বুক পকেটে একটা ছবি-অখন্ড (বিয়েতে অরুচি পুরুষদের জন্য উদ্দেপক গল্প)

অফিসের কাজের ক্লান্ত অবসরে আমার বুক পকেট থেকে মাঝে মাঝে একটা ছবি দেখি। ছবিটা মানিব্যাগে রাখার ভরসা পাইনা। অনেক কার্ড, খুচরো পয়সার আঘাতে ছবির মুখটা যদি রাগ করে বসে। ছবিটা রাখি আমার বুক পকেটে, হৃদয়ের ঠিক কাছাকাছি। চা খাওয়ার অবসরে, ট্র্যাফিক জ্যামে আটকা আমার স্থির গাড়িতে বসে আমার হৃদয়ের কাছ থেকে ছবিটা চোখের সামনে নিয়ে আসি। ওকে দেখি, ওর স্মিত হাসি, নির্বাক ঠোঁট, অপলক দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে থাকা, সেই একই ছবি। কিন্তু ক্লান্তি আসেনা কখনও। চায়ের ক্যাফেইনের মত প্রতিবার একই স্বাদ, সেই একই ছবি দেখি প্রতিদিন। চা আমার শরীরকে সজীব রাখে, আর ছবিটার ক্যাফেইন আমার মনকে সজীব রাখে। প্রতিদিনের বাঁচার সুখে ছবিটার মানুষের কাছে ফিরে যাই বার বার।
প্রতিদিনের অভ্যেসমত চা খাওয়ার অবসরে আজও ছবিটা দেখছিলাম। ঠোঁট গরম পেয়ালা ছুঁয়ে যাচ্ছিল, চোখ কোটিবার দেখা একই চোখের দিকে তাকিয়ে। এর মধ্যে কখন যে আমার সহকর্মী রাহুল এসে দাঁড়াল টেরই পাইনি। কিছু বোঝার আগেই আমার হাত থেকে ছো মেরে ছবিটা নিয়ে নিল।
-“এমন বিকশিত মুখ হাতে কেন বন্ধু। একে তো সারাজীবন হৃদয়ের ফ্রেমে বেঁধে রাখতে হয়। একে কি কখনও তোর ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে হয়না?”
আমি রাহুলের কাছ থেকে ছবিটা নিয়ে হৃদয়ের কাছে রেখে দিলাম।
-“সে অনেক কথা বন্ধু। একটু পরেই মিটিংয়ে যোগ দিতে হবে। কাল তো ছুটির দিন। কাল বিকালে তোর বাসায় যাব। তোকে বলব বৌদি বাদ যাবে কেন?”
পরদিন বিকালে রাহুলের বাসায় গেলাম। অনুপমা বৌদি দরজা খুলেই কৌতুহল গোপন করতে না পেরে, -“তা ভাই ছবি বুকে নিয়ে ঘুরে বেড়ান আর আমরা খবর জানিনা। ব্যাপার কি বলেন দেখি?”
আমি স্মিত হাসি হেসে অনুপমা বৌদিকে থামালাম, “বলছি, বলছি। যাও আগে চায়ের আড্ডা বসাও। তোমার বানানো পিঠাগুলো গরম করে আনো।”
-“আহা আগে বল। নইলে দেখবে চায়ে চিনি হয়নি। পিঠা পুড়ে ছাই।”- বৌদির অস্থিরতা স্পষ্ট।
আমরা তিনজন ওদের বেডরুমে বসলাম। আমি বলা শুরু করলাম। পাশে দুজন মুগ্ধ মনযোগী শ্রোতা আমার দিকে তাকিয়ে।
ওর নাম নীলা। আমার বাগানের একমাত্র ফুল। উত্তরাঞ্চলে দুর্গাপুর নামে একটা গ্রাম আছে, ওকে সেই বাগান থেকে নিয়ে এসেছি। অফিসের কাজে একদিন ওদিকে যাচ্ছিলাম। পথিমধ্যে হঠাৎ আমার গাড়ি নষ্ট হয়। ড্রাইভারকে গ্যারেজের খোঁজে পাঠিয়ে আমি অন্যমনস্কভাবে রাস্তায় পায়চারী করছিলাম। হঠাৎ দু’টো হাত আমায় জাপটে ধরে রাস্তার পাশে পড়ে গেল। কিছু বুঝে উঠার আগেই আমি জ্ঞান হারালাম।
