বৃহস্পতিবার ১৭ এপ্রিল ২০১৪, ৪ বৈশাখ, ১৪২১ সাইনইন | রেজিস্টার |bangla font problem


হৃদয় গহীনে !


মুক্তিযুদ্ধ যখন শুরু হয় সজলের বয়স তখন দশ কি এগারো বছর । গ্রামের মাষ্টার সাহেবের হাত ধরেই সেও চলে যায় যুদ্ধে । মাষ্টার সাহেব সজলকে কোথায় রেখে যাবে ? এই যুদ্ধ সজলের বাবা , মা , ভাইবোন সবাইকে কেড়ে নিয়েছে । এমন কি ভিটাটুকু থাকলেও বাস যোগ্য ঘর বাড়ি সব জ্বালিয়ে দিয়েছে রাজাকার মুত্তালিব। বাধ্য হয়ে সজল গ্রাম ছেড়ে সামিল হয় মুক্তি সেনাদের তাবুতে। সবার ফাইফরমাশ খাটে আর মাঝে মাঝে বন্দুকের নল পরিস্কার করে । বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজেও সে সাহসিকতার পরিচয় দেয় । আবার কখনো কখনো সে রান্নায় হাত বাটায় কুসুম খালার সাথে। বেশ আনন্দ সহকারে সে সব কাজ করে। যেদিন পাক সেনাদের ক্যাম্প দখল করে মুক্তিসেনার দল,সেদিন যেন ঈদের আনন্দ উৎসব বয়ে যায় তাবুতে । সবাই মিলে নাচ গানে মুখোরিত করে তোলে সেদিনটাকে । আবার নতুন করে শক্তি অর্জিত করে বিজয় ছিনিয়ে আনতে । এই আনন্দও কখনও কখনও হয়ে যায় ফিকে । যখন হায়েনার শিকার প্রিয় শহীদ বন্ধুটিকে সোনার মাটিতে ঢেকে দিতে হয় । যখন খবর আসে ধর্ষিতা হয়েছে কোন মা অথবা বোন। তখন আগুন জ্বলে যায় মুক্তিসেনার রক্ত কণায় কণায়। হাতের বন্দুকটাকে ধরে শক্ত করে - ‘ঐ কাপুরুষের বাচ্চারা সাহস থাকে তো আমাগো সামনে আয়, আয় সামনে তর বুকটারে ঝাঁঝরা কইরা দেই! এমন কইরা কি মায়ের পোলারে দমাইতে পারবি ? আগুন আরো দাউ দাউ কইরা জ্বলে তর রক্তের গন্ধ শুকবার লাইগা !’
কখনো কখনো আবার আগ্নেয়গিরির লাভা পাকস্থলীর অলিগলিতে যন্ত্রণার তাণ্ডবলীলা শুরু করে । দুর্বল করে দিতে চায় শক্তির পাহাড়,ক্লান্তি নেমে আসে দু’চোখের ঢালু বেঁয়ে । যখন দিনের পরে দিন একফোঁটা দানা পড়ে না পেটে । ক্ষুধার যন্ত্রণায় শিথিল হতে চায় বন্দুকের বাটলে রাখা হাত । তবুও একটু আশার আলো মুষ্ঠিবদ্ধ করে হাত,শক্ত করে মুখের চোয়াল। বাতাসে ভাসে পচা লাশের গন্ধ যা ভুলিয়ে দেয় ক্ষুধার জ্বালা । ঢকঢক করে একগ্লাস পানি খেয়ে মায়ের হাসিমাখা মুখখানা মনের পাতায় ভাসিয়ে তুলে অর্জিত করে স্বর্গীয় শক্তি । সবার মাঝে প্রতিদিন নতুন সূর্যের আলো নতুনভাবে উদ্যমতা এনে দেয় । মুক্তিসেনার দল প্রতিটা মুহূর্ত জয়ী হবার বাসনায় চোখের পাতায় প্রিয়জনের উজ্জ্বল হাসিমুখ স্মরণ করেই এক এক করে ছিড়ে ফেলে শত্রু রচিত পৈশাচিক পাণ্ডুলিপির পাতা !আগামীর বিজয় প্রতীক্ষায় কুয়াশা ভেদ করে সবুজ প্রান্তরে অগ্নিতপ্ত সূর্যোদয় একদিন হবেই হবে ।

