রবিবার ২৬ মে ২০১৩, ১২ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২০ সাইনইন | রেজিস্টার |bangla font problem


বিদেশযাত্রা

বিদেশযাত্রা
মোহাম্মদ ইসহাক খান

ফোনটা বেজে উঠতেই প্রায় ছুটে গিয়ে তুলে নিলেন মিসেস আয়েশা বেগম। প্রায় এক সপ্তাহ পার হয়ে গেছে, কাজেই ছেলের আজকালের মধ্যে ফোন করার কথা। তিনি সারা সপ্তাহ অপেক্ষা করে থাকেন রবিবার রাতের জন্য। তাঁর ছোট ছেলে মাসুম এইদিনে ফোন করে। একটু দেরী হয়ে গেলেই দুশ্চিন্তায় পড়ে যান তিনি। বয়স হয়েছে, এখন তাঁর অন্যতম প্রধান কাজ হল ছেলেদের জন্য দুশ্চিন্তা করা, কারণে, অকারণে; সময়ে, অসময়ে।
ফোন ধরে ব্যগ্র কণ্ঠে তিনি হ্যালো বললেন।
হ্যালো, মা?
কে, মাসুম?
হ্যাঁ। কেমন আছ মা?
ভালো আছি বাবা। খুব ভালো। তুই কেমন আছিস?
আমিও ভালো।
তারপর বল্‌, আর কী খবর?
খবর ভালো মা। তোমার ব্যবস্থা হয়ে গেছে।
কীসের ব্যবস্থা?
তুমি এখন আমেরিকায় চলে আসতে পারো।
কী বলছিস?
হ্যাঁ, মা। অনেক তো কষ্ট করলে। আর কত? এবার আমার কাছে চলে এসো।
ধুর, কী যে বলিস। দেশ ছেড়ে আমি কোথায় যাবো? সেই আমেরিকায়? পাগল!
পাগল না, মা। সত্যি বলছি। তোমাকে তো বলেছিলাম যে চেষ্টাচরিত্র করছি। এতদিনে ফল মিলেছে। আসলে বিদেশ থেকে যাদের জন্য চেষ্টা করা যায়, তাদের মধ্যে সবচেয়ে তাড়াতাড়ি রেস্পন্স পাওয়া যায় স্ত্রী আর সন্তানের জন্য। তারপরে মা, বাবা এরা। কয়েকদিনের মধ্যেই এমব্যাসি থেকে তোমার কাছে ফোন আসবে। তুমি দেখা করে আসবে।
ওরে বাবা, আমি তো শুনেছি ওখানে সব বিদেশী মানুষজন, ইংরেজীতে কথা বলতে হয়। আমি তো ইংরেজী পারিই না বলতে গেলে।
কোন চিন্তা নেই মা, তোমাকে ওরা জিজ্ঞেস করবে তুমি ইন্টার্ভিউ বাংলায় দেবে নাকি ইংরেজীতে। তুমি যদি বাংলায় বলতে চাও তাহলে ওরা বাংলাতেই প্রশ্ন করবে।
কী না কী জিজ্ঞেস করে, আমি উল্টোপাল্টা জবাব দিলে আমার কোন ঝামেলা ... ...
কোন সমস্যা হবে না। খুব সাধারণ সব প্রশ্ন করবে। কার কাছে যাচ্ছেন, বেড়াতে নাকি থাকতে এইসব।
ও, আচ্ছা।
কিছু কাগজপত্র, সার্টিফিকেট দেখতে চাইবে। আর কয়েকটা ছবি নিয়ে যেতে হবে। কী কী নিতে হবে আমি ভাইয়াকে ইমেইল করে জানিয়ে দিয়েছি।
ঠিক আছে, বাবা। কিন্তু, আমি তো কখনো প্লেনে চড়ি নি, কীভাবে আসবো?
সবকিছু শেষ হতে কয়েক সপ্তাহ চলে যেতে পারে। তুমি কোন চিন্তা কোরো না, তোমাকে কিচ্ছু করতে হবে না। আমার বন্ধু ফয়েজ দেড় মাস পর আমেরিকায় আসবে, ও তোমাকে সঙ্গে করে নিয়ে আসবে। মা, আমি সব পাকা ব্যবস্থা করে রেখেছি, কোন চিন্তা নেই, ওকে বলে রেখেছি। একেবারে তোমাকে সঙ্গে করে নিয়ে এসে আমার বাসায় দিয়ে যাবে।
আমার তো কেমন ভয় ভয় করছে বাবা।
মা, ওসব ভয়টয় বাদ দাও। আমি কয়েকমাস ধরে চেষ্টা করেছি, তুমি যদি বেঁকে বস তাহলে ভালো হবে না কিন্তু।
আচ্ছা বাবা। আমি আসবো।
ঠিক আছে মা। তোমার শরীরটা কেমন? ডায়াবেটিস কি এখনো হাই? শরীর কি এখনো দুর্বল, মাথা ঘুরে পড়ে যাও?
না, ডায়াবেটিস নেমে গেছে। মিষ্টি তো খাই-ই না। আমি ভালো আছি বাবা। তুই শুধুশুধু টেনশন করিস।
বেশ, ভালো তো। ঠিক আছে মা, আজ রাখি তাহলে।
বৌমা আছে, কথা বলবি না?
ভাবী? এক মুহূর্ত থামে মাসুম। না, থাক, মা। ভাবী ব্যস্ত মানুষ, পরে কথা বলবো।
নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে মিসেস আয়েশার। আচ্ছা, ঠিক আছে।
রাখি মা।
ভালো থাকিস।

