অন্যচোখে
হরহামেশাই বেলালকে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হচ্ছে। এর জন্য দায়ী তার ক্রমবর্ধমান ভুঁড়ি। তেমন কিছু খায় না সে, কিন্তু ভুঁড়িটা পাল্লা দিয়ে বেড়েই চলছে। নানান জনের নানান কথা টুকটাক শুনতেও হচ্ছে। সেসব কথা মোটেও প্রশান্তিদায়ক না। সে খাবার টেবিলে বসে লজ্জা লজ্জা মুখ করে। সেদিন খেতে বসে কী লজ্জাই না সে পেল!
গরুর মাংস ভুনা খুবই সুস্বাদু হয়েছে। সে নিজের হাতে একটা পিস নিতে গেল, এমন সময় তার ছোটবোন চামেলী বলল, ভাইয়া, কম খা। দেখছিস না তোর ভুঁড়ি বড় ডেকচির মতো হয়ে যাচ্ছে।
বাবা বলল, যত কম খাবে ততই ভালো। বেশি খেয়ে অকালে মরবে নাকি?
মা বলল, জিহ্বা সামলাও নইলে বিপদের সীমা থাকবে না। অল্প বয়সে নানান অসুখে ধরবে।
এরপর থেকে সে নিজে কোনো খাবার তুলে খায় না। মা যা দেয় তা চোখ-মুখ বুজে খায়। রান্না অসাধারণ হলেও সে নিজ থেকে চেয়ে নেয় না। মা’র উপর ভরসা করে থাকে। নিজের বাসায় তাকে অনাত্মীয়র মতো শরমে শরমে খেতে হয়, এরচে কষ্ট আর কী হতে পারে।
মানছুরা তার ছেলেকে পরামর্শ দিলো; রোজ রোজ সকাল-বিকাল দৌড়াতে। মা’র পরামর্শ গ্রাহ্য করল না বেলাল। চামেলীর কম খাওয়ার পরামর্শ শুনেই সে খেপে উঠে বলল, আমার খাওয়া দেখলে চোখ তোর টাটায়, তাই না? আমি বেশি খেলে কি তোর কম পড়ে?
বেলাল তার ভুঁড়ি নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তিত না। কিন্তু খাবার টেবিলে পরিবারের সবাই যখন তাকে নানানরকম উপদেশ দেয় তখন তার মন খারাপ না হয়ে পারে না। তারপরেও সে ভুঁড়ি কমানোর কথা ভাবে না। কিন্তু একসময় তাকে এটা নিয়ে গভীর ভাবনা ভাবতে হলো।
বেলাল মনের কারবার করে জান্নাতুলের সাথে। জান্নাতুল রূপসী মেয়ে। এবং দারুণ স্মার্ট। তার প্রেমিকের ভুঁড়ি দেখে সে বিচলিত। বিচলিত গলায় বলল, তোমার যা অবস্থা তাতে ডায়বেটিসে ধরতে বেশি সময় লাগবে না। ভুঁড়ি কমাও।
নিজের ভুঁড়ি নিয়ে অন্য কেউ মন্তব্য করলে আহত হতে হয়। প্রেমিকা করলে আরও বেশি হতে হয়। বেলাল আহত গলায় বলল, দেখি।
জান্নাতুল শাসন করার ভঙ্গিতে বলল, দেখি না। সত্যি সত্যি কমাতে হবে। ভুঁড়ি স্মার্টনেসও কমিয়ে দেয়। তুমি তো জানোই আনস্মার্ট মানুষ আমার একদম পছন্দ না। সো, তোমাকে ভুঁড়ি কমিয়ে স্মার্ট হতে হবে। সময় এক সপ্তাহ। এর মধ্যে না পারলে সম্পর্ক কাটাকাটি হয়ে যাবে, বুঝলে?