কনকনে শীতের রাত । না আছে গায়ে শীতের কাপড়, না পারছে আগুন জ্বালিয়ে উত্তাপ নিতে । নিশুতি রাতে জঙ্গলের মাঝে কুসুম খালার সাথে মশার কাপড়ে যন্ত্রণায় কাতর সজল । কুসুম খালা বুকের মাঝে জাপটে ধরেছে তাকে । একটা শব্দও যেন তার কানে না যায় দুহাতে চেপে ধরে কান । গুলি আর বোমার শব্দ সেই সাথে মানুষের চিৎকার ! কুসুম খালা বুকের মাঝে নাকমুখ এত জোরে চেপে ধরেছে যে দম নিতেও কষ্ট হচ্ছে সজলের । খুব জোরে জোরে দোয়া পড়ছে কুসুমখালা । হঠ্যাৎ অনেক আলো জ্বলে উঠে। গরম বাতাস জানান দেয় পাশেই কোথাও ভয়াবহ আগুনের সূত্রপাত ঘটেছে । একসময় থেমে গেল সব কিছু , এমন কি কুসুম খালার দোয়া পড়া কন্ঠও । আশার প্রত্যূষে অন্ধকার ভেদ করে উঠেছে নতুন দিনের সূর্য । সাথে নিয়ে প্রশান্তির জয়গান, কোটি বাঙালীর শিকল ভাঙ্গার স্বপ্ন গড়া প্রাণ । শুধু চিরতরে ঘুমিয়ে গেল কুসুম খালা আর মাষ্টার সাহেব । বিশ্বাস ঘাতকদের কাছ থেকে আসা বুলেটটা কুসুম খালার পিঠে লেগেছে। গুলিটা বের হতে পারেনি বলে আজ এই বিজয় অবাক চোখে দেখে যায় সজল ।
কুসুম খালাকে ভেবেছিল সবাই নিয়ে যাবে তাঁর গ্রামের বাড়ীতে । কিন্তু একদিন কুসুম খালা বলেছিলেন তিনি যদি যুদ্ধে মারা যান তাহলে যেন কোথাও না নেয়া হয় । খালা যুদ্ধে এসেছে বলে তাঁর পরিবারের সবাই তাঁকে পর করে দিয়েছে । একজন ছিল সেও মেয়ের শোকে চলে গেছে নাগালের বাইরে সেই অচীন দেশে । মৃতদেহটা নিয়ে গেলে হয়ত অনেক কথার জন্ম দেবে । লাশকে দাফন করতে দ্বিধান্বিত হবে প্রিয় কিছু মানুষের মন । যা চেয়ে চেয়ে দেখবেন কুসুম খালা বুকে নিয়ে যন্ত্রণার ঢেউ । কি দরকার দেহটাকে কষ্ট দিয়ে? আর মাষ্টার সাহেবের কেউ বেঁচে নেই । মিলিটারিরা তাঁর বাড়ীর সবাইকে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করেছিল । মাষ্টার সাহেব সেদিন পরিবারকে বাঁচাতে পারেননি । যে মানুষটা সারা দেশের মানুষকে শৃংখল মুক্ত করতে বন্ধপরিকর হয়েছে । আর সেই দাঁয়ে সেই মানুষটার পরিবারকে দিতে হয়েছে চরম মুল্য । মাষ্টার সাহেব খবরটা পেয়ে যখন এসেছিলেন তখন তিনি সজলকে পেয়ে বুকে টেনে নিয়েছিলেন । বলেছিলেন এই গ্রামের মাটিতে তিনি সেইদিন ফিরবেন যেইদিন সবকিছুর হোতা রাজাকার মুত্তালিবকে নিজে হাতে শাস্তি দিতে পারবেন । এইসব কথা ভেবে কুসুম খালা ও মাষ্টার সাহেবকে শ্রদ্ধা জানাতে তাঁদের ইচ্ছাকেই প্রাধান্য দেয়া হয়। প্রিয় দুজনকে জঙ্গলের মাটিতে অন্য সেনাদের সাথে থেকে সজল নিজেই চীরনিদ্রায় শুইয়ে দেয় পরম ভালবাসায় ।
এবার ঘরে ফেরার পালা ---
নদী শুকিয়ে গেছে । শীতের এই দিনে ওপারে যেতে এখন আর নৌকা লাগে না । গ্রামের ছোট্ট সুন্দর নদীটায় ভেসে আছে নারী,পুরুষ , পশুপাখি আর জীবজন্তুর লাশ । ক্লান্ত পায়ে সজল হাঁটু পানিতে সাতার কাটে । মাঝামাঝি আসতেই কেউ বুঝি তাকে জড়িয়ে ধরে । আঁতকে উঠে সে -দেখে আট দশ মাসের একটা শিশু মায়ের বুকে জাপটে আছে লাশ হয়ে । সেই মায়েরই চুল বেঁধেছে সজলের পায়ে । খুব কাছ থেকে যুদ্ধ দেখেও সাহসী সে ভয়ে আর আতঙ্কে পচা দুর্গন্ধ পানি ঢকঢক করে গিলে খায় । আকাশের দিকে মাথা উঁচু করে চিৎকার দিয়ে কেঁদে ওঠে । অজান্তেই মুখ থেকে বের হয়ে যায় -
