বুধবার ২৩ জুলাই ২০১৪, ৮ শ্রাবণ, ১৪২১ সাইনইন | রেজিস্টার |bangla font problem


ঈদ এবং অশ্রু

( গল্পটা রোজার ঈদের আগের দিন ওপারে চলে যাওয়া জারিন কে স্মরণ করে লেখা-২০১২ )
ঈদ মানে আনন্দ। ঈদ্ মানে খুশি। প্রতিবছর এই ঈদ আসে নতুনরুপে নতুন আনন্দ নিয়ে। আবার কিছু কিছু ঈদ আসে দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে যা সত্যিই কষ্টের। আর মাত্র একদিন পর ঈদ তাই ঈদকে সামনে রেখে গত ঈদের কিছু ঘটনা বার বার আমার মনে দাগ কেটে যাচ্ছে। স্মৃতি বড় প্রতারক স্মৃতি বড় ভয়ানক। আমার সর্বস্তরে যে স্মৃতি বার বার উঁকি দিয়ে যাচ্ছে এবার তার কথা একটু বলি। নাম জারিন। বয়স ৭ বছর।আমাদের পাশের বাসায় নাকি তারা সবেমাত্র উঠেছিলো। পড়াশুনার জন্য বাসায় থাকা হয় না তাই আগে জারিনকে চিনতাম না। ঈদের ছুটিতে বাসায় এসেছিলাম। একদিন বিকেলে বাসাথেকে বের হয়েই দেখি বাসার সামনে একটা পিচ্চি খেলা করছে। এতসুন্দর ফুটফুটে মুখে মিষ্টিহাসি আর হেলেদুলে ছুটাছুটি আমাকে এতটা আকৃষ্ট করেছিলো যে লোভ সামলাতে পারছিলাম না। তাই ওকে দৌড়ে গিয়ে কোলে নিয়েছিলাম।তারপর বললাম তোমার নাম কি? চটপট করে উত্তর দিল আমার নাম জারিন।তারপর হাত দিয়ে ইশারা করে ওর আব্বু আম্মু কে দেখিয়ে দিল। ওকে কোলে নিয়ে তার আব্বু আম্মুর দিকে গেলাম। সালাম দিয়ে পরিচয় হলাম। বললাম আপনারা এখানে কবে এসেছেন? বললো এই তো বাবা মাস খানেক হলো। আমারা দু জনেই সরকারি চাকরি করি তাই বদলি হয়ে এখানে এসেছি। প্রথম দিনই যেন আমি জারিনের অনেক আপন হয়ে গিয়েছিলাম। ঐ দিন ওকে রেখে আমি ঘুরতে যাই।
পরের দিন আবার আমি বিকেলে বন্ধুদের সাথে ঘোরার জন্য বের হই। বাসার সামনে দিয়ে যাবার সময় সে আমাকে ছাদ থেকে ডাক দিল ভাইয়া বলে। তাকিয়ে দেখি জারিন। ও আমাকে খুব সুন্দর মনে রেখেছে। বললাম আপু নিচে আস। যেই কথা সেই কাজ। সাথে সাথে ও ওর আম্মুকে নিয়ে নিচে নেমে এল। আমি ওকে কোলে নিলাম। এতটাই আপন হয়ে গিয়েছিল ও যা বলার মত না। আমি তাই ওকে বললাম কিরে বুড়ি তুই আমার পিচ্চি আপু তাই না……ও হেসে কুটিকুটি হয়ে গেল। পিচ্চিদের মিষ্টি হাসি কার না ভাল লাগে বলেন? প্রাণ যেন আমার ভরে গেল ওর হাসিতে। ঐ দিনের মত আমি ওকে আবার রেখে চলে গেলাম। আর আন্টিকে আমাদের বাসায় আসতে বললাম। সন্ধ্যায় আংকেল আর আন্টি আমাদের বাসায় আসলেন।বাবা মার সাথে পরিচয় পর্ব শেষ করে গল্প গুজব আর হালাকা নাস্তা করে তারা সেদিনের মত উঠলেন। এই অল্প সময়ের মধ্য জারিন যে্ন আমার মা বাবার মন জয় করে নিয়েছিল। এরপর থেকে জারিন সময় পেলেই আমাদের বাসায় আসতো। ছুটাছুটি করতো আর আমার ছবির এলবাম নিয়ে ছবি দেখত। ভাইয়া বলে একা একা হাসতো ছবি দেখে।
