ঋণী
মিরুদের অতিথি কক্ষটা সুন্দর। ছিমছাম। একপাশে একসেট সোফা। আরেক পাশে ছোটমোটো একটা খাট। মাঝখানে সেন্টার টেবিল। এক কোণায় একটা শোকেজ। সেটা শোপিচে ভর্তি। দেয়াল জুড়ে বৈচিত্র্যময় শিল্পকর্ম। সেন্টার টেবিলের উপর ফুলভর্তি দুটো ফুলদানি। মিরু তাকিয়ে আছে একটা ফুলদানির দিকে। তার পাশে বসে আছে বেণু। বেণু মেয়েটা টরটরে। যখন কথা বলে তখন মনে হয় যেন সে আবৃত্তি করছে। আর এ কারণেই মিরু তার ছোটবোন বেণু সাংঘাতিক ভালোবাসে।
সাজিদ এসেছে বেড়াতে। তাকে বসতে দেওয়া হয়েছে জানালার পাশে। খোলা জানালা দিয়ে বিকেলের মিষ্টি বাতাস হু হু করে ঘরে ঢুকছে। মন ভালো করে দিচ্ছে সবাইকে। কিন্তু সাজিদের লাজুক ভাবটা মুখ থেকে সরছে না। সে চোরাচোখে মিরুর দিকে তাকাচ্ছে। মিরু পাত্তাই দিচ্ছে না তাকাতাকির এই কারবারটাকে।
মিরু সাবলীল। কারো মুখের উপর কড়া কথা বলতে তার মুখ আটকায় না। বাসায় বেড়াতে এসেছে তা সত্ত্বেও সে সাজিদকে বলল, তোমার সবই ঠিক-ই আছে। কিন্তু জুতা জোড়া একদম বিশ্রী। পুরুষ মানুষের জুতা বিশ্রী হলে তাকে হাঁদা হাঁদা লাগে। আর এ কারণেই তোমাকে আমার পছন্দ হয় নি।
সাজিদ লজ্জায় পড়ল ভীষণ। পারলে সে দৌড়ে পালায়। এই তিক্ত কথার ঝাল পাকা মরিচের চেয়েও কয়েকগুণ বেশি। তার চেহারায় ফুটে উঠল লজ্জামিশ্রিত অসহায়ত্ব।
কাঁটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেবার মতো বেণু বলল, আমার আপু ভীষণ চুজি। পুরুষ মানুষের জুতা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে। পছন্দ না হলে তাকে একদম পাত্তাই দেয় না। আপু শুধু জুতা দেখে না, মোজাও দেখে।
সাজিদ এবার হতভম্ব হয়ে গেল- একজোড়া জুতার জন্য তাকে কী পরিমাণ নাকাল হতে হচ্ছে! তার জুতা তো ফুটপাত থেকে কেনা না। দেখতেও অতোটা খারাপ না। হয়ত মিরুর বিশেষ পছন্দ হয় নি। সাজিদের পছন্দের সাথে মিরুর পছন্দ হুবহু মিলে যাবে, বিষয়টা তো সেরকম না। খাপে খাপে মিলে না গেলেই একজনকে বাসায় একা পেয়ে নাস্তানুবাদ করতে হবে, এটা কোনো ধরণের ভব্যতা? যতটা না রাগ হলো মিরুর উপর তারচে বেশি হলো জুতা জোড়ার উপর- শালার জুতা! তোর কারণেই এই অপমান।
মিরুদের বাসা থেকে বেরিয়ে এসে সাজিদ জুতাজোড়া ছুঁড়ে ফেলে দিলো রাস্তায়। খালি পায়ে হেঁটে বাসায় এলো সে।
পরদিন গেল অভিজাত শপিং মলে। ঘুরে ঘুরে দেখেশুনে যাচাইবাছাই করে সবচে বেশি দাম দিয়ে দারুণ এক জোড়া বিদেশি জুতা কিনল। এই জুতা জোড়া দেখলে নিশ্চয়ই মিরুর পছন্দ হবে।
জুতা জোড়া পায়ে দিয়ে সাজিদ মিরুর সাথে দেখা করল। বাসায় না। কলেজ ক্যাম্পাসে।
মিরু সেজেগুজে টিয়া পাখি হয়ে আছে। কী সুন্দর লাগছে তাকে। বিশেষ করে তার চোখ দুটো। এই চোখ দুটোর বিশেষ টানে সাজিদ তার প্রেমে পড়েছে। কিন্ত বাদ সেধেছে জুতা। সেই জুতা ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে। নতুন করে কেনা হয়েছে আরেক জোড়া। মিরু আজ না করতে পারবে না কিছুতেই। সাজিদের মনে অনেক ভরসা – আজ মিরুর সাথে একটা কিছু হয়ে যাবে।
সাজিদের নতুন জুতা দেখে মিরু প্রশংসা করে বলল, তোমার জুতা জোড়া তো খুব সুন্দর। নতুন কিনেছ নাকি?