- “ঐ হারামির বাচ্চারা কি করছিলো এই মাসুম বাচ্চা? মায়ের বুকের দুধও খাইতে দিলি না অমানুষের বাচ্চারা!” তার মনে হয় এই অল্প পানিতে এখুনি ডুবে যাবে সে । গায়ের সব শক্তি কে যেন এক নিমেষে নিয়ে গেছে । তারপর বহু কষ্টে ফিরে আসে জন্মতরী ভিটায় । কিন্তু একি ! সেখানে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে সদ্য তোলা টিনের ঘর । এই কালবৈশাখীর দিনেও বদলে গেছে শৈশবের সুখের চর । কিন্তু কিভাবে ? সজলের পরিবারের কেউতো নেই এই ভিটাতে । তাহলে...? নাকে লাগে রান্নার ঘ্রাণ , পেটের মাঝে মোচড় দিয়ে বমি আসে । পায়ে একটুও জোর পায়না সজল । গোয়াল ঘরেই গরুর পায়ের কাছে নেতিয়ে পড়ে সে ।

পরবর্তীতে এই গোয়াল ঘরই হয় সজলের পরম শান্তির জায়গা । রাজাকার মুত্তালিব বুড়ী মায়ের অনুরোধে তাকে বাড়ীর কাজে রেখে দেয় । গোয়াল ঘরের লাল গরুটার সাথেই সজলের যেন নাড়ীর টান । রাতের অন্ধকারে ছেড়া মশারির মাঝে একটা চটের চাদর জড়িয়ে পরম প্রশান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ে সজল । শীতের তিব্রতা ছুতে পারে না সজলের রক্তকণিকা । এভাবেই দিন যায় ,মাস যায়, যায় বছরের পর বছর --- কেমন করে যে কেটে যায় এতোগুলো বসন্ত! সজল এখন বিশ/বাইশ বছরের টগবগে যুবক ।

সারা বছর যত না আনন্দিত হয় গ্রামের মানুষ , তার চেয়ে শীত মৌসুমের এই লগ্ন বেলায় আনন্দের বন্যা বয়ে যায় শতগুন । নাড়া , শন দিয়ে ঘর ছাউনি , নতুন ধানের পিঠা , খেজুরের রস, বরই , আর নতুন নতুন টাটকা সব শাকসবজি । সাথে থাকে বাড়তি পৌষমেলায় নাগর দোলা চড়া আর বাইস্কোপে সাহেব বিবির কিসসা দেখার মজা । গ্রামের মানুষের গায়ে তেমন কোন শীতের কাপড় নেই । নেই বাড়তি বিলাসিতা । তবুও কিছু ধান বিক্রি করে বা ধানের বিনিময়ে বউ ঝিয়েরা কেনে কাচের চুড়ী ফিতা , দেখে যাত্রাপালা ।
প্রকৃতির সাথে পাল্লা দিয়ে খুশি আর আনন্দের উচ্ছলতায় ভাসে সারা গ্রাম । এমনই একদিনে সজল খালে নেমে গোসল দেয় গরুকে । রাস্তা দিয়ে হেটে যায় এক পথিক । সজল জানে না কেন এই পথিককে তার অনেক চেনা মনে হয় ।গরুর শরীর মাজন দিতে দিতে হাঁক দেয় -
-" ও---কাকা কেমন আছেন ?" ঘুরে দাঁড়ায় আগন্তক । এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সজলের দিকে । তারপর বলে -
-"মারা যাবে , সব মারা যাবে ! শেষ হয়ে যাবে সব ! তুই পালা , তুই পা---লা ! বুম বুম "