ফোন রাখতেই বড় বৌমার গলা শোনা গেলো। কে ফোন করেছিল, মা?
মাসুম।
ও, পুত্রবধূ আবার নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
মিসেস আয়েশা পায়ে পায়ে নিজের ঘরে চলে আসেন। গালে হাত দিয়ে ভাবেন। একটা সময় ছিল, যখন তাঁর কাজ ছিল অনেক, ভাবনাচিন্তার সময় ছিল কম। কিন্তু এখন সময় পাল্টেছে, তাঁর এখন অখণ্ড অবসর শুধু চিন্তা করার।
তিনি বড়ছেলের বাসায় থাকেন। আছে ছেলে, পুত্রবধূ, ছোট একটা নাতি। সবাই ব্যস্ত, খুব ব্যস্ত। বড়ছেলে মাসুদ সকালে অফিসে যায়, রাতে আসে। পুত্রবধূ ফারাহ সারাদিন সংসারের কাজে ব্যস্ত, আর নাতি রাফসান তার বাবামায়ের চেয়েও ব্যস্ত। স্কুল, পরীক্ষা, প্রাইভেট টিউটর কত কী হাবিজাবি।
একটা সময় স্বামী আফজালুর রহমান বেঁচে ছিলেন, তখন তিনি সারাদিনের ব্যস্ততার পর এসে স্ত্রীকে সময় দিতেন, গল্প করতেন, একসাথে চা খেতেন, খোঁজখবর নিতেন। সেই মানুষটা রাতে ঘুমের মধ্যে একদিন হঠাৎ করে মরে গেল। এখন মিসেস আয়েশা একেবারে একা।
ছোটছেলে মাসুম আর এক মেয়ে লায়লা, অর্থাৎ মিসেস আয়েশার আরও দুটি সন্তান আছে। লায়লার বিয়ে হয়ে গেছে, স্বামী-পুত্র নিয়ে সে ভালোই আছে। এখানে কালেভদ্রে বেড়াতে আসে সে, কয়েক ঘণ্টা খুব আনন্দে কাটে। কিন্তু সে থাকে না, ছোট একটা ফ্ল্যাটে পরিবার নিয়ে কয়েকদিন থাকা মানে বড়ভাইকে কষ্ট দেয়া। কাজেই সে দিনে এসে দিনেই ফিরে যায়।
সবার কাজ আছে, মিসেস আয়েশার নেই। তিনি মাঝে মাঝে বৌমাকে সাহায্য করতে চান, সে কিছু করতে দেয় না। এই অভ্যাসটা বৌমার আছে, সে নিজের সংসারে কাউকে হাত দিতে দেবে না। তাকে দোষ দিতে পারেন না মিসেস আয়েশা। নতুন যুগে মেয়েরা চায় একান্ত নিজের সংসার, সেখানে বাইরের কোন উটকো মানুষ থাকবে না, কোনকিছুতে নাক গলাবে না।
উটকো মানুষ? তিনি মাসুদকে পেটে ধরেছেন, সেই ছোট্টটি থেকে মানুষ করেছেন। কিন্তু এখন পুত্রবধূ এসেছে, তাঁর কী অধিকার আছে তার সংসারে পড়ে থাকার, কোন কিছুতে নাক গলাবার? নিজেকে উদ্বাস্তু ধরণের একজন মানুষ বলে মনে হয়। ছেলেদুটো মানুষ খারাপ নয়, কিন্তু তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারেন যে দিনে দিনে তিনি ছেলে আর তার স্ত্রীর সংসারে একটা বোঝার মতো, একটা অবাঞ্ছিত মানুষের মতো হয়ে যাচ্ছেন।
স্বামী আফজালুর রহমান ছোট চাকুরে ছিলেন, সব সঞ্চয় ঢেলে দিয়েছিলেন ছেলেদের লেখাপড়া করানোর পেছনে। শেষ সময়ে দেখা গেলো, তাঁর আর কিছুই নেই, একেবারে অপাংক্তেয়। কাজেই নিজের একটা বাড়ি করে যেতে পারেননি। ছেলেরা নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে গেছে, এটুকুই তাঁর অর্জন।
ছেলেরা কিংবা পুত্রবধূ কেউ কখনো তাঁর সাথে খারাপ ব্যবহার করে নি, অন্তত তাঁর সামনাসামনি করেনি। কিন্তু তিনি চলতে ফিরতে কান পেতে থাকেন, আর তাতেই বুঝতে পারেন যে তিনি ছেলের সংসারে ঠিক "কাম্য" নন। মাঝে মাঝে ছেলে আর পুত্রবধূর মধ্যে আড়ালে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় শুনেছেন, আর বুঝতে পেরেছেন, সেই আলাপচারিতার বিষয়বস্তু তিনি।
বাইরের দেশ হলে খুব ভালো ব্যবস্থা হতো, তারা বুড়ো বাবামাকে সোজা বৃদ্ধাশ্রমে "ফেলে" দিয়ে আসে। উন্নত জাতির উন্নত ব্যবস্থা, বুড়ো হলে, তোমার "ডেট এক্সপায়ার" হয়ে গেলেই তোমাকে মূলধারার বাইরে চলে যেতে হবে। বাংলাদেশ বলে তাঁর ছেলেরা সেটা করতেও পারছে না, আবার ঠিক তাঁকে গ্রহণও করতে পারছে না। বড় বৌমা বলেছে, আর কতদিন টানবে? বড় ছেলে অসহায়ের মতো একটা কিছু বোঝাতে চেষ্টা করেছে তাকে, কিন্তু নিজের কাছে মিসেস আয়েশার নিজেকেই ছোট মনে হয়েছে। গ্রামে কোন সম্পত্তি নেই তাঁদের, সামান্য যা ছিল তা আফজালুর রহমান সাহেবের শরিকরা দখল করে নিয়েছে। খানিকটা জমি আর খোরাকের ব্যবস্থা থাকলে হয়তো একটা ছোট ঘর তুলে সেখানে থাকতে পারতেন মিসেস আয়েশা, সারাজীবন ঢাকার শহুরে জীবনযাত্রায় থেকে অভ্যস্ত তিনি, হয়তো প্রথম প্রথম অসুবিধা হতো, কিন্তু ঠিকই একসময় মানিয়ে নিতে পারতেন। সেখানেই একসময় মরে যেতেন, মামলা ডিসমিস, আর কারো কোন অসুবিধার কারণ হতেন না। তাঁর চাহিদা অল্প, বেশি খান না, বেশি পরেন না, তারপরেও কেন ছেলেদের বোঝা হয়ে গেলেন তাঁর বুঝে আসে না।

