বাতাসের গল্প

আব্দুস সালাম। একজন দরিদ্র রিকশাচালক। জীবিকার জন্য বেছে নেয়া তার একমাত্র পথ। ভালোই ছিল তার সাদামাটা জীবন যাপন। দুই ছেলে, এক মেয়ে আর তার বউ, এই নিয়ে তার সংসার। মা-বাবা গত হয়েছেন অনেক আগেই। রিকশার চাকার মতোই তার জীবনের চাকাটাও প্রতিনিয়ত ঘোরে। কখনো সুখ, তো কখনো দুঃখ। তারপরেও সুখে ছিল সালামের পরিবার।
এলাকার সবাই সালামকে বেশ ভালোবাবে চিনে। এমনকি আশে পাশের আরও দু-চারটে গ্রামের অনেক মানুষও। সদালাপী আর ভদ্রতার জন্য সবাই তার রিকশা যাতায়াত করে। যারা করে না, তারা ভয় পায়, সে খুব দ্রুত রিকশা চালায় বলে। একবার মোটরসাইকেলের সাথে পাল্লা দিয়ে তার রিকশা জিতেছিল। সেদিন, সে যেন বাতাসের মতো রিকশাটা চালিয়ে ছিল। সেই থেকে তার নাম হয়ে যায় বাতাস। আর বাতাসেই উড়ে গেলো তার আব্দুস সালাম নামটি।
গ্রামের নাম খলাপাড়া। বেশ বড় একটি গ্রাম। শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম পাড় ঘেঁসে। সুজলা সুফলা আর শস্য শ্যামলা একটি গ্রাম। এ গ্রামের বেশীর ভাগ জমিই চার ফসলী। তাই ভিন্ন ভিন্ন ঋতুতে গ্রামটি ভিন্ন ভিন্ন সৌন্দর্য নিয়ে আবির্ভূত হয়। একটি জুটমিল, একটি সাদা সিমেন্টের কারখানা, দুইটি উচ্চ বিদ্যালয়, পাঁচটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তিনটি মাদ্রাসা আর নয়টি মসজিদ নিয়ে বেশ গর্বের সাথে বাস করছে এ গ্রামের মানুষজন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ঘাঁটলেও গ্রামটির নাম পাওয়া যায়। ‘ঘোড়াশাল ম্যাসাকার’ নামে পাক হানাদারদের এক জঘন্য হত্যাযজ্ঞের সাক্ষী হয়ে আছে এ গ্রামেরই জুটমিলটি। ১৯৭১ সালের ১লা ডিসেম্বর জুটমিলটির অধিকাংশ অফিসারকে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করা হয়েছিলো।
নোংরা রাজনীতি’র চরমমুল্য গুনতে হয়েছে জুটমিলটির অনেক শ্রমিক সংগঠক আর শ্রমিককে তাদের জীবন দিয়ে। প্রায় দেড় দুই হাজারের মতো শ্রমিক কাজ করে জুটমিলটিতে। তাই মাস শেষে শ্রমিকদের কাছ থেকে একটা মোটা অঙ্কের চাঁদা উঠায় এর শ্রমিক সংগঠনটি। মালিক পক্ষের সাথে আঁতাত করে শ্রমিকদের বোনাস না দিয়ে, হাতিয়ে নেয় আরও টাকা। এছাড়া, টাকার বিনিময়ে অবৈধ শ্রমিক নিয়োগ, গরহাজির শ্রমিকের হাজিরা দেখিয়ে টাকা, পাটের ডিলারের কাছ থেকে চাঁদা, কাঠের ডিলারের কাছ থেকে চাঁদা ইত্যাদি আরও অনেক কিছু। এই মোটা অঙ্কের টাকার জন্যই সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে এর শ্রমিক সংগঠনেরও ক্ষমতার পরিবর্তন হয়। শ্রমিক নেতা কাশেম তখন সংগঠনটির সভাপতি।
জুটমিলটি থেকে পৌনে এক কিলোমিটার উত্তরে বাশাইর বাজার। গ্রামটির ব্যাবসার কেন্দ্রবিন্দু। শনিবার এবং মঙ্গলবার সপ্তাহের এই দুইদিন এখানে হাট বসে। তখন এই বাজারে প্রচুর লোকের সমাগম হয়। হাটবার ছাড়াও বাজারটিতে প্রতিদিন অনেক লোকের আনাগোনা হয়। বাতাসের রিকশাও তাই প্রিতিদিন ব্যাস্ত সময় কাটায়। বিভিন্ন জায়গা থেকে গ্রামের লোকজন, কোন সময় অন্য গ্রামের লোকজনও তার রিকশায় যাতায়াত করে।
সেদিন ছিল গ্রীষ্মের দুপুর। কাঠ ফাটা রোদ। হাটবারও ছিল না। বাতাস একটু দেরি করে রিকশা নিয়ে বের হল। ‘আইচকা রিকশা বাওনের দরকার নাই, যেই গরম পড়ছে।’ বউয়ের কথায় থামল না বাতাস। ‘বিয়ান বেলা বাইর অই নাই, অহন না বাইর অইলে কাইল খামু কি? চিন্তা কইরো না, রিকশার চাক্কায় পেডল মারলে শইল জুরাইয়া জাইব।’
বাতাস রিকশা নিয়ে সোজা বাশাইর বাজারে চলে গেলো। অনেকক্ষণ যাবত বসে আছে। কোন যাত্রী নেই। কাছেই একটা চায়ের দোকান। বেশ জমজমাট রাজনৈতিক আড্ডা। কেন্দ্রবিন্দুতে শ্রমিক নেতা কাশেম। আড্ডার এক পর্যায়ে কাশেম উঠে এলো। ‘বাতাস, ল যাই’। কাশেমকে নিয়ে ছুটল বাতাসের রিকশা। সেই দুরন্ত গতি। প্রানোচাঞ্চলে ভরা বাতাসের গতি। শীতলক্ষ্যার ধার ঘেঁসে কাঁচা পাকা রাস্তা ধরে। ‘কিরে বাতাস, এতো জোড়ে যে তুই রিকশা চালাছ, তোর ডর লাগে না।’ ‘নেতায় যে কি কন, ডরামু ক্যা, আমি অমনে চালাইয়া আনন্দ পাই।’
হঠাৎ তার রিকশার চাকা থেমে গেলো। মিল থেকে কিছু দূরে। পাশে একটি বাঁশঝাড়। রাস্তা থেকে একটু নেমে। পাঁচ জনের একটি দল রিকশার গতি রোধ করলো। হাতে তাদের ধারালো রামদা, চাপাতি আর ছুরি ছাড়া কিছুই ছিলোনা। যদিও অবৈধ আগ্নেয় অস্ত্রের ঝনঝনি তখনকার দিনেও ছিল। দিনের আলোয় দশ মিনিটের মধ্যেই নিভে গেলো কাশেমের জীবেনর আলো। নির্বাক নিষ্প্রাণ বাতাস শুধু চেয়ে দেখল। মুহূর্তের দমকা হাওয়ার মতো সব কিছু ওলট পালট করে দিয়ে গেলো তার জীবেনর। জুটমিলটির নোংরা রাজনীতির কালো অধ্যায়ে যুক্ত হল আরেকটি নাম।
খুনিরা তখনো ধরা পরে নাই। বাতাস ধরা পরল। বছর খানেক পরের কথা। ধ্বংস স্তূপের মতো একটা দেহ নিয়ে বাতাস ছাড়া পায়। কিন্তু জীবনের গতিটা পুলিশের ইন্টারোগেট সেলে রেখে এলো। সময়ের চাকার মতো টাকার রাজনীতির চাকা এখনও ঘুরছে জুটমিলটিতে। সেই সাথে ঘুরছে মিলের চাকাও। কিন্তু থামিয়ে দিয়ে গেলো বাতাসের রিকশার চাকা। জীবন চলে এখন তার প্রতিনিয়ত মৃত্যুর সাথে লড়াই করে।
==================================================্
ঘাস ফুল