সজল এবার উঠে আসে উপরে । সে যা ভেবেছিল তাই , রফিজ কাকা । তাহলে কাকা বেঁচে আছে ! একটা অপারেশনে বোমা নিক্ষেপ করেছিল এই রফিজ কাকা । সজলের মনে আছে ব্রিজের নিচে রফিজ কাকা ঠান্ডা পানির মধ্যে কচুরিপানার আড়ালে সজলের জন্য অপেক্ষা করেছিল দশটা ঘন্টা ধরে। সজল টিফিন কেরিয়ারে করে বোমা নিয়ে ব্রিজ পার হয়েছিল । বাচ্চা ছেলে দেখে মিলিটারিরা তাকে কিছুই বলেনি এমন কি কোন কিছু চেকও করেনি । রফিজ কাকা আর ফেরেনি তবে ব্রিজটি উড়িয়ে দিয়ে গ্রামের সাথে শহরের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল এবং বেশকিছু টহলরত মিলিটারি সেদিন মারা গিয়েছিল ।
-"রফিজ কাকা তুমি বাইচা আছো !" জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে সজল । তা দেখে রফিজ বিরক্ত হয় । ছাড়িয়ে নেয় নিজেকে সজলের আলিঙ্গন থেকে । বিরক্ত ভরা কন্ঠে বলে -
-"দূর দূর হ ! ছিঃ ছিঃ গায়ে হাত দিস কেন ! সব রাজাকার সব ! তুই রাজাকার , তুই রাজাকার ! "
হনহন করে হেটে যায় সে সামনের দিকে । সজলের মন খারাপ হয়ে যায় । চারিদিকে যুদ্ধের দামামা বাজে । কোলের শিশু অজানা ভয়ে মায়ের বুকে কুঁকড়ে কাঁদে । আর সেই সময়ে এই রফিজ কাকা সারাটা দিন দেশের গান গাইতো । সজলকে বলত -
-"শুনো কাকা , দেশের গান গাইলে অন্য রহম একটা শক্তি আহে গাঁয়ে ।তহন মনে লয় যা মনে চাইব তাই করতে পারুম ! ধর আমার লগে গান ধর -কারার ঐ লৌহ কপাট..ভেঙ্গে ফেল, কররে লোপাট ...রক্ত জমাট শিকল পূঁজোর পাষান বেদী...!" সেই বলিষ্ঠ, উদীপ্ত রফিজ কাকার এমন অবস্থা দেখে সেই দিনের কথাগুলো মনে করে আজ এতোটা বছর পরেও ঝরঝর করে ঝরে পড়ে অশ্রু প্লাবন । সজলের চোখে নামে বর্ষার ঢল !
রাতে জোসনার আলোয় বাঁশের খুঁটিতে হেলান দিয়ে চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকে সে । বহুদিন ধরেই এই জীবন তার আর ভাল লাগে না । আজ রফিজ কাকা যখন তাকে বলল ‘ তুই রাজাকার’ তখন সে ক্ষনিকের জন্য হলেও স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল । ভাবনাটা তাকে যে একেবারেই কখনো ভাবায়নি তা কিন্তু না । সে একজন রাজাকারের বাড়ীতে থাকে ! তারই ফায়ফরমায়েশ খেঁটে তারই হারামের নুন খায় । যদিও সজল গায়ে গতরে একশতভাগ খেঁটেই খায় । কিন্তু...? কিন্তু সেতো যার রোজগারের টাকা খায় সেই মানুষটার রোজগারের উৎস সৎ না ! সেই মানুষটাকে সে সাহায্য করছে যে কিনা দেশের শত্রু ! ভাল লাগেনা এই জীবন...এই জীবন থেকে সে মুক্তি চায় ।