ছোট ছেলে তাঁর জন্য স্পন্সর করেছে। সে বিএসসি পাশ করেই চলে গিয়েছিল আমেরিকায়, সেখানে পিএইচডি করেছে, কিছুদিন হল চাকরি করেছে। এখন তিনি গেলে, কিছুদিন থাকলে, সবকিছু ঠিক থাকলে তাঁরও গ্রিনকার্ড হয়ে যাবে। ছেলেটা মাকে কাছে নিয়ে রাখছে, খুবই ভালো কথা। কিন্তু তার ওখানেই বা কয়দিন? মাসুমও বিয়ে করবে, বউ আসবে। তখন তিনি ছোট ছেলের পরিবারেও অপাংক্তেয় হয়ে যাবেন।
তিনি কী-ই বা করবেন? জীবন যদি একটা খেলা হয়, তাহলে তিনি এমন একজন খেলোয়াড়, যার কাছে একটিও তুরুপের তাস নেই। অন্যরা খেলে, তিনিও খেলেন, কিন্তু তাঁর খেলায় কোন ভূমিকা নেই, শুধু একটার পরে একটা চাল দিয়ে যাওয়া। কে জানে, পথের শেষে কী আছে?
আগেকার যুগ কত ভালো ছিল। তিনি দুই হাতে তাঁর শ্বশুর, শাশুড়ি, দুই দেবর, সবাইকে রান্নাবান্না করে খাইয়েছেন, সবাইকে সাথে নিয়ে ছিলেন। কখনো বিরক্ত হননি, বলেননি যে এটা তো আমার সংসার, অন্যদেরকে আমি কেন দেখবো? সময় পাল্টেছে, এখন সবাই নিজেকে নিয়ে ভাবে। তবে তাদের কোন দোষ নেই, তাদেরও তো কত সীমাবদ্ধতা আছে। ছেলেরা যদি তাঁকে কোন একটা ওল্ড হোমে দিয়ে আসতো, তাহলে তাঁর বলার কিছু ছিল না, তিনি সবই মেনে নিতেন। কিন্তু সেটাও তো তারা করছে না, বরং বুড়ো মা-কে নিয়ে টানাহেঁচড়া করছে, আর নিজেরাই বিরক্ত হচ্ছে। নিজের বয়সজনিত অসুবিধাগুলোকে দোষ বলে মনে হয় তাঁর, মাসে মাসে ডাক্তার দেখাতে হয়, চেকআপ করাতে হয়, বাতের ব্যথায় কাবু, দিনে দিনে আরও উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। আর ছেলেগুলোকে সেসব দেখতে হচ্ছে।
তাঁর স্বামী আফজালুর রহমান প্রায় দরিদ্র একজন মানুষ ছিলেন, নয়তো তাঁর এখন নিজের একটা বাড়ি থাকতো, সেখানে মিসেস আয়েশার একটা দাবী থাকতো, "নিজের" বলে বলার মতো কিছু একটা থাকতো। কিন্তু তাঁর কিছু নেই, রাস্তার একজন মানুষের সাথে তাঁর আক্ষরিক অর্থেই কোন পার্থক্য নেই। পত্রপত্রিকায় তো কত খারাপ খবর পড়েন তিনি, ছেলেও যদি কোনকালে বিগড়ে গিয়ে তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়, তাহলে তাঁর যাওয়ার কোন জায়গাও নেই।

রাতে খাবার সময় তিনি বসলেন, বড় ছেলে বলল, তারপর মা, তোমার তো আমেরিকা যাবার ব্যবস্থা হয়ে গেলো।
তিনি হাসলেন, কিছু বললেন না।
মাসুদ বলল, কয়েকদিনের মধ্যেই এমব্যাসি থেকে চিঠি আর ফোন আসবে, কবে দেখা করতে হবে, কী সমাচার সব বলা থাকবে। সবকিছু ঠিক থাকলে এক থেকে দেড়মাসের ব্যাপার।
বড় বৌমা কিছু বলল না, সে কি খুশি হচ্ছে যে তিনি বিদায় হয়ে যাচ্ছেন?