লেখক ঘাস ফুল
- ঘাস ফুল -এর ব্লগ
- ৪০ টি মন্তব্য
- ২৫ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:৩৫
- গল্প
প্রিন্ট করুন
- ৪০ টি মন্তব্য
-
ছাইফুল হুদা ছিদ্দীকি২৫ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:৪৫
অসাধারন সুন্দর লেখনী।
সালাম মানে বাতাসের ঐ দিন বউ বের হতে নিষেধ করেছিলো।
কিন্তু বাতাস বউয়ের কথা শুনেনি।
শুনলে হয়তো এই পরিণতি হতোনা।
অশেষ ধন্যবাদ। -
কামরুন্নাহার ২৫ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:৪৭
আপনার লেখাটি পড়তে ভাল লাগলো। নোংরা রাজনীতি -র অক্টপাস -এ জড়িয়ে হারিয়ে গেল একটি সুন্দর জীবন। এটাই হয়ে আসছে, কবে যে আমরা এ থেকে মুক্তি পাব।
ধন্যবাদ আপনাকে। -
মুক্তমনবাংলা ২৬ জানুয়ারি ২০১৩, ১৫:৪০
আমার মুক্তমন৭১ আইডি হ্যাক হওয়ায় নতুন নামে আইডি খুলেছি । আশা করি সাথে থাকবেন । -
মাঈনউদ্দিন মইনুল২৫ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:১৮
বাতাসের গল্পে মুগ্ধ আমি। বিশেষত লেখার জন্য একটি মহৎ বিষয়কে আপনি বেছে নিয়েছেন। বর্ণনাও বেশ ভালো লেগেছে।
যেহেতু গল্প তাই ভাষার ব্যবহারে আরেকটু সাবধান হলে আরও ভালো করবেন:
>“এ গ্রামের বেশীর ভাগ জমিই চার ফসলী।” এই তথ্যটি মূল গল্পের জন্য কতটুকু দরকার দেখবেন।
> নির্বাক নিষ্প্রাণ বাতাস শুধু চেয়ে দেখল।” আমি ভেবেছিলাম বাতাসও বুঝি মারা গেছে।
ঘাস ফুলকে অনেক শুভেচ্ছা