একদিন ইচ্ছে হল পিচ্ছিকে নিয়ে ঘু্রে বেড়াব। তাই জারিনের আব্বু আম্মু কে বলে জারিন কে নিয়ে একটা শিশু পার্কে গেলাম। জারিন সেখানে ওর মত আরও পিচ্চিদেরকে দেখে মহা খুশি। যেন ওর আনন্দের শেষ নেই। ট্রেনে উঠল,ইলেকট্রিক সব ঘোড়ার পিঠে,হাসের পিঠে উঠল আর যেন আনন্দে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। তারপর ওর সব কিছু ঘুরে দেখা শেষ হলে সেদিনের মত বাসায় ফিরলাম জারি্নকে নিয়ে।
এর পরের দিন আমি শপিং এর জন্য বের হয়েছি,ওদের বাসা্র সামনে এসে ডাকলাম জারিন বলে,জানালা দিয়ে মুখ বের করে জবাব দিল কার্টুন দে…খ…বে ভাইয়া…অনেক মজার কার্টুন এসে দেখ। আমি বললাম এখন তুই দেখ বুড়ি পরে তোর কাছ থেকে আমি শুনব। তাই শুনে ও হাসতে লাগলো। কে জানত এই দিনই জারিনের শেষ দিন। আজ থেকে তার সুন্দর মুখের হাসি ম্লান হয়ে যাবে। একটু পরে নেমে আসবে কাল মেঘ আর এই মেঘ বৃষ্টি ঝড়াবে সারাক্ষন সবার মনে। জানলে আমি এই কঠিন নির্মতার কাছে হাত জোড় করতাম জারিনের একটু খানি বেঁচে থাকার জন্য।
আমি বললাম কিরে বুড়ি এবার ঈদ এ কি কি কিনবি? ছোট্ট মুখে জবাব দিল আব্বু সব কিনে দিয়েছে আমাকে। আমার সব আছে।আমি বললাম আর কি নিবি তুই। বলল কিছু না। একটু পর বলল শাড়ি নিব লাল। ওর আম্মু ন্ম্রতার সাথে বলল না ওর শাড়ি আছে এমনি বলল ও কিছু লাগবে না। এটা শুনে জারিন চুপ করে ওর আম্মুর দিকে তাকালো। আমি আস্তে করে জারিনকে ডেকে কানে কানে বললাম তোর লাল টুক টুকে শাড়ি আমি আনতে যাচ্ছি। ও একটু লাজুক হাসি দিয়ে দৌড়ে চলে গেল। এরপর আমি শপিং শেষ করে ওর জন্য শাড়ি নিয়ে রাত্রি বাসায় আসতেই ফোনটা বেজে উঠল আমার। দেখি আমার আম্মার কল। রিসিভ করে যা শুনলাম তাতে আমার গা হিম হয়ে যাচ্ছিল। শুধু বলল জারিন এক্সিডেন্ট করেছে(সন্ধ্যা বেলায় ওরাও মার্কেটে গিয়েছিল। ওর আম্মুর কোল থেকে নেমে হঠাত সে রাস্তায় দৌড় দেয় এমন সময় দ্রুতগামী একটা সি এন জি তাকে ধাক্কা দেয়) ডক্টরস ক্লিনিকে জরুরি বিভাগে আছে তুই আয়। এতক্ষনে জারিন আর এই পৃথিবীতে নেই। মিষ্টি মুখের হাসি ম্লান করে চারদিক অন্ধকার করে জারিন চলে গেছে না ফেরার দেশে। ক্লিনিকে গেলাম শুধু শুনতে পেলাম জারিনের আব্বু আম্মু আর স্বজনের বুকফাটা কান্না। অশ্রু আর ধরে রাখতে পারলাম না। বুক ফেটে যাচ্ছিল কষ্টে।