রাতে শুয়ে তিনি ভাবেন, একা একা। শুনেছেন যে বিদেশে বাঙালীদের আর কোন অসুবিধা নেই, শুধু একটা জিনিস খুব কষ্টকর। কথা বলার মানুষ নেই, সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত। মিসেস আয়েশার এটা নিয়ে কোন সমস্যা হবে না, তাঁর তো বলতে গেলে দেশেও কথা বলার মানুষ নেই। এখানে যা, ওখানেও তাই হবে।
দূরের একটা দেশ দেখা হবে, তাই বা কম কী? বাংলাদেশের মতো কি সুন্দর ঐ দেশটা? আফজালুর রহমানের দেশবিদেশ দেখার খুব শখ ছিল, পয়সার অভাবে সেটা শখই থেকে গেছে। মিসেস আয়েশার এমন কোন শখ ছিল না, তবুও তাঁর বিদেশ যাওয়া হচ্ছে। ভাগ্য বড়ই রহস্যময়, তিনি তো কোনদিন ভাবতেও পারেননি যে তিনি বিমানে চড়বেন। ওপর থেকে নিশ্চয়ই খুব সুন্দর দেখায় নিচের পৃথিবী।
মন ভালোই ছিল, কিন্তু তাঁর আবার মন ভার হয়ে যায় যখন ভাবেন যে আসলে তিনি খুব একা, তাঁর নিজস্ব কিছু নেই। তাঁর এই বিদেশযাত্রা কোন প্রমোদভ্রমণ নয়, ছেলেরা তাঁকে যখন যেখানে যেতে বলবে, তাঁকে সেখানেই যেতে হবে। তাঁর যদি অনেকগুলো টাকা থাকতো তাহলে কী মজাই না হতো, নিজের ইচ্ছেয় যা খুশি করতে পারতেন। কিন্তু তাঁর সে ক্ষমতা নেই, কোনকালে হবার সম্ভাবনাও নেই।

কয়েকদিন পর মাসুদ তাঁকে এমব্যাসিতে নিয়ে যায়, চিঠি এসে গেছে। বিশেষ মাপে চারকোণা ছবি তুলতে হল তাঁকে, ঘোমটা দেয়া চলবে না। দুই কান দেখা যেতে হবে, পেছনে ব্যাকগ্রাউন্ড সাদা হতে হবে, এমন কিছু শর্ত আছে। শর্ত পালন করে ছবি না তুললে বাতিল। নিয়মের খুব কড়াকড়ি এখানে, কোনরকম "ভুংভাং" নেই।
তাঁকে সিরিয়ালের টোকেন হাতে নিয়ে খানিকক্ষণ বসতে হল, বড় ঘরটাতে ডাক পড়ার অপেক্ষায়। তিনি আশেপাশে খেয়াল করলেন, কত মানুষ কত ধান্দায় ঘুরছে। কেউ পড়তে যাবে, কেউ ঘুরতে, আবার কারো আত্মীয়স্বজন হয়তো স্পন্সর করেছে। সবার চোখেই একটা আকুতি, লোভীর মতো দৃষ্টি, বড় ঘরটা থেকে কেউ যখন হাসিমুখে বেরিয়ে আসছে তখন সবাই কেমন লোলুপ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাচ্ছে, ভাবছে, এই লোকটার একটা গতি হয়ে গেলো। আমেরিকা স্বপ্নের দেশ, বাংলাদেশের মানুষ কথায় কথায় নিজের দেশকে গালি দেয় আর আমেরিকার সাথে নিজেদের অবস্থা তুলনা করে। সেখানে রাস্তাঘাট সুন্দর, ঘরবাড়ি সুন্দর, মানুষজন ভালো, বাঙালীদের মতো চোর-বাটপার নয়, এমনকি সেখানকার ধুলোবালিও নাকি ভালো, নাকে ঢুকলে ঠাণ্ডা লেগে খুসখুসে কাশি হয় না। সব ভালো আমেরিকায়, আর সব খারাপ জিনিস এখানে। একবার সেখানে যেতে পারলেই বর্তে যায় সবাই, আর ফিরবে না, চুপিসারে অনেকেই বলাবলি করছে। অনেকে আবার নিচু গলায় কথা বলার ধার ধারছে না, এখানে এসে আলাপ জুটিয়ে নিয়েছে পাশের জনের সাথে, বলছে বাংলাদেশ ছাড়তে পারলেই বাঁচে সে।
মিসেস আয়েশা অবাক হয়ে দেখেন মানুষগুলোকে, শোনেন তাদের কথাবার্তা। সবাই কত পিপাসু হয়ে আছে আমেরিকা যাওয়ার জন্য, কই, তাঁর তো এমন অনুভূতি হচ্ছে না।

ভেতর থেকে মুখ কালো করে বেরিয়ে এলো একজন, নিশ্চয়ই কোন গোলমাল হয়েছে। আমেরিকানরা খুব সাবধান, তথ্যে কোন গোলমাল আছে, এমন কাউকে তারা ভিসা দেয় না, আটকে দেয়। মিসেস আয়েশা নিজের কাগজপত্রে চোখ বুলোন। তাঁর কোন সমস্যা নেই তো? ছেলেটা এতদিন ধরে কষ্ট করে আজকে তাঁকে এমব্যাসিতে পাঠাতে পেরেছে, সবকিছু না ছোট একটা ভুলের জন্য নষ্ট হয়ে যায়।
কমবয়সী ছেলেটা হাউমাউ করে কাঁদছে, যেন হাত থেকে স্বর্গরাজ্যের টিকিট ফসকে গেছে। মিসেস আয়েশার মায়াই লাগলো ছেলেটার জন্য। হয়তো এখানেসেখানে টাকাপয়সা খরচ করে, অনেক কষ্ট করে এখানে আসতে হয়েছে তাকে, কিন্তু আমেরিকা যাওয়া আটকে গেছে।
কয়েকজনের পর ডাক পড়লো মিসেস আয়েশার। কাঁচে ঘেরা টেবিলের ওপাশে বসে আছেন একজন শ্বেতাঙ্গ পুরুষ এবং একজন মহিলা, মিসেস আয়েশা ভেবেছিলেন খটমটে ইংরেজিতে তাঁকে কিছু বলা হবে, কিন্তু পুরুষটি তাঁকে অবাক করে দিয়ে বাংলায় বললেন, মিসেস আয়েশা, বসুন। অনেকদিন থাকতে থাকতে শিখে গেছে, নাকি এমব্যাসিতে কাজ করতে হলে তাদের বাংলা শিখে আসতে হয়?
কথাবার্তা সংক্ষেপেই হল। যা বলার পুরুষটিই বললেন, মহিলাটি চুপচাপ কিছু একটা লিখছেন। মিসেস আয়েশা ঠিকঠিক জবাব দিয়ে গেলেন। লোকটির বাংলা উচ্চারণে তেমন কোন সমস্যা নেই, শুধু "ত" উচ্চারণ খানিকটা "ট" এর মতো শোনায়। প্রথম প্রথম শুনতে একটু হাসি পায় ঠিকই, তারাও হয়তো বাঙালীদের ইংরেজি উচ্চারণ শুনে হাসে।

