ফাল্গুনী হাওয়ায়-এ মন হারিয়ে যায়
পূর্ববর্তি ঘটনা জানতে এখানে ক্লিক করুন
পরের ঘটনা-
দুদিন পরে রায়হান আমাকে দুবার কল করেছে কিন্তু আমি ধরিনি। আসলে ধরতে ইচ্ছে হয়নি। এই সামান্য ভদ্রতাটুকুও আমার কেন যেন করতে ইচ্ছে হয়নি। কিন্তু যখন দেখলাম আর ফোন আসেনি তখন একটা অপরাধ বোধ আমাকে কষ্ট দিতে লাগলো। ঐদিন রাত দশটার দিকে আবার ফোন এলো এবার আর ইগনোর করতে পারলাম না
-হ্যালো
বহু কষ্টে শব্দটা বের হলেও নিজের কন্ঠকে নিজের কাছেই অচেনা লাগল।
-ইয়ে মানে কেমন আছেন আপনি?
মনে মনে রাগ হলাম এইটা বলতে এতো রাতে ফোন দিয়েছিস বোকা! কিন্তু পারলাম না বলতে ।
- জ্বী আমি ভাল আছি, আপনি?
- ধন্যবাদ আমি ভাল আছি। ইয়ে মানে আপনার সাথে কি একটু দেখা করতে পারি?
ইতঃস্তত করছি। কি বলব বা কি বলা উচিৎ ভেবে পেলাম না। যাকে বিয়েই করতে চাইনা, পছন্দ করিনা তার সাথে দেখা করার কোন কি অর্থ আছে?
-আপনি না চাইলে ঠিক আছে। আসলে আমার মনে হয় বিয়ের আগে আমাদের দুজনের কথা বলে নেয়া ভাল। মানে আমাকে আপনার পছন্দ হয়েছে কিনা? বিয়ে করতে চান কিনা? বা আমাকে আপনার কিছু বলার আছে কিনা?
রায়হান কথা বলে যাচ্ছে আর আমি ঘেমে নেয়ে উঠেছি। যতটা বোকা ভেবেছিলাম এই ছেলে ওতোটা বোকা নয়! আমি কিছু একটা বলতে যাব মাকে এদিকে আসতে দেখে লাইনটা কেটে দিলাম। মনটা খুঁতখুঁত করতে লাগল কি করব তাই ভেবে।
পরেরদিন থেকে যথারীতি বাসায় উৎসব শুরু হয়ে গেছে। কষ্ট লাগছে আমার মতামত জানতে বাবা না হোক মা তো একবার আসতে পারত!
সিমিকে ফোন দিলাম সে যা বলল তাতে আমি আকাশ থেকে পড়লাম। ও নাকি রায়হানের সাথে দেখা করেছে। এবং ও একশত ভাগ সিওর এই বিয়ে হবেনা। তাহলে আমাকে ফোন দিয়ে দেখা করার নামে সে এতো প্রশ্ন কেন করল? তাহলে কি সিমি কিছু বলেছে বলে এতো ভাল সেজেছে? আমি ভেবেছিলাম নাহ ছেলেটা আসলেই ভাল এখন তো দেখছি সিমি নিশ্চয় বলেছে আমি এই বিয়েতে অমত তাই এতো সুন্দরভাবে কথা বলেছে! তাইতো বলি এতোটা বুদ্ধিমত্তার পরিচয় কেন দিচ্ছে? হু...ম তাহলে এই কথা? যে বরফটুকু গলেছিল তা এবার জমে আরো বেশী শক্ত হয়ে গেল। ধরেই নিলাম ছেলে জানিয়ে দেবে যে সে এই বিয়ে করবেনা।
কিন্তু এমন কিছুই হলনা। কাল গায়ে হলুদ। যা করার আমাকে আজই করতে হবে। ভেবে নিলাম রায়হানের সাথে দেখা করব এবং বলব আপনাকে আমার পছন্দ হয়নি। আমি এই বিয়ে করবনা! কিন্তু এটা তো অনেক রুড হয়ে যাবে। তার চেয়ে বরং বলি আমি এখন বিয়ে করবনা আপনি অন্যকোন মেয়ে দেখেন। হ্যাঁ এটাই ভাল। অনেক চেষ্টায়ও আজ বের হতে পারলাম না।
হলুদের দিন সকালেই কাউকে কিছু না বলে বাসা থেকে বের হয়ে গেলাম । ছোট্ট একটা চিরকুট লিখে রেখে গেলাম-
মা আমি এই বিয়ে করবো না তাই বাসা ছেড়ে চলে গেলাম। আমাকে খোঁজার চেষ্টা করোনা পাবেনা-ইতি দোলা।
আমি গিয়ে উঠলাম সিমিদের বাসায়। আমাকে দেখে সিমি রেগে গেল। বলল
-আরে তুই! আজকের দিনে বাসার বাইরে কেন বের হয়েছিস?