যখন জ্ঞান ফিরল তখন দেখি একটা কুঁড়েঘরে শুয়ে আছি। রাত প্রায় শেষ, কাছেই কোথাও আযানের ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। চোখ মেলে দেখে একটা পরী আমার শিয়রে বসে পাখা নাড়ছে। ঘুমের ভারে নিদ্রালু মেয়েটি আমায় চোখ মেলতে দেখে কি একটা মায়াবী হাসি হেসে উঠল। দেখে মনে হল চাঁদটা বুঝি সত্যি সত্যি আমার কপালে টিপ দিয়ে আমার ঘুম ভাঙ্গাতে পেরে এত্ত খুশি। চাঁদ কি খুশি হলে এত্ত সুন্দর করে হাসতে পারে? এ যেন বাচ্চাদের টোল খাওয়া গালে কি স্নিগ্ধ, কি মিষ্টি হাসি। হাতের নাগালে চাঁদের মত একখানা মুখ। ছুঁয়ে দেখব নাকি? না থাক, স্বপ্ন ভেঙ্গে যাবে।
আমায় জাগতে দেখে চাঁদটি দূরে সরে যেতে থাকে, একসময় মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়ল। চাঁদের পিছু নেব কিনা ভাবার আগেই মেঘের আড়াল থেকে, পাশের একটা খুপড়ির আড়াল থেকে এক বৃদ্ধা বের হয়ে আসে।
-“কাল রাস্তায় তুমি ওভাবে অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটছিলে কেন বাবা? পিছন থেকে একটা ট্রাক বেপড়োয়া গতিতে ছুটে আসছিল তোমার দিকে। আমার পাগলী মেয়েটা তোমায় ধাক্কা দিতে গিয়ে সামলাতে না পেরে রাস্তার পাশে পড়ে গিয়েছিল। গত সপ্তাহেই ওখানে ট্রাক চাপায় ওর চোখের সামনে একজনকে মরতে দেখেছিল। তোমার এখন ভালো লাগছে তো? মা নীলা, বাবুকে খাবার দে।”
বৃদ্ধা একসাথে বলে গেলেন কথাগুলো। আমি পরীর রাজ্য থেকে বাস্তবে ফিরে এলাম। পরীটা সত্যি, কিন্তু এই পরীর বাস এই কুঁড়েঘরে। যে মেয়েটা আমায় নতুন প্রাণ দিল, যে রাত জেগে সেবা দিল, আবার সেই পরী ই ঘুমের ক্লান্তি ছাপিয়ে আমার জন্য রান্নাঘরের আগুনে পুড়ছে। একটা মেয়ে আর কত্তভাবে আমায় ঋণী করে ফেলবে?
পৃথিবীর কোন মানুষই ঋণমুক্ত নয়। কেউ টাকার ঋণী, কেউ অর্থের ঋণী; কেউ ভালবাসার ঋণী, কেউ স্নেহের ঋণী। আমার আর্থিক কোন ঋণ নেই। কিন্তু এই মেয়েটা আমায় যে ঋণে ঋণী করছে তা শোধ করার ক্ষমতা আমার নেই। জীবনে কিছু ঋণের বোঝা হয়ত বয়ে বেড়াতেই হয়।
অনেক খোঁজাখুঁজির পর ড্রাইভার আমার সন্ধান পেল। দুপুরে এই কুঁড়েঘরে খেয়েই আমরা রওনা শুরু করলে একদল লোক আমাদের পথ আগলে দাঁড়ায়।
-“আপনার এই মাইয়াডারে লইয়া তাইলে এই ব্যবসা শুরু করছেন। মাষ্টার মানুষ ছিলেন বইল্যা সম্মান করতাম। এহন দেখছি.................. ইত্যাদি, ইত্যাদি। এর তো একটা বিহিত করতেই অয়।”