মিসেস আয়েশার পর ডাক পড়লো আরেকজনের, তিনি বাইরে চলে এলেন। উৎকণ্ঠিত মুখে মাসুদ অপেক্ষা করছিলো, সে অফিস কামাই করে তাঁকে নিয়ে এসেছে এমব্যাসিতে। তিনি যখন জানালেন যে সব ঠিক আছে, তখন সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।

মিসেস আয়েশা এখনো ভেবেই চলছেন। সবকিছু ঠিকমতো হয়ে যাচ্ছে, কিছু আটকাচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত তাহলে কি দূরদেশে পাড়ি জমিয়েই ফেলবেন তিনি?
আজকাল বৌমা তাঁর সাথে খুব ভালো ব্যবহার করতে শুরু করেছে, আগে কিছু জিজ্ঞেস না করলে পারতপক্ষে কথা বলতো না, কিন্তু এখন বলে। আর তো ক'দিন, তারপরই বুড়ি বিদায় হয়ে যাবে, মেয়েটা তাই হয়তো ভাবছে। বেঁচে থাকুক, স্বামী সন্তান নিয়ে সুখে থাকুক, মিসেস আয়েশা কারো ওপরে রাগ পুষে রাখবেন না।

মেডিক্যাল চেকআপের জন্য একটা নির্দিষ্ট হাসপাতালে যেতে হয়, সময়মত সেখানে গিয়ে নানারকম পরীক্ষা করালেন মিসেস আয়েশা। রক্ত, ডায়াবেটিস, প্রেশার, আরও নানা কিছু।
এর মধ্যে একদিন বাসায় এলো ফয়েজ নামে ছেলেটা। এখানে একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করে, মাসুমের খুব ভালো বন্ধু। দেশে যখন মাসুম ছিল, তখন একসাথে অনেক বাঁদরামো করেছে, সেসব গল্প করলো মিসেস আয়েশার সাথে। এখন সে যাচ্ছে একটা কনফারেন্সে যোগ দিতে, কোম্পানির খরচে। বেশ গুছিয়ে নিয়েছে, বন্ধুর মা'কে সাথে করে নিয়ে যাবার কাজটা খুশিমনেই করে দেবে বলেছে। দিব্যি হাসিখুশি একটা ছেলে, মিসেস আয়েশার কথা বলে ভালো লাগলো বেশ।
তাহলে আসি খালাম্মা, বলে উঠে দাঁড়ায় ফয়েজ। তাকে বিদায় দেন তিনি।

ফয়েজ জানিয়েছে কীভাবে যেতে হবে। এখান থেকে হংকং, সেখানে প্লেন চার ঘণ্টা দাঁড়াবে। তারপর সেটা তাঁদেরকে নিয়ে যাবে ক্যানাডার ভ্যঙ্কুভারে, তারপর প্লেন বদলে ক্যালিফোর্নিয়া। এয়ারপোর্টে তাঁকে রিসিভ করবে মাসুম নিজে, তারপর ফয়েজের ছুটি। সব মিলিয়ে চব্বিশ ঘণ্টারও বেশি সময়ের ধাক্কা।
দিন ঘনিয়ে আসছে। আরও একবার এমব্যাসিতে গিয়ে ভিসা নিয়ে এলেন তিনি, পাসপোর্টে লাগিয়ে দেওয়া ছবিতে দেখলেন, তিনি নিজের অজান্তেই বেশ হাসিমুখে ছবি তুলেছেন। কোথায় যেন শুনেছিলেন তিনি, রামগরুড়ের ছানা, যে কীনা হাসতে জানে না, এমন মানুষজনও যখন আমেরিকার ভিসার ছবি জমা দেয়, তখন তাদের একান-ওকান হাসি হয়ে যায়। আজপর্যন্ত গোমড়া মুখে কোন বাঙালি আমেরিকান ভিসার ছবি তুলেছে বলে শোনা যায় নি। কিন্তু মিসেস আয়েশার মুখে হাসি কেন, তিনি নিজেও তা ধরতে পারলেন না।


আজ বাংলাদেশে মিসেস আয়েশার শেষ দিন। তাঁকে অবাক করে দিয়ে বেশ কয়েকজন এসে তাঁর সাথে দেখা করে গেছে, দূরসম্পর্কের আত্মীয়স্বজন, সেই দূর গ্রামদেশ থেকে, তাদের অনেককে তিনি কখনো দেখেনই নি। আশেপাশের প্রতিবেশিনীদের কথা নাহয় ছেড়েই দেয়া গেলো, তাঁদের মুখে তো মিসেস আয়েশার সৌভাগ্যের কথা ছাড়া আর কিছু নেই, কত ভালো ছেলে পেটে ধরেছেন আপা, আপনাকে বিদেশ দেখাবে, তাও আবার যে-সে দেশ নয়, খোদ আমেরিকা। মিসেস আয়েশা মলিন হাসি হাসেন।