রাজাকার মুত্তালিব এখন এই গ্রামের মাতবর । সজলের সামনেই, এমনকি কখনও কখনও ওকে দিয়েও কিছু অসৎ কাজ করিয়ে নেয় । কিছুদিন আগে রিলিফের টিন এসেছিল । যা মাতবর নিজের ঘরে লাগিয়েছে । কিছু দিয়েছে নিকট আত্মীয়স্বজনকে আর বন্ধুদেরকে । বাকী টিন পুকুরের পানিতে লুকায়ে রেখেছে । এসব কিছুই সজলের মনের বিরুদ্ধে করতে হয় । মাঝে মাঝে ভাবে- যে রাজাকার তার জীবনটাকে তছনছ করে দিয়েছে । জীবনের সব সুখ আর আনন্দ কেঁড়ে নিয়েছে সেই রাজাকারেরই কাজের ছেলে হয়ে সে জীবিত ,আশ্রিত হয়ে থাকবে ? না এ হতে পারে না । যেভাবেই হোক তাকে তার পরিবারের করুণ পরিণতির প্রতিশোধ নিতেই হবে ।
কিন্তু কিভাবে সে প্রতিশোধ নেবে? রাতদিন অনেক চিন্তা করে সে সিদ্ধান্তে পৌছে । কড়া একশিশি বিষ সে সংগ্রহ করে রাখে কিন্তু বুড়ী দাদীর কথা মনে করে সুযোগ পেয়েও মুত্তালিবকে খাওয়াতে পারে না ।ভাবে বুড়ীর একমাত্র সন্তান মুত্তালিব । সে মরে গেলে বুড়ী যে অনেক কষ্ট পাবে । ঈশ্বর মুত্তালিবের বিচার করবেন ,শাস্তি দিবেন । কিন্তু সজল মুক্তি চায় এই জীবন থেকে । একদিন সে হারিয়ে যাবে অনেক দূরে তা যেভাবেই হোক ।
-"কিরে মুখপুড়া কারে নিয়া স্বপন দেখোস ! "
-"দাদী তুমি এই রাইতের বেলা ! ঠান্ডা লাগব তো "
-"হ বুড়ী হইয়া গেছিতো তাই না !" মিটমিট করে হাসে বুড়ী । "এই নে তর মশারিতে পট্টি লাগাই দিসি । এহন আর মশাই তরে আদর করতে পারব না ।" সজল লজ্জা পায় । এই বুড়ী সজলকে অনেক বেশি ভালবাসে ।
- "আইজগো ঠান্ডা মনে লয় একটু কম কি কস মুখপুডা?"
-"হ দাদী ।"
এবার আনমনা হয়ে জিজ্ঞাসা করে সজল "আচ্ছা দাদী তুমি আমার মায়ের গপ্প কউনা ,আইজগো মাইরে খুব মনে পরতাছে ।"
হুস করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে বুড়ী ।
-"তর মা দেখতে ছিল পরির নাহান । মনডা ছিল আকাশের নাহান বড়। গড়ীব দুঃখী মানুষরে সে খুব ভালা পাইত । মনের মধ্যে একটুও গরিমা ছিল না । ছিলোনা ধর্ম- অধর্মের ভেদাদেভ ।”তারপর একটু সময় নিয়ে আবার বলে-
“কি শীত কি ঝড় তর মায়ে আমারে না দেখলে যেন্ তার ঘুম আইত না । ঘরে যাই রান্না হইতো আমারে আর আমার মুত্তালিবরে না দিয়া খাইত না ।তর মা'য়ে আমার মুত্তালিবরে ছোড ভাইয়ের নাহান খুব আ-------- ।" বুড়ী চুপ হয়ে যায় । তার মুখে আর কোন কথা আসে না । ধরিত্রীর সব কথা যেন হঠ্যাৎ দূর আকাশের তাঁরা হয়ে গেছে । আনমনে সেই তাঁরার দিকে তাকিয়ে থাকে । ঝড়বেগে হৃদয় গহীন থেকে আবারো দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে । অন্য খেয়ালে নিজের পেটে কয়েকটা চড় , ঘুষি মারে । সজল চাঁদের আলোতে দেখতে পায় দাদীর চোখে মুক্ত চিকচিক করছে । বুড়ীকে এমন করে পেটে মারতে অনেকবার দেখেছে সে ! কেন এমন করে ? জানে না সজল । বুড়ীর হাত ধরে এগিয়ে দিতে যায় ঘরের দাওয়া পর্যন্ত ।বুড়ী হোঁচট খেয়ে পড়তে যায় ধরে ফেলে সজল । পিছন থেকে গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠে-
- “বুরী তর চক্ষে নাই জ্যোতি, পায়ে নাই তি,...তর কি রাইতে আন্ধারে ঘর থাইকা না বাইর হইলে হয় না, না ?”