সাজিদ উচ্ছ্বসিত হয়ে মাথা নেড়ে নেড়ে হাসি হাসি মুখ করে বলল, হ্যাঁ।
মিরু জিজ্ঞেস করল, আগের জোড়া কী করেছ?
সাজিদ বাহাদুরি দেখিয়ে বলল, রাস্তায় ফেলে দিয়েছি।
তারপর আরেকজোড়া কিনেছ?
হ্যাঁ।
মিরু কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকল। তার মুখ হাস্যময়। সাজিদের মনে হলো মিরু গলে গেছে। এখনই হয়ত সে চিৎকার করে বলবে, সাজিদ, আমি তোমাকে ভালোবাসি।
মিরু তা বলল না। বলল মন ভাঙ্গার কিছু কষ্টদায়ক কথা- শোনো সাজিদ, তুমি শুধু রুচিহীন নও, বোকা এবং মেরুদণ্ডহীনও।
সাজিদ হতভম্ব হয়ে বলল, কী বলছ তুমি!
ঠিক বলছি, একদম ঠিক বলছি। একজন বলল তোমার জুতা জোড়া ভালো না আর অমনি তুমি সেটা ফেলে দিয়ে নতুন এক জোড়া কিনে ফেললে। এতে কত টাকা অপচয় হলো তোমার? একজনের পছন্দের দাম দিতে গিয়ে অপচয় করা বোকাদেরই কাজ। আর অন্যের কথা তাড়াতাড়ি প্রভাবিত হওয়া মেরুদণ্ডহীন লোকদেরই সাজে। বোকা এবং মেরুদণ্ডহীন মানুষ একদম আমার দু চোখের বিষ। সুতরাং বিদায় হও।
সাজিদকে নিরুপায় হয়ে বিদায় নিতে হলো। মিরু ব্যবহারে সে ভীষণ কষ্ট পেল। কিন্তু মিরুর কথার মর্ম যখন বুঝতে পারল তখন মনে মনে তাকে ধন্যবাদ দিতে লাগল। সাজিদের বুক চিরে বেরিয় এলো – মিরু, তুমি ভালোবাসো নি, কিন্তু চোখ খুলে দিয়েছ। আমি তোমার কাছে আজ থেকে ঋণী।
সাজিদ এসেছে বেড়াতে। তাকে বসতে দেওয়া হয়েছে জানালার পাশে। খোলা জানালা দিয়ে বিকেলের মিষ্টি বাতাস হু হু করে ঘরে ঢুকছে। মন ভালো করে দিচ্ছে সবাইকে। কিন্তু সাজিদের লাজুক ভাবটা মুখ থেকে সরছে না। সে চোরাচোখে মিরুর দিকে তাকাচ্ছে। মিরু পাত্তাই দিচ্ছে না তাকাতাকির এই কারবারটাকে।
মিরু সাবলীল। কারো মুখের উপর কড়া কথা বলতে তার মুখ আটকায় না। বাসায় বেড়াতে এসেছে তা সত্ত্বেও সে সাজিদকে বলল, তোমার সবই ঠিক-ই আছে। কিন্তু জুতা জোড়া একদম বিশ্রী। পুরুষ মানুষের জুতা বিশ্রী হলে তাকে হাঁদা হাঁদা লাগে। আর এ কারণেই তোমাকে আমার পছন্দ হয় নি।
সাজিদ লজ্জায় পড়ল ভীষণ। পারলে সে দৌড়ে পালায়। এই তিক্ত কথার ঝাল পাকা মরিচের চেয়েও কয়েকগুণ বেশি। তার চেহারায় ফুটে উঠল লজ্জামিশ্রিত অসহায়ত্ব।
কাঁটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেবার মতো বেণু বলল, আমার আপু ভীষণ চুজি। পুরুষ মানুষের জুতা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে। পছন্দ না হলে তাকে একদম পাত্তাই দেয় না। আপু শুধু জুতা দেখে না, মোজাও দেখে।
সাজিদ এবার হতভম্ব হয়ে গেল- একজোড়া জুতার জন্য তাকে কী পরিমাণ নাকাল হতে হচ্ছে! তার জুতা তো ফুটপাত থেকে কেনা না। দেখতেও অতোটা খারাপ না। হয়ত মিরুর বিশেষ পছন্দ হয় নি। সাজিদের পছন্দের সাথে মিরুর পছন্দ হুবহু মিলে যাবে, বিষয়টা তো সেরকম না। খাপে খাপে মিলে না গেলেই একজনকে বাসায় একা পেয়ে নাস্তানুবাদ করতে হবে, এটা কোনো ধরণের ভব্যতা? যতটা না রাগ হলো মিরুর উপর তারচে বেশি হলো জুতা জোড়ার উপর- শালার জুতা! তোর কারণেই এই অপমান।
মিরুদের বাসা থেকে বেরিয়ে এসে সাজিদ জুতাজোড়া ছুঁড়ে ফেলে দিলো রাস্তায়। খালি পায়ে হেঁটে বাসায় এলো সে।
পরদিন গেল অভিজাত শপিং মলে। ঘুরে ঘুরে দেখেশুনে যাচাইবাছাই করে সবচে বেশি দাম দিয়ে দারুণ এক জোড়া বিদেশি জুতা কিনল। এই জুতা জোড়া দেখলে নিশ্চয়ই মিরুর পছন্দ হবে।
জুতা জোড়া পায়ে দিয়ে সাজিদ মিরুর সাথে দেখা করল। বাসায় না। কলেজ ক্যাম্পাসে।
মিরু সেজেগুজে টিয়া পাখি হয়ে আছে। কী সুন্দর লাগছে তাকে। বিশেষ করে তার চোখ দুটো। এই চোখ দুটোর বিশেষ টানে সাজিদ তার প্রেমে পড়েছে। কিন্ত বাদ সেধেছে জুতা। সেই জুতা ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে। নতুন করে কেনা হয়েছে আরেক জোড়া। মিরু আজ না করতে পারবে না কিছুতেই। সাজিদের মনে অনেক ভরসা – আজ মিরুর সাথে একটা কিছু হয়ে যাবে।
সাজিদের নতুন জুতা দেখে মিরু প্রশংসা করে বলল, তোমার জুতা জোড়া তো খুব সুন্দর। নতুন কিনেছ নাকি?
সাজিদ উচ্ছ্বসিত হয়ে মাথা নেড়ে নেড়ে হাসি হাসি মুখ করে বলল, হ্যাঁ।
মিরু জিজ্ঞেস করল, আগের জোড়া কী করেছ?
সাজিদ বাহাদুরি দেখিয়ে বলল, রাস্তায় ফেলে দিয়েছি।
তারপর আরেকজোড়া কিনেছ?
হ্যাঁ।
মিরু কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকল। তার মুখ হাস্যময়। সাজিদের মনে হলো মিরু গলে গেছে। এখনই হয়ত সে চিৎকার করে বলবে, সাজিদ, আমি তোমাকে ভালোবাসি।
মিরু তা বলল না। বলল মন ভাঙ্গার কিছু কষ্টদায়ক কথা- শোনো সাজিদ, তুমি শুধু রুচিহীন নও, বোকা এবং মেরুদণ্ডহীনও।
সাজিদ হতভম্ব হয়ে বলল, কী বলছ তুমি!