রাত এগারোটায় প্লেন ছাড়বে। এখন বাজে বিকেল পাঁচটা। সাতটার মধ্যেই বেরিয়ে পড়তে হবে, ফয়েজের অফিসের গাড়ি এসে তুলে নিয়ে যাবে। মাসুদ নিজের গাড়িতে করে এয়ারপোর্টে দিয়ে আসতে চেয়েছিল, কিন্তু ফয়েজ মানা করেছে।
বৌমা সারাদিন ধরে তাঁর লাগেজ গুছিয়ে দিয়েছে, মেয়েটা সত্যিই অনেক খাটছে। মিসেস আয়েশা তেমন কিছু করার সুযোগই পেলেন না। নাতিটা এক-আধবার জিজ্ঞেস করেছিল, তিনি কোথায় যাচ্ছেন। তিনি বলেছেন, ছোট চাচুর কাছে। সে আর কিছু বলেনি, গম্ভীর মুখে পড়তে বসে গেছে, সামনেই এক্সাম।

মিসেস আয়েশা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন, এখান থেকে বেশ দূরে দেখা যায়। তাঁর বেশ মন খারাপ লাগছে, জন্ম থেকে এই দেশের আলোবাতাসে বড় হয়েছেন, জীবনের প্রায় ষাটটি বছর পার করে দিয়েছেন। এখন এই দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে, সত্যি বলতে, তাঁর কোন উৎসাহ আসছে না। তিনি দূরদিগন্তে তাকিয়ে থাকেন, যতটা পারা যায় দেখে নিতে চেষ্টা করেন, বড় বড় দম নিয়ে দেশের বাতাস ফুসফুসে ভরে নেন। দূরে কোন মসজিদে আযান দিচ্ছে, সেই আযানের ধ্বনিও কেমন বিষণ্ণ শোনায়। খানিকটা ঠাণ্ডা পড়েছে কয়েকদিন ধরে। মিসেস আয়েশা চাদরটা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নেন।

ফয়েজের গাড়িটা এসে পিঁপিঁ করে হর্ন দিলো। তিনি দ্রুত লাগেজপত্র নিয়ে বেরিয়ে এলেন। সুপরিসর মাইক্রোবাস, কোন অসুবিধা হবে না। ফয়েজ ভালো ব্যবস্থা করেছে।
হাত নেড়ে তিনি সবাইকে বিদায় জানালেন। বৌমার চোখে পানি দেখলেন। মেয়েটা কি সত্যি সত্যি কষ্ট পাচ্ছে? তিনি তো তাদেরকে একরকম মুক্তি দিয়ে যাচ্ছেন, কাঁদবে কেন? তার তো হাসা উচিৎ। তিনি বৌমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। আহা, নিজের সংসার নিজে গুছিয়ে নিক।
মাসুদ সাথে যাচ্ছে, তাকে বারবার করে বলে দিলো বৌমা, প্লেন ফ্লাই করার আগে যেন না আসে। অনেক সময় ফ্লাইট ডিলে হয়, তাহলে যেন ফোন করে জানিয়ে দেয় আর এয়ারপোর্টেই অপেক্ষা করে।

সারাপথ চুপচাপ বসে রইলেন তিনি, শুধু ফয়েজ মাঝেমধ্যে এটাসেটা জিজ্ঞেস করতে লাগলো, আর তিনি জবাব দিতে লাগলেন। ছেলেটা খুব মাইডিয়ার গোছের, সবসময় মুখে হাসি। তিনি আড়চোখে নিজের ছেলের দিকে তাকান, সে গম্ভীর হয়ে আছে। কেন কে জানে। মিসেস আয়েশা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।

ব্যস্ত এয়ারপোর্ট। অনেক মানুষ, কেউ যাচ্ছে, কেউ এই মাত্র বাংলাদেশে এলো। নানা রঙয়ের মানুষ, অনেক বিদেশী লোকজন দেখতে পেলেন তিনি। চেক ইন করতে হবে, ইমিগ্রেশনের কাজ আছে, লাগেজ বুঝিয়ে দিতে হবে। অনেক কাজ, সময় নিয়ে এসে ভালোই হল।
একে একে তিনি সব কাউন্টার পার হয়ে গেলেন, ফয়েজ সবজায়গায় তাঁকে বুঝিয়ে দিলো কোথায় কী করতে হবে। একা হলে নানা ঝামেলা হতো, ভাবলেন মিসেস আয়েশা।
মাসুদ স্টিলের ঘেরের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। ভেতরে ঢুকে গেলে আর বেরোনো যাবে না, তাই একবার ফিরে এলেন ভালোমতো বিদায় নেবার জন্য। মাসুদের চোখেও পানি, তিনি তাকে সান্ত্বনা দিলেন।
বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে মাসুদ বলল, ভালো থেকো মা।
তিনি ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। মাসুদ হাতটা জড়িয়ে ধরল, কিছু বলল না। এদেশে পরিচিত দৃশ্য হল ছেলে বিদায় নিচ্ছে আর মা কাঁদছেন, আর এখানে সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র। ছেলে কাঁদছে আর মা সান্ত্বনা দিচ্ছেন।
ফয়েজ মা-ছেলেকে একা থাকতে দিয়ে একটু দূরে সরে গেছে। মাসুদ বলল, আমাকে ক্ষমা কর মা, তোমার ঠিকমতো যত্ন করতে পারিনি।
কী বলিস বাবা, তোর মতো যত্ন আর কে করেছে? আমি তো খুব ভালো ছিলাম। মন খারাপ করিস না। আর চোখ মুছে ফেল, এত বড় ছেলে এভাবে কাঁদে?
বুকটা টনটন করে ওঠে মিসেস আয়েশার, সত্যিই তো, মাসুদ তার সাধ্যের মধ্যে যতটা পেরেছে, করেছে। আর কতদিন এই অথর্ব বুড়িকে টানবে? তিনি একবার কিছু বলতে চাইলেন, কিন্তু বললেন না। জ্বলজ্বলে ডিসপ্লের নিচ দিয়ে তিনি আর ফয়েজ ঢুকে গেলেন। একবার পেছনে তাকিয়ে দেখলেন, মাসুদ এখনো সেখানে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে।

