শনিবার ১৯ এপ্রিল ২০১৪, ৬ বৈশাখ, ১৪২১ সাইনইন | রেজিস্টার |bangla font problem


শেষ চিঠি

প্রিয় জয়িতা,
কেমন আছ তুমি? খুব বেশি জানতে ইচ্ছে করে। ৭২ দিন ধরে আমি হাসপাতালের বিছানায়। এরমাঝে শুধু একটিবার তোমার মুখায়ব আমার কছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। তুমি আমার পাশে বসে আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলে, নিজের অবিরত কান্নাকেও সংবরণ করতে পারনি তখন। তারপর আর কখনো আমার মাথায় তোমার হাতের আলতো স্পর্শ অনুভব করিনি। জয়িতা, এখনশরৎ কাল। বাহিরের আকাশটা হয়তো চাকচিক্যময় নীলে ভরা। আমার মন বলে; বিকালগুলোও ঠিক আগের মাতো স্নিগ্ধ থাকে। অথচ,আমি চার দেয়ালের মাঝে একটি মাত্র বিছানায় পড়ে আছি ৭২ দিন! জানালার পাশে গিয়ে পর্দাটাকে সরিয়ে দেয়ার সামর্থ্যটাও আমার নেই! তাই প্রকৃতির উজ্জ্বল আলোটুকুও আমার চোখ এড়িয়ে যায়। চাইলেই হয়তো কাউকে বলে পর্দাটা সরিয়ে নিতে পারি কিন্তু প্রকৃতিকেও এখন আমার বড় ভয় হয়! তাই কৃত্রিম আলো দিয়েই নিজেকে আলো দেখার সান্ত্বনা দেই!বিদ্যু্ত বিভ্রাট হলে বিকল্প আলো আসতে যতটুকু সময় লাগে ততক্ষণ আমার ভয়ার্ত মন বলতে থাকে; “এই বুঝি গেলাম আরো বেশি আঁধারে হারায়ে”। আমিতো আজ আঁধারেই হারানো! জীবনের চারদিকে ঘোর অমানিশা আমাকে ঘিরে নিয়েছে তার নিকটতম বন্ধু হিসেবে। জানি, এই আঁধার ফুরিয়ে কোনদিনই হয়তো আর আলো আসবে না। জয়িতা, হাতটা আমার শীতল হয়ে আসছে, কাগজের উপর কলমের আচড়টা দিতেও কষ্ট হচ্ছে। এই শীতলতা ও কষ্টের জন্য হয়তো আমার বিপর্যস্ত মানসিকতাই অনেকাংশে দায়ী অথবা হতে পারে লিখতে পারার মাতো শারীরিক শক্তিটুকুও আমি এখনো অর্জন করতে পারি নি। যত কষ্টই হোক, যত শীতলতাই আমকে গ্রাস করুক না কেন; আমি আজ তোমাকে লিখবই। জয়িতা, আমার এখনকার দিনগুলো ঠিক ৭২ দিন আগের দিনগুলার মতো মধুর নয়! ব্যথা মুক্তির ইনজেকশন দিতে দিতে আমার দুই হাতের পেশিই এখন বিষাক্ত। শরীরকে না -হয় কিছুটা কষ্ট দিয়ে মানিয়ে নিলাম। কিন্তু আমার এই মনকে যে, কোন সান্ত্বনার কথা দিয়েই বোঝাতে পারি না। বাবার মাথার উসকো-খুশকো চুল আর চিন্তাযুক্ত বদন আমাকে ভিতরে ভিতরে আতঙ্কিত করে। আড়ালে গিয়ে মায়ের কান্না এবং আমার সামনে মানসিকভাবে শক্ত হয়ে বসে থাকার অভিনয়টাও আমাকে আরও বেশি আবেগি করে তোলে। আমিও সুযোগ পেলে শব্দহীন গোপন কান্না করে নিজেকে একটু হালকা করার চেষ্টা করি। চাইলেই কি আর এত সহজে হালকা হওয়া যায়! ভবিষ্যতের অনিশ্চিত দিনগুলোর ভাবনা আমার মনকে যন্ত্রণায় ভরিয়ে দেয়। জয়িতা, এমন দিনে তুমিও আমার পাশে নেই! ৭২ দিনের মাঝে শুধু একদিন! তুমি কি নিজেই নিজেকে আড়াল করেছো! জানি, আর কোনদিন তোমাকে পাওয়ার বাসনা মুখ ফুটে বলতে পারবো না কিন্তু এতোদিনের অন্তরঙ্গ সম্পর্কটা কি একেবারেই ঠুন্কো! আমার এই বিপদের দিনে! জয়িতা, আমার দুপায়ের কাটা জায়গায় পচন ধরেছে, ডাক্তাররাও চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়েছেন। দুটো পা হারিয়েও আমার কষ্টের নিস্তার হবে না! বাসের দুটো চাকা একটা মানুষের জীবনকে কতোটা বদলে দেয়! জয়িতা, প্রচন্ড ব্যথায় যখন আমি কুঁকড়ে যাই তখন চেষ্টা করি তোমার সাথের সুখের মূহুর্তগুলোর কথা ভেবে মানসিক কষ্টটা একটু কমিয়ে নিতে। সেই যে; পলকহীনভাবে চোখে চোখ রেখে নীরবে সময় কাটানো, বিকেলের নদীতে ওঠা ঢেউগুলো হিসাব করতে যাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করা, একসাথে তোমার ফুলের বাগানের যত্ন নেয়া, কথার মাঝে হাসতে হাসতে তোমার লুটিয়ে পড়া, আরো কতো কি!! অথচ এখন তোমার সাথে দেখা হয় না, কথা হয় না; তা ভাবতেই আবার আমার কষ্ট কমানোর পন্থাটা ভীষণ কষ্টময় হয়ে দাঁড়ায়। নিজের মনকে বোঝাতে চাই কিন্তুকোন যুক্তি দিয়েই আমি আমার শূন্যতাকে পরিহার করতে পারি না। জানি, আমার জীবনে আর সেই পরম সুখের দিনগুলো না-ও আসতে পারে, তোমাকেও বাস্তবতার পথে হেঁটে অন্যের সাথে চলতে হবে হয়তো! কিন্তু আমি! শুধু দুটো পা হারাই নি! এর সাথে হারিয়েছি আমার জীবনের সমস্ত সুখ, স্বপ্ন, বেঁচে থাকার রসদ। মানুষের করুণাই এখন আমার জীবনের পাথেয়! জয়িতা, হাতটা আরো বেশি শীতল হয়ে যাচ্ছে তাই লেখা শেষ করতে হবে। শুধু কয়েকটি কথা; তোমাকে অনেক মনে পড়ছে, সাথে ভাবনাতে অসছে ”৭২ দিনে মাত্র একদিন তোমাকে দেখেছি!”