ঠিক বলছি, একদম ঠিক বলছি। একজন বলল তোমার জুতা জোড়া ভালো না আর অমনি তুমি সেটা ফেলে দিয়ে নতুন এক জোড়া কিনে ফেললে। এতে কত টাকা অপচয় হলো তোমার? একজনের পছন্দের দাম দিতে গিয়ে অপচয় করা বোকাদেরই কাজ। আর অন্যের কথা তাড়াতাড়ি প্রভাবিত হওয়া মেরুদণ্ডহীন লোকদেরই সাজে। বোকা এবং মেরুদণ্ডহীন মানুষ একদম আমার দু চোখের বিষ। সুতরাং বিদায় হও।
সাজিদকে নিরুপায় হয়ে বিদায় নিতে হলো। মিরু ব্যবহারে সে ভীষণ কষ্ট পেল। কিন্তু মিরুর কথার মর্ম যখন বুঝতে পারল তখন মনে মনে তাকে ধন্যবাদ দিতে লাগল। সাজিদের বুক চিরে বেরিয় এলো – মিরু, তুমি ভালোবাসো নি, কিন্তু চোখ খুলে দিয়েছ। আমি তোমার কাছে আজ থেকে ঋণী।
লেখক মোহাম্মদ এনামুল কবির
- মোহাম্মদ এনামুল কবির -এর ব্লগ
- ১৮ টি মন্তব্য
- ২৫ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:৩৬
- গল্প
প্রিন্ট করুন
- ১৮ টি মন্তব্য
-
মাঈনউদ্দিন মইনুল২৫ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:৫৩
“শোনো সাজিদ, তুমি শুধু রুচিহীন নও, বোকা এবং মেরুদণ্ডহীনও।”
-আমিও সাজিদকে একই কথা হয়তো বলতাম। টিয়ার মতো সেজে চোখের চাহনীতে মন কেড়েছে, তাই বলে নিজের অস্তিত্বকে বিসর্জন দিতে হবে? পুরুষ মানুষ প্রেমে পড়লে বোকা হয়ে যায়, তাই ক্ষমা করে দিলাম।
সুন্দর গল্প ফেঁদেছেন কবির ভাই! এটি তো সুন্দরভাবেই একটি দীর্ঘ গল্পের প্রথম পরিচ্ছেদ হতে পারে। পরের পর্বের অপেক্ষা করবো নাকি? আমারও কিন্তু মিরুকে পছন্দ হয়েছে! হুম! -
ভূতের আছড় ২৫ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:১২
কোথাও ভুল হচ্ছেনা তো প্রিয় এনামুল ভাই
'রিফাত " এটি আমার নাম নয় এবং কোন কালেই কেউকে এই নাম বলা হয়নি। তাছাড়া এই নাম মেয়েদের হয় যতদূর জানি।
দুঃখিত । -
অনিন্দ্য অন্তর অপু২৫ জানুয়ারি ২০১৩, ২৩:০৬
োথায় হারিয়ে যাও মাঝে মাঝে? গল্প হোক এরকম যা কিছু ভাবনা দেবে। আর একটু বড় করে লিখ -
মোঃ হাসান জাহিদ২৬ জানুয়ারি ২০১৩, ০১:১১
অনেকদিন পর আপনার দেখা পেলাম কবির ভাই । কেমন আছেন ? গল্পটাও খুব ভালো লেগেছে ।

-
ফেরদৌসা২৬ জানুয়ারি ২০১৩, ০৩:০৭
একজনের পছন্দের দাম দিতে গিয়ে অপচয় করা বোকাদেরই কাজ। আর অন্যের কথা তাড়াতাড়ি প্রভাবিত হওয়া মেরুদণ্ডহীন লোকদেরই সাজে। বোকা এবং মেরুদণ্ডহীন মানুষ একদম আমার দু চোখের বিষ।
তারা আমার ও চোখের বিষ ।
-
সাম্প্রতিক পোস্ট
-
সাম্প্রতিক মন্তব্য





নীতিমালা
ব্লগ বই
অভিযোগ
সাম্প্রতিক পোস্ট

ফনেটিক