- তুই না বলেছিলি ঐ ছেলে নিজেই বিয়ে ভেঙে দেবে? কিন্তু কিছুই তো হয়নি! বরং আজ ওদের বাড়ি থেকে আমাকে গায়ে হলুদ দিতে আসছে বিকাল পাঁচটায়।
-হ্যাঁ জানি তো
-জানিস মানে?
- আরে আন্টি আর আপু কাল এসে কার্ড দিয়ে গেছে তো
-তুই জানিস যে আমি এই বিয়েতে মত নেই তারপরও
সিমি কিছুক্ষণ আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল
-দোলা বিয়েটা ভাঙার আমি অনেক চেষ্টা করেছি এমন কি ঐ ছেলেকে যা যা বললে বিয়েটা ভেঙে যাবে সবকিছু বলেছি কিন্তু তুই কি জানিস ঐ ছেলে কি বলেছে?
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি সিমির দিকে। আমার জন্য আরো কিছু বিস্ময় তখনও লুকিয়ে আছে তা আমার জানা ছিলনা। সিমি বলল
-তুই এককাজ কর ঐ ছেলের সাথে তুই নিজেই কথা বল
-কিন্তু কীভাবে
-শোন আমাদের বাসায় আসতে বল...না না শোন তুই কথা বলবি না। হুম... আমি বরং ফোন করি। আমি কথা বলি তুই শোন কি উত্তর দেয়। আজ তোর বিয়ে ভেঙেই ছাড়বো।
স্পীকার অন করে রায়হানকে ফোন দিতেই বেশ কয়েকটা রিং হওয়ার পরে সে রিসিভ করে। আমি চুপ করে বসে থাকি
বুকটা ধুকপুক ধুকপুক করছে। রায়হানের ভয়েস যেটুকু শুনেছি একদিনই ফোনে। আজ অন্যরকম বেশ গম্ভীর একটা কন্ঠ শুনতে পেলাম
-দেখুন আমি আগেও যা বলেছি আজও তাই বলব। শুধু আপনি দোলার খুব ক্লোজ বন্ধু তাই আজও কথা বলছি।
-আমি আবারও বলছি একটু ভেবে দেখুন
-আমি ভেবেছি আপনি বলেছেন দোলার ফেসবুকে তিন হাজারের মত ফ্রেন্ড আছে। পাঁচশো ছেলেকে প্রেমের কথা বলে ঘুরিয়েছে। আমি তো বলেছি এতে আমার কোন অসুবিধা নেই আমারও অনেক বন্ধু আছে। ফেসবুক না শুধু বাস্তবেই অনেক মেয়ে বন্ধু আছে আর আমি দোলাকে বিয়ে করছি প্রেম প্রেম খেলছি না।
আমার অজ্ঞান হয়ে যাবার জোগাড়। আরে সিমি এগুলো কি বলছে! আমার তো কোন ফেসবুকই নেই! বাসায় তো নেটের কোন ব্যবস্থাই নেই!
-আর আমি বুঝতে পারছিনা আপনি কেন বিয়েটা ভাংতে চায়ছেন?
-আর আমিও বুঝতে পারছিনা আপনার কপালে কি এই মেয়ে ছাড়া আর কোন মেয়ে নেই?