এই লোকগুলোর অকথ্য, মিথ্যা আঘাতে বৃদ্ধা ভেঙ্গে পড়লেন। তার ভাঙ্গা কুঁড়েঘরের সামনে বৃদ্ধা বসে পড়লেন। নীলা ওর বাবাকে আগলে ধরে। ওর সজল চোখে মিনতি,
-“তোমরা ওরকম বলনা। যে বাবা সারাজীবন শিক্ষার আলো ছড়িয়ে গেছেন এই শেষ বয়সে তার কুঁড়েঘরে অন্ধকার কালো তিনি ডেকে আনবেন কোন দুঃখে।”
যে ঘর চাঁদের আলোয় আলোকিত থাকে সবসময়, বাইরের কালোর সাধ্য কি সে ঘরে ঢোকে। কিন্তু এই মুর্খের দলের ওর চোখের ভাষা বোঝার ক্ষমতা নেই। ওদের ভাষা আরও অশ্লীল থেকে অশ্লীলতর হতে থাকে।
আমি কি করব ভেবে পাইনা। জগৎ সংসারে আমার কেউ নেই। এই বৃদ্ধা, এই নীলা আমায় যে ঋণে ঋণী করেছেন তা শোধরানোর সামর্থ্য আমার নেই। এদের সেবা, এদের স্নেহ, এদের ভালবাসার সাথে এদের সম্মানটুকুও কি আমি নিয়ে নেব? বিনিময়ে এই মিথ্যে কলঙ্কের বোঝা এদের ঘাড়ে দিয়ে যাব? এই বৃদ্ধা এই বয়সে এ বোঝা বইতে পারবে তো? আচ্ছা, এই হত দরিদ্র স্কুল মাষ্টারের কাছে ওর শেষ সম্বল ওর সম্মানটুকুর জন্য আবার হাত পাতব? আমার লজ্জা করবে না? এরকম একঝাক প্রশ্ন পাখির মত আমার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেললাম।
সে সন্ধ্যার লগ্নেই নীলার সাথে আমার বিয়ে হয়। ওকে নিয়ে আমার বাড়িতে উঠলাম। তুমি তো জানই সংসারের সবকিছুই আমার বাড়িতে আছে। অনুপমা বৌদি তন্ময় হয়ে আমার কথা শুনছিল। আমি থামতেই অনুপমা বৌদির বিদ্রুপ হাসি, “তাই বুঝি নতুন বৌয়ের ছবি বুকে নিয়ে ঘুরে বেড়ান?”
আমি আবার শুরু করলাম,
-“দেখ বৌদি, ছোটবেলা থেকেই আমি একা একা মানুষ। আমার বাড়িতে আসবাবের অভাব নেই, অর্থের অভাব নেই। কিন্তু তাতে কোন প্রাণের স্পন্দন, ভালবাসার স্পর্শ ছিলনা, বড্ড একা লাগত। মাঝ রাতে জানালা গলে আসা চাঁদের আলো দেখতাম। আর সেই চাঁদকে আমার ঘরে পেয়ে একটা অস্থির সুখ আমায় উন্মাদ করে তুলেছিল।”
বাসর রাতে নীলার ঘোমটা খুলে ওকে দেখে বুকে একটা কাঁপন শুরু হয়ে গেল। চাঁদের মত মুখখানা মেঘে ঢাকা; অবিরাম বর্ষনে চাঁদটা যেন একটু ম্লান হয়ে পড়ছে। আমি ওকে ছুঁয়ে দিতেই সকাল বেলার অদ্ভুত সুন্দর হাসির মেয়েটা আমার পায়ে লুটিয়ে অস্ফুট কান্না শুরু করে দিল। আমি কিছু বুঝে উঠতে পারলাম না। ওকে তুলে স্থির করে বসালাম। ও আমার বুকে মাথা রেখে আমার হাতে একখানা কাগজ তুলে দিল।
কাগজে লেখা ছিল,
“তোমাকে বার বার বলতে চেয়েছি কিন্তু বিধাতা আমায় সে ক্ষমতা দেননি। তোমাকে বার বার ইশারায় কাছে ডেকেছি, তুমি আমার ডাক শোননি। জানি, আমাকে ক্ষমা করতে পারবে না। ক্ষমা আমি চাইনে। স্ত্রীর মর্যাদা না দাও, তোমার পায়ে একটু ঠাই দিও।”