বেলাল এবার অগ্রাহ্য করতে পারল না। উঠেপড়ে লেগে গেল ভুঁড়ি কমাতে।
এক সপ্তাহ একেবারই কম সময়, এর মধ্যে আস্ত ভুঁড়িটা কমিয়ে শরীর ঝরঝরে করা কঠিন কাজ। প্রেম টিকিয়ে রাখতে হলে তাকে সেই কঠিন কাজটিই করতে হবে।
অনিচ্ছায় সকাল- বিকাল রোজ রোজ সে বিরামহীনভাবে দৌড়াতে লাগল। নানানরকম পরিশ্রমের কাজ করে ঘাম ঝরাতে লাগল। জিমেও যেতে শুরু করল। পাশাপাশি খাবারে আনল ব্যাপক পরিবর্তন।
সকালের নাস্তায় এক পিস পাতলা রুটি আর এক বাটি সবজি। দুপুরে এক কাপ ভাত, কিছু সবজি আর এক টুকরো মাছ। রাতে একদম উপোস।
এই ভাবে কয়েক দিন চলার পর বেলাল হাঁপিয়ে উঠল। এমনিতে দৌড়াদৌড়ি তারপর অতি অল্প খাবার, শরীরে কুলায় না। একবার ভাবে ছেড়ে দেবে এসব, পেটভরে সকাল- বিকাল খাবে। কিন্তু জান্নাতুলের কড়া হুমকি মনে পড়লেই চিন্তা গুলিয়ে যায়। নব উদ্যামে শুরু করে দৌড়াদৌড়ি। খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করলেও খাবার থেকে দূরে থাকে। সুস্বাদু খাবার দেখে জিহ্বায় পানি আসলেও সে অনড় থাকে তার লক্ষ্যে।
তার লক্ষ্য কিছুটা পূরণ হলো খাবার কন্ট্রোল আর এক্সারসাইজের গুণে। আগের চেয়ে ভুঁড়ি কিছুটা কমেছে। চেহারায় স্মার্টনেসও কিছুটা বেড়েছে। সে খুশি খুশি মনে জান্নাতুলকে নিজের অবস্থাটা দেখাতে গেল। জান্নাতুল পুরোপুরি আনন্দিত হলো না, কিছুটা হলো। নিরস গলায় বলল, ভুঁড়ি কিছুটা কমেছে। স্মার্টনেসও কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু আমি আরও স্মার্টনেস চাই। আরও ফিটনেস চাই।
বেলাল মোটেও খুশি হতে পারল না। তার ধারণা ছিল জান্নাতুল তাকে বাহবা দেবে। তো জান্নাতুলের বাহবা পাওয়ার জন্য, তাকে খুশি করার জন্য বেলাল আরও দৃঢ় হলো। আগে থেকেই সে রাতে খেত না। এখন থেকে সে দুপুরে খাওয়াও ছেড়ে দিল। কয়েকদিন পর আবার সে জান্নাতুলের কাছে গেল। জান্নাতুল ভাবলেশহীন গলায় বলল, তোমার উন্নতি হচ্ছে ঠিকই। কিন্তু আমি পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারছি না। আমি আরও ফিটনেস চাই।
এবার বেলাল সকালের নাস্তাও ছেড়ে দিল। শুধু পানি আর একমুঠো মুড়ির উপর নির্ভর করে চলতে লাগল। কিন্তু বেশিদিন সে চলতে পারল না। দিন দুয়েক বাদেই অসুস্থ হয়ে পড়ল। মাথার মধ্যে চক্কর দেয়। চোখে অন্ধকার দেখে। হাত পা দুর্বল লাগে। বিছানা ছেড়ে উঠতে পারে না। তাছাড়া দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা প্রচণ্ড পেটে ব্যাথা। এর মধ্যে সে মাঝে মাঝে পেটে হাত বুলিয়ে দেখে তার ভুঁড়ি কমেছে কি না- না কমলে সমস্ত চেষ্টা, অসুখের কষ্ট সবই বৃথা যাবে। সে অসুখের কষ্টকে কষ্টই মনে করল না। তার মনোভাব – ভুঁড়ি কমেছে, সেটাই অনেক কিছু। অসুখ- টসুখ ওসব কিছু না।
অসুস্থতার খবর পেয়ে জান্নাতুল এলো বেলালকে দেখতে। বেলাল আশান্বিত হল- ভুঁড়িহীন পেটটা দেখে জান্নাতুল খুশিতে গদ গদ হবে। তা হলো না। জান্নাতুল মিয়ানো গলায় বলল, ভুঁড়ি তো কমেছে, কিন্তু অসুখের কী হবে, বল? আমি আবার রোগাভোগা মানুষ পছন্দ করি না। সময় নাই অসময় নাই ডাক্তার হাসপাতাল- খুব ঝামেলার ব্যাপার। আমি ঝামেলা সহ্য করতে পারি না।
দুঃখে বেলালের চোখে পানি এসে গেল। ভুঁড়ি কমাতে গিয়ে অসুস্থ হওয়া, অথচ সে কারণেই জান্নাতুল অপছন্দ করছে। অন্যের চোখে সুন্দর হওয়ার জন্য কিছু কিছু মানুষ প্রাণপণ চেষ্টা করে। নানান কৌশল খাটায়। কিন্তু সুন্দর আর হতে পারে কই? বরং জীবনটা অনেক সময় দুর্বিষহ করে ফেলে। অন্যের কাছে নয়, নিজের কাছে সুন্দর হওয়াই জীবনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
গরুর মাংস ভুনা খুবই সুস্বাদু হয়েছে। সে নিজের হাতে একটা পিস নিতে গেল, এমন সময় তার ছোটবোন চামেলী বলল, ভাইয়া, কম খা। দেখছিস না তোর ভুঁড়ি বড় ডেকচির মতো হয়ে যাচ্ছে।
বাবা বলল, যত কম খাবে ততই ভালো। বেশি খেয়ে অকালে মরবে নাকি?