-না নেই! আমি যেদিন প্রথম দেখি সেদিনই ঠিক করেছি বিয়ে করলে দোলাকেই করব। আপনি যত চেষ্টাই করেন এই বিয়ে ভাঙতে পারবেন না।
-এখনো সময় আছে পরে কিন্তু পস্তাতে হবে এই আমি বলে দিলাম
-আমার কথা নাইবা ভাবলেন আপনি দোলার কথা ভাবুন। ও যদি জানতে পারে আজকে ওর গায়ে হলুদের দিনে ওরই ক্লোজ ফ্রেন্ড ওর হবু বরকে ওকে নিয়ে বাজে ভবিষ্যৎ বাণী করছে,বিয়েটা ভেঙ্গে দিতে সর্বাত্মক চেষ্টা করছে তাহলে কি আপনাদের এতো দিনের এই সম্পর্ক থাকবে? আমি এখন ফোনটা রাখব জানেনইতো আজ আমার দোলার গায়ে হলুদ? ফোনটা রাখছি...
বলেই ফোনটা কেটে দিল। আমার চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। এযুগে এমন ভাল মানুষ এখনো আছে! আমি কি করব তা ভাবতে একটুও সময় নিলাম না...কিন্তু কিভাবে বাসায় যাব? এতক্ষণে সবাই জেনে নিয়েছে চিরকুট পড়ে যে আমি বাবার শ্রদ্ধা, সম্মান মায়ের ভালবাসা সব কিছুকেই ধোঁকা দিয়েছি! আমার কাঁধে দেখি সিমির হাত।
ফোন দিলাম, একটা রিং হতেই ফোনটা ধরল সে । মনে হল এই ফোনের অপেক্ষাতেই ছিল। কাঁপা কাঁপা স্বরে বললাম-
-হ্যালো আমাকে একটু হেল্প করবেন প্লীজ
-হ্যাঁ দোলা বলুন
-আমি একটা ঠিকানা দিচ্ছি একটু এসে বাসায় নিয়ে যাবেন আমাকে। যদি আপনার.....
-অবশ্যই আমি দশ মিনিটের মাঝেই আসছি। বাসায় অনেক মেহমান একটা অজুহাত দেখিয়ে আসতে হবে একটু অপেক্ষা করুন।
ঠিকানাটা এসএমএস করে দিয়ে আমি গেইটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকলাম। দশ মিনিটের আগেই দূর থেকে দেখতে পেলাম মটর বাইকে করে সানগ্লাস পরে একটা ছেলে এগিয়ে আসছে। নেভী ব্লু গেঞ্জি আর জিন্স পরা ছেলেটাকে আজ অন্যরকম লাগছে। প্রথম দেখা সেই মানুষটার সাথে আজকের দেখা মানুষটা যেন অনেক পার্থক্য। আমাকে দেখে খুব সুন্দর একটা হাসি দিয়ে নেমে কাছে এলো। এবার আমি লজ্জায় মাটির দিকে তাকালাম। আমাকে বাইকে বসতে বলল। দেখি সে আগেই বসেছে। আমি গিয়ে পিছনে বসলাম। আমাদের দুজনের মাঝে বেশ দূরত্ব।
-দোলা ইজি হয়ে বসুন...সংকোচের কিছু নেই
আমি ধীরে ধীরে ডান হাতটা রায়হানের ডান কাঁধে রাখলাম। একটা মিষ্টি ডিওড্রেনের সুবাস আমাকে নিয়ে যায় অচেনা সুখের আবেশে। কখন যে নির্ভরতায় দূরত্বটা নিজেই কমিয়ে এনেছি একটুও টের পাইনি! ফাগুণের বাতাসে আমার চুলগুলো অবাধ্য হয়ে বারবার আমার মুখে ও রায়হানের গালে লাগছে...। মনে মনে ভাবি এই পিচঢালা পথটা যদি আজ শেষ না হত...এই সময়টা যদি এখানেই থমকে যেত।
লেখক সেলিনা ইসলাম
- সেলিনা ইসলাম -এর ব্লগ
- ১৯ টি মন্তব্য
- ২৪ জানুয়ারি ২০১৩, ০১:৩০