আমার সমস্ত উৎসাহ, আমার পৃথিবীর আলো, বাসর প্রদীপ হাতে নিয়ে আমার অপেক্ষারত প্রতিমা। একটা দমকা বুনো বাতাস যেন আমার সব আলো, সব প্রদীপ নিভিয়ে দিয়ে আমায় একটা অন্ধকার সুগভীর কুয়োয় ফেলে দিল। আমি অন্ধকার গভীরে তলিয়ে যেতে থাকি আর একটা প্রেত ধ্বনি আমার কানের কাছে অস্থির চিৎকার করে যাচ্ছে,
আমি নীলার দিকে তাকাই। ওর কথাগুলো বলতে পেরে, বর্ষণ শেষে আকাশ মেঘমুক্ত। তবু অন্ধকার কাটেনি। মায়াবী দু’টো চোখ আমার চোখের ভাষা পড়তে চেষ্টা করছে। উৎকণ্ঠা কাটিয়ে ওর শুষ্ক দু’টো ঠোঁট স্থির হতে পারছে না। ওর কাঁপা ঠোঁটে, মায়াবী চোখে শুধুই ক্ষমা প্রার্থণা।
কিন্তু আমার চাপা ক্ষোভ, ক্রোধ লুকিয়ে রাখতে পারিনা। ওকে বুক থেকে ছুঁড়ে ফেলে আমি বিছানায় পাশ ফিরে শুয়ে পড়ি। আমার কেবলই মনে হতে থাকে ঐ বৃদ্ধা, এই চালাক মেয়ে আমায় মায়ার জালে ফেলে ঠকিয়েছে। আমার নির্বাক পৃথিবীটাকে আরও বোবা করে দিয়েছে।
সকালে স্নান সেরে নীলা আমার জন্য চা নাস্তা করে আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলে। আমার অভ্যস্ত চোখে আমার অবিন্যস্ত ঘর না দেখে অবাক হলাম। সবই পরিপাটি করে সাজানো। এ বড় সুক্ষ্ম হাতের কাজ।
যেন কাল রাতে ওর আকাশে বৃষ্টি হয়নি। যেন আমি ওর হৃদয়ের ভেজা মাটিতে ইচ্ছে করেই লাফিয়ে লাফিয়ে পদাঘাতে কর্দমাক্ত করে দেইনি।
কিন্তু এ ঠোঁটে শব্দ নেই জেনে মুহুর্তের মুগ্ধতা শূন্যে মিলিয়ে গেল। আমি চা টা খেয়ে আমার মত করে রেডি হয়ে ওকে একা রেখে অফিসে চলে গেলাম।
অফিস থেকে ফিরলে ও স্মিত হাসি হেসে দরজা খুলে দিত। ঘরে ঢুকলেই আমার টাই জামা খুলে দিতে এগিয়ে আসত। আমি ওকে কাছে ঘেষতে না দিয়ে নিজের কাজ নিজেই করে নিতাম।
এভাবে সপ্তাহ খানেক কেটে গেল। একদিন অফিস শেষে এক বন্ধুর বাসায় গিয়ে রাতে আর ফিরতে পারলাম না। বাসায়ও খবর দেয়া হয়নি। পরদিন অফিস শেষে বাসায় ফিরে দরজার কলিং বেল টিপলাম।
ভিতর থেকে সম্ভবত দৌড়ে এসে নীলা দরজা খুলল। আমার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। আমি লক্ষ করলাম ওর মলিন মুখ, চোখের নীচে কালির রেখা। অনাহারে কাঁদতে কাঁদতে মেয়েটা নিজের শেষ শক্তিটুকু হারিয়ে ফেলেছে। আমার হাত ধরে ও আমাকে ভিতরে নিয়ে আসল যেন আমি ওর কত আপন, কত কাছের।
কান্না যেন দু’মুখো আয়না। এর একপাশে আনন্দের কান্না, অন্যপাশে কষ্টের কান্না। কষ্টের শেষে নীলাকে আনন্দের কান্না কাঁদতে দেখে ভাল লাগছে। আমি ওর চাঁদমুখ দু’হাতে নিয়ে চাঁদের কপালে চুম্বন টিপ এঁকে দিলাম। আমার আকাশে অবহেলিত চাঁদের কপালে ভালবাসার প্রথম টিপ। চাঁদের কান্না তাতে থামে না, বরং বাড়ে। আমি ওর কান্না থামাই না। ওকে কাঁদতে দেই। আজ যে নীলা শেষ কান্না কাঁদবে।