আমার হাতে তখনো লাল শাড়ি যেটা ছিল জারিনের জন্য। আমি শাড়িটা দিতে পারিনি জারিন কে। আজও আমার কাছে শাড়িটা আছে স্মৃতি হয়ে যা শুধু কষ্টই বাড়ায়। তবুও রেখেছি শাড়িটা। আমি যেন ওখানেই খুঁজে পাই জারিন ও তার মিষ্টি মুখের হাসির ধ্বনি। ক্ষণে ক্ষণে শাড়িটা দেখে মনে হয় এই বুঝি জারিন এসে বলবে ভাইয়া আমার লাল শাড়ি দাও। মাস খানেক আগে আংকেল আন্টি চলে গেছেন অন্যথায় শুধু চাকরির কারণে। এখনো মাঝে মাঝে তাদের সাথে যোগাযোগ হয়। কিন্তু জারিনের জন্য মনটা কেঁদে উঠে তখনি। জারিন এসেছিল অল্প সময়ের জন্য আমাদের মাঝে আর দিয়ে গেছে অনন্ত কালের জন্য ব্যথা আর তীব্র কষ্ট যা অনুভব করি সবসময়। জারিন তুই ছি্লি পবিত্র,তুই ছিলি শিশু,তুই আছিস ফুলের বিছানায় ঘুমিয়ে,তুই তোর ফুল বাগিচায় ঘুরে বড়াস মুখেমিষ্টি হাসি নিয়ে। তবুও জানতে ইচ্ছে করে তুই কেমন আছিস? আমি তোকে অর্ন্তরচক্ষু দিয়ে ঐ জগতে দেখতে পাই শুধু এ জগতে তোকে চর্মচক্ষু দিয়ে দেখতে পাই না রে। বুড়ি তুই আমার অন্তরে আছিস থাকবি চিরকাল।পরশু ঈদ তাই তোকে খুব মনে পড়ছে,কিন্তু যখন ভাবি এই ঈদের আগেই তুই চলে গিয়েছিলি না ফেরার দেশে তখন মনটাকে আর ধরে রাখতে পারি না। আবার ঈদ এল তাই যেন আর কাউকে জারিনের মত ঘটনার শিকার হতে না হয়। আমরা সবাই ভালভাবে ঈদ করি। আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে ভালভাবে ঈদ করার তৌফিক দান করেন। আমিন।
৬ টি মন্তব্য
lnjesmin লুৎফুন নাহার জেসমিন৩১ জানুয়ারি ২০১৩, ০১:৪৮
আপনার লেখাটি পড়ে বুকটা ফেটে যাচ্ছে । সামান্য অসতর্কতায় কত বড় সম্পদ হারাতে হয় ।
sizarsalam সিজার সালাম৩১ জানুয়ারি ২০১৩, ১৫:৪৫
ঠিক বলেছেন ।
mitro আমি অনিমেষ মিত্র ৩১ জানুয়ারি ২০১৩, ০১:৫৭
হুম ।

আপনার জন্য শুভ কামনা রইল ।
sizarsalam সিজার সালাম৩১ জানুয়ারি ২০১৩, ১৫:৪৭
আপনার জন্যও শুভ কামনা রইল
muktomon71 মুক্তমন ৭১ ৩১ জানুয়ারি ২০১৩, ১২:০৭
আমার চোখে পানি এসে গেছে । প্রিয়জন হারানোর যন্ত্রণা যে হারায় সেই বোঝে । ভালো থাকবেন ।
sizarsalam সিজার সালাম৩১ জানুয়ারি ২০১৩, ১৫:৪৯
আপনিও ভালো থাকবেন