রতিযোগী। সে ফাইনালে উঠেছে। গতকাল ফাইনাল খেলা ছিল। গত পরশু দিনই আমাকে ও আরেক বন্ধু কাওছার (ছদ্মনাম) কে দাওয়াত করে রেখেছিল। ওর খেলার দর্শক হতে। সন্ধ্যার পর খেলা। আমি ও কাওছার এক জায়গায় মিলিত হয়ে রিক্সাযোগে ভেন্যুর দিকে যাত্রা শুরু করলাম। কাছাকছি পৌছেই ইমনের মুঠোফোনে ফোন করলাম। ইমন ফোন ধরছিল না। এদিকে আমাদের প্রচন্ড খিদে পেয়েছে। বুঝতে পারলাম ওর খেলা শুরু হয়ে গেছে। না খেয়েই ভেন্যুতে পৌছলাম। সত্যিই খেলা শুরু হয়েছে। ইমনের বিধ্বংসী আক্রমন যেন প্রতিপক্ষের উপর চাবুকের মত পড়ছে। কিছুক্ষণের মধ্যে প্রতিপক্ষ ধরাশায়ী। ইমন বিজয়ী। আমার বন্ধু বিজয়ী। আমাদের বন্ধু বিজয়ী। আমরা খুশিতে ফেটে পড়লাম। খেলা শেষে পুরস্কার বিতরণি হল। চ্যাম্পিয়নের পদক ইমনের হাতে। ওর চোখে মুখে স্বস্তি, আনন্দ আর তৃপ্তির স্পষ্ট ছাপ। আমাদেরও ওর আনন্দের অংশ হবার সৌভাগ্য হল। পুরস্কার বিতরণকারী অতিথিদের একজন জানালেন আগামী বার থেকে একজন সেরা খেলোয়ার নির্বাচনের ব্যবস্থা থাকবে। এটা শুনেও আমার ভালো লাগল। ওদের কেমন লেগেছে তা বলতে পারব না। ওরা হয়ত ভাবছে এবার দেয়া হলে সেই আসনটি তো ইমন নামের মানুষটি ছাড়া আর কেউ দখল করত না। প্রকৃতপক্ষে আমি ব্যাপারটিকে অন্যভাবে দেখেছি। ইমনের বিয়ে ঠিক হয়েছে। আগামী ২/৩ মাস পর ও বিয়ের পিড়িতে বসতে যাচ্ছে। অগ্রিম অভিনন্দন এবং শুভ কামনা। হয়ত আগামী আসরে দর্শক সারিতে ভাবীজান থাকবেন। তার জীবনসঙ্গী কর্তৃক প্রতিপক্ষের উপর আক্রমন উপভোগ করবেন। ওর আনন্দের নতুন একজন ভাগীদার হবেন। সেই আনন্দের কথা ভেবে এবারের শুধুমাত্র মৌখিক সিদ্ধান্তের অতৃপ্তি ঝেড়ে ফেললাম।
আমাদের প্রচন্ড খিদে চুইঙ্গাম চাবাতে চাবাতে কোথায় দূরে মিলিয়ে গেল তার দৌরাত্ম খুঁজতে গেলে হয়ত রুপকথার তের নদী সাত সমুদ্র পাড়ি দিতে হবে। একে একে সবাই বিদায় নিল।
ইমনকে আমরা আদর করে ড্রাইভার ডাকি। ওর একটা বাইক আছে। ঢাকা শহরে রাস্তার যে কোন কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করা বা কোথাও ঘুরতে যাবার ক্ষেত্রে ওর সার্ভিসের জুড়ি নেই। তাই ওকে অনেক ধন্যবাদ আর প্রান ভরে দোয়া। আমাদের দুজনকে বাইকে বসিয়ে ও রওয়ানা হল। আমি ও কাওছার আদৌ জানি না গন্তব্য কোথায়। অবশ্য ওকে আমাদের খিদে পাবার কথা বলেছিলাম। বাইকেই ও আমদের কাছে জানতে চাইল আমরা কি খেতে চাই। আমি বললাম, তুই আজ জিতেছিস তাই যা খাওয়াবি তাই খাব। অথচ আমদের উচিত ওকে খাওয়ানো। পকেটের অবস্থা খুব একটা ভালো না তাই আমি সাহস করিনি। কাওসারের কথা বলতে পারব না।
ইমন আমাদের কমলাপুরে ঐতিহ্যবাহী খাজা বিরিয়ানি খেতে নিয়ে গেল। কাওসার হলে থাকে তাই ওকে একটু বেশি খাওয়ালাম। এই চিন্তায় যে, আমরা বাসায় গিয়ে আরেক দফা চালিয়ে দিতে পারব।
খাওয়া শেষে কাওসারকে হলে পৌঁছে দিয়ে আমি ও ইমন বাসায় ফিরছি। হঠাৎ ভাবলাম ইমনকে হারাতে যাচ্ছি। হয়ত ইমন জীবনের নতুন ইনিংস শুরু করতে যাচ্ছে, আগামীতে খেলার আসরে দর্শক সারিতে ইমনের আরো একজন নতুন একনিষ্ঠ দর্শক যোগ হতে যাচ্ছে, নতুন কেউ ইমনের বাইক সঙ্গী। ইমনকে অভিনন্দন। কিন্তু তখন কি আমাদের এই উড়নচন্ডী বন্ধুত্ব আর থকবে। হয়ত হারিয়ে যাবে আমাদের ড্রাইভারের বাইক সার্ভিস। আজ ওর বাইকের পেছনে যেখানে আমি ও কাওছার সেখানে জায়গা করে নেবে আরো কাছের কেউ। ঘটে যাওয়া সবই কেবল স্মৃতি। এর নাম প্রকৃতি, এর নাম জীবনের রুপবদল।
জীবন মাত্রই এর ধর্ম হল রুপবদল। তবে সেই রুপবদল কেবলমাত্র ধনাত্মক হলেই গ্রহণযোগ্যতা পাবে। হোক না ইমনের জীবনে ধনাত্মক কোন পরিবর্তন। ও তো আমদেরই একজন। একই বৃন্তের কলি। জীবনের রুপবদলের স্রোতে ওকে স্বাধীন হতে সুযোগ করে দেয়া, সামনে আগাতে প্রস্তুত করে দিয়ে ওর সাহসের স্পর্ধা বাড়িয়ে দেয়া এতো আমদেরই দ্বায়িত্ব।
হোক না ইমন আমাদের বন্ধুত্ব শিকল ভেঙ্গে বাধনহারা। মনের অন্তিনির্হিত স্মৃতি, ভালোবাসা, ত্যাগ, শ্রদ্ধা, পারস্পরিক বোঝাপরা নিয়ে বেঁচে থাক আমাদের বন্ধুত্ব।
২ টি মন্তব্য
sulary আলভী৩১ জানুয়ারি ২০১৩, ১৯:৪৩
চমৎকার গল্প প্রিয় নাজমুল......

lnjesmin লুৎফুন নাহার জেসমিন৩১ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:৩৪
বন্ধুকে অনেক ভালোবাসেন । তাই এভাবে তাকে নিয়ে ভাবছেন । আপনার বন্ধু ভাগ্যবান ।