এরপর থেকে নীলাকে অবহেলা করার সাহস আমার হয়নি। অদ্ভুত একটা মায়া ও আমার চারপাশে ছড়িয়ে রাখে। নীলা পায়ে নুপুর পড়ে সারা ঘর এমনভাবে ঘুরে বেড়ায় যেন ওর নুপুর ওর হয়ে কথা বলে, “আমি তোমার সাথে আছি প্রিয়, বুকে হাত রাখ। দেখ ওখানে ধুক ধুক করছি আমি।”
মেয়েটা অদ্ভুত সুন্দর করে হাসতে পারে। বিধাতা যাকে এরকম সুন্দর হাসি দিয়েছেন তাকে শব্দ করে কথা না বললেও চলে। ওকে কথা বলতে হয়না, ওর চোখের দিকে তাকালেই আমি বুজতে পারি ও কি বলতে চাইছে। ওর ইশারা যেন শব্দের চেয়েও সুন্দর। ওর চোখ, ঠোঁট, কিংবা ভ্রর ভঙ্গিমা এমন কৌতুক রস সৃষ্টি করে যে আমি হেসে লুটোপুটি। আমার সাথে ওকে ওর মত করে হাসতে দেখে বড় ভালো লাগে। ওর স্নিগ্ধ কোমল দু’টো হাত হঠাৎ যখন গলা জড়িয়ে আমার একাগ্রতা ভেঙ্গে আমার গালে চুমু খায় তখন ওর স্পর্শ সুখ আমায় মুগ্ধ, মাতাল করে দেয়।
সকাল বেলা স্নান সেরেই ও সিঁদুরের কৌটো নিয়ে আমার ঘুম ভাঙ্গাবে। আমি গোল করে সিঁদুর পড়াতে পারিনা। তবু প্রতিদিন আমার স্বামিত্বের চিহ্ন ওর কপালে এঁকে দিতেই হবে। আমি খুব মনযোগ দিয়ে চেষ্টা করি কিন্তু দুষ্ট মেয়েটা মাথা নাড়ে। লাল সিঁদুর ওর কপাল লাল করে দেয়। ও তেড়ে এসে ওর কপাল আমার ঘাড়ে, কপালে, গালে ঘষে যেন সব দোষ আমার, আমি ওর সিঁথি লাল করে দিয়েছি। আমিও ওর রংয়ে রাঙ্গা হয়ে নতুন দিন শুরু করি। আমায় রাঙ্গাতে পেরে ওর খিলখিল হাসি। এরকম একটা স্নিগ্ধ গোলাপ আপন মনে ফুটতে দেখে আমার দিন শুরু হয়।
শোবার ঘরের দেয়ালে একটা সাদা বোর্ড গাথা আছে। নীচে টেবিলের উপর মার্কার, সাদা ছোট ছোট কাগজ, কলম রাখা থাকে। নীলা যে কথাগুলো প্রকাশ করতে পারত না বোর্ডে লিখে দিত। এমন ভাব দেখাত যেন ও আমার মাষ্টারনী। ওর দুষ্টমীতে আমি মুগ্ধ হয়ে থাকি। ছোট্ট চিরকুটে মাঝে মাঝে দুষ্টো দুষ্টো কথা লিখে আমার হাতে ধরিয়ে দেয়।
অফিসে কিংবা বাইরে যাবার আগে আমার দিকে মাঠে এগিয়ে দেবে নীলা। ওর সিঁথিতে ঠোঁটের স্পর্শ দিয়েই তবে বের হতে দেবে আমাকে। ও প্রতিবার ঘর থেকে বের হওয়ার সময় আমার হাতে একটা চিরকুট ধরিয়ে দেবে। যাতে লেখা থাকে---
-“এই শোন। তাড়াতাড়ি ফিরো। আমার বড় একা লাগে।”
-“আমাকে ভুলে যেওনা কিন্তু।”
-“সাবধানে গাড়ী চালাবে, আমার কথা মনে রেখ।”
ইত্যাদি মিষ্টি মিষ্টি কিছু কথা। ওকে তোমাদের এখানে আজকে নিয়ে আসতে চেয়েছিলাম। ও লিখলো, “আজ আমার অনেক কাজ। তার চেয়ে তুমি ওদের একবার নিমন্ত্রণ করে এস। ওরা আমাদের নতুন সংসার দেখে যাবে।”