-
রব্বানী চৌধুরী২৫ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:৪৯
ভালো লাগলো গল্পের কথায়, দেশে শুদ্ধ রাজনীতির বড় প্রয়োজন। উন্নত রাজনৈতিক দর্শন ছাড়া অর্থনৈতিক মুক্তিও সম্ভব না। ভালো থাকবেন প্রিয় ঘাসফুল। -
অরিত্র অন্বয়২৫ জানুয়ারি ২০১৩, ২৩:৫৮
আমি মোটেও বাড়িয়ে বলিনি ভাইজান। বোঝা যায়...আপ্নার ঝুলিতে ম্যাজিক আছে, বুঝতে পারা যায়....
আজকের দিনটা ভাল গেছে বলবনা, কিন্তু কালকে খারাপ থাকবনা থাকবনা....
আপনি আছেন তো ভাল? -
আশরাফুল কবীর২৬ জানুয়ারি ২০১৩, ০০:১৮
সেদিন ছিল গ্রীষ্মের দুপুর। কাঠ ফাটা রোদ। হাটবারও ছিল না। বাতাস একটু দেরি করে রিকশা নিয়ে বের হল। ‘আইচকা রিকশা বাওনের দরকার নাই, যেই গরম পড়ছে।’ বউয়ের কথায় থামল না বাতাস। ‘বিয়ান বেলা বাইর অই নাই, অহন না বাইর অইলে কাইল খামু কি? চিন্তা কইরো না, রিকশার চাক্কায় পেডল মারলে শইল জুরাইয়া জাইব।’

#শুভেচ্ছা আপনাকে ঘাসফুল..অভিনন্দন সুন্দর গল্পের জন্য

#বাতাসের কাহিনী টেনে নিয়ে গেছে অনেকটা দূর পর্যন্ত...চারপাশের বর্ণনা রয়েছে..রয়েছে জুটমিলকে কেন্দ্র করে নোংরা রাজনীতির খেলার সামারি
#এগিয়ে চলুন,ভাল থাকুন সবসময়, এ প্রত্যাশা


-
ফেরদৌসী বেগম (শিল্পী)২৬ জানুয়ারি ২০১৩, ০২:০৬
নিজের কাছেই প্রশ্ন থেকে যায়। দেশ স্বাধীন হয়েছে অথচ আমরা কি স্বাধীন ভাবে বাচতে পারছি?? তখন ভীষণ কষ্ট হয় মনে উত্তর না পেয়ে। অসম্ভব সুন্দর একটি গল্প পড়লাম। ভাল লাগল। -
আমি অনিমেষ মিত্র ২৬ জানুয়ারি ২০১৩, ০২:১৯
সময়ের চাকার মতো টাকার রাজনীতির চাকা এখনও ঘুরছে জুটমিলটিতে। সেই সাথে ঘুরছে মিলের চাকাও। কিন্তু থামিয়ে দিয়ে গেলো বাতাসের রিকশার চাকা। জীবন চলে এখন তার প্রতিনিয়ত মৃত্যুর সাথে লড়াই করে।




-
আশরাফুল ইসলাম ( এক জন মানুষ )২৬ জানুয়ারি ২০১৩, ০২:৪২
প্রথম বার আপনার লেখা পরলাম। খুব ভাল লাগলো। গল্পটি চমৎকার
ধন্যবাদ -
ফেরদৌসা২৬ জানুয়ারি ২০১৩, ০৩:০০
সময়ের চাকার মতো টাকার রাজনীতির চাকা এখনও ঘুরছে জুটমিলটিতে। সেই সাথে ঘুরছে মিলের চাকাও। কিন্তু থামিয়ে দিয়ে গেলো বাতাসের রিকশার চাকা। জীবন চলে এখন তার প্রতিনিয়ত মৃত্যুর সাথে লড়াই করে।
এমন নোংরা রাজনীতির কবলে পড়ে কত বাতাসের জীবন যে প্রতিদিন তছনছ হয়ে যাচ্ছে ।
আপনি তো গল্প লেখায় খুবই পারদর্শী । শুভেচ্ছা আপনার জন্য। -
লুৎফুন নাহার জেসমিন২৬ জানুয়ারি ২০১৩, ০৪:২৯
লেখক কি কবে বলেছিলেন , সে গল্প দাঁড় করাতে পারছেনা । এটা তাহলে কি ?
-
সাম্প্রতিক পোস্ট
-
সাম্প্রতিক মন্তব্য





নীতিমালা
ব্লগ বই
অভিযোগ
সাম্প্রতিক পোস্ট

ফনেটিক
অবাক হচ্ছি, জনাব ঘাসফুলের গল্প পড়িয়া। তিনি এত চমৎকার লেখেন, সেটা জানার সুযোগ করে দেবার জন্য কৃতজ্ঞতা।
আমি মুগ্ধ হয়ে পড়লাম। গল্পটার ছোট্ট অবয়বে অনেক কিছু বলে হয়ে গেছে...
ভালবাসা।