অনন্ত

পুনশ্চঃ এই চিঠি জয়িতার কাছে পৌঁছে গিয়েছিল কিন্তু অনন্ত কোন প্রত্যুত্তর পেয়েছে কি-না বা তাদের সাক্ষাত হয়েছে কি-না তা জানা যায় নি। তবে এই চিঠি লেখার কয়েকদিনের মধ্যে অনন্ত তার পায়ের ক্ষতস্থান থেকে ছড়িয়ে পড়া ক্যান্সারে
মৃত্যুবরণ করে।
৮ টি মন্তব্য
Rabbani রব্বানী চৌধুরী২৪ নভেম্বর ২০১২, ১৩:৫৫
আপনার প্রথম পোষ্টটির জন্য আপনাকে অভিনন্দন। নিয়মিত লিখবেন। শুভেচ্ছা জানবেন। ভালো থাকবেন।
Numan75 নুমান২৪ নভেম্বর ২০১২, ১৩:৫৭
sopnerdin45 এনামুল রেজা২৪ নভেম্বর ২০১২, ১৩:৫৭
স্বাগত আপনাকে।
লেখাটি সুন্দর হয়েছে। তবে স্পেস রেখে প্যারা করে দিলে পড়তে সুবিধা হত।

শুভেচ্ছা আর শুভকামনা জানবেন।
kalpuruss আমি কালপুরুষ২৪ নভেম্বর ২০১২, ১৪:৩১
এম মাহমুদ ব্লগে আপনাকে স্বাগতম।

আশা করি নিয়মিত লিখবেন
ভালো লাগলো।

প্রথম লেখা নিয়ে সমালোচনা করতে ইচ্ছে করছেনা।

শুভেচ্ছা রইলো।
gunatia মোহাম্মদ রোমান হোসেন২৪ নভেম্বর ২০১২, ১৭:০১
অনেক সুন্দর লেখা।আপনাকে ধন্যবাদ।
mahamudjnu এম মাহমুদ২৪ নভেম্বর ২০১২, ১৭:৪৪
সবাইকে ধন্যবাদ ।
MainulAmin মাইনুল আমিন২৪ নভেম্বর ২০১২, ১৮:১৫
বেশ ভালো লাগলো গল্পটি। চমত্কার লিখেছেন । চালিয়ে যান অবিরাম । আপনাকে শুভেচ্ছা ----------------------
lnjesmin লুৎফুন নাহার জেসমিন২৫ নভেম্বর ২০১২, ০৩:১৭
একটি করুন কাহিনীর সফল বর্ণনা ।