প্রতিদিনের অভ্যেসমত নীলা আজও আমা ঠোঁট স্পর্শিত আদর নিয়ে আজকে তোমাদের এখানে বের হওয়ার সময় এই চিরকুটটি ধরিয়ে দিয়েছিল। আমি চিরকুটটি অনুপমা বৌদির হাতে দিলাম। যাতে সুন্দর করে গোটা অক্ষরে লেখা ছিল,
-“প্লীজ লক্ষ্মীটি। আমার নামে বাড়িয়ে বলনা।”
না বৌদি, বাড়িয়ে কিছু বলিনি। হৃদয়কে শব্দ দিয়ে টেনে বাইরে বের করার মত ক্ষমতা আমার হাতে নেই। ও ঠিক ছবির মতই আমার হৃদয়ে স্থির থাকে। ওখান থেকে ওকে টলানোর কেউ নেই। কখন যে আমার আত্মা ওর সাথে মিশে একাত্ম হয়ে গেছে টেরই পাইনি। ও আছে বলেই তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করে। অফিসে বসেও সারাদিন ক্লান্তি আসে না যখন ভাবি অপেক্ষায় আছে কেউ যে আমার সব ক্লান্তি দূর করে দেবে। মনের মধ্যে কিছু শব্দ কেবলই ঘুরে ফিরে আসে-
সারাদিন অফিস। রক্তঘাম করে মাস শেষে কিছু টাকা।
এ উপার্জন কার?
সন্ধ্যা রাতে যখন বাসায় ফিরে দেখি অপেক্ষায় আছ তুমি।
তখন বুঝি এ সবই তোমার।

উৎসর্গঃ যে মেয়েটি নারী হবার আগেই আমায় চুমু খেয়েছিল। আমায় হনুমান বানিয়ে নিজে হয়েছিল হনুমতি। সে ক্ষণজন্মা বুড়ি মেয়েটিকে যে সাত বছর বয়সে হারিয়ে গেছে না ফেরাদের ভীড়ে।
আমার প্রথম প্রেম, বাল্যবন্ধু সৃষ্টি সরকার কে।
লেখক অনিন্দ্য অন্তর অপু
- অনিন্দ্য অন্তর অপু -এর ব্লগ
- ৬৪ টি মন্তব্য
- ১০ এপ্রিল ২০১২, ১৭:৪৩
- গল্প
প্রিন্ট করুন
- ৬৪ টি মন্তব্য
-
লুৎফুন নাহার জেসমিন১০ এপ্রিল ২০১২, ১৭:৫২
খুব খুব সুন্দর । আর কিছু বলতে ইচ্ছে করছে না । মন টা ভাল লাগায় ভরে গেল । -
স্যাম আহমেদ্১০ এপ্রিল ২০১২, ১৮:১৩
খুব সুন্দর ভালবাসায় ভরপুর একটা গল্প উপহার দেয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ অপু ভাই। অনেক অনেক শুভেচ্ছা আপনাকে। ভালো থাকবেন। -
পাহাড়ী১০ এপ্রিল ২০১২, ১৮:২৫
মুগ্ধ ..............................।

অনিন্দ্য ... অনেক শুভেচ্ছা
কিছু শব্দ দিয়ে শেষ করলাম বলে মনে করোনা কম ভালো লেগেছে...আমি আসলে মনে হয় ভাষা হারিয়ে ফেলেছি......।।
-
সফেদ কুহেলি১০ এপ্রিল ২০১২, ১৮:৪২
অপু শুভেচ্ছা রইল।
একসাথে করে দেবার জন্য ধন্যবাদ।
সুন্দর সমাপনি ভাল লাগল।
ভাল থাকো প্রিয় -
আলইমরান ১০ এপ্রিল ২০১২, ১৯:৩০
ভাগ্য ভালো অপু ভাই, যে নীলা কথা বলতে পারে না। নইলে দুজনের কপালেই দুঃখ ছিল।

-
আলইমরান ১০ এপ্রিল ২০১২, ২১:৫৩
এইযে, খালি ভাবির ডর দেহান, এই জন্যই বিয়া করন উচিৎ না। করলেও নীলার মত মেয়ে বিয়া করা দরকার......