চেক-ইন হল, ইমিগ্রেশনের লাইনের কাজ হয়ে গেলো, সবকিছু ঠিক আছে। লাগেজ জায়গামত ঢুকিয়ে দিলো ফয়েজ। চলুন খালাম্মা, প্লেনে ওঠা যাক।
আরেকবার পেছনে তাকালেন তিনি, না, এতদূর থেকে মাসুদকে দেখা যাচ্ছে না।
প্লেনের সিঁড়ি বেয়ে সব যাত্রীর মতো মিসেস আয়েশাও উঠলেন, ফয়েজ তাঁকে তাঁর সীট দেখিয়ে দিলো, তাঁর আর খুঁজে বের করতে হল না। ফয়েজের সীট খানিকটা পেছনে। সে বলল, আমি পেছনেই আছি খালাম্মা, অসুবিধা হলেই আমাকে বলবেন। তাছাড়া এয়ার হোস্টেসরা আছে, কিছু লাগলে ওদের কাছে চাইলেই হবে। কোন ভয় কিংবা লজ্জার কিছু নেই, হা হা হা।

জানালার বাইরে টার্মিনালের একটা অংশ দেখা যায়, আর সামনে রানওয়ে। কিছুক্ষণ পরেই বিমান ছাড়বে, সীটবেল্ট বেঁধে বসে আছেন সব যাত্রী। মিসেস আয়েশাকে কমবয়সী একজন এয়ার হোস্টেস সবকিছু দেখিয়ে দিলো, তিনি আশেপাশে চেয়ে দেখলেন যে কেউ তাঁর অবস্থা দেখে হাসছে কীনা। না, কেউ হাসছে না। সবকিছুরই প্রথমবার আছে, হাসির কী আছে? তাছাড়া অনেকেই বাঙালি, অনেকেই হয়তো তাঁর মতো প্রথম প্লেনে চড়ছে। এক বুড়োকে দেখতে পেলেন তিনি, নোয়াখালীর ভাষায় এয়ার হোস্টেসকে ধমকাধমকি করা শুরু করেছেন এখনই, এই যে দ্যাহেন তো, আমার বেল্ট লাগে না ক্যান, দুই নাম্বার জিনিস নাকী? নিশ্চয়ই পুরো রাস্তা বেচারি মেয়েগুলোকে জ্বালিয়ে মারবেন। এয়ার হোস্টেস মেয়েগুলোর চালচলন কেমন যেন, রোবটের মতো। মুখে হাসিটা সবসময় লেগেই আছে, কিন্তু দেখেই বোঝা যায় নকল, প্রাণহীন হাসি। ভেতরে ভেতরে হয়তো খুবই বিরক্ত তারা, কিন্তু এই কাজ করতে হলে গোমড়া মুখে থাকার নিয়ম নেই।

স্পীকারে ধাতব কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। "আমরা কিছুক্ষণের মধ্যেই আকাশে উড়তে যাচ্ছি। সম্মানিত যাত্রীগণকে অনুরোধ করা হচ্ছে তাঁদের মোবাইল ফোন বন্ধ রাখার জন্য।"
মিসেস আয়েশা অপেক্ষা করছেন প্লেন আকাশে ওড়ার জন্য। আকাশ পরিষ্কার, দেরী হয় নি এক মিনিটও। এই তো, বাংলাদেশের মাটি ছাড়িয়ে উঠে যাবে এটি। খুব ঝাঁকুনি লাগবে কি? তিনি মনে মনে দোয়া পড়ছেন।
কিন্তু আয়েশা বেগমের হঠাৎ কী যেন হয়ে গেলো। তাঁর বুকের বামপাশে একটা চিনচিনে ব্যথা শুরু হয়েছে। তিনি হাত নেড়ে সামনের এয়ার হোস্টেস কিংবা ফয়েজের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেষ্টা করলেন, কিন্তু পারলেন না। মুখ দিয়ে কোন কথা বেরুলো না, তাঁর সম্পূর্ণ চেতনাকে গ্রাস করে নিলো তীক্ষ্ণ ব্যথা।
এয়ার হোস্টেস তাঁকে দেখতে পেয়েছে। কোন অসুবিধা ম্যাডাম? বলে সে এগিয়ে এলো।
তিনি জবাব দিতে পারলেন না, চোখের সামনে সব তখন ঘুরছে। কয়েক মুহূর্ত সময় মাত্র, কিন্তু মিসেস আয়েশার সামনে এই খানিকক্ষণ সময়েই ঝিলিক দিয়ে গেলো বিগত জীবনের অনেক স্মৃতি, তাঁর বাবা-মা, তাঁর স্বামী, তাঁর সন্তানদের ছোটকালের কথা, নাতি, বৌমার কথা, গ্রামের কথা, স্বচ্ছ পুকুর, স্কুল সবকিছু।
ব্যথাটা ওপর দিকে উঠছে। মিসেস আয়েশার খুব পানির পিপাসা পেয়েছে। চাইলে কি ওরা এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি দেবে না?
এয়ার হোস্টেস মেয়েটা মিসেস আয়েশার হাতটা ধরে নাড়ী দেখল। তার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে।