- “হ রে হারামখোর। মরন দেখবার লাইগা আন্ধারে যাই ।” কটাক্ষ ঝরে পড়ে দাদীর কথায় । দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দাওয়ায় রাখা খেজুরের পাটিতে কাত হয়ে শুয়ে পড়ে সে । সজল ঘুরে দাঁড়ায় নিজের জায়গায় আসার জন্য । পিছন থেকে শুনতে পায় দাঁতে দাঁত চেপে খুব নীচু স্বরে বলে ।
- “ মরতে মরতেও আবার বাইচা উডে বুড়ী, মরেও না”
সজলের হাত মুষ্ঠিবদ্ধ হয়ে যায় । পরক্ষনে মনে মনে ভাবে যে মানুষ তার জন্মভুমির সাথে বেঈমানী করতে পারে । নিজের দেশের মেয়েদের ইজ্জত নিয়ে খেলতে পারে সেই মানুষের কাছে জন্মদাত্রী মায়ের মর্যাদা আশা করাটা বোকামী,একেবারেই ভুল। নাহ এই ভুল আর সে করবে না, কোনভাবেই না ! বুড়ীর দোয়া দরূদ শুনতে শুনতে রাত কাটে অনেক ধীর গতিতে ...।

পরের দিন সজল দেখে বেশ খুশীর জোয়ার সবার মনেই। কারন জানতে যায় মাতবরের খাস বন্ধু জমিলের কাছে । সেখানে সে হয় ব্যর্থ । কিন্তু তাকে যে জানতেই হবে কি এমন কথা ? যার জন্য চামচাদের নিয়ে মাতবর বৈঠক খানায় হাসাহাসি , গলাগলি করছে ? কিছুক্ষন পরিশ্রম করতেই রহস্য উদ্ঘাটনে সক্ষম হল সজল । এই গ্রামেরই মেয়ে শিউলি । সে এখন সিনেমার নায়িকা । বেশ টাকার মালিক সে । শিউলি দুইমাস আগে এসেছিল গ্রামে বাবা মায়ের কবর দেখতে আর গরীবদের খিচুড়ি খাওয়াতে । অবশ্য সজলের ছোটবেলার খেলার সাথিও ছিল এই শিউলি । কিন্তু তাতে কি ? এখন সে সজলকে চিনেনা । শিউলি গ্রামের গরীব নারী ও শিশুদের জন্য কিছু কাপড় পাঠিয়েছে মাতব্বরের কাছে । যা শুধুমাত্র গরীব নারী ও শিশুদেরই প্রাপ্য । এই নিয়েই সবার আনন্দ । সজলও অনেক খুশি হয় । এটাতো সত্যিই অনেক আনন্দের । এই ঠান্ডায় মানুষগুলোর গায়ে গরম কোন কাপড় নেই ।গ্রামের শিশু ও বৃদ্ধ মানুষের ঠাণ্ডায় সর্দি-কাশী , শ্বাসকষ্ট , লেগেই আছে । যাক ঈশ্বর মুখ তুলে তাকিয়েছে ! সজল শিউলিকে অনেক দোয়া দেয় ।
ঐদিন রাতের বেলা মাতবর সজলকে ডাকলেন । আস্তে আস্তে বললেন-
-"শুন , কাল ভোরে গ্রাম জাগনের আগেই ভ্যানে কইরা কাপর গুলা গঞ্জে আমার যে দোকান আছে, ঐখানে পৌচাইয়া দিবি । ঠিক আছে ?"
-"কিন্তু কাকা এই কাপুরতো------------!" বেশ ভয়ে ভয়ে কথাটা বললেও শেষ করতে পারেনা সজল । মাতবরের হাতের লাঠি এসে পড়ে পিছনে । মাতবর অগ্নিমূর্তি ধারন করেন।
-"চুপ থাক হারামি! আমার নুন খাস আর আমার মুখের উপ্রে কথা কস! যা কইছি তাই হরবি ! যা কাপর গুলান ভ্যানে উডা।"গজগজ করতে করতে অন্ধকারে মিলায় মাতবর মুত্তালিব ।
সজল বিড়বিড় করতেই থাকে। নিজেই নিজেকে গালি দিতে থাকে, ধিক্কার দিতে থাকে । সে এখন বুঝতে পারছে কেন রফিজ কাকা তাকে রাজাকার বলেছে । ভ্যানে সব কাপড় তুলে , সারা রাত লাল গরুটার মাথায় আদর করে আর কথা বলে । ছোট্র বেলার লাল গরুটা মারা গেলেও সজলকে নিঃসঙ্গ করে যায়নি । রেখে গেছে ছোট্ট বাছুরটিকে । সেই এখন ঠিক মায়ের মত হয়েছে । কিন্তু একি ? সজল নিজেও জানে না কেন তার অনেক কান্না পাচ্ছে ? সেতো সহজে ভেঙ্গে পড়ার মত ছেলে না । গরুটা জিভ দিয়ে আদর করে দেয় সজলের কপোলে । তাকে কিছু বলল সান্ত্বনার সুরে । সজলের মনে হল তার হৃদয়ের কোণে কিছুটা আলোর ঝিলিক ধীরে ধীরে অমানিশার অন্ধকার সরিয়ে দিচ্ছে । মাতবরের লাঠির বাড়ীগুলো বেশ জোরে ছিল তাই শুতে তার অনেক কষ্ট হচ্ছে ।