-
আলইমরান ১০ এপ্রিল ২০১২, ২২:০৯

আমার নাম ইমরান। আপনি চাইলে ইমু বলতে পারেন, ব্লগের অনেকেই বলে।
আর আপনার ভাবির এই ব্লগে নিক হচ্ছে আফরোজা ববি। সিনিয়র প্রায় সবাই আমাদের চেনে।
চার বছর প্রেম করে, ৬.৫ বছর ধরে সংসার করছি। বুঝতেই পারছেন।
আমি এবং আমার স্ত্রী

আমার একমাত্র মেয়ে। ও এখন স্কুলে পড়ে। -
আলইমরান ১০ এপ্রিল ২০১২, ২২:২৩
কোন সমস্যা নাই। জাস্ট চলে আসবেন। নিজের প্রশংসা নিজে করতে চাই না..
কথায় নয় কাজে প্রমান করে দেব। -
নীলশালুক১০ এপ্রিল ২০১২, ২০:০২
অপু ভাই, ভালো তো? আজ নতুন এসেছি, সবাইকে এক চক্কর করে দেখে নিচ্ছি, যাকে ভাল লাগছে সেখানে কমেন্ট করছি, আশা করবো পাশে পাবো আপনাকে। -
সাজ্জাদ হোসাইন ১০ এপ্রিল ২০১২, ২০:৩৩
কি বলবো-
শুধু বলি ভালো লেগেছে।
আর একটু বলতে পারলে ভালো লাগতো-
কেন জানি মজবুত শব্দের দেখা মিলছে না।
শুভেচ্ছা রইল







-
বাউন্ডুলে তীর্থ১০ এপ্রিল ২০১২, ২১:৩৩
দাদা.. আপনার সাথে আমার একটা দরবার হাওয়া দরকার..
একটু প্রয়োজনে দেখা করতে চাই..
আপনি ফেসবুকে আমায় একটা রিকোয়েস্ট পাঠাইয়েন..
বাউন্ডুলে তীর্থ নামে আইডি আছে...
আপনার গল্পটি নিয়ে আমি একটা কাজ করতে চাই প্লিজ একটু যোগাযোগের ব্যবস্থা কইরেন -
প্রদীপ্ত প্রদীপ১০ এপ্রিল ২০১২, ২২:৫৫
পুরোটা এখনো পড়া হয় নি ভাইয়া, পড়ে নেব।
শুভেচ্ছা আপনার জন্য.......। -
নেফারতিতিবাংলা১১ এপ্রিল ২০১২, ০০:১৭
ওরে বাপরে,শেষ পর্যন্ত পুরোটা পড়লাম।এবার শান্তি লাগছে।
খুব ভালো লিখেছেন।
-
মোরশেদ আলম১১ এপ্রিল ২০১২, ১০:২৩
কি বলে express করবো ভেবে পাচ্ছিনা।আবেগটা ঠিক ভাবে প্রকাশ করেছেন।এগিয়ে যান....... -
আফসানা১১ এপ্রিল ২০১২, ১১:৫০
হুম....ভাগ্যিস তোমার ভাইজান এই ব্লগে আসে না, তাইলে মনে মনে বলত আহারে আমার বউটা যদি এরকম চোখের ভাষায় কথা বলত (মানে যদি মুখে শব্দহীনা হত)


লেখা অনেক ভালো হয়েছে। অবশ্য তোমার লেখার শেষ টা এরকমি তো হবে
। পরের লেখার আশায় থাকলাম। -
রি )০(১২ এপ্রিল ২০১২, ০৭:০৬
সব পর্ব একসাথে পেয়ে মজা করে পড়লাম।
সুন্দর ভালবাসার গল্প। আপনার গল্পের জন্য স্নিগ্ধ ভালো লাগা। -
জিনজির১২ এপ্রিল ২০১২, ২২:১০
অনেক পরে পড়লাম। কিছু কিছু তো পড়া ছিল। খুবই ভাল লাগল অপু ভাই। অসাধারন। এরকম আরও গল্পের আশায় রইলাম। মনটা যদি একটু বদলায়!!! ভাল থাকুন।
-
সাম্প্রতিক পোস্ট
-
সাম্প্রতিক মন্তব্য





নীতিমালা
ব্লগ বই
অভিযোগ
সাম্প্রতিক পোস্ট

ফনেটিক