- গল্প
প্রিন্ট করুন
- ১৯ টি মন্তব্য
-
লুৎফুন নাহার জেসমিন২৪ জানুয়ারি ২০১৩, ০১:৪২
অনেক চমৎকার সমাপ্তি । আমার কেন জানি এমন মিষ্টি গল্প পড়তে ভীষণ ভালো লাগে । -
আমি অনিমেষ মিত্র ২৪ জানুয়ারি ২০১৩, ০৪:৩৯
গল্পটা এক কথায় চমৎকার ।
কিন্তু দোলাকে তার বয়সের আবেগে বেঁধে বিয়ের ব্যবস্থা করলেও, তার সপ্ন যে ধূলিসাৎ হয়ে গেলো ।
অবশ্য আমাদের সমাজের এটাই বাস্তবতা । মেয়ে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেছে তো বিয়া দাও । গল্প উপন্যাসেও এই বয়সের চরিত্রটাই বেশি । আমি বলছি না যে গল্পটা খারাব । কিন্তু এখানে প্রতিবাদী দোলার বড় বেশি প্রয়োজন ছিলো । জেগে ঊঠার সময় এসেছে । আর এক্ষেত্রে কলম হলো একটা শক্তিশালি হাতিয়ার । প্রতিবাদী দোলাকে জেনে যদি কেউ প্রতিবাদী হয়ে নিজের সপ্ন বাস্তবায়নে এগিয়ে যায় তবে সেখানে গল্পকারের সার্থকতা । মেয়েদের সংস্কার মেয়েদেরই আগে ভাঙতে হবে ।
আপনার জন্য শুভ কামনা রইলো । -
ভূতের আছড় ২৪ জানুয়ারি ২০১৩, ০৯:০৬
আমি আগেই জানতাম বিয়েটা হবে।
মন বলছিল যে বিয়েটা ভাঙ্গা ঠিক হবেনা ।
কিন্তু এত দ্রুত গল্পটা শেষ হয়ে গেলো ? গল্পের প্রতি আগ্রহ রয়েই গেলো ।
আসলে মজাদার লেখা অল্পতে ফুরিয়ে যায়।
-------------
অনেক ধন্যবাদ সুন্দর গল্পের জন্য -
ছাইফুল হুদা ছিদ্দীকি২৪ জানুয়ারি ২০১৩, ১৬:১২
অসাধারন সমাপ্তি।মিলনেই সমাধান।ভালো লাগল গল্পটি।
অশেষ ধন্যবাদ। -
মাঈনউদ্দিন মইনুল২৪ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:৪২
হুম! এরকমই হতেই পারে। নিজের মতো করে পছন্দ না হওয়া পর্যন্ত সত্যিকার আগ্রহ সৃষ্টি হয় না। মানুষ সবসময়ই নিজের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার ওপর নির্ভর করতে চায়।
তবে কতকাল সিমি একটু সাসপেন্স তৈরি করেছিলো, শেষের দিকে। ভেবেছিলাম বিয়েটা হয়তো সিমির সাথে হতে পারে। এটি আপনার সার্থকতা।
গল্পের শেষ লাইনগুলো চমৎকার হয়েছে।
সেলিনা আপাকে শুভেচ্ছা
-
রব্বানী চৌধুরী২৫ জানুয়ারি ২০১৩, ০০:২৩
চমৎকার গল্প, পড়ে খুব্ ভালো লাগলো। যখন মন্তব্য লিখছি তখন গল্পটি চতুর্থ পৃষ্ঠায় একটা ভালো লেখায় আমাদের মন্তব্য থাকবে এটি আমাদের একটি নীতি।
শুভেচ্ছা জানবেন, ভালো থাকবেন। -
ফেরদৌসী বেগম (শিল্পী)২৬ জানুয়ারি ২০১৩, ০৬:৫৮
সেলিনা আপু কিভাবে এত সুন্দর করে গল্প লিখেন। ভাল লাগল ভীষণ।অসংখ্য ধন্যবাদ আপনার সুন্দর গল্পটির জন্য।
-
সাম্প্রতিক পোস্ট
-
সাম্প্রতিক মন্তব্য





নীতিমালা
ব্লগ বই
অভিযোগ
সাম্প্রতিক পোস্ট

ফনেটিক