দুচোখে আঁধার ছিল-২

দুচোখে আঁধার ছিল-১
সময় উড়বেই। তা প্রজাপতির ডানায় আঁকা থাকুক, আর শকুনের পালকের ভাজে লুকানো থাকুক। একদিন আমাকেও নিয়ে যাবে সে। যেমন বাকি সব কিছু অন্ধকারে ডুবিয়ে সাদা রঙটুকু চুলে ঢেলে দিয়েছে। কিন্তু কোথায় নিয়ে যাবে সে আমায়? ভালো, মন্দ কাজের জন্য বিধাতা স্বর্গ, নরক রেখেছেন। আর পৃথিবীর কোন কাজেই যে লাগেনি, তার স্থান কোথায়? হয়তো কোন অস্তিত্বই থাকবেনা আমার স্বর্গ, নরক অথবা মর্ত্যে। সেই ভালো। এই যন্ত্রণাময় অকেজো অস্তিত্বের থেকে অস্তিত্বহীন হওয়া ঢের ভালো।
জোহরা ঠিকই বলেছে। যে মেয়েকে সামান্য একটা কলম কিনে দেওয়ার সামর্থ্যও আমার নেই, আর যাই হোক তাকে আমি শাসন করতে পারি না। মা-মেয়ে মিলে সংসারটাকে টিকিয়ে রেখেছে এখনও। আমি কেবল বোঝা হয়ে ওদের টানাটানির সংসারের জোয়ালটা আরও ভারী করে তুলেছি। চোখ ভর্তি অন্ধকার নিয়ে ঈশ্বরের কাছে ওদের আলোকময় জীবনের প্রার্থনা ছাড়া আর কিছুই করার নেই আমার। অথচ জোহরা আমাকে দোষী করল। আমি নাকি মেয়ের ভালো সহ্য করতে পারি না। আমি তো শুধু ছেলেটার পরিচয় জানতে চেয়েছিলাম। ঘটনার সূত্রপাত সেই সকাল বেলা। আমাকে সাথে নিয়ে বাজার করে ফিরছিল মহুয়া। মাথার মধ্যে তখনও মাছ বাজারের সেই মাছ-ওয়ালার চিৎকার ঘুরপাক খাচ্ছে, “আপা, নিয়্যা যান। তাজা ইলিশ।” সাহস করে মহুয়াকে বলেছিলাম, “মাছটা নে না মা। অনেকদিন খাওয়া হয় না।”
“তুমি পাগল হয়েছ বাবা? এজন্যই তোমাকে নিয়ে বাজার করা যায় না। নিজে তো কিছু করই না। তার উপর......” ওর বিরক্ত কণ্ঠে আমার লোভী ইচ্ছেরা লুকানোর পথ খোঁজে। চোখ তো বিধাতাই বন্ধ করে দিয়েছেন। আপাতত মুখটাও বন্ধ করে মেয়ের হাত ধরে পথ চলি। রিকশায় ওঠার আগে আমাকে রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে ও কোথায় যেন গেল। কিছুক্ষণ পরে বুঝলাম একটু দূরে দাঁড়িয়ে ও একটা ছেলের সাথে কথা বলছে। ছেলেটা ওকে বিকালে দেখা করতে বলছিল। মহুয়া ফিরে আসলে ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “কোথায় গিয়েছিলি?” ও বলল, “কিছু না বাবা। টাকা ভাংতি করে আনলাম।” বাড়ি ফিরে জোহরাকে এসব কথা বলার পর সে রেগে গেছে। তার মতে বসে থেকে থেকে মনের মধ্যে কুচিন্তা বাসা বেঁধেছে আমার।
এখন এই সন্ধ্যায় মনের মধ্যে বাসা বাঁধা চিন্তা বা কুচিন্তা যাই হোক, বড় বেশী জ্বালাচ্ছে। শিরা উপশিরায় বয়ে চলা ব্যর্থতা সূচের মত বিঁধছে চামড়ার নিচ দিয়ে। যদিও চামড়ার পুরুত্ব তীব্র তিরস্কারের চাবুকে আজ প্রায় পশুর চামড়ার সমান। একসময় খুব বেশী স্বপ্ন দেখতাম। তাই বুঝি শাস্তি-সরূপ চোখের আলো কেঁড়ে নিলেন বিধাতা। পোড়া চোখ আজ আর স্বপ্ন দেখে না। কেন বেঁচে আছি? হয়তো মৃত্যুর জন্যই। ভাঙা চেয়ারে হেলান দিয়ে সেই সময়ের জন্য প্রার্থনা করতে গিয়ে চোখদুটো জলে ভরে গেল। জানি না, অশ্রুর রং এখন কালো কি না।