রাত এগারোটার ফ্লাইটটা খানিকক্ষণ ডিলে হবে, কারণ একজন যাত্রী মারা গেছেন। যাত্রীর নাম মিসেস আয়েশা বেগম। তাঁর লাশ এখানেই রাখা হবে, আত্মীয়স্বজনদের কাছে দেয়া হবে, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আবার ফ্লাই করতে বেশি দেরী হবে না। একেবারে শেষ মুহূর্তে থামান হয়েছে প্লেন।
কয়েকজন লোক নিচু স্বরে নিজেদের মধ্যে আলাপ করছে, এই ফ্লাইটটাই কুফা। একজন আকাশে উড়ার আগেই মইরা গেলো। মরার আর টাইম পাইলো না।
কয়েকজন খুব বিরক্ত, আচমকা বাধা পড়ায় ভীষণ অস্থির হয়ে পায়চারি করছে। মানুষজনের কাছে আজকাল সময়ের দাম জীবনের চেয়েও বেশি। হয়তো বড়সড় ডিল মিস হয়ে যাচ্ছে।
ফয়েজ সাদা কাপড়ে ঢাকা মিসেস আয়েশার মৃতদেহটি নিয়ে যাচ্ছে, একজন ডাক্তারের রেফারেন্স লাগবে, তার সাথে আছে এয়ারপোর্টের কয়েকজন ক্রু। বাইরে হয়তো এখনো মাসুদ ভাই দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁকে খবরটা দিতে হবে। এত খারাপ একটা খবর নিশ্চয়ই তিনি আশা করেননি, কীভাবে বলবে বুঝতে পারছে না সে।
ক্যালিফোর্নিয়ায় অপেক্ষা করবে মাসুম, তাকেও তো খবরটা দিতে হবে। বেচারা হয়তো আরও বড় শক পাবে।
মিসেস আয়েশার সব আত্মীয়স্বজনকে খবর দিতে হবে, তাঁর মেয়েটিও নিশ্চয়ই এসে দেখে যাবে। বড় তাড়াহুড়ো করে মরে গেলেন তিনি, কেউ কিছু বোঝার সুযোগই পেলো না।

পুত্রবধূ ফারাহ নিজের সংসার পেয়েছিল মাত্র, সেটা তারই থাকলো। মিসেস আয়েশা সবাইকে মুক্তি দিয়ে চলে গেছেন। আমেরিকার ভিসা খুব সৌভাগ্যবানেরা পায়, মিসেস আয়েশা তাঁদের একজন। কিন্তু সবার সেখানে যাবার সৌভাগ্য হয় না।
মিসেস আয়েশার আর বিদেশযাত্রা হল না, দেশের মাটি ছাড়ার আগেই তিনি অন্য ভুবনে চলে গেলেন।

(২-৫ নভেম্বর, ২০১২)
৮ টি মন্তব্য
baganbilas1207 কামরুন্নাহার ২৭ জানুয়ারি ২০১৩, ০০:০৫
" মিসেস আয়েশার আর বিদেশযাত্রা হল না, দেশের মাটি ছাড়ার আগেই তিনি
অন্য ভুবনে চলে গেলেন। "- - -

আপনার লেখাটা ভাল লাগলো। বাস্তবজীবনে এখন এটাই হচ্ছে। হয় বৃদ্ধ বাবা-মার বিদেশ গমন অথবা বৃদ্ধাশ্রম।
ishakkhan ইসহাক খান ২৭ জানুয়ারি ২০১৩, ০৯:৩৫
আপনাকে ধন্যবাদ এবং শুভেচ্ছা।
shsiddiquee ছাইফুল হুদা ছিদ্দীকি২৭ জানুয়ারি ২০১৩, ০৯:৪৪
গল্পটি ভালো লাগলো।করুন পরিনতি।
বাংলাদেশের পৃথিবীর সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছে।
জানিনা বিদেশ নিয়ে আমাদের আরও কত নতুন নতুন অভিজ্ঞতা
হয়।অশেষ ধন্যবাদ।
ishakkhan ইসহাক খান ২৭ জানুয়ারি ২০১৩, ১৮:৫১
আপনিও ধন্যবাদ জানবেন। অনেক জায়গায় দুঃখজনক হলেও এটাই বাস্তবতা।
rodela2012 ঘাস ফুল২৭ জানুয়ারি ২০১৩, ১১:৪২
সংসারে মায়েরা কিভাবে অপাংক্তেও হয়ে যান, বিদেশের লোভে কিভাবে আমারা নিজের দেশকে তাচ্ছিল্য করি, হেয় করি, স্বামীর ভিটার প্রতি বৃদ্ধ মায়েদের ভালবাসা, স্ত্রীর রোষানলে পড়ে কিভাবে ছেলেরা মায়েদের প্রতি অবহেলা করেন এর সবই আপনার গল্পে উঠে এসেছে। খুব সুন্দর লিখেছেন। আমি যদিও নোয়াখালী অঞ্চলের লোক না, তবু বলছি, নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় লেখা লাইনটা বোধহয় পুরোপুরি ঠিক হয় নাই। অন্তত একটা শব্দের ব্যপারে আমি নিশ্চয়তা দিতে পারি। 'আমার' শব্দটার যায় জায়গায় 'আর' হবে। বাকিগুলো মিলিয়ে নিবেন।
ishakkhan ইসহাক খান ২৭ জানুয়ারি ২০১৩, ১৮:৫৪
ঠিকই বলেছেন, বাক্যটি নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষা হয়নি, আমরা সাধারণ মানুষেরা যে ভাষায় কথা বলি সে ভাষার হয়েছে। আপনি খুঁটিয়ে পড়েছেন দেখে ভাল লাগলো। পরবর্তীতে সতর্ক থাকার চেষ্টা করবো। ধন্যবাদ।
AmiTarannum আমিনা তারান্নুম৩০ জানুয়ারি ২০১৩, ১৭:৪৯
ভালো লাগলো।
ishakkhan ইসহাক খান ৩১ জানুয়ারি ২০১৩, ১০:৪৫
ধন্যবাদ আপনাকে। শুভেচ্ছা জানবেন।

সাম্প্রতিক পোস্ট Star

সাম্প্রতিক মন্তব্যComment