মা বলল, জিহ্বা সামলাও নইলে বিপদের সীমা থাকবে না। অল্প বয়সে নানান অসুখে ধরবে।
এরপর থেকে সে নিজে কোনো খাবার তুলে খায় না। মা যা দেয় তা চোখ-মুখ বুজে খায়। রান্না অসাধারণ হলেও সে নিজ থেকে চেয়ে নেয় না। মা’র উপর ভরসা করে থাকে। নিজের বাসায় তাকে অনাত্মীয়র মতো শরমে শরমে খেতে হয়, এরচে কষ্ট আর কী হতে পারে।
মানছুরা তার ছেলেকে পরামর্শ দিলো; রোজ রোজ সকাল-বিকাল দৌড়াতে। মা’র পরামর্শ গ্রাহ্য করল না বেলাল। চামেলীর কম খাওয়ার পরামর্শ শুনেই সে খেপে উঠে বলল, আমার খাওয়া দেখলে চোখ তোর টাটায়, তাই না? আমি বেশি খেলে কি তোর কম পড়ে?
বেলাল তার ভুঁড়ি নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তিত না। কিন্তু খাবার টেবিলে পরিবারের সবাই যখন তাকে নানানরকম উপদেশ দেয় তখন তার মন খারাপ না হয়ে পারে না। তারপরেও সে ভুঁড়ি কমানোর কথা ভাবে না। কিন্তু একসময় তাকে এটা নিয়ে গভীর ভাবনা ভাবতে হলো।
বেলাল মনের কারবার করে জান্নাতুলের সাথে। জান্নাতুল রূপসী মেয়ে। এবং দারুণ স্মার্ট। তার প্রেমিকের ভুঁড়ি দেখে সে বিচলিত। বিচলিত গলায় বলল, তোমার যা অবস্থা তাতে ডায়বেটিসে ধরতে বেশি সময় লাগবে না। ভুঁড়ি কমাও।
নিজের ভুঁড়ি নিয়ে অন্য কেউ মন্তব্য করলে আহত হতে হয়। প্রেমিকা করলে আরও বেশি হতে হয়। বেলাল আহত গলায় বলল, দেখি।
জান্নাতুল শাসন করার ভঙ্গিতে বলল, দেখি না। সত্যি সত্যি কমাতে হবে। ভুঁড়ি স্মার্টনেসও কমিয়ে দেয়। তুমি তো জানোই আনস্মার্ট মানুষ আমার একদম পছন্দ না। সো, তোমাকে ভুঁড়ি কমিয়ে স্মার্ট হতে হবে। সময় এক সপ্তাহ। এর মধ্যে না পারলে সম্পর্ক কাটাকাটি হয়ে যাবে, বুঝলে?