সজল একটু কাঁত হয়ে শোয় - দেখে মা তুলসী পুজা দিচ্ছে । দাওয়ায় বসে বাবা হুক্কাতে গড়গড় আওয়াজ তুলে বেশ আয়েস করে টান দেয় । সজল লাল নীল কাগজে ঘুড়ি বানায় উঠানে বসে । প্রজাপতির মত ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে চার বছরের ছোট্ট শিখারানি । আধো আধো সুরে বলে "দাদ্দা , শীত লাগে কোলে নেউ । চল রোদ পোহাই , পাটকাঠি দিয়ে কাঁচা রস খাই !" নাটাই ঘুড়ি রেখে পরম স্নেহভরে শিখারানিকে কোলে তুলে নেয় সজল । রোদ পোহাতে থাকে সে স্বর্গীয় আনন্দে । কিন্তু আজকে রোদটা এত কড়া কেন ? চোখে লাগে , ভীষণ চোখে লাগে । চোখের উপরে হাত দেয় সজল । পিছনে বেশ জোরে কেউ লাথি মারে ।
-"ঐ হারামি এহনো ঘুমাইতেছোস নাক ডাইকা ! উঠ হালার পুত !" খুব কষ্টে চোখ মেলে তাকায় সজল । দেখে মাতবর টর্চের আলো ফেলেছে চোখে ।
- "কাকা অহন তরিতো সকাল হয় নাই ..." ঘুম জড়ানো কন্ঠে বলে সে । রেগে যায় মাতবর -
-"উঠ পান্তা খাইয়া বাইর হ । হালার পুত একটা কাম যদি ঠিকমত করে । খালি খাওন আর ঘুম" গজগজ করতে করতে চেয়ার নিয়ে বসে উঠানে ।
-"হ সব কাজ আপনে করেন ! আপনের ঘুমও নাই খাওনও নাই । খালি আছে পেডের বিতরে শয়তানি বুদ্ধি !" সজল আপন মনে কথাগুলো বলে আর হাতমুখ ধোয় চাপকলের ধারে । তারপর চটের চাদরটা জড়িয়ে নেয় গায়ে ।
মুত্তালিবের প্রতিদিন সকালে একগ্লাস ইসুবগুলের সরবত খাবার অভ্যাস । আজ সরবতের স্বাদ হয় অন্যরকম যা খেতে খারাপ লাগেনা রাজাকার মাতবর মুত্তালিবের । সজল তার নির্ধারিত এক সানকী পান্তা , দুইটা কাঁচা মরিচ আর লবন প্রতিদিনের মত খেতে শুরু করে । পান্তায় হাত দিতেই মনে হল আঙ্গুল গুলি অবশ হয়ে গেছে। কোন দিকে না তাকিয়ে অন্যরকম এক তৃপ্তিতে গপগপ করে খাওয়া শেষ করে । তারপর দাদীকে সালাম করে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে ।
-"দাদী আমারে মাফ কইরা দিও " বুড়ী হাসে । বলে-
-" ক্যা রে মুখপুরা ? শশুর বারি যাইতে আসোস আর আইবি না ? " কিছুই বলে না সজল ।
সজল বহুদিন পর মায়ের গায়ের গন্ধটা পায় দাদীর গা থেকেই । চোখ মুছে নেয় বাম হাতের চেটো দিয়ে তারপর রওনা দেয় গঞ্জের দিকে । তাল গাছের পাতার ফাঁকে কুয়াশা ভেদ করে উকি দেয় সূর্য । টপটপ করে ঝরে পড়ে গাছের পাতায় পাতায় জমে থাকা শিশির । সজল কিছু শিশির হাতে নিয়ে মেখে নেয় ফাঁটা ঠোঁটে-মুখে । তারপর তাকায় আকাশের দিকে । খুব বড় করে একটা নিশ্বাস নেয় । গায়ের জোর দিয়ে ভ্যান চালায় । রাস্তার মাঝখানে কিছু শিশু শুঁকনো পাতা জ্বেলে আগুন পোহায় । সজল বেশ ধীরে ধীরে ভ্যান থামায় । প্রতিটা শিশুর হাতে তুলে দেয় কিছু কাপড় । আবার সামনে এগিয়ে যায় গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে -"মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি ........." নিজেকে অনেক হাল্কা মনে হচ্ছে তার । আনন্দ সুখানুভূতিতে এভাবেই সব কাপড় যেতে যেতে বিলায় গ্রামের মানুষের মাঝে । তারপর উঠে পড়ে চলন্ত মালবাহী ট্রেনে । মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ একযুগ পরে কিছুটা মুক্তির স্বাদ নিয়ে অন্যকোন মুত্তালিবের সন্ধানে...... এক অজানার পথে --এবার আর গুন গুন করে নয় । রুদ্ধশ্বাস ছেড়ে কন্ঠটাকে আকাশের বুকে ভাসিয়ে দিয়ে গলা ছেড়ে গায়- "পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে রক্ত লাল , রক্ত লাল , রক্ত লাল........." ট্রেন ছুটে চলে দুর্বার গতিতে , গানেরই ছন্দে------------------------ ঝিকঝিক---ঝিকঝিক---ঝিকঝিক------------------------------
১৩ টি মন্তব্য
Rabbani রব্বানী চৌধুরী১৫ ডিসেম্বর ২০১২, ০৯:৪৮
" সজল কিছু শিশির হাতে নিয়ে মেখে নেয় ফাঁটা ঠোঁটে-মুখে । তারপর তাকায় আকাশের দিকে । খুব বড় করে একটা নিশ্বাস নেয় । গায়ের জোর দিয়ে ভ্যান চালায় । রাস্তার মাঝখানে কিছু শিশু শুঁকনো পাতা জ্বেলে আগুন পোহায় । সজল বেশ ধীরে ধীরে ভ্যান থামায় । প্রতিটা শিশুর হাতে তুলে দেয় কিছু কাপড় । আবার সামনে এগিয়ে যায় গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে -"মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি ........." নিজেকে অনেক হাল্কা মনে হচ্ছে তার ।"

আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের উপর একটি চমৎকার গল্প। শুভেচ্ছা জানবেন।
Shongkhobas সেলিনা ইসলাম১৬ ডিসেম্বর ২০১২, ০৩:৪৪
অনেক অনেক ধন্যবাদ শুভকামনা রইল
aSaber আহমেদ সাবের১৫ ডিসেম্বর ২০১২, ১০:৪৯
দারুণ একটা গল্প পড়লাম। হৃদয়ের গহীনে একটা মোচড় দিয়ে উঠলো। বিজয় দিবসের অগ্রিম শুভেচ্ছা।
Shongkhobas সেলিনা ইসলাম১৬ ডিসেম্বর ২০১২, ০৩:৫০
পড়ার জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ শুভেচ্ছা রইল
KohiNoor মেজদা১৫ ডিসেম্বর ২০১২, ১২:২১
বিজয়ের অগ্রিম শুভেচ্ছা। ভাল লাগলো। ধন্যবাদ।
Shongkhobas সেলিনা ইসলাম১৬ ডিসেম্বর ২০১২, ০৪:৫৪
আপনাকেও বিজয়ের শুভেচ্ছা । ধন্যবাদ
tmboss172 তৌফিক মাসুদ১৫ ডিসেম্বর ২০১২, ১২:৪৭
শুরুটা পড়লাম। প্রিয়তে রেখে দিলাম। সময় করে পড়ে নেব।
*************
মেজদার মত আপনাকে আমিও বিজয় দিবসের অগ্রিম শুভেচ্ছা দিয়ে গেলাম।
Shongkhobas সেলিনা ইসলাম১৬ ডিসেম্বর ২০১২, ০৪:৫৪
ধন্যবাদ বিজয়ের শুভেচ্ছা রইল
Niloy1073 নির্ঝর নাসির১৫ ডিসেম্বর ২০১২, ১৭:০৮
সময় করে পড়ে নেব
Shongkhobas সেলিনা ইসলাম১৬ ডিসেম্বর ২০১২, ০৪:৫৬
বিজয়ের শুভেচ্ছাসহ ধন্যবাদ
chomok001 মোঃ হাসান জাহিদ১৫ ডিসেম্বর ২০১২, ২৩:২০
অসাধারণ লেখনি । মুগ্ধ হয়ে পড়লাম ।
Shongkhobas সেলিনা ইসলাম১৬ ডিসেম্বর ২০১২, ০৪:৫৫
অনেক অনেক ধন্যবাদ বিজয়ের শুভেচ্ছা রইল
razazogi আবদুর রাজ্জাক২০ ডিসেম্বর ২০১২, ০১:৪০
ভাল লাগল...