সেই রহস্যময় পায়ের শব্দ আবার পাচ্ছি। কে এভাবে পিছু পিছু ঘোরে আমার? সে কি আমার কান্নায় বিরক্ত হয়? নাকি করুণা হয় তার? সাহস করেই জিজ্ঞেস করলাম, “কে?” মিষ্টি গলায় কেউ বলল, “কেমন আছো বাবা?” রাতুল। আমার রাতুলের কণ্ঠ। ফিরে এসেছে ও। চোখের জল এখন খরস্রোতা নদী। আমার হাঁটুতে মাথা রেখে শুরু হল ওর গল্প বলা। ও বলল, “মেঘ দেখবা বাবা?”
-আমি দেখতে পারি না রে।
-কে বলেছে? আমার হাতটা ধর। চল, তোমাকে আজ মেঘ দেখাব।
রাতুলের হাত ধরলাম। ওর সাথে মেঘ দেখলাম দুচোখ ভরে। মেঘের উপরে গিয়ে রংধনুও দেখে এলাম। রঙগুলো এখন বাড়াবাড়ি রকমের উজ্জ্বল। ভাঙা চেয়ারে আমার নিথর দেহকে জড়িয়ে অঝোরে কাঁদছে জোহরা আর মহুয়া। আমার সাদা পাঞ্জাবীর উপর গড়ানো অশ্রুবিন্দুতে কোন কপটতা নেই। আলোর ঝলকানিতে দুচোখ ঝলসে যাচ্ছে। কালো মেঘের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সব আলো খুঁজে পেয়েছি আজ। হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নগুলো মেঘ হয়ে হুড়মুড় করে ভেসে যাচ্ছে নীলাকাশে। আমি ইচ্ছেমতো গড়াগড়ি খায় সেই রঙিন মেঘে।
লেখক রি )০(
- রি )০( -এর ব্লগ
- ২২ টি মন্তব্য
- ২৩ মে ২০১২, ১১:২৪
- গল্প
প্রিন্ট করুন
- ২২ টি মন্তব্য
-
রব্বানী চৌধুরী২৩ মে ২০১২, ১১:৪৫
" সময় উড়বেই। তা প্রজাপতির ডানায় আঁকা থাকুক, আর শকুনের পালকের ভাজে লুকানো থাকুক। একদিন আমাকেও নিয়ে যাবে সে। যেমন বাকি সব কিছু অন্ধকারে ডুবিয়ে সাদা রঙটুকু চুলে ঢেলে দিয়েছে। কিন্তু কোথায় নিয়ে যাবে সে আমায়? ভালো, মন্দ কাজের জন্য বিধাতা স্বর্গ, নরক রেখেছেন। "
ভালো লাগলো গল্পের লাইনগুলি।
গল্পটাই ভালো লেগেছে।
অনেক ধন্যবাদ। শুভেচ্ছা রইল। ভালো থাকবেন। -
মুক্তমন৭৫২৩ মে ২০১২, ১১:৫৭
খুব সুন্দর লেখাটি। কমেন্ট করবার আগে আমি আপনার প্রথম পর্বটি পড়ে নিলাম। সত্যি অনেক চমৎকার লিখেছেন। প্রচণ্ড আবেগে লিখা, তা পড়লেই বুঝা যায়। শুভ কামনা রইল। আর নামটি বদলে দেবার জন্য এখন আরও অনেক সুন্দর হয়েছে। ভালো থাকুন সবসময়। -
জিনজির২৪ মে ২০১২, ০৩:২৯
হৃদয়ে তার কত কথা
হতাশার মিষ্টি ব্যথা,
বহুদিন সে দেখেনা
রোদ নাকি সোনা
তাইত,
হৃদয় আজ হয়েছে বোবা।
কতদিন, কতদিন ছুই না চাঁদের আলো
তোমরা বল তারে ভালো,
আহা, একটু খানি আনো
আমার জন্য ভালবাসার আলো।
আফসোস,
একটুও পাই না তারে বাগে
দুষ্টু হাতের তলে,
কতদিন, কতদিন আগে
চোখ দুটি হারিয়েছিলাম, অকালে।
খুব ভাল লাগল দেবী আপনার গল্পটি। শুভেচ্ছা রইল। -
জিনজির২৪ মে ২০১২, ২১:০৫
আপনার লেখাটা পড়ার পর!!!
মনটা হঠ্যাৎই বেকুব ধরনের কবি হয়ে গেল। তাই................
খুব সুন্দর হয়েছে আপনার লেখা।





নীতিমালা
ব্লগ বই
অভিযোগ
সাম্প্রতিক পোস্ট

ফনেটিক
ভাল থাকবেন।