বেলাল এবার অগ্রাহ্য করতে পারল না। উঠেপড়ে লেগে গেল ভুঁড়ি কমাতে।
এক সপ্তাহ একেবারই কম সময়, এর মধ্যে আস্ত ভুঁড়িটা কমিয়ে শরীর ঝরঝরে করা কঠিন কাজ। প্রেম টিকিয়ে রাখতে হলে তাকে সেই কঠিন কাজটিই করতে হবে।
অনিচ্ছায় সকাল- বিকাল রোজ রোজ সে বিরামহীনভাবে দৌড়াতে লাগল। নানানরকম পরিশ্রমের কাজ করে ঘাম ঝরাতে লাগল। জিমেও যেতে শুরু করল। পাশাপাশি খাবারে আনল ব্যাপক পরিবর্তন।
সকালের নাস্তায় এক পিস পাতলা রুটি আর এক বাটি সবজি। দুপুরে এক কাপ ভাত, কিছু সবজি আর এক টুকরো মাছ। রাতে একদম উপোস।
এই ভাবে কয়েক দিন চলার পর বেলাল হাঁপিয়ে উঠল। এমনিতে দৌড়াদৌড়ি তারপর অতি অল্প খাবার, শরীরে কুলায় না। একবার ভাবে ছেড়ে দেবে এসব, পেটভরে সকাল- বিকাল খাবে। কিন্তু জান্নাতুলের কড়া হুমকি মনে পড়লেই চিন্তা গুলিয়ে যায়। নব উদ্যামে শুরু করে দৌড়াদৌড়ি। খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করলেও খাবার থেকে দূরে থাকে। সুস্বাদু খাবার দেখে জিহ্বায় পানি আসলেও সে অনড় থাকে তার লক্ষ্যে।
তার লক্ষ্য কিছুটা পূরণ হলো খাবার কন্ট্রোল আর এক্সারসাইজের গুণে। আগের চেয়ে ভুঁড়ি কিছুটা কমেছে। চেহারায় স্মার্টনেসও কিছুটা বেড়েছে। সে খুশি খুশি মনে জান্নাতুলকে নিজের অবস্থাটা দেখাতে গেল। জান্নাতুল পুরোপুরি আনন্দিত হলো না, কিছুটা হলো। নিরস গলায় বলল, ভুঁড়ি কিছুটা কমেছে। স্মার্টনেসও কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু আমি আরও স্মার্টনেস চাই। আরও ফিটনেস চাই।
বেলাল মোটেও খুশি হতে পারল না। তার ধারণা ছিল জান্নাতুল তাকে বাহবা দেবে। তো জান্নাতুলের বাহবা পাওয়ার জন্য, তাকে খুশি করার জন্য বেলাল আরও দৃঢ় হলো। আগে থেকেই সে রাতে খেত না। এখন থেকে সে দুপুরে খাওয়াও ছেড়ে দিল। কয়েকদিন পর আবার সে জান্নাতুলের কাছে গেল। জান্নাতুল ভাবলেশহীন গলায় বলল, তোমার উন্নতি হচ্ছে ঠিকই। কিন্তু আমি পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারছি না। আমি আরও ফিটনেস চাই।
এবার বেলাল সকালের নাস্তাও ছেড়ে দিল। শুধু পানি আর একমুঠো মুড়ির উপর নির্ভর করে চলতে লাগল। কিন্তু বেশিদিন সে চলতে পারল না। দিন দুয়েক বাদেই অসুস্থ হয়ে পড়ল। মাথার মধ্যে চক্কর দেয়। চোখে অন্ধকার দেখে। হাত পা দুর্বল লাগে। বিছানা ছেড়ে উঠতে পারে না। তাছাড়া দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা প্রচণ্ড পেটে ব্যাথা। এর মধ্যে সে মাঝে মাঝে পেটে হাত বুলিয়ে দেখে তার ভুঁড়ি কমেছে কি না- না কমলে সমস্ত চেষ্টা, অসুখের কষ্ট সবই বৃথা যাবে। সে অসুখের কষ্টকে কষ্টই মনে করল না। তার মনোভাব – ভুঁড়ি কমেছে, সেটাই অনেক কিছু। অসুখ- টসুখ ওসব কিছু না।
অসুস্থতার খবর পেয়ে জান্নাতুল এলো বেলালকে দেখতে। বেলাল আশান্বিত হল- ভুঁড়িহীন পেটটা দেখে জান্নাতুল খুশিতে গদ গদ হবে। তা হলো না। জান্নাতুল মিয়ানো গলায় বলল, ভুঁড়ি তো কমেছে, কিন্তু অসুখের কী হবে, বল? আমি আবার রোগাভোগা মানুষ পছন্দ করি না। সময় নাই অসময় নাই ডাক্তার হাসপাতাল- খুব ঝামেলার ব্যাপার। আমি ঝামেলা সহ্য করতে পারি না।
দুঃখে বেলালের চোখে পানি এসে গেল। ভুঁড়ি কমাতে গিয়ে অসুস্থ হওয়া, অথচ সে কারণেই জান্নাতুল অপছন্দ করছে। অন্যের চোখে সুন্দর হওয়ার জন্য কিছু কিছু মানুষ প্রাণপণ চেষ্টা করে। নানান কৌশল খাটায়। কিন্তু সুন্দর আর হতে পারে কই? বরং জীবনটা অনেক সময় দুর্বিষহ করে ফেলে। অন্যের কাছে নয়, নিজের কাছে সুন্দর হওয়াই জীবনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
লেখক মোহাম্মদ এনামুল কবির
- মোহাম্মদ এনামুল কবির -এর ব্লগ
- ১২ টি মন্তব্য
- ৩০ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:২২
- গল্প
প্রিন্ট করুন
-
সাম্প্রতিক পোস্ট
-
সাম্প্রতিক মন্তব্য





নীতিমালা
ব্লগ বই
অভিযোগ
সাম্প্রতিক পোস্ট

ফনেটিক